রাস্তা বলে কিছু নেই। একে ঠিক পথও বলা যায় না। দুপাশে মাঠ। শস্যক্ষেত। গ্রামের চাষিরা চাষ করছে। মাথায় গামছার মতো কাপড় বেঁধে তারা চাষ করছে। এই দৃশ্য বদলায়নি। মৃন্ময় বুঝতে পারল। আজ থেকে হাজার বছর পরে খেতের মাঠে কাজ করার দৃশ্য যেমন, ঠিক তেমনই। বাংলার খেত তেমনই নানারকম সবুজ হয়ে আছে। স্তরে স্তরে এই সবুজের রং বদলে যায়। কখনো গাঢ় সবুজ, কোথায় বা হালকা। দূর দিগন্ত অব্দি দেখতে পাওয়া যায় এই সবুজ। ঠিক যেন কেউ একটা তুলি দিয়ে রঙের বিভিন্ন শেড তৈরি করেছেন। মৃন্ময়ের পাশে নীরবে হেঁটে চলেছেন শান্ত ভিক্ষু। তাঁর কোনও তাড়া নেই। তিনি যেন বা নিজের মধ্যেই বিভোর।
মৃন্ময় তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে সে কোন সময় থেকে এসেছে। আসলে ঠিক কোন সময়ে তাঁর শরীরটা শুয়ে আছে। কিন্তু এই বোঝানোটাই সার হয়েছে। তার পোশাক আশাক, চালচলন এবং কথাবার্তায় অন্তত এইটুকু তিনি বুঝতে পেরেছেন, যে সে অনেক কিছু জানে। সে একটা অন্য জায়গা থেকে এসেছে। সে তাদের মতো ভাষাতেই কথা বলছে। কিন্তু তার বলা কথা, ভাবা বিষয় সবই অন্য।
– আপনি জানেন, তাম্রলিপ্ত বন্দরটা আগামী দিনে শুকিয়ে যাবে? জানেন, আমরা ওই জায়গাটাকে এখন কী বলি?
শান্ত ভিক্ষু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
আমরা বলি তমলুক। কিছু কিছু নমুনা অবশ্যই পাওয়া যাচ্ছে, যা থেকে বোঝা যায় জায়গাটায় একটা বিশাল বড় বন্দর ছিল। আপনি তো বললেন ওইদিকেই যাচ্ছেন।
– হ্যাঁ। তাম্রলিপ্ত বন্দর এই সমগ্র দেশের মধ্যে একটা বিরাট বন্দর। অনেক অনেক রাজাদের সম্রাটদের লোভের দৃষ্টি আছে এই তাম্রলিপ্ত বন্দরের দিকে।
– কিন্তু আপনি এই বন্দর থেকে কোথায় যেতেন?
– অনেক জায়গায় যাওয়ার ছিল। ব্রহ্মদেশ, সিংহল।
– তাম্রলিপ্ত তো অনেক পুরোনো তাই না? সিন্ধুসভ্যতার সময়েও কি ছিল?
– সিন্ধুসভ্যতার কথা আমি জানি না। তবে বৌদ্ধ পুথিতে পাওয়া যায় সারা বিশ্বে পরিচিত ছিল লোথাল, সোপারা প্রভৃতি বন্দর। সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে এই বন্দরগুলির মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্য চলত পশ্চিমের বিভিন্ন দেশগুলির সঙ্গে। একইভাবে প্রাচীন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল তাম্রলিপ্ত।
– মানে, অত হাজার বছর আগেও?
– তুমি বলি?
– হ্যাঁ।
– তুমি জানতে চাও ইতিহাস? বিহারের সিংভূম জেলার ঘাটশিলা থেকে তামা খনন করা হত এবং তাম্রলিপ্ত বন্দরের মাধ্যমেই তা রফতানি করা হত। মহাভারতেও তাম্রলিপ্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাম্রলিপ্ত ছিল রাজা তাম্রধ্বজ্যের রাজধানী। অশ্বমেধযজ্ঞের সময় পাণ্ডবদের অশ্ব এই তাম্রধ্বজ ধারণ করেন এবং অর্জুনের সঙ্গে তাঁর ভয়ানক যুদ্ধ হয়। রাজার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে কৃষ্ণ ও অর্জুন তাঁর সঙ্গে সখ্যসূত্রে আবদ্ধ হন বলে জানা যায়।
– সত্য না হলেও একটা মহাকাব্যে আছে যখন, তখন প্রাচীন ভারতের কবিরা জানতেন।
– মৌর্য সাম্রাজ্যের বাণিজ্য জাহাজগুলো এখান থেকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম বিশ্বে পাড়ি জমাত। মোগলমারি্র খুব কাছেই স্থাপিত হয়েছিল বৌদ্ধ বিহার। যার উল্লেখ পাওয়া যায় চিনা পর্যটন ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাংয়ের লেখায়। মহাভারতে বলা আছে, রূপনারায়ণ নদীর ধারে তাম্রলিপ্ত ছিল ভীমের জয় করা সাম্রাজ্যের অংশ। রাজগৃহ (রাজগির), শ্রাবস্তী, পাটলিপুত্র (পাটনা), বারাণসী, চম্পা, কৌশাম্বীর মতো নগরের সঙ্গে এই বন্দরের যোগাযোগ ছিল।
– প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঠিক কবে শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও মহামতি সম্রাট অশোকের সময় যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে তা অনুমান করা হয়। তিনি ভারতবর্ষে ১৪ বছর ছিলেন। তার মধ্যে তাম্রলিপ্তে ২ বছর ছিলেন। এই বন্দর দিয়েই নিজ দেশের উদ্দেশ্যে পারি দিয়েছিলেন।
– – কার কথা বলছেন?
– – ফা হিয়েনের কথা। আরও অনেক ইতিহাস আছে। বাংলার মাটিতে আসলে ক হাজার বছরের যে ইতিহাস আছে, তা বলে বোঝানো যাবে না। আজ ব্রাহ্মণ আর মুসলিমরা এই ইতিহাসকেই মেটানোর চেষ্টা করছে।
– আচ্ছা, আর কী আছে?
– কনৌজের নাম শুনেছ?
– হ্যাঁ। কনৌজ তো এখনো আছে। পড়েছি এর আসল নাম কান্যকুব্জ।
– হ্যাঁ। আস্তে আস্তে লোকমুখে কনৌজ বলাই হয়। সেই নামেই লেখা হয়। মৌখরিয় বংশের রাজা হর্ষবর্ধনের সময় চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাং ভারতে বর্ষে এসেছিলেন। তার বিবরণ থেকে জানা যায় তিনি পুন্ড্রবর্ধন ছাড়া প্রাচীন বাংলার অন্যান্য জনপদে গিয়েছিলেন। যেমন তাম্রলিপ্ত কর্ণসুবর্ণ সমতটে মৌর্য সম্রাট অশোকের তৈরি বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন। সেই সময় তিনি তাম্রলিপ্তে অবস্থিত সমস্ত বৌদ্ধ বিহারগুলির বিবরণ শুনে ছিলেন । এ নিয়ে গ্রন্থও আছে।
– – পুথি?
– হ্যাঁ আমরা পুথিগুলিকেই বহুবার নকল করে গ্রন্থনির্মাণ করি।
– সেই সব গ্রন্থ কোথায়?
– কিছু কিছু পুড়িয়ে দিয়েছে। কিছু কিছু আছে। পালি ভাষায় লেখা সিংহলের প্রাচীন ইতিবৃত্ত মহাবংশ পুষ্পক থেকে জানা যায় তাম্রলিপ্ত জনপদটি সম্ভবত অশোকের সাম্রাজ্য ভুক্ত ছিল। মৌর্য রাজ অশোকের সম্পর্কে একটি কাহিনি থেকে জানা যায় প্রায় দেড় হাজার বছর আগে সিংহলের অধিপতি পান্ডুকাভয় এর পৌত্র দেবানজ প্রিয় অথবা দেবানং প্রিয় তিসসের রাজত্বকালে ভারত সম্রাট অশোক তাম্রলিপ্ত রূপনারায়ণ নদী বন্দর দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংহমিত্রাকে পাঠিয়েছিলেন । তাদের সঙ্গে ছিল পবিত্র বোধিদ্রুম এর চারা। সম্রাট স্বয়ং এই ধর্মীয় প্রচার যাত্রার সময় তাম্রলিপ্ত উপস্থিত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। মহামতি অশোকের বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের ফলে বৌদ্ধধর্ম যে বাংলার অন্যান্য জনপদের মতো তাম্রলিপ্ত রাজ্যে বিস্তার লাভ করেছিল তা অনুমান করা বোধ হয় ভুল হবেনা। গুপ্ত যুগ থেকে চৈনিক পরিব্রাজকদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত-র মধ্য দিয়ে তাম্রলিপ্তি বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব প্রতিপত্তির কথা জানা যায়। আজ থেকে নশ বছর আগে প্রথম দিকে চৈনিক বৌদ্ধ শ্রমন ফা-হিয়েন চম্পা থেকে দক্ষিণ মুখে ৫০ যোজন পথ অতিক্রম করে গঙ্গা নদীর মোহনায় অবস্থিত তাম্রলিপ্ত বন্দর শহরে এসেছিলেন তা আমরা আগেই জেনেছি। এখানে এসে তিনি একটি বৃহৎ পাঠাগার দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
– পাঠাগার? মানে লাইব্রেরি?
– কী?
– না, মানে যেখানে সব গ্রন্থ থাকে।
– হ্যাঁ, তিনি তাম্রলিপ্ত বন্দরে অবস্থিত বৌদ্ধ বিহার সংলগ্ন উন্নত মানের পাঠাগার তাকে এমনি মুগ্ধ করে যে তিনি দু’বছর এখানে একটি বৌদ্ধ মঠে অবস্থান করে বৌদ্ধ সূত্র ও বৌদ্ধ প্রতিমা চিত্র নকল করেন। ফা হিয়েন এর সময়ে তাম্রলিপ্ত যে বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট সমৃদ্ধি ছিল তা তার বিবরণ থেকে জানা যায় তার সময়ে তাম্রলিপ্তি অসংখ্য বিকশিত চব্বিশটি বৌদ্ধ বিহার ছিল এমনকি তিনি লিখেছেন সমগ্র দেশটি ছিল বৌদ্ধপ্রধান। আনুমানিক ৬৩৯ অথবা ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙ বাংলাদেশে আসেন এবং বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রগুলি অনুসন্ধানের জন্য বাংলার বিভিন্ন জনপদ ঘুরে বেড়ান। তার বিবরণ থেকে জানা যায় তিনি পুন্ড্রবর্ধন, কর্ণসুবর্ণ, তাম্রলিপ্ত ও সমতটে গিয়েছিলেন এবং ঐ সকল জনপদগুলোতে প্রচলিত ধর্মমত সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন। তার লেখা থেকে জানা যায় পুন্ড্রবর্ধন হীনযান ও মহাযান উভয় পন্থি বৌদ্ধ ভিক্ষু, কর্ণসুবর্ণ সম্মতিও শাখাবোলম্বি
– বৌদ্ধ ভিক্ষু, তাম্রলিপ্তের সর্বাস্তিবাদ এ বিশ্বাসী শ্রমণ এবং সমতটে হীনজানপন্থি বৌদ্ধ ভিক্ষু বাস করতেন।
– তার বিবরণ থেকে জানা যায় ওই সময় তাম্রলিপ্তি মাত্র ১০ টি বিহার ছিল এবং ওই বিহার গুলিতে মোট প্রায় ১০০০ স্রবন বাস করতেন। এছাড়া তিনি তাম্রলিপ্ত রাজ্যে সম্রাট অশোক নির্মিত একটি বৌদ্ধ স্তুপ এর নিকট চারটি বুদ্ধ মূর্তি স্থাপিত ছিল তাও লিপিবদ্ধ করে গেছেন। শুধু হিউ এন সাং নন ৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে চৈনিক পরিব্রাজক ইৎসিং তাম্রলিপ্ত এসেছিলেন এবং তিনি সেই সময়ে ৫~৬ টি বৌদ্ধ বিহার এখানে দেখেছিলেন।
– সুতরাং তাম্রলিপ্ত যে উচ্চমানের বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্র ছিল তা চৈনিক পরিব্রাজক দের বারবার আকর্ষণের অন্যতম কারণ। ইৎসিং এখানে অবস্থানকালে চৈনিক শ্রমন তা-চেন-তেন এর দর্শন পান।
– ইৎসিং এখানে কিছুকাল অবস্থান করে সংস্কৃত শব্দ বিদ্যা অধ্যয়ন করেন এবং “নাগার্জুন বোধিসত্ত্ব সু হৃ লেখ ” উল্লেখ নামে একটি সংস্কৃত পুস্তক চৈনিক ভাষায় অনুবাদ করেন । তার সময়ে এই বরাহ ও বিহারে রাহুল মিত্র নামে ৩০ বছরের বয়স্ক ভিক্ষু বাস করতেন। তার অসীম জ্ঞান ও অনিন্দনীয় চরিত্র যে ইদ সিং কে মুগ্ধ করেছিল তার পরিচয় তিনি দিতে ভোলেননি। প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্ত বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসাবে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেছিল তা চৈনিক পরিব্রাজক দেশ ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে একদিকে তাম্রলিপ্ত বন্দর এর পতন ঘটে অপরদিকে হুগলি রূপনারায়ন গতিপথ পরিবর্তন ও সমুদ্রের নাব্যতা কমে যাওয়ার জন্য তাম্রলিপ্ত নামটি বিবর্তনের ২৩ টি অধ্যায় অতিক্রম করে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় থেকে তমলুক নামে পরিচিতি লাভ করে।
– প্রায় পাঁচ হাজার বছরে বহমান কালের নানান ইতিহাসের সাক্ষী তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ি। ময়ূর রাজবংশ নামে পরিচিত।
– তাম্রলিপ্ত রাজপরিবারের উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে। মহাভারতের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় তাম্রলিপ্তের রাজকুমার তাম্রধ্বজ উপস্থিত ছিলেন। এর পরে উল্লেখ মেলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে। যুবরাজ তাম্রধ্বজ বিশাল হস্তিবাহিনী সঙ্গে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষ নিয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে করেন। মহাভারতে তাম্রলিপ্তের রাজ পরিবারের তৃতীয় উল্লেখ পাওয়া যায় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর, সম্রাট যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞের সময়ে।
– তমলুক রাজবাড়ির ময়ূরধ্বজ এবং তাঁর পুত্র তাম্রধ্বজ মহাভারত প্রসিদ্ধ। দ্রুপদ কন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় বহু রথী মহারথী রাজদের নামের সঙ্গে তাম্রলিপ্ত ও কলিঙ্গ নাম দুটি প্রাপ্ত হয়। সভাপর্বে বঙ্গবিজয় প্রসঙ্গে তাম্রলিপ্ত রাজার নাম পাওয়া যায়। জৈমিনী মহাভারতে আশ্বমেধিক পর্বে ৪১ তম – ৪৬ তম অধ্যায় তাম্রলিপ্তরাজ ময়ূরধ্বজের নাম মেলে। তাঁর বংশধরেরা নিজেদের
– মাহিস্য বলতেন।
– কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বের মহাভারতীয় যুগে ভারতের সভ্যতার এক চরম বিকাশ হয়েছিল। মহাভারতে বহু প্রপথ , পরিরথ্যা এবং বাণিজ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বঙ্গের তাম্রলিপ্ত সেই যুগ হতেই এক বিশিষ্ট স্থল ও নৌবাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই জন্য জৈমিনী মহাভারতে তাম্রলিপ্ত রত্নগড় বা রত্নপুর নামে অভিহিত করেছেন।
– বলেন বৈশম্পায়ন, শুন জনমেজয়।
– রত্নাবতীপুরে গেল পান্ডবের হয়।।
– রত্নাবতীপুরে রাজা শিখিধ্বজ নাম।
– বড়ই ধার্ম্মিক সেই সর্ব্ব গুণধাম।।
– কাশীদাসী মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে লেখা হয়েছে উত্তর পূর্ব ভারতের মণিপুর থেকে যুধিষ্ঠিরের আশ্বমেধের ঘোড়া তাম্রলিপ্ত নগরে প্রবেশ করে। এখানে তাম্রলিপ্ত রাজ্যকে রত্নাবতীপুর নামে অভিহিত করা হয়েছে। উক্ত পংক্তিতে হয় অর্থে ঘোড়াকে বোঝানো হয়েছে।
– শিখি কথাটির অর্থ হল ” ময়ূর” ; তাই তমলুক রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজার নাম ময়ূরধ্বজ হিসাবেই রাজবাড়ির বংশতালিকায় উল্লেখিত এবং বিভিন্ন গ্রন্থেও ঐ নাম দেখা যায়। তিনি অর্থাৎ ময়ূরধ্বজও অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সময়টা পাণ্ডবদের অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতির সময়েই ছিল। উক্ত কারণে তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞ আনয়নের কার্যও সমাপ্ত করে রেখেছিলেন। সেই অশ্ব রক্ষার দায়িত্ব ছিল ময়ূরধ্বজ পুত্র তাম্রধ্বজের উপর।
– অশ্বমেধ যজ্ঞ করিবেন নরপতি।
– অশ্বরক্ষা করে তাম্রধ্বজ মহামতি।।
– জ্ঞাতব্য যে পবিত্র নর্মদা নদীর একটি অংশ হয়ত অখণ্ড ভারতের পূর্ব উপকূল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল ,যা এখন লুপ্ত অথবা ময়ূরধ্বজের রাজত্ব নর্মদার তীর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল।
– কাশীদাসী মহাভারতে তাই বলা হয়েছে –
– অশ্ব লয়ে আছে সেই নর্ম্মদার তীরে।
– দৈবে অর্জ্জুনের ঘোড়া গেল সেই পুরে।।
– দৈবের খেলায় দুই অশ্বমেধের ঘোড়াই তাম্রধ্বজের হাতে এলো। সেই সময় তাম্রলিপ্ত রত্নাবতীপুর নামেই ভারতে পরিচিত। হস্তিনাপুরের অশ্বমেধের ঘোড়া আটকানোর জন্য পাণ্ডব পক্ষের সঙ্গে তাম্রধ্বজের প্রবল সংগ্রাম হয়।
– সেই সংগ্রামে তাম্রধ্বজ একা পরপর কর্ণপুত্র বৃষকেতু, রাজা যুবনাশ এবং তাঁর পুত্র সুবেগ, দৈত্যরাজ অনুশাল, ভদ্রাবতীপুরের রাজা হংসধ্বজ, মণিপুরের রাজা অর্জুনপুত্র বভ্রুবাহন, কৃষ্ণ -নন্দন প্রদ্যুম্ন, কৃষ্ণ সারথী সাত্যকি, ভীম, অর্জুন একে একে সকলকে পরাজিত করেন।
– শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে তাম্রধ্বজের পিতা পরম বৈষ্ণব ময়ূরধ্বজের মিলনে হস্তিনাপুরের অশ্ব মুক্ত হয় এবং ময়ূরধ্বজ সসম্মানে পাণ্ডববাহিনীতে যোগদান করেন। অতঃপর দুইটি অশ্বই হস্তিনাপুরে আনীত হয়। তাম্রলিপ্তের অশ্বটির সঙ্গে হস্তিনাপুরে রাজা ময়ূরধ্বজ স্বয়ং আসেন এবং হস্তিনাপুরে একই দিনে দুইটি অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়।
– মধ্যযুগে তাম্রলিপ্ত বন্দর ছিল অন্যতম। এই তাম্রলিপ্ত বন্দর দিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সিংহল যাত্রা করেছিলেন সম্রাট অশোকের পুত্র ও কন্যা।
হাঁটতে হাঁটতে দুজন এসে দাঁড়ালেন একটি দিঘির সামনে।
দিঘির জলে শাপলা ফুল ফুটে আছে। দেখে মনে হচ্ছেনা সময়টা আলাদা। আকাশটাকে দেখেও বোঝা যাচ্ছে না কিছু। শান্ত ভিক্ষু এবং মৃন্ময় দুজনেই তন্ময় হয়ে তাকিয়েছিলেন সেইদিকেই। এখান থেকে অনেকটা দূর পর্যন্তই আকাশটাকে দেখা যায়।
– আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগে, তাই না?
– খুবই।
– তারপর তাম্রলিপ্ত সম্পর্কে বললেন না?
– অনেক কিছুই তো আছে। মহাভারত কাব্যেও তাম্রলিপ্তের সম্পর্কে কথা আছে। তখন তাম্রলিপ্ত-র নাম কী ছিল জানো?
– না।
– রত্নাবতীপুর।
– কী দারুণ নাম। কিন্তু এই নাম তো কেউ বলে না তেমন।
– বলেন বৈশম্পায়ন, শুন জনমেজয়।
রত্নাবতীপুরে গেল পান্ডবের হয়।।
রত্নাবতীপুরে রাজা শিখিধ্বজ নাম।
বড়ই ধার্ম্মিক সেই সর্ব্ব গুণধাম।।
– আরে বাবা, মহাভারত।
– হ্যাঁ। মহাভারত। রত্নাবতীপুরমের কথা অনেকেই জানে না। কিন্তু বজ্রপুর নামটা আজও তাম্রলিপ্তে গেলে শোনা যায়। কারণ সেখানে বজ্রপুর বলে একটা এলাকাই আছে। বজ্রপুরে আমাদের একটা স্তূপ ছিল। সেই স্তুপে প্রচুর পরিমাণে গ্রন্থ ছিল। কিন্তু সব ধ্বংস হয়ে গেছে।
– সব ধ্বংস ?
– হ্যাঁ। সব ধ্বংস।
– এ জন্যই কি একে অন্ধকার যুগ বলে?
– অন্ধকার যুগ কোনটা? আর কোনটাই বা নয়? ভারতের ইতিহাসে প্রচুর অন্ধকার যুগ এসেছে, যাচ্ছে। আমরা কবে আর অন্ধকার যুগ পেরোলাম? শুধু গৌতম কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন এই অন্ধকার থেকে মানুষকে আলোর পথ দেখাতে।
– পারেননি।
– গৌতমের নাম নিশ্চয় শুনেছেন আপনি?
– হ্যাঁ মহামতি বুদ্ধের কথা কে না জানে?
– আপনি যেখান থেকেই আসুন না কেন, মহামতি বুদ্ধের কথা শুনেছেন দেখে ভাল লাগল।
– আমার একটা কথা মনে হয় ভিক্ষু, বলি?
– হ্যাঁ বলো।
– আপনি আমাকে মাঝেমাঝে আপনি বলছেন, মাঝেমাঝে তুমি। আমার একটা বিনীত ইচ্ছে হল, আপনি আমাকে তুমিই বলবেন। কারণ আপনি আমার চেয়ে এক হাজার বছরের কাছাকাছি সময়ের বড়।
– আমি? কই? আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আমাদেরই বয়সী।
– ভুলে যাবেন না, আমি কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে আপনার কাছে এসেছি।
-কিন্তু তুমি আমার পরম বন্ধুর বন্ধু। আমার বন্ধু তোমাকে কেন যে অমন ভাবে ছুটে আসতে বলল, বুঝতে পারলাম না। সে কি খুব বিপদে পড়ল আবার?
– সূত্রধরের সঙ্গে আপনার পরিচয় এতটা, সে আমাকে কখনো স্বপ্নে বলেনি।
– আমি সেটিও ভাবছি। আসলে, কী জানো, তোমাকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, তুমি এমন একটা জায়গা থেকে এসেছ, যে জায়গাটা খুব একটা শান্তির জায়গা নয়।
– না নয় তো। দু দুটো বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেছে এর মধ্যে। ধ্বংস হয়েছে একটা গোটা শহর। আপনি অনেক কিছুই জানেন না। আপনাদের ধর্মে যারা বিশ্বাসী, তাদের কাছে এখন লক্ষ লক্ষ পারমাণবিক বোমা।
– বোমা? সেটা কী?
– আপনাকে তা বোঝাতে অনেক কিছু জানাতে হবে। আসলে, আমরা যে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেটিই অন্ধকার যুগ।
– অন্ধকার যুগ?
– হ্যাঁ। জানেন, আপনাদের এই সময়কে বলা হয় মধ্য যুগ। অন্ধকার যুগ। কিন্তু আসলে এ যুগটা আমাদের যুগের তুলনায় খুব কম হিংস্র।
– কিন্তু তুমি কোথা থেকে এসেছ? কী করবে? কীভাবে করবে, আমি বুঝতে পারছি না।
– আপনাকে সব বলব, শুধু আমাকে বলুন, আপনি আমেরিকার কথা জানেন? জাপান? রাশিয়া?
– না। এসব কী?
– আপনারা এর পর পাড়ি দেবেন এই দেশ ছেড়ে অন্য দেশে। ব্রহ্মদেশের কথা বললেন, তার পরে যাবেন সুমাত্রায়, জাকার্তায়, কম্বোডিয়ায়, ভিয়েতনামে, জাপানে, চিনে। আপনাদের ধর্ম ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বজুড়ে।
– শান্তি আসবে তবে?
– শান্তি? না। আপনাদের ধর্মে যারা দীক্ষিত হবে, তারাই আবার একের পর এক মানুষকে হত্যা করবে। নৃশংস হত্যা। তারা নিজেরাও ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। এ হচ্ছে বাস্তব।
– ভগবান বুদ্ধর কথা মেনে চললে?
– ভগবান বুদ্ধের পথে কেউই হাঁটবে না ভিক্ষু। শুধু অল্প কিছু জায়গায় জ্ঞান পড়ে থাকবে। কিন্তু সে সব এক গুপ্ত সাধনার মতো থেকে যাবে মানুষের কাছে।
– সে অবশ্য শাসকের ধর্ম। এর আগেও যাঁরা বৌদ্ধধর্মানুসারী শাসক ছিলেন এই বাংলায়, তাঁরাও খুব একটা শান্তিপ্রিয় ছিলেন তা নয়।
– আপনি কি মাৎস্যন্যায়ের সময়ের কথা বলছেন?
– সময়কাল আসলে পরবর্তীকালে মনে হয় গতকালের বিষয়। কিন্তু তা তো নয়। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে পাল বংশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর প্রায় একশ বছর ধরে বাংলায় ঘোর অরাজকতার চলছিল। সেই মাৎসন্যায় থেকে মুক্তি পেতে বাংলার জমিদাররা গোপাল পাল নামক এক সামন্তকে গৌড়ের রাজা হিসাবে বসান গদিতে। গোপাল পাল তাঁর রাজত্ব শুরু করেন।
পাল মানে জানো তো? “রক্ষাকর্তা”। পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ। মহাযান অবলম্বন করতেন। কেউ কেউ তান্ত্রিকদেরও। গোটা বাংলা এবং বিহারে ছিল পাল রাজাদের শাসন। পাটলীপুত্র, বিক্রমপুর, রামাবতী, মুঙ্গের, তাম্রলিপ্ত ও জগদ্দলে তখন আমরা শান্তিতেই থাকতাম।
এই সময়টাকে বলা যায় বাংলা তথা ভারতে সবকিছুর স্বর্ণযুগ। পাল বংশের রাজারা ছিলেন ঘোরতর কূটনীতিবিদ। প্রকৃত রাজা বলতে ওদেরকেই বলা যায়। তাঁরা ভারতীয় দর্শন, সাহিত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এ যুগটাই ছিল বাংলার সোনার যুগ।
গোপালের মৃত্যুর পর, ধর্মপাল বাংলার সিংহাসনে বসেন। তিনিও ছিলেন যোগ্য যোদ্ধা এবং কূটনীতিজ্ঞ। তিনি সারা ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে চেয়েছিলেন।
৪০ বছর ধরে ধর্মপালের রাজত্ব ছিল। কিন্তু তিনিও কি হিংস্র ছিলেন না? তিনি সারাজীবন ধরে পশ্চিম ভারতের গুর্জ্জর প্রতিহার রাজবংশ এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিলেন, যা ইতিহাসে “ত্রিশক্তি সংগ্রাম” নামে পরিচিত।
সিদ্ধমাতৃকা লিপিতে বাংলার শাসক ধর্মপালের নামাঙ্কিত একটি স্বর্ণমুদ্রা বা দিনার ছিল। এখনো পাওয়া যায়। আমার কাছে কিছু আছে। তোমাকে দেব। যার একপিঠে রয়েছে অশ্বারোহী ধর্মপালের খোদিত চিত্র। রাজার হাতে রয়েছে একটি বল্লম, যা দিয়ে তিনি একটি পশুকে বধ করতে উদ্যত হয়েছেন।
মুদ্রার অপরপিঠে দেখা যাচ্ছে দেবী লক্ষ্মী একটি প্রস্ফূটিত পদ্মফুলের উপরে বসে আছেন। দেবীর দুই হাতে রয়েছে লম্বা ডাঁটা সম্বলিত পদ্মফুল। দুই পাশে রয়েছে দুটি মঙ্গলঘট।
রাজার সামনে থাকা পশুটি, যাকে রাজা বধ করতে উদ্যত হয়েছেন, একঝলক দেখলে পশুটি সিংহ বলে মনে হলেও পশুটির মুখের সম্মুখভাগের সঙ্গে বরাহের সাদৃশ্য আছে। সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবে পশুটিকে সিংহ এবং বরাহের এই মিলিত রূপ দেওয়া হয়েছিল। কারণ, সিংহ ছিল ধর্মপালের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত রাষ্ট্রকূটদের রাজকীয় চিহ্ন এবং বরাহ ছিল গুর্জ্জর প্রতিহারদের রাজকীয় চিহ্ন। অর্থাৎ ধর্মপাল তাঁর উভয় প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীকে বধ করছেন।
– প্রতীক।
– হ্যাঁ প্রতীক। এই দেশের শিল্পচর্চার এক অন্যতম ভাষা হল প্রতীক। যা বলছি, তা আসলে বলছি না। যা বলছি, তা আসলে অন্য কিছু বলার একটা ভাষা।
– চর্যাপদ।
– চর্যা? আমি তার কিছু অংশ পড়েছি। সব পড়িনি। বেশ কিছু পুথি নিয়ে এদিকে ওদিকে চলে গিয়েছিলেন কয়েকজন ভিক্ষু। তার একটা অংশ পড়েছিল আমাদের এই গৌড়ে। কিন্তু সেই পুথি কতদিন সংরক্ষিত থাকবে, তা বুঝতে পারছি না।
– কেন?
– তার কারণ দুই দিক থেকে এখন আমাদের উপর আক্রমণ চলছে। বৌদ্ধদের ধ্বংস করার জন্য ব্রাহ্মণদের কেউ কেউ হাত মিলিয়েছে সুলতান শাসকদের সঙ্গে। তবে এখন সুলতান শাসকরাও বাংলায় এসে পালটে গেছে।
দিঘির পাড় ধরে ধরে কিছুদূর এগিয়ে তারা দেখতে পেল সামনে একটা বিশাল বড় জঙ্গল।
মৃন্ময়ের দুই চোখ সেই জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে ভিক্ষু জিজ্ঞেস করল, সামনে যেটা আছে, তা এক বিরাট বড় জঙ্গল। আমাদের কিন্তু এই জঙ্গল পেরিয়ে যেতে হবে।
– এত বড় জঙ্গল তো এখানে ছিল না।
শান্ত ভিক্ষুর ততক্ষণে সয়ে গেছে এই ধরনের কথাবার্তা।
তিনি বললেন, এই জঙ্গল কিন্তু বহুদিনের পুরোনো। কত ভিক্ষু যে এই জঙ্গলের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন যখন ব্রাহ্মণরা আক্রমণ করেছিল।
– সে আবার কবেকার কথা?
– একশ দেড়শ বছর আগে।
– কী হয়েছিল?
– ব্রাহ্মণরা এই বাংলাদেশ থেকে বৌদ্ধদের উৎখাত করতে চেয়েছিল। ততদিনে বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যেও অনেক বেনো জল ঢুকে গেছে। অনেকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করছে তার ভিতরের কোনো কথা আদৌ না বুঝে। কিন্তু ব্রাহ্মণরা এ সময়ে সারা দেশেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হত্যা করছে। এদের আবার সাহায্য করছে দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট বংশের রাজারা। গোটা দেশেই ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে তখন। বৌদ্ধবিহার, বৌদ্ধ মঠ তো ধ্বংস করলই। তারা বাংলা, উড়িষয়া, বিহার নানা জায়গায় বৌদ্ধবিহার, বৌদ্ধ মঠগুলোকে ধ্বংস করে সেখানে তৈরি করল তাদের মন্দির। অনেক জায়গায় বৌদ্ধদের তৈরি করা কাঠামোতেই মন্দির গড়ে তুলল। আবার অনেক জায়গায় গোটা মঠ বা বিহারটাকেই মন্দির বলে ঘোষণা করে দিল। সে সময় এই ভয়ংকর জঙ্গলের মধ্যে বৌদ্ধরা নিজেদের লুকিয়ে ফেলল। এখানে লুকিয়ে একটা মঠও গড়ে তুলল। সেই মঠ এখনো আছে। আমি নিজেও সেই মঠেই ছিলাম। থাকিও মাঝেমাঝে।
– তাহলে এই জঙ্গল এত বিপদের কেন?
– কারণ দুটো। প্রথমটি তত বিপদের কারণ নয়। তারা হল হিংস্র জন্তু। এখানে বাঘ, চিতাবাঘ, সাপ সবই আছে। পদে পদে বিপদ। কিন্তু তারা বনের পশু। খিদে পেলে আক্রমণ করে। খিদে না থাকলে আক্রমণ করে না। একটূ সাবধানে যেতে হবে, যাতে সাপের গায়ে পা না পড়ে। বাংলা মানেই সাপের জঙ্গলও বটে। কিন্তু দ্বিতীয় বিপদটি সাংঘাতিক। ডাকাত।
– ডাকাত! মানে সেই আগের যে সব ভয়ংকর ডাকাতের কথা পড়েছিলাম?
– ডাকাতরা খুব ভয়ংকর। তারা সর্বস্ব লুট করে নেয়। তোমার এই বিচিত্র পোশাক তো তারা লুট করে নেবেই। তোমাকে বিচিত্র শত্রু হিসেবে ভেবে নিয়ে হত্যাও করতে পারে।
– হত্যাও?
– হ্যাঁ।
– এত রাগের কারণ কী?
– ভাই, কোনোকিছুই কারণ ছাড়া হয় না। কারো কারো কাছে অত্যাচার, অনাচার, জাতিবিদ্বেষ সবকিছু এত অসহ্য হয়ে যায়, যে সে তখন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
– তাই বলে ডাকাত হবে?
এ কথা শুনে চুপ করে রইলেন শান্ত ভিক্ষু। তার মুখে একটা কালো ছায়া পড়ল। একটু কি দুঃখের ভার?
-না , ডাকাত হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু কেউ সাধ করে ডাকাত হয় না। এরা আমাদের এই বাংলার এই অঞ্চলের প্রান্তবাসী। এদের কেউই সহ্য করতে পারে না। না পারে ব্রাহ্মণরা, না পারে বৌদ্ধরা না পারে সুলতান শাসকরা। এদের মধ্যেই অনেকে ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছে। তারা চাষবাস করে, জেলেমাঝি, কোথাও বা শ্রমিক।
শুনেছি। আমি জানি।
না কিছুই জানো না। এদের উপর শুধু ব্রাহ্মণরা অত্যাচার করত তাই না, অত্যাচার করত তথাকথিত উচ্চবর্ণের বাঙালি জমিদাররাও। গ্রামের মধ্যে এদের ছায়া মাড়ালে নাকি জাত যেত। বৌদ্ধধর্ম প্রথমে এই জাতিভেদ প্রথা দূর করে। কিন্তু বৌদ্ধদের হারিয়ে আবার যখন হিন্দুরা মানে হিন্দু উচ্চবর্ণীয় শাসকরা এসে যায়, তখন আবার শুরু হয় প্রান্তবাসী মানুষের উপর চরম নির্যাতন। এরা সবাই ভাগচাষি। নিজেদের জমি থাকলেও এদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়। অন্যের জমিতে চাষ করে আধপেটা খেয়ে জীবন যাপন করে। এদের পরিবারে মা বোনেদের ইজ্জত ইজ্জত নেই। বরের সামনে বউকে গ্রামের মধ্যে ধর্ষণ করা হয়। যে কোনও সময় হত্যা করে ফেলে রাখা হয় খেতের মধ্যেই। এদের জন্য কোনও নিয়ম নেই, আইন নেই, শাসন নেই। এরা সবসময়ই অত্যাচারিত।
আমরা যে এই জঙ্গলের মধ্যে ঢুকব, আমাদের…
মৃন্ময়ের এবার ভয় করতে শুরু করল। সেও যে বাংলার এই সব ডাকাতদের নামে আগে পড়েনি তা নয়। কিন্তু মধ্যযুগের এসব ডাকাতদের কথা আগে শোনেনি। কোথাও লেখা নেই যে।
– বাংলার প্রান্তে থাকা নিচু জাতের এই সব লোকেরা অনেক অত্যাচার সইতে সইতে একটা সময় নিজেদের প্রয়োজনেই অস্ত্র ধরে। এদের ভয় পায় মারাঠারাও। সুলতানি ফৌজও এই জঙ্গলে ঢোকে না। তাই এখানে বৌদ্ধরা নিজেদের মতো করে থাকতে পারে। ডাকাতরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কোনোভাবে স্পর্শ করে না।
– কেন? আপনাদের ওই মঠেও তো অনেককিছুই আছে।
– আছে। তবে সবই পুথি। শিল্পকার্য। সোনাদানা টাকাপয়সা নেই। বরং বুদ্ধকে এরা কীভাবে যেন নিজেদের ভগবান করে নিয়েছে। হিন্দুরা এখন থেকেই তো বলতে শুরু করে দিয়েছে বুদ্ধ হচ্ছে বিষ্ণুর দশম অবতার। সে কথা এদেরও কানে গেছে হয়তো। বুদ্ধকে এরাও ভগবান নামে পুজো দিয়ে যায় মাঝেমাঝে।
– আমাকে ছাড়বে না তবে।
– কেন?
– আমি তো ভিক্ষু নই।
– তাই তো ভিক্ষু সাজাব। তোমাকে আমার মতো একটা পোশাক দেব। সেই পোশাক পরে তুমি সম্পূর্ণ লামা সেজে তোমার ব্যাগ আমার মতো করে পুঁটুলির কাপড়ের মধ্যে নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে যাবে। তুমি ভিক্ষু দেখলে, তোমাকে ওরা আক্রমণ করবে না।
– তাহলে আমি।।
– – হ্যাঁ এই যে ডানদিকে পাহাড় দেখছ, ওইখানে আমরা এখন যাব। সেখানে একটা গুহা আছে। সেখানেই আমরা খেয়েটেয়ে নেব। কিছু কাঠকুটো জড়ো করে নিয়ে আসছি। তুমি গুহার ভিতরেই থাকবে। বাইরে যাবে না।
– আজ আমরা তবে পাহাড়ের গায়ে?
– হ্যাঁ। পাহাড় থেকে জঙ্গলটাও সম্পূর্ণ দেখা যাবে, দেখতে পাবে। রাতে আমরা জঙ্গলে প্রবেশ করব না। প্রবেশ করব আগামীকাল ভোরবেলায়। ভোরবেলায় ঢুকে আমরা ডাকাতদের এলাকাটা খুব দ্রুতই পেরিয়ে যেতে পারব আশা করছি। তারপর আমাদের যেতে হবে সেই মঠে। সেখানে আমার একটি গুম্ফা আছে। ছোট। মঠের মধ্যে একটি ঘর আর কী। সেখানে তুমি আমাদের গ্রামের মানুষগুলোর মতো করে পোশাক পরে নিও।
– তাহলে আমরা এগোই?
শান্ত ভিক্ষু এবং মৃন্ময় এগিয়ে চলল জঙ্গলের পশ্চিম দিকে যে পাহাড়, সেই দিকে। এই পাহাড়টিকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় কেউ যেন এর গা থেকে মাংস খুবলে নিয়ে চলে গেছে।
পাহাড়টির এক দিক থেকে একটি বিশাল বড় ঝরনা নেমে এসেছে। ঝরনা থেকে জন্ম নিয়েছে নদী। নদীটি অবশ্য ছোট একটি নদী। বৃষ্টির জল থেকেই এই নদীর জন্ম। এই নদীর নাম শ্রী। শ্রী নামের এই নদীর কথা আগে কখনো শোনেনি মৃন্ময়। শান্ত ভিক্ষুর সঙ্গে খেতের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের দিকে যেতে যেতে ভাবছিল মৃন্ময়, জীবন কী অদ্ভুত একটা মোড়ের মাথায় এসে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাদের। নানারঙের পাখি উড়ছে। পাহাড়ের নিচ থেকেই ঘন জঙ্গলটা শুরু হয়ে গেছে। এমন ঘন জঙ্গল, যেন মনে হচ্ছে কারো মাথার কোঁকড়ানো চুল। সেই দিগন্ত অব্দি বিস্তৃত এই জঙ্গল। মৃন্ময়ের মনে পড়ে, এই এলাকায় সে কখনো জঙ্গল দেখেনি। একটি জঙ্গলের মধ্যে সে একবার বেড়াতে গিয়েছিল, সেই জঙ্গলের নাম ছিল জয়পুরের জঙ্গল। এই কি সেই জয়পুরের জঙ্গল?
শান্ত ভিক্ষুর দিকে তাকিয়ে মৃন্ময় জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, এটাই কি জয়পুরের জঙ্গল?
– জয়পুরের জঙ্গল? সে তো বিষ্ণুপুরের দিকে। তুমি তো বিষ্ণুপুরের দিকে নও। অবশ্য এখান থেকে বিষ্ণুপুরের দিকে যাওয়া যায়। জয়পুরের জঙ্গলেও বহু বৌদ্ধদের হত্যা করা হয়েছিল।
– বৌদ্ধদের হত্যা করা হয়েছিল?
– হ্যাঁ। যে সব বৌদ্ধ দক্ষিণের দিক থেকে বাংলা ধরে নেপালের পথে তিব্বতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তাদের পিছনে ধাওয়া করে হিন্দু রাজাদের সৈনিক। নেতৃত্বে ছিলেন ব্রাহ্মণরা। এখানে তখন ব্রাহ্মণরা প্রবল বৌদ্ধবিরোধী হাওয়া তুলেছিলেন। সে সময় পালাতে পালাতে পুঁথিপত্র সহ এই জঙ্গলের মধ্যে আশ্রয় নেন সেই সব বৌদ্ধভিক্ষুরা। কিন্তু কোনোভাবে খবর চলে যায় হিন্দু রাজা আর জমিদারদের কাছে। তারা সৈন্য পাঠায় আর জঙ্গলটাকে ঘিরে ধরে। এই জয়পুরের জঙ্গলে প্রায় আড়াইশো জন বৌদ্ধ ভিক্ষুককে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের পুথিপত্রও এই জঙ্গলেই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
– অ্যাঁ। আমি তো এসব জানতামই না।
– অনেকেই জানে না। কারণ ব্রাহ্মণরা এসবের কোনও চিহ্ন রাখবে না। এই সমস্ত কিছু যে ধ্বংস হয়েছে, তার জন্য দায়ি করে ব্রাহ্মণরা মুসলিমদের। মুসলিমরা দস্যু। ভয়ংকর অত্যাচারী। ওরা এখানে অনেক কিছুই ধ্বংস করেছে। কিন্তু আমাদের ধ্ব্বংসের জন্য দায়ি হল হিন্দুরা। কিন্তু তারাই ইতিহাসকে বিকৃত করছে। জানি না,কত বছর ধরে এই বিকৃত ইতিহাস জানবে মানুষ।
– জানবে। বহু বছর ধরেই জানবে। একটা সময় আসবে, যখন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা একটা ইতিহাসকেই মুছে ফেলার
– ভগবান বুদ্ধর পথ এতই কি কঠিন মৃন্ময়?
– আপনি তো জানেন না ভিক্ষু, বুদ্ধের নামে একটি বোমা তৈরি হয়েছিল।
– আবার বোমা?
– হ্যাঁ। আগামী সময়ের অস্ত্র।
– এই আগামীটা কবে আসবে?
– এই ধরুন আগামী পাঁচশো বছরের মধ্যেই আসবে।
– পাঁচশ বছরের মধ্যে আর কী কী আসবে? যা বলছ শুনছি।
হেসে উঠল মৃন্ময়। তারা দুজনেই পাহাড়ের ঢালের একটি গুহার সামনে চলে এসেছে। কথা বলতে বলতে আসার সময়ই ভিক্ষু বেশ কিছু শুকনো কাঠকুটো সংগ্রহ করে এনেছিলেন। যে ঝরনাটার জলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, তা খুব কাছ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে। শব্দ যেমন জোরালো ছিল, আকৃতি তেমন ভয়ংকর কিছু নয়। এলাকায় একে বলে ঝোরা। আবার ভাল বাংলায় বলে নির্ঝরিনী। গুহার মুখে জামাকাপড় খুলে একটা পট্টবস্ত্র নিয়ে মৃন্ময় ছুটল ঝরনার কাছে। পাথর ফাটিয়ে ঝরনাটি নেমে আসছে। এই পাহাড়ের মাথায় কোনও একটা জায়গা থেকে এই ঝরনার জল আসছে। একটু আগে ভিক্ষু বললেন যত শীত আসবে ঝরনার জল শুকিয়ে যাবে। শীতে একেবারেই শুকিয়ে যাবে। গ্রীষ্মেও কিছু পাওয়া যাবে না। আবার বর্ষার সময় এই ঝরনার জলের প্রাবল্য প্রচুর হয়ে যাবে। ক্ষীণতনু নদীটাকে উপর থেকে দেখতে ফিতের মতো লাগছে। এখান থেকে এই বাংলার অনেকটাই দেখা যাচ্ছে। এটাই কি তবে স্বপ্নের বাংলা? ডানদিকে বাঁদিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে শুধু খেত আর খেত। শস্যখেত। দূরে দূরে গ্রাম। কোনও কোনও গ্রাম থেকে ধোঁয়া উঠছে আকাশে। সেই সব গ্রাম সম্ভবত এই এলাকা থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার। সেখানে গিয়েই একদম থাকলে হত না? না, হত না কারণ সেই সব গ্রাম তারা ফেলে এসেছে। এবার তার চোখ গেল জঙ্গলের দিকে। যে জঙ্গলের মধ্যে এই ক্ষীণতনু নদীটা এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে। ভিতরে কতদূর গেছে নদীটা? পূর্ব থেকে পশ্চিমে এক বিশাল জঙ্গল। এই জঙ্গলই মিশে গেছে দক্ষিণে জয়পুরের জঙ্গলের সঙ্গে। যতদূর উত্তরের দিকে দেখা যায়, ততদূর জঙ্গল। হন গভীর জঙ্গল। অন্তত দশ কিলোমিটার একটা পথ তো এই জঙ্গলের ভিতরে রয়েছেই। তারও কি বেশি?
মৃন্ময় ঝরনার নিচে দাঁড়াতেই জলের ধারা তাকে ভিজিয়ে দিয়ে চলে গেল। আহ, যেন একেই বলে আরাম। মনের বিষণ্ণতা এভাবে স্নান করলে জলের সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে যায়। মুছে যায় সব মলিনতা। স্নান করলেই পেটের ভিতরটা কুঁইকুঁই করে। কিন্তু এখন কী খাবার আছে সঙ্গে? ভিক্ষু অবশ্য এ ব্যাপারে অভয় দিয়েছেন। দেখাই যাক, তিনি শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা করেন। আপাতত একটা বিষয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এটা মৃন্ময়ের চেনা বাংলা নয়। এমন একটা বাংলা যা তার সময়ের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে। সূত্রধর তাকে তো সেই বাংলাতেই চলে আসার কথা বলেছেন।
স্নান শেষে মৃন্ময় ধীরে ধীরে চলে এলেন গুহার সামনে। আগুন জ্বালিয়েছেন ভিক্ষু। তিনি এখানেই আটকে থাকেননি। সূর্যাস্ত আসন্ন বলে তিনি রান্নাও চাপিয়ে দিয়েছেন সেই আগুনে। একটি ছোট হাঁড়ির মতো দেখতে পাত্রে ভাত ফুটছে। গরম ভাতের গন্ধ সবসময়ই অন্যরকম। গরম ভাতের গন্ধের জন্য মানুষ যে কোনও সময়ের থেকে যে কোনও সময়ের দিকে চলে যেতে পারে। তার ভিতরে তিনি কীসব দিয়ে রেখেছেন। এগুলি কী, কে জানে। থাকগে, জানার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু তিনি কোথায়?
এদিক ওদিক চাইতেই মৃন্ময় দেখতে পেল একটা ভারী পুঁটলি নিয়ে তিনি পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে আসছেন।
– হল স্নান? এবার আমি স্নানে যাব। এই কিছু ফলমূল নিয়ে এলাম। আম, পেয়ারা, কলা। এগুলো খেতে শুরু করো। ভাতে কাচকলা আছে। এ৭
এই বলে তিনি চলে গেলেন ঝরনার দিকে। পুঁটলি থেকে একটা পরিষ্কার বস্ত্র নিয়ে নিলেন আর আরেকটি বস্ত্র নিয়ে ওর দিকে ছুঁড়ে বললেন, এই বস্ত্র পরে নাও এখনই। আর তোমার বস্ত্র এবং অন্যান্য যা যা আছে তা একটি পুঁটলির মধ্যে লুকিয়ে ফেলো। এই গুহার মধ্যে সেসব থাকবে। সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
– সে কী? আমি সে সব তো সূত্রধরকে দেওয়ার জন্য…
– না। কিছু নিয়ে যাওয়া যাবে না। তুমি যেখান থেকেই এসেছ, তুমি আসলে এই সময়ের মানুষের কাছে বিদেশি । আর বিদেশি মানেই এখানকার লোকেরা তোমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে। শত্রু ভাববে। আমাদের মিত্ররাও শত্রু ভাববে, আমাদের শত্রুরাও শত্রু ভাববে।
এই বলে চলে গেলেন শান্ত ভিক্ষু।
তা অবশ্য জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখার পক্ষে এই গুহা খুবই ভাল। গুহার দিকে এবার নজর গেল মৃন্ময়ের। গুহাটা ছোট। কিন্তু ভিতরে অনেকটা জায়গায় যাওয়া যায়। তার ব্যাগটা থেকে একটা টর্চ নিয়ে সে এগিয়ে গেল গুহার ভিতরে। গুহাটি বেশ লম্বা। স্থানে স্থানে গাছের শিকড়বাকড় ঝুলছে। এ গুহা কি তৈরি করা না কি নিজে থেকেই হয়েছে? এই পাহাড়টাই বা আছে তবকেন এমন ভাবে এখানে? আশেপাশে তো কোনও পাহাড় নেই। অবশ্য এই পাহাড়টাও ক্ষয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আধুনিক যুগের মতো মানুষ যে এই সব পাহাড়কে ক্ষতবিক্ষত করছে তা নয়।
ব্যাগের ভিতর থেকে শুধু মৃন্ময় তার ফোনটা লুকিয়ে নিয়ে নিল অন্তর্বাসের মধ্যে। নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না কিন্তু ছবি তুলতে হবে, যতক্ষণ চার্জ থাকে। অন্তত আরো দু দিন তো চার্জ থাকবেই আশা করা যায়।
ব্যাগটা নিয়ে গুহার ভিতরের এক কোণে রেখে দিল। জায়গাটা অন্ধকার। তিনটি পাথর দিয়ে আড়াল করে দিল ব্যাগটাকে।
তারপর এসে দেখল মৃন্ময় দুজনের জন্য খাবার সাজিয়ে ফেলেছে।
– এসো। খেয়ে নাও।
একটু হবিষ্যি খাওয়ার মতো অনুভূতি হল। কিন্তু পেট ভরে গেল। সূর্য তখন পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। জঙ্গলের দিক থেকে পশ্চিম দিকে দিগন্তের এক কোণে লাল বলের মতো সূর্যটা ঠিক তার নিজের সময়ের মতোই মনে হল মৃন্ময়ের। তার পর তার নিজেরই এই সব অনুভূতি নিয়ে হাসি পেল। এই সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের কাছে চার পাঁচশ বছর আর এমন কী? যেখানে সূর্য থেকে পৃথিবী আসতে আলোর সময় লাগে আট মিনিট, যেখানে পৃথিবীর বয়স সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের চেয়েও বেশি, যেখানে সৌরজগত পেরোতেই কত বছর লাগে, সেখানে চার পাঁচশ বা হাজার বছর এমন কী।
মৃন্ময় তন্ময় হয়ে ভাবছিল। শান্ত ভিক্ষু খাবার পরে ঝরনা থেকে নিয়ে আসা জল খাচ্ছিলেন।
মৃন্ময় জিজ্ঞেস করল, এই ঝরনার জল খাওয়া যায়?
শান্ত ভিক্ষু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মৃন্ময়ের দিকে।
– হ্যাঁ মানে, কেন খাওয়া যাবে না? খাও।
পাত্রটা নিয়ে একটু দোনামোনা ভাব করলেও তৃষ্ণা বেশিক্ষণ সহ্য করা যায় না। একটু জল খেয়ে প্রাণে স্বস্তি এল মৃন্ময়ের।
অন্ধকার হয়ে আসছে। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নানা জন্তুর গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়ের নিচেই রয়েছে জঙ্গল। জঙ্গলটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বেড়ে চলেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক অবশ্য অনেকক্ষণ ধরেই পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু অন্ধকার না হলে ঠিক এই ঝিঁঝিঁপোকার মাহাত্ম্য বোঝা যায় না। অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে অসংখ্য জোনাকি।
মনে যেন আস্তে আস্তে যেন শান্তি ফিরে আসছে। বাতাসে কোনও বিষ নেই। কিন্তু মানুষের মনে বিষের অভাব নেই। সে যে যুগেরই সময়ের মানবসভ্যতা হোক না কেন, মানুষ মানুষকে অত্যাচার করবে, মানুষ মানুষকে হীন করে দেখাবে, মানুষে মানুষের বিভেদ গড়ে তুলতে মানুষই মানুষকে ছোট করবে বারবার। আর সেই সব মানুষ একটা সময় ঘুরে দাঁড়াবে। সেই সব মানূষের মধ্য থেকেই উঠে আসবে প্রতিশোধ। এই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অন্যায়ের এক আবহ গড়ে উঠবে, টিকে থাকবে। মানুষের মনের ভিতর গেঁথে যাবে অন্যায়ের এক চিরন্তন প্রবাহ। তিক্ততা বাড়তে বাড়তে এক সুউচ্চ পাহাড় তৈরি হবে, যা অদৃশ্য থাকবে। কিন্তু মানুষের মনের ভিতর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলবে হিংসার এক ধারাবাহিক স্রোত, বিদ্বেষের আধিপত্যবাদ।
আগুনের পাশে বসে আছেন শান্ত ভিক্ষু। বসে আছেন, কিন্তু চোখদুটি বোজা। আগুন এমন ভাবে জ্বলছে, যাতে দূর থেকে দেখা না যায়। জঙ্গলের মধ্য থেকে নানান শব্দ আসছে। মনে হচ্ছে কিছু কিছু মানুষ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সরে সরে যাচ্ছেন। আবার শান্ত ভিক্ষুর দিকে তাকাল মৃন্ময়। কী আশ্চর্য ব্যাপার, একটা লোক, যাকে সে চিনত না, সেই লোকটির সঙ্গে বিপদের তোয়াক্কা না করে সে চলেছে এক অজানা রাস্তায়। যে রাস্তা বিপদসংকুল। ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু ঘুমোলে কি সে আবার তার সময়ে চলে যাবে? কিছুতেই এই সময়কে সে একবিন্দু হারাতে চাইছে না।
ঘুমের ভিতরে কি ঘুমোনো যায়? আর যদি তার ঘুমের ভিতরে সে নিজেই জেগে ওঠে? তাহলে কি তার এই ঘুম কোনোদিন জাগবে না? না কি এই ঘুমের ভিতরে সে যদি চিরঘুমে তলিয়ে যায়, তাহলে সে আর তার প্রকৃত ঘুমের ভিতরে আর জেগে উঠবে না?
এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? কারো দেওয়ার কথা না। কেউ দিতেও পারবে না। আস্তে আস্তে তার দু চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে দেখল শান্ত ভিক্ষু বসে আছেন এক পাশে।
সঙ্গে একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
(ক্রমশ)
আগের পর্বের লিঙ্কঃ পোড়ামাটির গ্রাম – ষষ্ঠ পর্ব



