এবারে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি দুর্গা পুজো পড়েছিল। তারপর কালী পুজো পার হয়ে প্রায় অগ্রহায়ণ মাস পড় গেল। বাতাসে ভালো রকম শীতের শিরশিরানি, সন্ধের পরে হিম পরে। গায়ে তুষের চাদর জড়াতে হয়। মেঝেতে পা ফেলতে গেলে বেশ ঠান্ডা লাগে। এদিকে রোগীর অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এত যত্ন করা সত্বেও শরীরের নানা জায়গায় ঘা হয়ে রস গড়াচ্ছে। পচা গন্ধে ও ঘরে টেঁকা দায়। দরজা খুললেই বিকট দুর্গন্ধ ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানদা পর্যন্ত ঝাঁট দিতে বা মুছতে ও ঘরে ঢুকতে চায় না। বাধ্য হয়ে কঙ্কাকেই সে কাজ গুলো করতে হয়। খুব জোরে ডাকাডাকি করলে রোগী চোখ কখনো কখনো খুলছে বটে কিন্তু সে ঘোলাটে চোখের কোন দৃষ্টি নেই, ভাষা নেই। তাঁর চেতনা কোন অতলে তলিয়ে গেছে কে জানে। কানের কাছে জোরে শব্দ হলে হয়ত অভ্যেস বসত চোখ খুলে যায়। কঙ্কা আর আমি প্রাণপনে শাশুড়ির বিছানা পরিষ্কার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন বাজারে একটা নতুন জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, জিনিসটার নাম অয়েল ক্লথ। কচি বাচ্চাদের ওর ওপর কাঁথা পেতে শোয়ালে বিছানা ভেজে না। আমাদের গ্রামে এই জিনিসটা এর আগে কখনো দেখিনি। শৈলেন বাবু ওই একটা কিনে এনে দিলেন। গ্রামে হয়ত এর ব্যবহার এখনো নেই। শহরে বাস করার সুবিধে অনেক। জিনিসটা পেয়ে আমরা যেন বেঁচে গেলাম। এর ফলে কাচাকাচিটা অর্ধেকেরও বেশি কমে গেল। কঙ্কা আজকাল শাশুড়ির পাশের ঘরে শুচ্ছিলো, দুটো ঘরের মাঝখানে দরজা। যেহেতু রোগীর নড়াচড়া একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে সে কারনে ওঁর ঘরে ঘুমানোর আর দরকার পড়তো না। পচনধরা শরীর নিয়ে একাই আসন্ন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন অচেতন মানুষটা। সংসারের মায়া মোহ, সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনার স্মৃতি কোন অতলে তলিয়ে গিয়ে শুধুমাত্র শ্বাসটুকুই তাঁর সম্বল হয়ে ছিল। ভাত জল দিয়ে চটকে চটকে লেই বানিয়ে একটা ঝিনুকে করে খাওয়াতে হতো, তার কতটা পেটে যেত আর কতটা গাল বেয়ে পড়ে যেত কে জানে। মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিলাম তিনি যেন এবার ওঁকে মুক্তি দেন। দিন গুলো এভাবেই বয়ে যাচ্ছিল।
এই সময়েই একদিন একটা কান্ড ঘটল। সেদিন সন্ধে বেলায় পুরুত ঠাকুর পুজো সেরে চলে যাওয়ার পর ঘরে ঘরে প্রদীপ দেখাচ্ছিলাম। বাড়িটায় অনেক ঘর, চওড়া চওড়া বারান্দা। প্রতিটি ঘরে কাচে বাঁধান লক্ষ্মী, দুর্গা, শিব, গণেশ ইত্যাদি ঠাকুর দেবতার ছবি টাঙানো আছে। প্রতি ঘরে গিয়ে সব দেবতাকে প্রতিদিন প্রদীপ দেখাতে হয়। শুধুমাত্র শৈলেন বাবুর ঘরে ঢুকি না। প্রদীপের দিকে চোখ নামিয়ে চলতে গিয়ে ভেতরের বারান্দার আধো অন্ধকারে কার সঙ্গে ধাক্কা লাগলো। কোনক্রমে টাল সামলে দেখি মানুষটা কঙ্কা, তাড়াহুড়ো করে হাঁটছিল। আমার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়েই গেছে বেচারী। খুব জোর লেগেছে। তাও তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে ওর হাত থেকে একটা লালচে বেগুনি রঙের কাগজ পরে গেল। আমি সেটা তুলতে যেতে ও আমার আগেই চট করে সেটা তুলতে গেল আর অসাবধানে কাগজটা থেকে একটা ঝলমলে কিছু মেঝেতে পড়ে গেল।
কঙ্কা কেমন যেন অপরাধীর মতো কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ও তুলল না দেখে আমি নিচু হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিলাম। জিনিসটা হাতে নিয়ে চমকে উঠলাম, প্রায় এক দেড় ভরির হার। এ হার ও কোথায় পেল! শাশুড়ির দেরাজ থেকে চুরি করলো? কিন্তু ও তো নিজে আমাকে বলেছে যে জ্ঞান পুরোপুরি যাওয়ার পর চাবিটা শাশুড়ির আঁচল থেকে খুলে শৈলেন বাবুকে দিয়ে দিয়েছে। তাহলে কী মিথ্যা বলেছে? কিন্তু ওর সামনে সেদিন মানদাও ছিল, সেও সমর্থন করে ঘাড় নাড়িয়ে ছিল । হতভম্ব হয়ে ওর দিকে চেয়ে ছিলাম সেই সুযোগে চট করে সেই হারখানা আমার হাত থেকে কেড়ে নিল।
— “কী এত ভাবছো সেজ বৌদিমনি, হারখানা আমি চুরি করেছি? তাই তো?”
গম্ভীর ভাবে বললাম, “এ হার তুমি কোথায় পেলে কঙ্কা? এ তো সোনার হার, বেশ ভারী আর দামি।”
ও বোধহয় মনে মনে উত্তর তৈরি করেছিল, একটু সময় নিয়ে উদ্ধত ভাবে জবাব দিল, “কেন আমার নিজের কি কিছুই থাকতে পারে না? এটা আমার বিয়ের গয়না।”
— “কিন্তু কঙ্কা তুমি তো নিজের মুখে আমার কাছে গল্প করেছিলে, বলেছিলে তোমার স্বামী মারা যাওয়ার পর তারা সব গয়না কেড়ে নিয়ে এখানে ফেলে গিয়েছিল? সে সব কথা কি সত্যি নয়?”
এবার ও একটু চুপ করে থাকলো, হয়তো নতুন কোন মিথ্যা খুঁজে পেল না । তার পর উত্তপ্ত স্বরে বললো, “এটা আমারই বুঝলে? যে কাজ করছো সেটা করো দিকিনি, সব খবর তোমার না রাখলেও চলবে। আজ একটা কথা তোমায় ভাল ভাবে বলে দিচ্ছি আমি যেমন তোমার কোন ব্যাপারে নাক গলাই না তেমনি তুমিও আমার কোন ব্যাপারে একদম নাক গলাবে না।”
কথা গুলো আমার মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে দুমদুম করে পা ফেলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আমি হাঁ করে ওর দম্ভ ভরে চলে যাওয়া দেখছিলাম। পিতলের প্রদীপটা খুব গরম হয়ে হাতে ছ্যাঁকা দিছিলো, আঁচল দিয়ে সেটাকে জড়িয়ে নিয়ে এগোলাম। শৈলেন বাবুর ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম তিনি চৌকাঠে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে এদিকেই চেয়ে আছেন। আমাকে দেখে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার কেমন যেন মনে হল এ ঘটনা উনি জানেন। উনি এ ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু কিভাবে এবং কেন সে উত্তর মনে এলেও প্রাণপণে সে চিন্তা সরিয়ে দিলাম। হে ভগবান, যা ভাবছি তা যেন না হয়।
ক্রমশ
আগের পর্বঃ পাপ – পর্ব ১৩



