বিপাশার তীরে -১ম পর্ব

bipasar tire prothom parbo

দিগন্তের শেষ সীমা রক্তিম বিদায় জানিয়েছে সূর্য দেবতাকে। বিপাশা নদীর ধারে সোমরাং তখনও বসে অপেক্ষা করছে একটু পরেই হয়তো সে আসবে। ক্লান্ত অবসন্ন চোখে ঘোড়াটার গায়ে হাত রাখবে। তারপর নিজেকে সঁপে দেবে বিপাশার জলে। দীর্ঘ গৌর গাত্রবর্ণ লালচে কালো দেখাবে আকাশের রঙের জন্য। পেশিগুলো যেন পাথর কুঁদে নির্মাণ করেছেন বিধাতা। সে জল থেকে উঠে ভিজে শরীর উন্মুক্ত করে পোষাক বদলাবে তখন সোমরাং নিজেকে বড় পাথরটার নিচে পুরোপুরি লুকিয়ে নেয় তাকানোর সাহস হয় না তার। ঘোড়ার চলার আওয়াজ আসতেই আবার মাথাটা তোলে সে তখন পিছন ফিরে চলে যাচ্ছে সেনা শিবিরের দিকে। সোমরাং এরপর হাঁটা শুরু করে। ওদের গ্রামের আশেপাশে এর আগে কখনো সেনা আসেনি। পাইন গাছে ঘেরা বিপাশার তীরে গ্রামখানি ছবির মত সুন্দর সকলের বাড়িতেই প্রায় রয়েছে সেবফল ও দারিমের গাছ। তবে প্রবদর গাছ সোমরাং এর সবচেয়ে প্রিয়। তাদের বাড়ির চারিপাশে প্রবদরে ঘেরা। বছরের শেষে যখন প্রিয় বসন্তকাল পাহাড়ের কোল জুড়ে ফুলের বাহার তখন প্রবদরের শোভায় মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সারা উপত্যকা জুড়ে সাদার সাথে হালকা গোলাপি রঙের ফুল। যৌবন যেন উছলে উঠে গ্রামটির। মৃদু খসখস শব্দে সচেতন হয়ে ওঠে সোমরাং। দুহাতে ভর দিয়ে মাথাটা সামান্য উঁচু করে কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে পাইনের ঋজু শরীরে। মায়ের কাছে বকুনি জুটবে খুব। বারবার মা বলেছে, শেষ আলো পায়ে নিয়ে ফিরবে না সোম, আগে ফিরবে। শেষের আলোতে বিপদ লুকিয়ে থাকে। মায়ের মন হাজার কু সংস্কারে ভরা। সোমরাং বাবার কাছে পড়ে। ওর বাবা যে পণ্ডিত। পায়ে হেঁটে বহু দূরে দূরে পুজোপাঠ করতে যান ওর বাবা। শান্ত সৌম্য মানুষটা মানুষ ভালোবাসেন খুব। মেয়েকে তিনি বলেন, ঈশ্বর কোন রূপে আসে কে জানে রে বিটিয়া? তাই সব মানুষকেই সম্মান করতে হয়, ভালোবাসতে হয়। এই পৃথিবীই দেবতার বাসভূমি। শুধু পবিত্র রাখাটা মানুষের কাজ। নদীর পাড় ঘেঁষে আকাশ থেকে তারা নেমে আসা শুরু হয়েছে। আর দেখা হবে না বুঝে সোমরাং উঠে পড়ে। গ্রামের পথে হাঁটা লাগায়। এবড়ো খেবড়ো জঙ্গলের পথে জন্তুর ভয়, সাপের ভয় আছে বইকি। সোমরাং এর তাতে কিছু যায় আসে না। জন্মানোর সাথে সাথেই একমাত্র নির্ধারিত সত্য হল মৃত্যু। তাই নিয়ে এক মুহুর্ত ভাবতে চায় না সে। এ পথ তার চেনা। পাথর, নুড়ি সব তার সহচর। একটা চাপা গোঙানির শব্দ হঠাৎ সোমরাং এর কানে আসে, ধ্বস্তাধ্বস্তি, হুঙ্কার, ছিটকে আসা চিৎকার। এই উপত্যকা এমন আশ্চর্য বিচিত্র শব্দ আগে শোনেনি। সচেতন সোমরাং সেই দিকে এগোতেই কেউ হাত ধরে টান দেয়। মুহুর্তে কোমর থেকে ছুরিটা বার করে বসিয়ে দিতে গেলে আরেকটা হাত আটকে দেয়। চাপা গম্ভীর সেই শব্দ অশ্রুতপূর্ব।

-ওদিকে যাওয়া সমিচীন নয়। এখানেই থাকুন।

মুখ চাপা থাকায় গরগর করতে থাকে সোমরাং। ওর ক্রমশ দুলতে থাকা শরীর কাবু করতে চায় পুরুষ মানুষটি। আকাশের ঘোলাটে আলোয় মুখটা চেনা লাগে সোমরাং এর। পোড়া পাইনের গন্ধ আসে নাকে। শরীর আলগা করে সে। পুরুষ বোঝে দুরন্ত নারী শান্ত হতে চলেছে। তবে তখনি ছেড়ে দেয় না। নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ধীরে বসিয়ে দেয় পাথরের উপর। আকাশের ঘন অন্ধকারে হাজার জোনাকি।

-এমন সময় বাইরে কী করছেন?

গম্ভীর চাপা কন্ঠস্বর। সোমরাং এর কানে আসে ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। চাপা চিৎকারটা ম্লান হতে থাকে। গুজগুজ ফিসফাস কমে কিন্তু কয়েকটা পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসতে থাকে। পুরুষটি সোমরাংকে নিয়ে আরও একটু বনের দিকে সরে যায়। ফ্যাকাশে আলো আলতো করে ছুঁয়ে আছে চরাচর। এরা সৈনিক নয়, অন্য কোনো মানুষ কিন্তু গ্রামের মানুষ বলেও মনে হয়না সোমরাং এর। কী করছে এরা? কী চায়? খানিক পর সব নিশ্চুপ হলে পুরুষটি ওকে ইশারায় এগিয়ে যেতে বলে। নিজেও সঙ্গী হয়।

-আমি আকেশ। আপনাদের অঞ্চলে নতুন যে সেনা শিবির স্থাপিত হয়েছে, তারই একজন সৈনিক। আজ আপনি যা দেখলেন এই নিয়ে কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই।

সোমরাং মাথা সোজা করে তাকায়, আপনি না সৈনিক? ঘোড়সওয়ার, আপনার কোমরে না সব সময় খাণ্ডা থাকে। অথচ আপনি ভীরুর মতো লুকিয়ে রইলেন? আকেশ! আকাশের দেবতা আপনি? ছিঃ। ছুট্টে চলে যায় সোমরাং। হতভম্ব আকেশ দুরন্ত পাহাড়ি ঝোরার কাছে নতজানু হয়ে বসে। ফিরতে ইচ্ছে করে না শিবিরে। গ্রামের বাড়িগুলো থেকে রাতের রান্নার ধোঁয়া রেশমি চাদরের মতো ছড়িয়ে পড়ে আর সুখস্বপ্নের মতো ভেঙে যায় দ্রুত। সেদিকে তাকিয়ে সে ভাবে এই গ্রামেরই কোনো এক ঘরে মেয়েটি ফুঁসছে হয়তো এখনও। ভালো করে দেখা হল না, নাম জানাও হল না। নাহ্ রাতের খাবার দেবার আগে তাকে ফিরতেই হবে শিবিরে। আকেশ দ্রুত পা চালায়। তবে অন্যদিকে।

অন্য সব দিনের তুলনায় মেয়ে যে দেরি করে এসেছে সেই নিয়ে কিছু বলার সুযোগ হয়না চামেলি দেবীর। মেয়ের মুখ রক্তিম হয়ে আছে, চোখ ছলছল, বুকের ভিতর যেন ঝড় বন্দী করে রেখেছে। কাঠের ছোট্ট বাড়ি তাদের, দুটি মাত্র ঘর। বাইরে ছাউনি দিয়ে রান্নার জায়গা। সোমরাং নিজের ঘরে দাপাতে থাকে। জামাকাপড়ে মুখ গুঁজে চিৎকারের আওয়াজ আটকে রাখে। বুকের ভিতর ভূমিকম্প শুরু হয়। গত পনেরো দিন ধরে যে পুরুষকে সে নিজের সর্বস্ব বলে কল্পনা করেছে, নিজের স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে লুকিয়ে দেখেছে, সে আদতে কাপুরুষ? জীবনের প্রথম ভালো লাগার অপমৃত্যুতে সোমরাং অধীর হয়ে ওঠে। চামেলি দেবী ঘরে এসে মেয়ের পিঠে হাত রাখেন। চমকে ওঠে সোমরাং।

-কী হয়েছে বিটিয়া এত অস্থির হয়ে আছিস কেন রে?

-কিছু না তো মা। আমায় তুমি আজ কিছু বললে না যে। আমি সন্ধ্যে পেরিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

-তুমি তো কখনও এমন করো না মা। আজ নিশ্চই কারণ ছিল?

সোমরাং মাকে জড়িয়ে ধরে। হুহু করে চোখ দিয়ে জল আসে তার। মা মা বলে অস্ফুটে ডাকতে থাকে। চামেলি দেবী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, খুব কষ্ট হলে আমায় বলতে পারো আর যদি না বলতে পারো তাহলে গাছকে বলে দাও। যে গাছ তোমার বন্ধু তাকে।

-মা, কারো বিপদ দেখে লুকিয়ে পরা কি ভুল কাজ নয়?

-দেখো মা, আমি শাস্ত্র জানি না, শুধু জীবনের নিয়ম জানি। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে হয় ঠিকই কিন্তু নিজের জীবন সংশয় করে নয়।

-কিন্তু বাঁচানোর চেষ্টাও করব না মা?

-তেমন কিছু কি হয়েছে সোমরাং?

চুপ করে যায় মেয়ে। চামেলি দেবী অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে ভিতরে ভিতরে। এমন কিছু কি হল যা মেয়ে দেখে ফেলেছে? অথচ না দেখলেই ভালো ছিল। রাত বাড়ে উপত্যকায়। দূর থেকে বাঁশির মৃদু সুর ভেসে আসে। সোমরাং উঠে রান্নাঘরের দিকে যেতে নিলে ওর মা আটকায়।

-আজ আমি খানা বানিয়ে নিচ্ছি রে মা। তুই যা, চোখেমুখে জল দিয়ে বিশ্রাম নে। নয়তো পুঁথি নিয়ে বোস।

সোমরাং ছোট্ট জানলা দিয়ে দূর আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে অজানা অচেনা মানুষের মনোভাব নিয়ে এত ভেবে সে কী করবে? থাক সে নিজের মতো। পাহাড়ের অপর পাড়ে আরেকটি মানুষও অন্ধকার আকাশের গায়ে চেয়ে আছে। কানে বাজছে শ্লেষের কন্ঠস্বর। ‘আপনি আকেশ! আকাশের দেবতা!’ তার নামের অর্থ পর্যন্ত জানে তাই নিয়ে আঘাত করতেও জানে, এমনকি তার তলোয়ারের নাম পর্যন্ত অজানা নয়। এই মেয়ে অসাধারণ। তার চোখ সুন্দর নাকি চোখের দৃষ্টি? তার মুখ সুন্দর নাকি মন? আকেশ অধীর হতে থাকে। অপেক্ষা করতে থাকে সূর্যোদয়ের।

ওদিকে যজমান বাড়ি থেকে ফেরার পথে ধর্মরাজ কাশ্যপ মনে মনে একটু শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। চরাচর বড্ড নিশ্চুপ। দূর থেকে বাঁশীর শব্দটা কেঁদে কেঁদে উঠছে যেন। আজ যজমান বাড়িতে পুজো করার সময়েই খবর এসেছে মহারাজ রাজধানী নাগ্গর থেকে সরিয়ে আনতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যে কারণে বহু সেনা এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। মহারাজের কুষ্ঠ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রায়শ্চিত্তের নিদান চেয়ে সমস্ত ব্রাহ্মণদের সভা আহ্বান করেছেন তিনি। এদিকে বর্হিদেশ থেকে পর্যটকের আকর্ষণও এই অঞ্চলের প্রতি। বড্ড শঙ্কা হয় ধর্মরাজের। এত পরিবর্তন, এত দ্রুত ধারণ করা কি সম্ভব? কোনো ভুলচুক হবে না তো? এলাকার বহু মানুষ বর্হিদেশীয় মানুষ সম্পর্কে বিজাতীয় ঈর্ষা ঘৃণা পোষণ করে। মনটা বড্ড কু গাইতে থাকে। ঠিক তখন প্রেতের মতো জঙ্গলের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে মেয়েটি। বিবস্ত্র, চুল বিস্রস্ত, দুটি হাত দিয়ে লজ্জা নিবারণের বৃথা চেষ্টায় রত। দ্রুত নিজের গায়ের চাদরটা ছুঁড়ে দেন ধর্মরাজ। এ কি দুর্বিনীত আচরণ?  কে করল এমন কাজ?

-মাগো কে তুমি? আমায় ভয় পেও না মা, আমি এই গ্রামের ব্রাহ্মণ পূজারী। তুমি আমার কাছে নির্ভয়ে আসতে পারো।

মেয়েটির ভাষা দুর্বোধ্য ঠেকে ধর্মরাজের। শুধু তার অস্ফূট চাপা কান্না সব যেন বলে যায়। ধর্মরাজ তাকে আশ্বস্ত করেন, হাতের ইশারায় নিজের পিছনে আসতে বলেন। মেয়েটি ভয়ে, ঠাণ্ডায় জুবুথুবু। ধর্মরাজ মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকেন। হে দয়াল প্রভু, এ কোন অনাচার? রক্ষা করো দয়াময়। বাড়ির দরজায় মৃদু কড়া নাড়েন। চামেলি দেবী দরজা খুলে কোনো প্রশ্ন না করে আতঙ্কিত মুখে আগে মেয়েটিকে ঘরে টেনে নিলেন। দ্রুত তাকে কম্বলে আচ্ছাদিত করে মেঝের এক কোণায় বসিয়ে তারপর স্বামীর দিকে চাইলেন।

-ভিনদেশী নারী, গুরুতর বিপদে আক্রান্ত, এরচেয়ে বেশি কিছু জানি না। আশ্রয় দান সবচেয়ে পূণ্যদান। এই আমার ধর্ম।

মৃদুস্বরে চামেলি বললেন, আমারও। মেয়েটিকে নিয়ে পিছনের ঢাকা স্থানটিতে নিয়ে উনোনে বসিয়ে রাখা গরম জলের পাত্র থেকে কিছুটা জল দিলেন। মেয়েটি অস্ফুটে মা বলল। চামেলি ইঙ্গিতে বললেন, ভয় নেই। রক্ত, পাথুরে মাটি সব ধুয়ে দিলেন নিজের হাতে, মুছিয়ে দিলেন অবসন্ন শরীর। নিজের পরিস্কার পোষাকে আচ্ছাদিত করে ঘরে আনলেন। মৃদু পায়ে সোমরাং এসে দাঁড়িয়েছে। রাতের খাবার প্রায় নীরবতার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম হল। চামেলি মেয়ের ঘরে আশ্রিতাকে নিয়ে এলেন। তিনজনে একসাথেই শয্যা গ্রহণ করলেন। সোমরাং স্পষ্ট বুঝতে পারছে কে এই নারী। বিধাতার কাছে সে ধন্যবাদ জানাচ্ছে বারবার শেষ পর্যন্ত মেয়েটি বেঁচে আছে বলে। শীত এই সময় কমতে শুরু করে কিন্তু তবু যেন বড্ড কনকনে হয়ে উঠছে রাত। যে পুরুষের জন্য এ’কদিন উথাল পাথাল করেছে তার বুক আজ তার কথা মনে পড়লেই ভুরু কুঁচকে উঠছে। তবু চোখের কোণে জল জমছে কেন তা যেন ঠাহর পায় না। সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে এক সময় চোখ জুড়িয়ে আসে তার। একটা প্রবদর গাছের নীচে এসে দাঁড়ায়, একটু দূরে ঘোড়া বাঁধা। প্রবদরের ফুল ইতিউতি ছড়িয়ে স্বর্গীয় করে তুলেছে চারিধার। নিজের সামনে আকেশকে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে দেখে হতবাক সোমরাং। কাতর তার মুখ, দুটি হাত আকাশের দিকে মেলে ধরে বলছে, ইশারা দিচ্ছে মহাকাল সোমরাং, তুমি বুঝতে চেষ্টা করো। খুব কাছে কেউ গান ধরে। কথা বোঝে না সোমরাং তবে ভারী মিষ্টি সে সুর। মিলিয়ে যেতে থাকে আকেশ, ধোঁয়ার ভিতর থেকে জেগে ওঠে সোমরাং। তার পাশে শুয়ে ভিনদেশী মেয়েটি খুব মৃদু কন্ঠে গাইছে, চোখে জল।

“কে তুমি রয়েছো দাঁড়ায়ে কুয়াশা জড়ায়ে

আমায় নাও ডেকে নাও দুহাত বাড়ায়ে

আমি একা বড় একা পথ হারায়ে 

বারেবারে খুঁজি চমকিয়া উঠি এসো হে নাথ

নাও নাও আমারে, আমারে, আমারে” 

জানলা দিয়ে ভোরের মোমরঙ গলে আসছে। সোমরাং ওর মাথায় হাত রাখে। বাবার কাছে সে শুনেছে, পরিত্রানায় সাধুনাম্ বিনাশ্চায়চ দুষ্কৃতাম ধর্মসংস্থাপনারথায় সম্ভবামী যুগে যুগে। কিন্তু সত্যিই কি ভগবান আসেন নাকি মানুষকেই সেই কাজ করতে হয়? জানে না সে। মেয়টির চোখে বিস্ময়, জিজ্ঞাসা, যন্ত্রণা। এই প্রকৃতির টানে সে হয়তো বহু পথের ক্লেশ সহ্য করেই এখানে এসেছিল। কেন হল তার সাথে এমন? এর উত্তর খুঁজতেই যেন বাবার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াল সোমরাং। ধর্মরাজ চিন্তিত। তার কপালের রেখা বলছে বহু দুশ্চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

-বিটিয়া, অতিথির ঘুম ভেঙেছে টের পেয়েছি তার গানে। বড় মধুর তার কন্ঠ। কেমন আছে সে এখন?

-ভালো থাকা কি সম্ভব পিতাজি? কোনো খোঁজ পেলেন তার পরিবারের?

-হ্যাঁ বিটিয়া পেয়েছি। তারা খুব তাড়াতাড়ি আসছেন ওকে নিয়ে যেতে।

-আর যারা এই গর্হিত কাজ করল তাদের কোনো সংবাদ?

ধর্মরাজ চকিতে মেয়েকে দেখে নিলেন। একটা বড় ঝড় যে তার মনের ভিতর বয়ে গিয়েছে টের পেলেন। মেয়ের সাথে শাস্ত্র পুঁথি নিয়ে আলোচনা কালে ধর্মরাজের বারবার মনে হয়েছে তার মেয়ে সাহসী, সৎ এবং আবেগপ্রবণ। তবে আবেগের সাথে যুক্তিবোধ তীব্র হওয়ায় একটু বেপরোয়া। ধর্মরাজ তাই ধীর গতিতে এগোলেন।

-শোনো বিটিয়া, পরিবর্তন কালের ধর্ম। কিন্তু পরিবর্তনের সাথে কিছু উৎপাত মানুষের জীবনে ঢুকে পড়ে। তাকে শান্ত মাথায় বুঝতে হয় তারপর সমূলে উৎখাত করতে হয়। এই অঞ্চলে ভিনদেশীদের আগমন অনেকেই মেনে নিতে পারছে না। কারণ একাধিক। তবে বণিকদের একাংশ এতে মাত্রাতিরিক্ত আহ্লাদিত। কারণ তাদের নানাবিধ উপকার সাধিত হচ্ছে। এই ধরো গতকাল যে কথা শুনলাম তা কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন বাণিজ্য পদ্ধতি। 

সোমরাং আগ্রহী হয়ে ওঠে। যে কোনো ঘটনার পিছনে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যোগ থাকাটা খুব স্বাভাবিক বিষয় বলেই সে জেনে এসেছে। তার বাবা বলল, বিপাশা নদীর অপর পাড়ে গ্রামে কিছু ভিনদেশী এসে আশ্রয় চায়। এতদিন আমরা জানতাম, অতিথি দেব ভবঃ, আজ সেই অতিথিই গৃহস্বামীকে অর্থ দিতে চেয়েছে আশ্রয় ও খাদ্যের বদলে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে তারা ঠিক কী কী সুবিধা প্রত্যাশা করে তাও জানিয়েছে। সোমরাং বলে, সে তো ভালো কথা পিতাজি। গম্ভীর হয়ে যান ধর্মরাজ। 

-সেবা যদি বিক্রয় যোগ্য হয়ে ওঠে তাহলে লোভ বড় হবে বিটিয়া, সেবা আর গুরুত্ব পাবে না। 

কথাটার সাথে সোমরাং যেন একমত হতে পারে না। ধর্মরাজ বোঝেন উপত্যকায় নতুন হাওয়া আসছে। মেয়ের ভিতর দিয়ে তিনি দেখতে পাচ্ছেন নতুন কুলু রাজ্য। সকালের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সিড্ডু ভাপে দিয়ে চামেলি আপনমনে কাজ করে চলেছে। আশ্রিতার চোখ মুখ বিষাদে ভরা। সে চেয়ে রয়েছে সৌন্দর্যময়ী প্রবদর গাছের দিকে। দূরে কিছু মানুষ আসতে দেখে মেয়েকে ইশারা করতেই বসার ছোট্ট ছোট্ট কাঠের টুকরো সে সাজিয়ে দিয়ে গেল। ভিনদেশী দুজন মানুষ হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইল, দুজনেই আহত। একজনের চোট সামান্য, হাতে কেবল পট্টি বাঁধা। আরেকজনের মাথা ফেটে গিয়েছে, একটি চোখ কালো হয়ে ফুলে ঢেকে গিয়েছে প্রায়। মেয়েটি গুণগুণ করে কাঁদতে কাঁদতে ঠোঁট চেপে রেখেছে। চামেলি দেবী ওর মাথায় হাত বোলাচ্ছেন। দোভাষী ভীমশর্মা বুঝিয়ে বলল সব। 

-এই ভদ্রলোক নিজের স্ত্রী ও বন্ধুকে নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়েছে। আমাদের এলাকায় গত দশদিন ধরে রয়েছে। গতসন্ধ্যায় বিপাশার ধার থেকে সূর্যাস্ত দেখে নিজেদের তাবুতে ফেরার সময় হঠাৎ দুষ্কৃতিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু এদের লক্ষ্য ছিল এর স্ত্রী। অনেক চেষ্টা করেও মহিলাকে বাঁচাতে পারেনি এরা শয়তানরা টেনে নিয়ে যায় গভীর জঙ্গলে। এদের মাথা পাথর দিয়ে ফাটিয়ে দেয়। জ্ঞান ফিরলে এক সৈনিকের সহায়তায় তারা তাবুতে ফেরে কোনো রকমে কিন্তু মহিলাকে খুঁজে পায়না। সৈনিকটিই রাত অবধি এদের সাথে নানা জায়গায় ঘুরেছে সন্ধানের জন্য। শেষে এরা আমার কাছে আসে। তারপর আপনার পাঠানো খবরে বুঝতে পারি এই সেই মহিলা। এখন আপনি অনুমতি দিলে ইনি নিজের স্ত্রীকে নিয়ে ফিরতে পারেন।

সোমরাং মেয়েটির স্বামীকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে। ওর চোখ আর মন একপথে কিছুতেই চলতে চায় না। মেয়েটির সরল মুখের কাছে এই লোকটি যেন চতুর। তার বন্ধুটি বরং কারো কথায় মন না দিয়ে নানা ইশারায় মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। সোমরাং উঠে দাঁড়ায়। বিনয়ের সঙ্গে বলে, পিতাজি উনি আহত, সেই ক্ষত কিছুটা মেয়েলি কিছুটা মানসিক। আমার নিবেদন অন্তত আরও দুটি দিন উনি আমাদের কাছে থাকুন। তারপর না হয় ফিরবেন স্বামীর সাথে। জনতা ফিসফিস শুরু করে। ধর্মরাজ জানেন তার কথার উপর কেউ কিছু বলার সাহস করবে না। তবু জনগণের মন বোঝা জরুরি। তাছাড়া ভিনদেশী মানুষকে সে কী অধিকারে বাড়ি রাখবে? ধর্মরাজ মেয়েটিকে ডেকে পাঠালেন। হাওয়ায় ওড়া শুকনো বাঁশপাতার মতো কাঁপছে সে। ধর্মরাজ বললেন, বিটিয়া তোমার শরীর এখন নাজুক আছে। কদিন আমাদের কাছে থাকবে? মেয়ের চোখ আসমানী। বিপাশা বয়ে যায় তার আঙিনা দিয়ে। চামেলি দেবী শক্ত করে ধরে থাকে তাকে। ধর্মরাজ বলেন, মহারাজের আদেশে আজই আমি এবং আশপাশের পণ্ডিতরা তার সাথে সাক্ষাৎ এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ছি। ফিরব দশদিন পর। তাকে আমি এ বিষয়ে অবগত করব। ভীম তুমি খোঁজ করো সেই সৈনিকের আমি ফিরে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী। এই ঘটনা যাতে দ্বিতীয় বার আমাদের গ্রাম ও সন্নিহিত অঞ্চলে না ঘটে তার দায়িত্ব আমাদের। রূপচাঁদ তুমি সকলের সুরক্ষার দায়িত্ব নাও। রূপচাঁদ তাগড়াই যুবক। লাঠি, তলোয়ার সবেতেই দক্ষ। বয়েসে সোমরাং এর চেয়ে বছর দুয়েকের ছোটো। এ বাড়িতে তার অবাধ আনাগোনা, গ্রামের সকলের প্রিয়পাত্র সে। যেমন দুরন্ত যুবক তেমন সদা হাস্যময়। সবাই চলে গেলেও ভিনদেশী দুজন ব্যক্তি ও ভীমশর্মা থেকে যায়। আশ্রিতা একটু দূরত্ব রেখে বসে। সোমরাং তাদের কথা বুঝতে না পারলেও বুঝতে পারে, পুরুষ দুজন মেয়েটি কেমন আছে জানতে চাইছে। সে ফিরতে চায় কিনা এ নিয়ে একটু বারবার প্রশ্ন করছে। মেয়েটি মৃদু মাথা নাড়িয়ে যাবে না বলছে হয়তো। বন্ধু লোকটি আবার মায়ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে‌ মেয়েটির দিকে। সোমরাং এর ভিতরটা কেমন যেন করে। প্রেমের অক্ষর সে সহজেই চিনতে পারে। ভীম জানাল, পণ্ডিতজি, ওরা জানতে চাইছেন ওরা কি মহিলার সাথে দেখাসাক্ষাৎ করতে আসতে পারেন? ধর্মরাজ বললেন, হ্যাঁ দিনে একবার আসতে পারবেন। সূর্যাস্তের পর নয়। তবে মেয়েটি সুস্থ হলে এবং তার মর্জি হলে সে তার স্বামীর সাথে যাবার কথা অবশ্যই ভাবতে পারে। মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়। ওর পায়ে পুরোপুরি শক্তি ফিরৎ আসেনি। তাই টলমল করতেই সোমরাং হাতটা ধরে নিল। মৃদু হেসে সে ভিতরে যাবার ইঙ্গিত করল। ওরা ভিতরে যেতেই ধর্মরাজ উঠে পড়লেন প্রস্তুত হবার জন্য। বাড়িটা নির্জন হল। 


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top