পাপ-পর্ব ১

paap

বেশ কয়েকটা যুগ পার হয়ে গেল তোমাদের হিসেবে। প্রথম দিকে বিনির সঙ্গে দেখা হতো কিন্তু ও আর আসে নাকো। হয়তো বা নতুন কারো ঘরে গেছে নতুন করে বাঁচবে বলে  কিন্তু আমার যে কেন কোন গতি হয় না কে জানে। বিনি … আমাদের বিনি, চিরটা কাল মেয়েটা দাপিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছে। কারোর কোন বাধা  মানতে চাইত না। প্রচন্ড অবজ্ঞায় সব কটু কথা, নিন্দা সমালোচনা উড়িয়ে দিত। সব শাসন বাঁধনের ওপর পদাঘাত করে পায়ের তলায় মিশিয়ে দিত। ওর যা চাই তা ছিনিয়ে নিত। কারোর দয়ার দানের অপেক্ষা করতো না। প্রায়ই বলতো — কেন লা? সবার সব কতা শুনব কেন? নিজের কোন বিচের বুদ্ধি নেই নাকি? বানের জলে ভেসে এইচি নাকি আমরা? বাপ মায়ে জন্ম দিছে তাই তো ধরাধামে আসা নাকি? স্বেচ্ছায় তো এখানে মরতে আসিনি। যে যেমন ইচ্ছে বুঝিয়ে যাবে, যে যার খুশি মতো কাজ করতে বলবে আর আমি ঘাড় নিচু করে সব মেনে নেব এমনটি তো হবে না বাপু! আমি চলব আমার মতে, তা সে ভুল হোক বা ঠিক হোক। ভুল হলে সে কাজের দায় কারোর ওপর চাপাব না। কিন্তু কারও খ্যামতা নেই আমাকে দিয়ে জোর করে কিচ্ছুটি করানোর। তা সে বত্ত উপুস হোক বা ঘরের কাজ কিংবা পাড়ায় পাড়ায় বেরিয়ে বেড়ানো বন্ধ করা। যা করলে আমার ভাল লাগে কিন্তু কারোর ক্ষেতি হয় না আমি তাইই করব। 

আমার কপাল পোড়ার কথা আজও ভালো ভাবেই মনে আছে। কতটুকুই বা ছিল তখন, হয়তো দশ বা এগারো। সেদিন বড্ড গরম পড়েছিল। মায়ের শোয়ার ঘরে আমি আর বিনি খেলছিলাম। বাইরে চোত মাসের ঝরা পড়া পাতা উড়িয়ে মাঠে ঘাটে গরম শুকনো বাতাস পাক খাচ্ছিল। দূরের দিকে চোখ মেলে চাওয়া যায় না এমনি ঝাপটা দেওয়া আগুনে রোদের হলকা। বিনি আর আমি মেঝেতে বসে বাঘবন্দী খেলছিলাম। গরম হলকা বাতাসের ঘরে ঢুকে পড়া আটকাতে সব জানলা বন্ধ ছিল। বাইরে যতই গরম থাক ঘরের লাল মেঝেটা বরফের মতো ঠান্ডা ছিল। আমার পরণে ছিল লাল টুকটুকে একখানা মিহিজমির শান্তিপুরী শাড়ি। বয়সের তুলনায় বেড়ে উঠেছিলাম বলে ছোটদের নয় বড়দের কাপড় পরতাম। বিনিও কাঁচা হলুদ রঙের একখানা কাপড় পরেছিল। দুজনের কারোর মাথায় ঘোমটা ছিল না। মাথা কালো কার দিয়ে বেড়া বিনুনি করে বাঁধা ছিল। বিনিকে হারিয়েই দিচ্ছিলাম। সে দিনটা আমার জীবনে বিশেষ দিন ছিল, বিশেষ দিন কোন মঙ্গল অর্থে নয়। ওই দিনেই আমার জীবনের দিকটা বদলে গিয়েছিল বরাবরের মতো। তার গতি বদলে গেল চিরকালের মতো অমঙ্গলের দিকে। 

বারমহলে একটা গোলমালের আঁচ আসছিল অনেকক্ষণ ধরে। তার পর যেন মা আর পিসি ঠাকমার গলার আওয়াজ পেলেম, না না গলার আওয়াজ নয় কান্নার আওয়াজ।  আরও অনেক জন যেন সেই কান্নায় যোগ দিয়েছিল। গন্ডগোলের আওয়াজ শুনে বিনি খেলা ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল – তুই এখানে বসে থাক পুঁটি, আমি দেকে আসছি কী হল এদের। দিনদুপুরে এমন করে মরা কান্না জুড়ল কেন সবাই মিলে।

খেলা ফেলে ওর উঠে যাওয়াটা আমার পছন্দ হল না। আমি জিতে যাচ্ছিলাম কিনা! ভাবলাম ও ইচ্ছে করে উঠে গেল। আসলে বিনির সব তাইতেই বেশি বেশি আগ্রহ। আমি একবার ক্ষীণ স্বরে ওকে অনুরোধ করলাম দানটা শেষ করে যেতে, কিন্তু ও কী কারোর কথা শোনার মেয়ে! পায়ের নুপুর ঝমঝম করে বাজিয়ে  চলে গেল।  

ও সেই যে গেল তিন দিন আর এল না। আর এই তিন দিনে আমি মানুষটাকে যেন সবাই মিলে ডাল ঘুটানিতে করে ঘুঁটিয়ে দিয়েছিল। ওই তিন দিনের কথা ঠিক মতো স্মরণে আসে নাকো। যেটুকু মনে পড়ে তাও খুব ঝাপসা। স্মৃতির আয়নায় অনেকটা ধুলো জমেছে। তবু প্রথম দিনের অনেক ঘটনা দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে। মনে পড়ে সবাই ছুটে এসেছিল মায়ের ঘরে, সবার পেছনে ছিল মা। আমাকে ঘিরে ধরে গিন্নিরা অনেক আকথা কুকথা বলছিল। সেগুলো গালি বলে বুঝলেও মানে বুঝতে পারিনি। আমি তো শান্ত মেয়ে, বিনির মতো আচার চুরি করে খেতে গিয়ে বয়াম সুদ্ধ আচার ইচ্ছে করে এঁটো করে দিই না। দেরাজ থেকে লুকিয়ে কাচের  পুতুল পাড়তে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলি না। তবে কী এমন অপরাধ করলাম যে সবাই মিলে এমন করে কাঁদছে, এভাবে আমায় গালমন্দ করছে? 

যারা কাঁদছিল তাদের সবাইকে টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দিয়ে, আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকা মাকেও সরিয়ে দিয়ে পিসি ঠাম্মা আমাকে টেনে আমাদের খিড়কির পুকুরে নিয়ে গিয়েছিল। পুকুরপাড়ে নিয়ে গিয়ে এদিক ওদিক খুঁজে একটা পুরোনো ভাঙা ইঁটের আধখানা নিয়ে প্রথমে আমাকে বলল –এই ছুঁড়ি, আগে সোনার বালা আর চুড়ি গুলো খুলে ফেল। তারপর একে একে নাকের নথ কানের ঝুমকো গলার হার সব খুলে নিয়ে পুকুরের জলে ধুয়ে আমায় দে।

পিসিঠাম্মাকে ভয় পেত না এমন কেউ আমাদের বাড়িতে ছিল না। আমার হাত পা ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। কিভাবে যে গয়না গুলো খুলেছিলাম ভগবান জানে। 

পিসিঠাম্মা আমার গয়না গুলো নিজের আঁচলে বেঁধে এক খাবলা ভিজে মাটি কপালে আর সিঁথিতে ডলে দিল। তার পর ঘাটে পড়ে থাকা একটা ইঁট দিয়ে ঠুকে ঠুকে আমার শাঁখা পলা ভাঙল। আমি কেঁদে উঠে বলেছিলাম–  “কী করছো পিসি ঠাম্মা, এগুলো ভাঙছো কেন? গয়নাগুলো খুলে নিলে কেন। ইঁটের ঘায়ে আমার বুঝি লাগে না?

পিসিঠাম্মা আমাকে ধমকে বলল–  আর একটা কথা বললে গলা টিপে মেরে এই পুকুরের জলে ভাসিয়ে দেব। চুপ করে থাক হারামজাদী মুখপুড়ি! কপাল পুড়িয়ে এখন মুখে মুখে বড় বড় কতা কইচে!

পিসিঠাম্মার অমন রাগ আর রূপ আগে কখনো দেখিনি। ভয়ে কাঁদতেও যেন ভুলে গেছিলাম, একবার নিজের অজান্তেই মাকে ডেকে কেঁদে ফেলেছিলাম। অমনি ধমকে উঠেছিল খেমি ঝি, সে যে কখন নতুন একখানা সাদা থান নিয়ে ঘাটে এসেছে আগে খেয়াল করিনি। 

— মা গো মা, হতছাড়ি পোড়াকপালি বলে কী? ওর সতী নক্কি এয়োতি মা নাকি এই দিশ্য দেখতে আসবে? সংসারের একটা কল্যাণ অকল্যাণ নেই নাকি?

আধলা ইঁটটা দিয়ে শাঁখা পলা তো ভাঙা হলো কিন্তু নোয়া বাঁধানোটা নিয়ে কী করবে সবাই ভেবে পাচ্ছিলো নে। কিন্তু সোনা বলে কথা, শেষমেষ সেখানাও পিসি ঠাম্মার আঁচলে ঠাঁই পেল। পুকুর থেকে ডুব দিয়ে যখন উঠলাম ঘাটে গাঁয়ের দশ বারো জন বিধবা দাঁড়িয়ে ছিল। অনেক কাল পরে তারা বুঝি এমন মজার ঘটনা দেখার সুযোগ পেয়েছিল। এত কাল পর আর মনে নেই তারা কারা ছিল। শুধু এটুকুই মনে আছে তাদেরই কারোর খ্যানখ্যানে গলার ইনিয়ে বিনিয়ে কান্নার অবসরে আমার পরনের চওড়া জরি পাড়ের লাল টুকটুকে শান্তিপুরী শাড়িটা খুলে নতুন ধপধপে সাদা থানখানা জড়িয়ে দেওয়া হল। পিসিঠাম্মা গামছা আনতে বোধহয় ভুলে গেছিল, আমার কোমর ছাপানো চুলের জল গোটা থানটাকেই ভিজিয়ে দিয়েছিল। ভাঙা শাঁখা পলা ছুঁড়ে পুকুরে ফেলে দিয়ে শাড়িটার কী গতি করবে ভেবে পাচ্ছিল না এমন সময় শতছিন্ন ত্যানা পরা কে একটা মেয়ে লোক দৌড়ে এল — আমারে দ্যান মা ঠাইরেন বস্তরটা নষ্ট করিয়েন না!

শাড়িটা সে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। 

 হতভম্ব ভাবটা কাটতেই পিসি ঠাম্মা গাল পারলো — মর মর হতভাগী, মুয়ে আগুন! যত্ত কাঠ বাঙাল ভিখিরী সব জুটেছে! লুটে পুটে নিলে গা? তোমরা দেখলে কেমন শকুনের নজর! ওঁৎ পেতে ছিল কখন ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে যাবে। হারামজাদী মাগী কোন জেতের কে জানে বাবা, কেমন করে ছুঁয়ে দিল! কী আস্পদ্দা মাগীর  তুই দেখলি খেমি?

ভয়ে তো এমনিতেই সিঁটিয়ে গেছিলাম এবার কেমন যেন জ্বর জ্বর লাগছিল, শীত করছিলো। ভ্যাঁ করে কেঁদে বলেছিলাম — মায়ের কাছে যাব!

আজ এত কাল পরেও সেই লাল শাড়ি খানার জন্য আমার পরানটা কাঁদে। ভুলতে পারিনি সেটার কথা

সেদিনের পর থেকে রোজই কাকভোরে পুকুরে চান করে আসতাম। ছোট বলেই বোধহয় সঙ্গে পিসিঠাম্মা থাকতো। এছাড়া অন্য কোন কারনেও ঘাটে গেলে ডুব দিয়ে চান করে আসতে হতো। ভিজে থানখানা গায়েই শুকোতে হতো। মায়ের কোলে কাছে শোয়া বন্ধ হল। পিসিঠাম্মার ঘরের দোর বন্ধ করে একা একা হব্যিষ্যি রাঁধার সময় দু চোখ জ্বলে যেত। মাটির হাঁড়িতে আতপ চাল, কাঁচা কলা আর কী সব হাবিজাবি অনেকটা জল দিয়ে চাপিয়ে দিতাম। কী যে একটা আধপোড়া ঘ্যাট মতো হতো। ন্যাকড়া দিয়ে হাঁড়ি নামাতে গিয়ে রোজই ছ্যাঁকা খেতাম। কোন রকমে সেই পিন্ডি গিলে আদাড়ে পোড়া হাঁড়ি আর কলাপাতা যখন ফেলতে যেতাম পাড়ার বউ ঝিদের চোখে পড়লেই মুখ ফিরিয়ে হাত দিয়ে চোখ ঢাকতো, সঙ্গে অবিশ্যি পিসিঠাম্মা থাকতো, বিড়বিড় করতো — রকম দেখ মাগীদের, মরণ আর কী! কার কখন কপাল পোড়ে তা কি মানুষে আগে থেকে জানতে পারে না জানতে পারলেই তাকে আটকানো যায়?

তিন দিন পরই একাদশী এল। সক্কাল সক্কাল চান করে আসার পর অন্য দিনের মতো এক কুচি ফলও জুটলো না। উপরন্তু কে যেন বাইরে থেকে শিকল তুলে দিয়েছিল। অনেক ডাকাডাকি করার পর দরজার বাইরে থেকে মায়ের ক্ষীণ গলা পেয়েছিলাম — আজ কিছু খেতে নেই মা গো, জল টুকুও না। কাল আবার …

মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই পিসিঠাম্মার খ্যানখ্যানে গলার ঝংকার ভেসে এসেছিল — একি বউ, সদ্য মরা জামাইয়ের চিতে ঠান্ডা হয়নি এখনো এই ভরা একাদশীর দুপুরে পোড়াকপালি মেয়েকে সোহাগ করতে এসেছো বুঝি? বলি সোয়ামীর মঙ্গল অমঙ্গল চিন্তেটাও বিসজ্জন দিয়েছো?

দরজা খুলল না, একটা সময় বুড়ি গজ গজ করতে করতে চলে গেল — বেধবার শক্ত জান বাপু, এত সহজেই মরবে? তাহলে আমি এত দিন মরে আবার জন্মে যেতুম বাপু। 

ঝিম ধরা কাঠফাটা দুপুর শরীরের সব রক্ত রস শুষে নেয়।

 – দোর খোল! একটু খানি জল দাও না গো! বড্ড তেষ্টা পেয়েছে যে!

ছোট ছোট হাত দিয়ে সকাল থেকে দরজায় কতবার ঘা দিলাম কিন্তু কেউ দরজাটা একটি বারের জন্যও খুলে দিল না। চিৎকার করে কাঁদার ফলে একসময় গলা শুকিয়ে গেল। জিভ খড়খড়ে হয়ে গেল তবুও কারোর দয়া হল না। হাল ছেড়ে দিয়ে মেঝের ওপর বসে পড়েছিলাম। চোখের জল বোধহয় একটু চটচটে, অন্ধকার ঘরের মেঝেতে একলা বসে হাতের আঙুলে নিয়ে তাই পরীক্ষা করে দেখছিলাম। ঘরের পেছনের জানলায় ছোট ছোট টোকা পড়লো। 

4c73d1ad d263 4636 9a1c afe2999b60c5 md

কে ডাকছে! নিশ্চই মা! আমার জন্য খাবার এনেছে নিশ্চই। লাফিয়ে উঠে জানলার কাছে ছুটে গেলাম। শক্ত খিল খুলতে হাতে বেশ একটু লাগলো। একি! মা নয় তো!  এ যে বিনি! ছোট্ট একটা কাঁসার বাটিতে এক খাবলা ছানা আর ছোট্ট এক ঘটি জল নিয়ে এসেছে। জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে ঘটিটা গললো না তাই দু হাত অঞ্জলি করে খেলাম। খানিকটা ছানা রাতের জন্য নতুন হাঁড়িতে লুকিয়ে রাখতে বলল বিনি। পরে আবার জল এনে দিয়েছিল একই উপায়ে এবার একটা ছোট গেলাসে। কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল — রাগ করিস না পুঁটি। তুই বেধবা হয়েছিস বলে মা আমাকে তোর কাছে আসতে দিচ্ছে না রে।

বাড়িতে সবাই বলাবলি করছিল আজ একাদশী বলে তোকে জলটুকুও খেতে দেবে না। তাই আমি হেঁসেল থেকে এই চান টুকু আর ঘটি করে জল নে এয়েচি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। কে কোত্থেকে দেখে ফেলবে।বিনি আমার ছোট বেলার সই বিনি, সাহসিনী বিনি। সব বাধা ভেঙে নিজের ইচ্ছে মতো চলার শিক্ষা সেই ছোট্ট বয়স থেকে পেয়েছিল। কিন্তু কার কাছ থেকে পেয়েছিল তা হয়তো স্বয়ং ঈশ্বরও জানেন না। এ বোধহয় ওর অন্তরের সম্পদ। কেউ ওকে শেখায়নি।

এগারো বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলাম, পরে শুনেছিলাম আমার স্বামীর রাজরোগ হয়েছিল বিয়ের আগেই। ওঁরা রোগ লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। ঘাটকাজের দিন আমার অমন কোমর ছাপানো চুল নাপিতের কাঁচির ঘায়ে যখন উঠোনে ছড়িয়ে পড়লো আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কোন দোষে একের পর এক শাস্তি আমার ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে তার কোন ধারণাই আমার ছিল না। পাড়ায় আমার বয়সী কোন মেয়ের কপালে আমার আগে এভাবে দুর্ভাগ্য নেমে আসেনি। আর এসব ঘটনা সধবাদের দেখতেও নেই। তাই এ সব নিয়মের নির্যাতনের কোন ধারণা থাকা সম্ভব ছিল না। বেশ মনে আছে দু হাতে চুলগুলো জড়িয়ে ধরে উঠোনের মাঝে লুটিয়ে পড়ে কেঁদেছিলাম, গড়াগড়ি দিয়েছিলাম না বোঝা বোবা যন্ত্রনায়। তারপর নিজের ন্যাড়া মাথা চেহারার প্রতিবিম্ব প্রথম দেখলাম পুকুরের জলে। দিন কয়েকের মধ্যেই আমার শৈশব কৈশোর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। যা বেঁচে থাকলো তাকে কী বলা যায় আজও ভেবে পাই না। তখন তো বুঝিনি আগামী জীবনের জন্য অবহেলা, বঞ্চনা আর হাহাকার ছাড়া আর কিছুই থাকল না।

বিনির কপাল পুড়ল আরো তিন বছর পর। না না সে বিধবা হয় নি, দিব্যি মাথা ভরা সিঁদুর আর শাঁখা নোয়া নিয়েই তার কপাল ভাঙল। তার স্বামী পশ্চিমে গিয়েছিল রেল কোম্পানির চাকরী করতে, সেখানেই সে এক নিচু জাতের সুন্দরী পশ্চিমা মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করে প্রথম বউকে ত্যাগ দিল। সেই যে বউকে ফেলে দিয়ে গেল তারপর সে বাড়ি আসাই বন্ধ করে দিল। দু এক বছর পর ওর শ্বশুরবাড়ীও আর ওকে রাখল না। ছেলের সব দোষ আর নিজেদের সব দুর্ভাগ্যের বোঝা নিরপরাধ মেয়েটার ঘাড়ে দিয়ে জঞ্জাল ফেলার মতো করে বাপের বাড়ি ফেলে দিয়ে গেল। মাছ খাওয়া, রঙীন শাড়ি আর আলতা-সিঁদুর পরা ছাড়া ওর সঙ্গে আমার কোন তফাৎ রইলো না। বাপের ঘাড়ে ফেলে দেওয়া এক দুর্ভাগা মেয়ে, একজন বিধবা আর একজন সধবা।

ক্রমশ


1 thought on “পাপ-পর্ব ১”

  1. দারুণ সুন্দর লেখা। সেই সময় বাল্য বিধবাদের কী নিদারুণ কষ্ট পেতে হয়েছে। এই আধুনিক যুগে আমরা তাদের ভুলে গেছি কিন্তু তাঁরাই তো আমাদের পূর্ব নারী। এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে আবার তাদের কে মনে করা। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।❤️

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top