পোড়ামাটির গ্রাম – ষষ্ঠ পর্ব

poramatir6th

দূর দিগন্ত থেকে যখন অশ্বারোহীরা আসে, তখন আলাদা করে চেনা যায় না, তারা মারাঠা না সুলতান না রাষ্ট্রকূট বংশের। একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী এগিয়ে আসতে থাকে। বাড়ির চারপাশে মাটির মধ্যে ক্রমাগত একটা গুড়গুড় ধ্বনি। গাছগুলিও কাঁপতে থাকে। শস্যখেত বিমর্ষ হয়ে যায়। কারণ যে কোনও মশালের ফুলকি গোটা খেত পুড়িয়ে নষ্ট করে দিতে পারে। কত খেত যে জ্বলে গেছে, কত মাটিকে যে ওরা অনুর্বর করে দিয়েছে, কত প্রাকৃতিক বাঁধ যে এরা ভেঙে দিয়ে প্লাবিত করে দিয়েছে খেত- ভাবলেই বুকের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। একটা শূন্যতার জায়গা তৈরি হয়।

কিন্তু এখন এই অঞ্চলে আর কারাই বা আসবে। কেনই বা আসবে। আসছে নিশ্চয় মুসলমান শাসকের সেনা। এই তো গোয়ালপাড়ার যুদ্ধে নিজের বাবা সিকান্দর শাহকে হত্যা করে মসনদে বসেছে ইলিয়াস শাহী রাজবংশের শাসক গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। লোকে বলে ইনি নাকি সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট। এই সময়ে তিনি চিনের মিং সাম্রাজ্যের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন। চুক্তি করছেন। বাংলা কি তবে পুরোপুরি ভাবে মুসলিম শাসকদের আওতাতেই চলে গেল।

কিন্তু কীভাবে তারা এই বাংলাকে শাসন করবেন?

শিবচরণ তাঁর কারখানার মধ্যে খুবই সূক্ষ্ম ভাবে পঙ্খপদ্মলতাগুলিকে নির্মাণ করছিলেন তখন। আর মনের মধ্য দিয়ে তখন ভাসছিল বাংলার সেই সময়কার রাজনীতির এই সব টুকরো টুকরো চিত্র।

কখনো বাংলায় শান্তি এল না। অথচ শুনেছে সে, বৌদ্ধযুগে বাংলা ছিল শান্তির জায়গা। জাতপাতের লড়াই নাকি বাংলাতেই কম ছিল। কিন্তু সে সব সহ্য হয়নি হিন্দুদের। বাংলার কাব্য সঙ্গীত শিল্পচর্চার ইতিহাসকে তারা একেবারে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছে। অথচ বাঙালিরা তো যুদ্ধপ্রধান একটি জাতি নয়।

শিবচরণ যখন আপনমনে কাজ করছে, তখন তার পিছনেই যে ছায়ার মতো এসে দাঁড়িয়েছে তারই কল্পনার শালভঞ্জিকা, তা সে বোঝেনি। কিন্তু সে মানে হৈমন্তী কুমরো গাছের লতাপাতার ফাঁক দিয়ে শিবচরণকে একমনে কাজ করতে দেখে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে শিবচরণের ডেরায়।

কেউ জানেও না।

আচমকাই হৈমন্তীই প্রশ্ন করল, এইগুলি কী আঁকছ?

শিবচরণ চমকে উঠল।

বুকের ভিতরটা কেমন ধড়াস করে উঠল তার। তারপর মুখ ফিরিয়ে হৈমন্তীকে দেখে তার বিস্ময় আর থামে না।

কোনও কথা বলার মতো শব্দ তার মুখ থেকে বেরোচ্ছিল না। তাকে এভাবে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল হৈমন্তী।

–        আরে আমাকে দেখে এমন ভূত দেখার মতো করছ কেন?

ঘোর কাটছিল না শিবচরণের।

–        আরে কিছু বলো গো।

–        এখানে ?

–        এই দেখতে এলাম। বললে না যে এগুলো কী?

–        এগুলো একধরনের অলংকরণ। পঙ্খ পদ্মলতা। ফুলবল্লী। এগুলো সব আমাদের পোড়ামাটির কাজের অলংকরণ।

–        কী সুন্দর দেখতে। এর কোনও অর্থ আছে গো?

–        এর অর্থ একধরনের তরঙ্গ। যে তরঙ্গ সবসময় আমাদের মনের মধ্যে প্রবাহিত হয়। যে তরঙ্গ প্রবাহিত হয় ফুলের মধ্যে গাছের মধ্যে। সেই তরঙ্গ।

হৈমন্তী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর শিবচরণের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তোমার শালভঞ্জিকা হতে রাজি।

–        রাজি?

–        হ্যাঁ। কিন্তু যা করবে, গোপনে।

–        তুমি রাজি হলে কেন?

–        তোমার মতো শিল্পীকে না বলতে ইচ্ছে হল না। কিন্তু এ কথা যেন আর কেউ জানতে না পারে।

–        তাহলে তোমাকে রাতে আসতে হবে।

–        রাতেই আসব। সকলে ঘুমিয়ে গেলে। আর একটা কথা…

–        কী?

–        আমাকে তোমার এই শিল্প শেখাবে?

–        তুই এই শিল্প শিখবি? কোনো মেয়ে আজ পর্যন্ত পোড়ামাটির শিল্পের কাজ করেনি।

–        করেনি বলে আর কী সে করতে পারবে না নাকি?

–        না, পারব না, তা বলিনি।

–        লোটনবিবি কে?

–        লোটনবিবির কথাও কানে গেছে দেখছি।

–        হুম গেছে।

–        সে এক রাজনর্তকী। ভাতুরিয়ায় বাড়ি। অপূর্ব সুন্দর। তার আসল নাম হল নটু। মীরাবাঈ নামেও লোকে জানে। তিনি একটি মসজিদ তৈরি করতে চান। লোট্টন মসজিদ।

–        কিন্তু কেন? রাজনর্তকী মসজিদ তৈরি করতে চান কেন?

–        এ কথা তো বলতে পারব না। নিশ্চয় তার মনে হয়েছে তিনি একটি মসজিদ তৈরি করবেন।

–        আচ্ছা। আর তুমি সেই মসজিদেই আমাকে খোদাই করতে চাও।

–        তোকে নয়, তোকে নয়। তোকে নিয়ে যে আমি শালভঞ্জিকা তৈরি করব, তাকে।

–        আমাকে নিয়ে শালভঞ্জিকা তৈরি করব, কিন্তু তাতে আমি থাকব না?

–        না হৈমন্তী। তুই আমার আরও অনেক শিল্পে থাকবি। তুই কখনো শালভঞ্জিকা হবি, কখনো পার্বতী, কখনো সীতা, আবার কখনো বা জনপদবধূ। আসলে তোর এই রূপটা তো একটা আধার। তাতে যে প্রবেশ করবে, সেই হয়ে উঠবে আমার শিল্প।

–        কিন্তু আমি?

–        তুই থাকবি তোর সৃষ্টি করা চরিত্রগুলোর মধ্যে।

–        মানে আমি কেউ নই। আমাকে মানে এই হৈমন্তীকে কোথাও রেখে যাবে না তুমি? আমার এই রূপটাকেই তুমি চাও শুধু?

–        জানি না। আমি তো এসব ভাবিনি কখনো হৈমন্তী। আমি তোর মধ্যে শুধু তোকে দেখিনি। আমি তোর মধ্যে দেখেছি সকলকে। আমার শালভঞ্জিনীকে, আমার পার্বতীকে, আমার…

–        এরা কে, আমি চিনি না।

এই বলে হৈমন্তী ছুটে বেরিয়ে চলে গেল।

শিবচরণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন। মনে মনে একটা ক্ষোভ কাজ করতে শুরু করল। তিনি কি ভুল করলেন হৈমন্তীকে এসব কথা বলে? শিল্প যে প্রেক্ষাপট নিয়ে যে পট নিয়ে কাজ করেন, তা তো মূল বিষয় নয়, মূল বিষয় হল শিল্পী যা নিজের মানসপটে দেখেছেন, তা। হৈমন্তী কি ভাবল শিবচরণ তাকেই ফুটিয়ে তুলবে শিল্পে?

সে কথা তিনি হৈমন্তীকে বলতেই পারতেন। বোঝাতে পারতেন, যে এই শিল্পে সে থেকে যাবে অনন্তকাল। কিন্তু তাকে যে ফুটিয়ে তোলা হবে না। তার বাইরের রূপকেই যে শুধু ব্যবহার করা হবে, সে কথাও তো বলতে হবে তাকে। এ তো একটি অভিনয়ের মতো। তাদের গ্রামে যেমন পালা হয়, যেমন নেচেকুঁদে মানুষ বিভিন্ন চরিত্রে রূপদান করেন, নাটকের সেই শক্তিই তো তিনি ফুটিয়ে তুলতে চান তাঁর এই শিল্পের ভিতর।

পোড়ামাটির শিল্পের পরতে পরতে এই নাট্যরূপকেই তিনি চিরস্থায়ী করে রাখতে চান। এইটুকু কাজের জন্যই তো তিনি এসেছেন এই ভবে। আহা, কী সুন্দর করেই না গাইত সূত্রধর। তার ভাঙা গলায় ফুটে উঠত এই সব গান। কী সুর সে সব। এক গভীর শূন্যতার কথা।

কিন্তু হৈমন্তীকে সে কীভাবে বোঝাবে, যে সে ছাড়া যেমন শিল্পটি হবে না, তেমন শিল্পটি শুধু তাকে নিয়ে হবে না। শিল্পের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠবে আরও একজন। যাকে শিবচরণ মনের মধ্যে দেখেছে। যাকে সব শিল্পীই মনের মধ্যে দেখে।

কিন্তু সে কে, এই প্রশ্ন করলে, হয়তো কেউই বলতে পারবে না।

দূর থেকে যে ধোঁয়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল, তা আসলে অশ্বারোহী সৈন্যদলই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষুরের শব্দ শোনা গেল।

কুটির থেকে বেরিয়ে এলেন শিবচরণ।

গ্রামের অন্য সকলেও কুটির থেকে বেরিয়ে এসেছেন।

এক দীর্ঘ সুসজ্জিত সেনাদল। আর তাদের মাঝখানে আছেন স্বয়ং সম্রাট গিয়াসউদ্দিন।

গিয়াসউদ্দিন তাঁর বাবাকে হত্যা করে মসনদে বসেছেন বটে, কিন্তু তিনি আসার পর বাংলার অন্ধকার দশাও কিছুটা কেটেছে। আগের ইসলামি শাসকদের মতো তিনি অন্যান্য ধর্মের প্রতি ঘৃণার মনোভাব পোষণ করেন না। বরং তাঁর রাজসভায় প্রচুর হিন্দু অমাত্যরাও থাকে। বাবাকে গোয়ালপাড়ার যুদ্ধে হারানোর পর সিংহাসনে বসে তিনি ভোগ করতে শুরু করেননি। কামরূপ গেছেন। সেখানে জয় করেছেন গোটা একটা রাজ্য। তারপর বাংলায় ফিরে এসেছেন। গঠন করেছেন একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। বাংলার মাটি, জল,হাওয়া তাঁর মনের মধ্যে হয়তো ঢুকে গিয়েছিল। তিনি স্বভাবে শুধু তুর্কী ছিলেন না। কিছুটা সুফিভাব তাঁর মনের মধ্যে হয়তো বাসা বেঁধেছিল। অথবা, তিনি বুঝতে পারছিলেন, এখানে তাঁর সিংহাসন বজায় রাখতে তাঁকে সকলকে নিয়েই চলতে হবে।

গিয়াসউদ্দিন গ্রামের প্রতিটি মানুষের দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে চলে গেলেন।

সেনাদল এই গ্রামে দাঁড়াল না। কোথায় যাচ্ছে, তাও জানা হল না কারোর। যেমন এসেছিল, তেমন চলে গেল। গ্রামের মাঝবরাবর রাস্তাটা দিয়ে মাঠ পেরিয়ে শস্যক্ষেত পেরিয়ে চলে গেল দূরের জঙ্গলের দিকে।

কোথায় চলেছেন গিয়াসউদ্দিন?

মানুষ তো আসলে ভিন্ন রকমের হয়। এই গিয়াসউদ্দিন পোড়ামাটির শিল্পীদের জন্য কাজের দক্ষিণা বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের কিছু কিছু জমি দেওয়ারও ব্যবস্থা করেছেন।

তা না হলে, এত যুগের মতো, শিল্পীদের অবস্থা একইরকম থাকত। বাংলার শিল্পীদের অবস্থা যেমন হয়। যেমন থাকে কবিদের অবস্থা। খেতে না পাওয়া, কাজ না পাওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা না পাওয়া।

শোনা যাচ্ছে দক্ষিণে কৃত্তিবাস ওঝা নামের একজন নাকি রামায়ণের বাংলা অনুবাদ করছেন। গিয়াসউদ্দিন শাহ নিজেও নাকি কবি। আরবি এবং ফারসি ভাষায় তিনি কবিতা লেখেন।

শিবচরণ না জানলেও, সূত্রধর আরবি এবং ফারসি দুটি ভাষায় শিখেছে। তাদের গ্রামে বাঙালি শিল্পী ও কবিদের মধ্যে আরবি ও ফারসি শেখার চল আছে। অনেকেই আরবি এবং ফার্সি জানে। এ জন্য বাংলা ভাষাতে এই দুই ভাষার অনেক শব্দও ঢুকে পড়ছে।

আসলে, রাজ্য শাসনের জন্য, আইন প্রণয়নের জন্য  যা কাজ, তা তো করতেই হত আরবি এবং ফারসি ভাষাতেই। তার সঙ্গেই মিশে যেত বাংলা। সেই সব শব্দ ব্যবহার করতে করতে বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়ছে।

পুরোনো তো এভাবেই নতুন হয়ে ওঠে।

শিবচরণের আফশোষ হয়, সে বাংলা ভাষা ছাড়া আর অন্য কোনও ভাষাই শেখেনি বলে। সূত্রধরকে বারবার সে বলেছে অন্য কোনও একটি ভাষা তাকে যেন শেখানো হয়। কিন্তু সে রাজি নয়। সূত্রধর যেমন পালি, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি সবই জানে।

কিন্তু শিবচরণ সংস্কৃত ভাষাটাও জানে না। যখন সে গ্রামে সংস্কৃত ভাষা শেখার জন্য বামুনের কাছে আবদার করেছিল, তখন বামুনঠাকুর তার নামে গ্রামের মোড়লের কাছে নালিশ করেছিল।

এই সব নিচু জাতের লোকেদের সংস্কৃত ভাষা শেখার অধিকার ছিল না। পোড়ামাটির কাজ করে তারা। শিল্প নিয়েই কারবার। শিল্পের জন্যই তো তাদের সংস্কৃত ভাষা শিখলে ভাল হত।

কিন্তু ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা তাদের সংস্কৃত ভাষা শেখালে ভাষাটাই নাকি অপবিত্র হয়ে যেত।

ভাষা কীভাবে অপবিত্র হতে পারে?

এ কথার উত্তর সে পায়নি। পাওয়ার কথাও নয়। কারণ মৌলবাদীদের কাছে যুক্তির উত্তর থাকে না।

শিবচরণের মতো অনেক বাঙালিই একটা সময় যেমন হিন্দু ধর্ম ছেড়ে বৌদ্ধধর্মের আশ্রয় নিয়েছিল এমন জাতিবিদ্বেষের জন্য, তেমন ভাবেই, এখন অনেকেই ইসলামকেই গ্রহণ করছে।

মানুষ কতদিন আর অত্যাচার সহ্য করবে?

অথচ আরবি ফারসি ভাষা শিখতে গেলে, সকলেই নাকি সহযোগিতা করে।

গিয়াসউদ্দিন নিজে কবি। তিনি অনেক মাদ্রাসাও খুলেছেন।

কিন্তু হৈমন্তী কোথায় গেল, তাকে তো বোঝাতে হবে।

সেনারা যে ধুলো উড়িয়ে দিগন্তের দিকে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল, সেই ধুলো আস্তে আস্তে মিশে গেল হাওয়ায়, মাটিতে, জলে।

এমনই হয়। এক একটা সাম্রাজ্য আসে, চলে যায়। তাদের পায়ে পায়ে যে ধুলো ওড়ে, তা মিলিয়ে যায় বাতাসে। মানুষের জীবন চলতে থাকে নিরন্তর। এ কথাই তো আসলে সে বলতে চেয়েছে হৈমন্তীকে। কে শিল্প সৃষ্টি করল, কার রূপের আধারে তৈরি হল শিল্প, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, কী তৈরি হল। পুরোহিতগুলো যেমন জানে না, তেমন এই সেনারাও জানে না, তাদের অস্তিত্ব থাকবে না, কিন্তু যে মন্দির, যে মসজিদের গায়ে শিবচরণের মতো অসংখ্য শিল্পী এই পোড়ামাটির কাজ করে রেখে দিচ্ছেন, তা থেকে যাবে। সেই সব শিল্পের ভিতর দিয়ে থেকে যাবে রক্তমাংস মজ্জা দিয়ে মানুষের এই প্রার্থনা।

যদি একটূ ভাল থাকা যেত। যদি একটু ভালবাসার কথা বলা যেত। যদি সকলে মিলে পাশাপাশি শান্তির একটা সময় পাওয়া যেত।

কিন্তু এমন শান্তির জীবন কবেই বা কোন সময়ের মানুষ পেয়েছে? শুধুই মানুষের রক্ত পড়েছে মাটিতে। যে শস্য তারা খাচ্ছে, সে শস্যেও লেগে আছে মানুষের রক্ত।

শোনা যায় গিয়াসউদ্দিন তার বাবাকে হত্যা করেছিল। আবার এও শোনা যায়, তার বাকি সতেরটা ভাইও তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। দিল্লির সুলতান নাকি এই শাহদের মসনদে বসে নিজেদের শাসন কায়েম রাখার বিরোধী ছিলেন।

কিন্তু বাংলা ছিল স্বাধীন। দিল্লি তাদের নিজেদের আওতায় আনতে পারেনি। কিন্তু এই স্বাধীনতা যেন ক্রমেই হারাচ্ছিল। বাংলা সিকান্দর শাহের সময় অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বী ছিল না। একে অপরের মধ্যে খুন, রাহাজানি, হত্যা চলত।

এই অন্ধকার যুগে গিয়াসউদ্দিন সত্যই এক আলোকবর্তিকা রূপে হাজির হয়েছিলেন।

আবার মনে পড়ল শিবচরণের হৈমন্তীর কথা। সে কোথায় গেল? হৈমন্তীর এই রূপ যদি গিয়াসউদ্দিন একবার দেখে, তবে সে তাকে বেগম করে নেওয়ার জন্য নিয়ে যাবে।

কিন্তু হৈমন্তী নিশ্চয় সুলতানের সামনে আসার চেষ্টা পর্যন্ত করবে না। সুলতানদের পত্নীর পাশাপাশি অসংখ্য যে উপপত্নী থাকত,তাদের বেশিরভাগই ছিল বাঙালি। ফলে, সুলতানি বংশের পরবর্তীকালের সন্তানদের রক্তে বাংলার রক্ত মিশে আছে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

কিন্তু আদার ব্যাপারী জাহাজের কথা ভাবছেই বা কেন। শিবচরণ ওই উড়িয়ে দেওয়া ধুলোর স্তিমিত হয়ে আসা দেখতে দেখতে চলল নিজের কুটিরের দিকে। তার যে অনেক কাজ পড়ে আছে।

সে সময় আমরা যদি একবার চোখ ফেরাই নদীর তীরে, তাহলে দেখব হৈমন্তী মনমরা হয়ে বসে আছে সেখানে। এ নদী ছোট। ভাতুরিয়ার একটা অঞ্চল থেকে বয়ে আসছে যার নাম বিন্দোল। এই অঞ্চলের এই সব ছোট ছোট নদী যে কোথা থেকে এসে কোথায় মিশে যায়। লোকে বলে বিন্দোল নাকি আগে বৌদ্ধদের কিছু একটা ছিল। তারপরে তা অধিকার করে হিন্দুরা। সেখানে নদীর মধ্যে এই ভৈরব মূর্তি খুঁজে পাওয়া যায়। সে বহু বছর আগের কথা। তারপর এই মন্দির হয়ে যায় এক মসজিদ। আবার এক হিন্দু রাজা এসে এই মসজিদ অধিকার করেন। এখন সেটি মন্দির। ভৈরব মূর্তিও তার জায়গা ফিরে পেয়েছে।

শিবচরণের কথায় আসলে হৈমন্তীর আঘাত পাওয়া তার বয়সী একজন তরুণীর পক্ষেই খুব স্বাভাবিক। এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিল সে। দেখেছিল, প্রতিটি মন্দিরের গায়ে তার নিজের মূর্তি। তার মুখ। তার রূপ। বহু বছর পর যখন লোক এসে মন্দিরগুলো দেখবে তখন তাকেই দেখবে লোকে। মন্দির মসজিদের গায়ে তারই মূর্তি হয়ে উঠবে শিল্প। এ স্বপ্ন অবশ্য সে আগে দেখত না। সেদিন গোধূলতে যখন চন্দনের সঙ্গে এই নদীর ধারে এসে বসেছিল, তখন চন্দন তাকে বলল, তুই যে শিবচরণের মতো শিল্পীর ডাকে সাড়া না দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, এ কিন্তু ভাল কথা নয়।

–        কেন, আমাকে কেন তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে?

–        দেখ আমরা কেন কবিতা ভাবি? কেন একজন কবিতা লেখে, গান লেখে? কারণ সে সময়ের কাছে তার নিজের সৃষ্টিটিকে বাড়িয়ে দিতে চায়।

–        তো, আমি তো আমাকে সৃষ্টি করিনি।

–        না, কিন্তু তুই নিজেই সৃষ্টি, নিজেই সুন্দর। এমন সুন্দর, যাকে হয়তো হাজার লক্ষ বছর পেরিয়েও মানুষ দেখার জন্য তাকিয়ে থাকবে।

–        আমাকে?

–        তুই তেমনই সুন্দর। আমি যেমন বিশ্রী, তেমনই তুই শ্রী।

খিলখিল করে হেসে উঠেছিল হৈমন্তী। কবি এমন কথা বলে, যে নিজের মনে খুব শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু কবি একটু বাড়িয়েই বলে না? হৈমন্তী বুঝতে পারে আসলে, চন্দনের মনের মধ্যে হৈমন্তীকে নিয়ে একপ্রকার গান আছে। একপ্রকার কবিতা আছে। একপ্রকার মোহ আছে। প্রেম আছে। এই প্রেম মানুষকে দেবতা করে দেয়।

চন্দন হৈমন্তীকে বলল, এত হাসির কিছু নেই। যার যা থাকে। তোর এটা আছে। আমি তোর সৌন্দর্যের কাছে মাথা নত করে থাকি।

–        শুধু কি আমার বাইরের রূপটাই দেখো তুমি?

–        না না এই সৌন্দর্য তো আসতই না, যদি না তোমার ভিতরটা সুন্দর হত। তোমার মনের মধ্যে সুন্দরের এক দিগন্ত আছে। যার জন্য আজ তা বাইরেও এমন উজ্জ্বল। তার আলোয় আমি ভেসে গেছি।

–        এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তুমি এবার বাড়াবাড়ি করছ হে কবি।

–        সে যাই বলো, তুই আলোর সামনে দাঁড়ালে নিজেই এক কবিতা হয়ে যাস। আচ্ছা, তোর যদি মনে হয়, তা হোস না, এখন তো গোধূলি, কনে দেখা আলো। দেখ তুই নিজেকেই। দেখ।

এই বলে চন্দন হৈমন্তীকে ধরে জলের কাছে নিয়ে গেল।

–        এবার দেখ জলের মধ্যে নিজের ছায়া।

চন্দনের পাশে থাকলে, এমনিতেই হৈমন্তীর মনে হয়, তার রূপ অনেকটাই খুলে গেছে। চন্দন যেন বা এক স্পর্শ, যার মাধ্যমে হৈমন্তীর নিজের সঙ্গে নিজেরই পরিচয় হয়। সে তাকাল জলের দিকে।

এ কী সত্যি সে? সে এমন সুন্দর। নিজেকে যে ভালবাসতে ইচ্ছে হচ্ছে। কী করলে চন্দন, তুমি আমাকে আমার প্রেমিকা করে তুললে। কিন্তু আমার এ রূপ তো চিরজীবন থাকবে না। একটা সময় তো ঝরে পড়ে যাবে। আমাদের মতো সমাজের প্রান্তভাগে থাকা এই গ্রামের এক মেয়ে, সে কীভাবে এত সুন্দর হতে পারে?

নিজেরই প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার নিজেরই চোখে জল এল। সে কীভাবে এই জল লুকোবে সে বুঝতে পারল না। এই রূপকে ভালবাসা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই।

চন্দন বলল, দেখেছিস, কখনো কখনো নিজেকে এভাবে চিনতে হয়। নিজে কী, সেটা জানতে হয়। তুমি যদি বাঘ হও, তবে নিজেকে চেন, যে তুমি বাঘ। তুমি যদি ফেউ হও, তাহলেও নিজেকে চেনো। কিন্তু তুমি নিজেকে চেনার দিকে এগোচ্ছ না। নিজেকে ভুলে থাকার কথা ভাবছ। কিন্তু আসলেই তুমি একজন শালভঞ্জিকা। তোমার ভিতরে থাকা সেই শালভঞ্জিকাকে আয়নার মতো করেই দেখতে পেয়েছেন শিবচরণ।

যা তুই। যা, শিবচরণের কাছে যা। সে তোর এই রূপকে চিরন্তন করে দেবে।

খুব আশা নিয়ে হৈমন্তী গিয়েছিল শিবচরণের কাছে। কিন্তু শিব যা ওকে বলল, তা কি বুঝতে পারল হৈমন্তী। যদি বুঝতে পারত হৈমন্তী, তাহলে কি সে এমনভাবে বনের মধ্যে দিয়ে একা দৌড়ে দৌড়ে চলে আসতে পারত এই ছোট নদীটার কাছে?

কেন সে ফিরে এল এই নদীটার কাছে? কারণ এই নদীটাই তাকে দেখিয়েছিল তার আসল রূপ। সে চিনতে পেরেছিল নিজের আসল সত্ত্বাকে। সে তো এই সত্ত্বাকে নিয়েই থাকতে চায়।

হৈমন্তীর এই রূপ এবং রূপের প্রতি তার তীব্র ভালোবাসাই যে শেষপর্যন্ত তার বিপদের কারণ হবে, সেই বা কে জানত। কিন্তু আবার বিপদই বা বলার কারণ কী। রূপের এই ছটা যে সকলের মনকে সমান ভাবে আন্দোলিত করতে পারে না, সে কথাও তো সকলেই জানে। শুধু যে মানুষের মনের ভিতরে সৌন্দর্যবোধ ছন্দের মর্মরধ্বনির মতো কাজ করে, সে মানুষই রূপের এবং সৌন্দর্যের মধ্যে একপ্রকার বোধের সন্ধান পায়।

গিয়াসউদ্দিন আসলে এমন মনেরই মানুষ ছিল। গিয়াসউদ্দিন ছিল সিকান্দর শাহ-এর ছোট রানির ছেলে। একদিকে তার বিমাতার ঈর্ষা এবং অন্যদিকে গিয়াসউদ্দিনের সতেরজন ছেলের উচ্ছৃঙ্খলা দেখতে দেখতেই সে বড় হয়েছে। তার মা কখনো সিকান্দর শাহের কাছে নিজের সন্তানের জন্য কোনওকিছুর তদ্বির না করলেও, একটা বিষয় জানত, যে নিজের ছেলেকে গড়ে তুলতে হবে তখতের জন্য।

সেভাবেই সে গড়ে তুলেছে তার একমাত্র সন্তানকে। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। যেমন সে সুন্দর, তেমনই সে শক্তিতেও সুন্দর। সে যেমন বুদ্ধিমান, তেমন হৃদয়বানও বটে। সর্বোপরি, সে নিজে একজন উঁচু মানের কবি। পারসি ভাষা এবং আরবি ভাষায় সে কবিতা লিখে পাঠিয়েছে ইরানে, কবি হাফিজের কাছে। হাফিজ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তার কবিতার। কাব্যের সেই ঘোর তার কাটেনি। যদিও রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে সে কিছুকাল যুদ্ধ এবং হত্যার মধ্যে বয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কবিমনটা তার হারিয়ে যায়নি। সেই শান্তির খোঁজেই সে এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়ে।

আসলে কবিতা এক অভিমানী পাখির মতো। সুফি এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব আছে। তিনি আসেন মাঝেমাঝে বহু দেশ ঘুরতে ঘুরতে। তিনি বলেন, সুলতান কী হবে এই রাজপাট নিয়ে/ যদি না প্রেমের কাছে রাজ্য খুঁজে পেলে?

প্রেম। কোথা থেকে আসে এই প্রেম। পাখিদের একান্তে ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার মধ্যে কি এই প্রেম আছে? গিয়াসউদ্দিন গ্রামের পথ ছেড়ে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবছিল। কোথায় যাবে, এ কথা জিজ্ঞাসা করেছিল, তার রক্ষীরা। কিন্তু এই রক্ষীরা তার বহুদিনের বিশ্বাসভাজন। তারা জানে, সুলতানের যখন মনখারাপ হয়, তখন এভাবে কোথাও না যেতে চেয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। বিনা বাধায়, বিনা উদ্দেশ্যে, তিনি একের পর এক জায়গা ঘোরেন। তাঁবু লাগান কোনও নিরিবিলি প্রান্তরে।কারো সঙ্গে খুব একটা কথা বলেন না। বহু আগে এমন ভাবে ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁকে আক্রমণ করেছিল কিছু তীরন্দাজ। তাদের সম্ভবত পাঠিয়েছিল তারই সতেরজন ভায়েদের মধ্যে কেউ। কিন্তু কিছু হয়নি। সেই সব শত্রুদের বিনাশ করা হয়ে গেছে। তবু সতর্ক থাকতে হয় তাদের। কারণ সুলতানকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র প্রায় সকলেই করছে। এক প্রতিশোধ স্পৃহার আগুন ধিকিধিক জ্বলছে সর্বত্র। আসলে, এমনটি হতেই থাকবে। যতদিন ক্ষমতা থাকবে, ততদিন প্রতিশোধ থাকবে, হিংসা থাকবে, প্রতিশোধ স্পৃহাও থাকবে। ঠিক এভাবেই আজও চলেছেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। গ্রামের মেঠো পথ ছেড়ে তিনি নিতে বললেন পায়ে চলা সরু পথ। এই পথ সামনের ধানখেতের মধ্য দিয়ে চলে গেছে সামনের জঙ্গলের দিকে। জঙ্গল পেরোলেই একটি সরু নদী বয়ে গেছে। আরবি ঘোড়াগুলোর পক্ষে এই নদী পেরোনো কোনও সমস্যাই নয়।

সেই নদীর ধারেই না হয় এই যাত্রার যবনিকা পতন করা যাবে। অন্তত দু তিন দিনের জন্য। তারপর সামনের, আরও সামনের সেই জঙ্গলের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও হয়। কিন্তু রাজধানী ছেড়ে বেশিদিন কি বাইরে থাকা উচিত হবে? এই গিয়াস তো আগের গিয়াসের মতো স্বাধীন নয়। সে তো নিজের মন যা চাইছে, তার মতো করে হারিয়ে যেতে পারে না। এর পিছুটান আছে।

গিয়াসউদ্দিন যখন জঙ্গল পেরোচ্ছেন, তখন হৈমন্তী নিজের মুখ আবার দেখছিল এই স্বচ্ছ নদীর জলে। তার দুচোখ দিয়ে নদীর মতো জল গড়িয়ে আসছে। শিবচরণ তাকে অভিনয় করতে বলছেন। কিন্তু সে তো অভিনয় করতে চায় না। সে চায় নিজেই একটি মূর্তি হতে। নিজের এই মুহূর্তগুলিকে চিরস্থায়ী করে রাখতে।

তার মনে মনে চন্দনের জন্য একটা বিষাদ চলে আসতে লাগল। কোথায় সে? কেন তার বাঁশি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না?

ঠিক সে সময়ই দূর থেকে সে শুনতে পেল ঘোড়াদের ডাক। জঙ্গলের মধ্যে একটা তীব্র আলোড়ন যেন। তার বুকের মধ্যে ভয় যেন দুন্দুভি বাজাতে শুরু করেদিল। কে আসতে পারে এই বিজন নির্জন নদীর ধারে? এই নির্জন জায়গাটির খোঁজ তো খুব বেশি মানুষের জানার কথা না।

সুলতানি সেনাদের অত্যাচারের খবর সে শুনেছিল। সে জানত রানীকে কীভাবে জীবনযন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছে। সে ভাবল, এখন এখান থেকে পালিয়ে গেলেই ভাল।

নদীর ধার থেকে সে যখন উঠে পড়ল, তখন আকাশে কনে দেখা আলো। আর ঠিক সে সময়ই সুলতানের সৈন্যদল এবং স্বয়ং সুলতান গিয়াজউদ্দিন আজম শাহ এসে দাঁড়ালেন তার সামনে।

পিছনে ধুলো উড়ছিল। কিন্তু কনে দেখা আলোর এই অপরূপ আভায় হৈমন্তীর রূপের সামনে ঘোড়ায় বসে যেন গিয়াজ বিহ্বল হয়ে গেলেন। এ কেমন ফুল। কোথায় ফুটেছে।

কীভাবে রাস্তার কোণে একটি পুটুশ ফুলের মতো ফুটে আছে।

তার মতো বিহ্বল হয়েছিল বাকি সৈন্যরাও। হৈমন্তী বুঝতে পারছিল বেশ কয়েকজোড়া চোখ তাকে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো দৃষ্টিতেই ভক্ষণ করছে। কিন্তু সে একবিন্দু নড়ল না। সে জানে সে যদি দৌড়োয়, তাহলেই তার বিপদ বেশি। সে সোজা ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

গিয়াস সাধারণত কাউকে দেখে তাঁর ঘোড়া থেকে নামেন না। কিন্তু স্বয়ং কবিতার সামনে তো নতজানু হওয়া ছাড়া তার গতি নেই।

তিনি ঘোড়া থেকে নামলেন। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন হৈমন্তীর দিকে।

হৈমন্তীর সামনে এসে বললেন, অধমের নাম সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। আপনি?

নামটা শুনে প্রথমেই কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ল হৈমন্তী। সুলতান ! স্বয়ং সুলতান! সে তো শুনেছিল সুলতানরা খুব ভয়ংকর হয়। কিন্তু এ তো পরম রূপবান। চোখে যেন এক কবির মতো উদাস দৃষ্টি। সারা শরীর থেকে এক অদ্ভুত আভা বেরিয়ে আসছে। এত সুন্দর কোনও রাজা হয়?

বলতে গেলে, হৈমন্তী সে সময় চন্দনকে ভুলেই গেল।

গিয়াসের মনের আলো তার হৃদয়কে স্পর্শ করল এমনভাবেই, যে তার পক্ষে আর কোনও কথা বলা সম্ভব না।

সে নিজের সম্পর্কেও ভাবতে ভুলে গেল। যেন হিরের টুকরোর সামনে ম্লান হয়ে গেল গ্রামের স্বচ্ছ পুকুরের জল।

কিন্তু গিয়াসের চোখে অন্য একটা মোহ।

হৈমন্তী বলল, সুলতান, আমার আদাব নিন। আমি এমনি ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছি। আমার এই নদীর ধারে বসে থাকতে ভাল লাগে।

–        সে কী, জঙ্গলে তো বন্য জন্তু। সাপ। ভয় লাগে না?

–        আমরা তো কাছেই গ্রামের লোক, আমাদের ওরা চেনে। আমরাও ওদের চিনি।

–        কোন গ্রাম?

–        পোড়ামাটির গ্রাম।

–        ওহ। আপনি তো শিল্পীদের গ্রামের লোক। তাই এমন সুন্দর। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি সেই সুন্দর, যাকে স্পর্শ করে তার সৌন্দর্য নষ্ট করে দেওয়া যায় না।

এ কথা শুনে হৈমন্তী লজ্জা পেল। ভালোও লাগল। অন্তত কেউ তো তার সৌন্দর্যকে সম্মান দিল।

–        আমি দুজন সৈন্য দিচ্ছি আপনার সঙ্গে যারা আপনাকে আপনার গ্রামে পৌঁছে দেবে।

–        না সুলতান, তা হয় না। আমি নিজেই চলে যাব। সন্ধে নামছে।

–        তাই জন্য তো বলছি, বিপদ। আপনি সুলতানের আজ্ঞা পালন করবেন না?

–        না, সুলতান। কিন্তু আপনার লোকেদের সঙ্গে নিয়ে গেলে, গ্রামের লোকজন আমাকে ভুল বুঝবে।

–        আচ্ছা।

বুঝলেন গিয়াস।

হৈমন্তী জঙ্গলের দিকে চলে গেল। হরিণীর মতোই। তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন গিয়াস।

সৈন্যদের বললেন,আজ রাতে এখানেই তাঁবু হোক।

জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছুটতে ছুটতে হৈমন্তী বুঝতে পারল, সে সুলতানের চোখে এমন কিছু দেখেছে, যা সে কখনোই কারো চোখে দেখেনি। কিন্তু চন্দন?

চন্দন তাকে তো ভালোবাসে। চন্দনের ভালোবাসার জন্যই তো হৈমন্তী নিজেকে চিনতে পারল।

বেশিক্ষণ লাগল না।

জঙ্গল পেরিয়ে আলপথ ধরে খেতের মধ্য দিয়ে যেতে যেতেই তার দেখা হয়ে গেল চন্দনের সঙ্গে।

–        এ কী, এত দৌড়ে দৌড়ে কোথা থেকে আসছিস?

–       

–        আমি আসছি নদীর ধার থেকে।

–        আর আমি যাচ্ছিলাম নদীর ধারে।

–        না না আর যেতে হবে না ওদিকে।

–        কেন রে

–        তুমি চলো আমার সঙ্গে। আজ আমরা সেই পুকুরের ধারে যে শক্তিকালী তার কাছে যাব।

–        ওই দিকে, যেখানে কাকু যায়।

–        হ্যাঁ। চলো না।

হতে পারে, গিয়াসউদ্দিনের চোখে প্রেমের সন্ধান পেয়েছে হৈমন্তী। হতে পারে, যে গভীর মায়াবী কবিতা তার হৃদয়কে স্পর্শ করে দিয়ে গেছে, তা আর আগের কারো মধ্যেই পায়নি হৈমন্তী। কিন্তু এই চন্দনের কাছে এলে হৈমন্তী যা খুঁজে পায়, তা আর কারো মধ্যেই খুঁজে পায় না। চন্দন পাশে থাকলে, তার মনে হয়, তারই আরেকটা অংশ যেন তার পাশে পাশে চলেছে।

চন্দনের হাত ধরতে দ্বিধা বোধ করে না হৈমন্তী।

চন্দন হৈমন্তী একে অপরের হাত ধরে খেতের আলপথ ধরে ছুটে চলে গেল।

শিবচরণ ওদিকে ঠায় বসেই ছিল। নিজের সৃষ্টিগুলির সামনে বসে কেমন অসহায় লাগে।

শিবচরণ বুঝতে পারে, আসলে শিল্পের মধ্যে দিয়ে নিজের হৃদয়ের এক তুমুল অসহায়তার কাছে পৌঁছে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই হয় না।

এক একটা কাহিনির মতো শিল্পগুলো তার মনকে স্পর্শ করে চলে যায়। সে কাহিনির সন্ধানে থাকে।

যেমন, সে শুনেছিল সুদূর এশিয়ায় এক দুর্দান্ত পাখির গল্প। সে পাখির দুই পাশে দুটি অদ্ভুত ডানা। সে পাখি উড়ে আসে কোনও  মেঘলা অঞ্চল থেকে। সে পাখিকে একবার সে তার শিল্পের মধ্যে খোদাই করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মনের মধ্যে যে রূপ জেগে ওঠে, তাকে কি এতই সহজে ফুটিয়ে তোলা যায়?

শিবচরণের দু চোখে আস্তে আস্তে ঘুম নেমে আসে।

কিন্তু ঘুম আসে না গিয়াসউদ্দিনের চোখে। কী অপরূপ লাবণ্য, কী অদ্ভুত সারল্য ওই দুই চোখে। এমন একজন মানুষকে দুই চোখে দেখাও যেন এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর একটি কাজ।

গিয়াসউদ্দিন আস্তে আস্তে তার খাগের কলমটাকে কালিতে ডুবিয়ে লিখতে শুরু করে কাপড়ের উপর।

“ এ জীবন তোমার দুচোখে এসে চাঁদ হয়ে যায়

যেন আমিই সেই আয়না, যার দিকে তুমি তাকিয়ে থেকেছ

আর হায় আমি সেই আয়না, যে তোমায় ছুঁতে পারবে না কখনো

চাঁদের আলোয় যে ভেজে, সে আর কখন চাঁদ ছুঁতে পেরেছে গোলাম”।

এই গজল সে কাকে শোনাবে? এই মসনবী সে কার কাছে পেশ করবে? তার মনে পড়ে মহান ফার্সি কবি রুমির কথা। হাফিজ তাঁকে রুমির বেশ কিছু কবিতা পাঠিয়েছেন। মহাকবি হাফিজ। হাফিজের কবিতা পড়তে পড়তে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যায়। আহ কী সুন্দর সেই জীবন হতে পারত, যদি এই চাঁদনী রাত্রির কোনও শেষ থাকত না। যদি এই তাঁবুর ভিতরে সেই অপূর্ব ফুলের মতো রমণী বসে থাকত আর তার সামনে তার কাব্য নিয়ে বসে থাকত গিয়াসউদ্দিন। সে কি পারে না, একজন সুলতান হয়ে, সেই মেয়েটিকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে? সে যদি একবার হাঁক পাড়ে, তাহলে, সব সৈন্য গিয়ে সেই মেয়েটিকে নিয়ে আসবে তার কাছে। মেয়েটিকে সে সারাজীবন ধরে ভোগ করতে পারবে। কিন্তু তাহলে কি মেয়েটির এই অপরূপ সৌন্দর্য বজায় থাকবে? বজায় থাকবে তার সুন্দর দুই চোখে বিস্ময় এবং সারল্যের ঝলক সে দেখেছে?

গিয়াসউদ্দিন আবার লিখতে থাকে-

“ সেই সম্রাট, যে সবকিছু জয় করেছে, কিন্তু সেই সম্রাট যে হেরেছে সব

তোমার কাছে গিয়ে ভোগ করতে পেরেছে তোমার রূপ, কিন্তু পায়নি তোমার মন

সেই সম্রাট, যে আসলে ভিখিরি হতে পারলে হয়তো স্পর্শ করতে পারত তোমায়”

নিজেকে সম্রাট বলে তার গর্ব হয়, আবার সম্রাট বলে, তার কষ্টও হয়। সে কোথায় এই অপরূপ সুন্দরী মেয়েটির কাছে চলে যেতে পারছে? মেয়েটি তো এই  প্রকৃতির নারী। প্রকৃতিই যেন বা নারী হয়ে মেয়েটির রূপ ধরে প্রকাশিত হয়েছেন। কিন্তু তার সামনে তো কেউ রাজা নয়। রাজা হয়ে কখনো প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে যাওয়া যায় না। যেতে হবে ভিখিরি হয়ে। ভিখিরি না হলে, কী করে বা হাত পাতবে সে এমন সুন্দরের সামনে?

সন্ধে হয়ে এসেছে।

চন্দন এবং হৈমন্তীও ফিরে গেছে পোড়ামাটির গ্রামে।

শিবচরণের কুটিরের মধ্যে প্রবেশ করল তখন সূত্রধর।

শিবচরণ এক প্রান্তে পড়ে আছে। অন্য প্রান্তে ভূর্জপত্রের পাণ্ডুলিপির উপর আঁকা আছে তার শিল্প।

সূত্রধরের ভাল লাগল। ভাল লাগে শিবচরণের কথা ভেবে, যে, সে কোনোদিনই শিল্পের প্রকৃত পথ থেকে নিজেকে বিচ্যুত করেনি।

এখন কেমন ঈশ্বরের মতো মুখ করে বসে আছে।

কিন্তু এখন যে তার শিবচরণকে খুব দরকার।

ধাক্কা দিয়ে শিবচরণকে ওঠালো সূত্রধর।

–        আরে, তুমি?

–        কথা আছে একটূ। যদি তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারো, খুব ভাল হয়।

–        আমি কী করতে পারি বলো, তোমার মতো একজন শিল্পীকে আমি কী করে সাহায্য করব

–        আমি আসলে চাইছি যেটা, তা হল, যৌনক্রিয়ার ছবি পোড়ামাটিতে আনতে।

–        কেন? এ কাজ তুমি কোরো না সূত্রধর। মুসলমানরা এ সব বিষয়ে হিন্দুদের মতো অত প্রগতিশীল না।

–        না না, মসজিদের গায়ে না। যদি বিষ্ণুপুরের কোনো মন্দিরের গায়ে করা যায়।

–        শুনেছি মধ্যভারতের কোনো কোনো মন্দিরের গায়ে এমন শিল্পকলা আছে?

–        হ্যাঁ। সেগুলি পুরোনো। চোল রাজাদের সময়ে বানানো। দাক্ষিণাত্যের অনেক মন্দিরের গায়েই এমন শিল্পকীর্তি।

–        তুমি সে সব  এই বাংলায় আনতে চাও?

–        হ্যাঁ।

–        আমার কাছে তুমি কী চাও?

–        কামসূত্র।

–        কামসূত্র?

–        হ্যাঁ। আমি জানি, তোমার কাছে সেই পুথি আছে। যে পুথি অবলম্বন করেই খাজুরাহর শিল্প।

–        খাজুরাহ কোথায়?

–        আছে। মধ্য ভারতে। এখান থেকে অনেক দূর। আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগেই সে সব হয়ে গেছে। খাজুরাহোর দেওয়ালে তৈরি প্রত্যেকটি মৈথুন ভাস্কর্যের আছে নিজস্ব এক রূপ। একটি দেওয়ালে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ৩টি ভাস্কর্য কামসূত্রে লেখা একটি নীতির অনুকরণ। মিলনের শুরুতে আলিঙ্গন এবং চুম্বনের মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়ানো,  একই দৃশ্যে একজন পুরুষকে ৩ জন নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে দেখানো সবই আছে। তার সঙ্গে রয়েছে পশুর সঙ্গে মিলনের দৃশ্যও।  আরেকটি মূর্তিতে আবার দেখানো হয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকার একে অপরকে উত্তেজিত করার জন্য নখ ও দাঁতের ব্যবহার করার দৃশ্য। এগুলো সবই কামসূত্র থেকে নেওয়া। তুমি জানো এসব। তোমার কাছে পুথি আছে।

–        আছে তো। কিন্তু এগুলিকে বাংলায় করতে চাইলে ভাল হবে কি?

–        কেন হবে না? তুমি জানো খাজুরাহতে ২২টি মন্দির আছে। এই সব মন্দির মূলত মহাদেবের। পুজো হয়।

–        তবুও এমন যৌন মিলনের দৃশ্য?

–        যৌনতার সঙ্গে তোমার বিবাদ আবার কবে থেকে হল?

–        আমার কোনো বিবাদ নেই। শুধু এই মুসলমান আমলে আমরা যদি এই সব করি, তাহলে আমাদের বিপদ হতে পারে।

–        আমরা বিপদের কথা ভাবব, নাকি বিপদ থেকে বেরিয়ে গিয়ে শিল্পের কথা ভাবব? আর কত রামায়ণ মহাভারতের কাহিনি খোদাই করে যাব বলো তো। এবার সময় এসেছে নতুন নতুন ভাবনা আনার। যদি না আনা হয়, তাহলে আমাদের কাজের কোনো বিশেষত্ব আসবে না। আর যৌনতার মতো পবিত্র কার্যধারার সঙ্গে আমাদের শিল্পের সম্পর্ক থাকবে নাই বা কেন? দেবদেবীর মৈথুন দৃশ্যই তো আমরা রচনা করতে পারি।

–        সূত্রধর এ কাজ খুব কঠিন। তুমি একটূ ভেবে দেখো। আমাদের মন্দিরের গায়ে যদি শিব পার্বতীর যৌনতার দৃশ্য রাখি, তাহলে ব্রাহ্মণরা আর আস্ত রাখবে না আমাদের। এরা তো শিল্পের অনুরাগী নয়, এরা হল ধর্মের অনুরাগী। ঠিক যেমন মুসলমানরাও। তারা শিল্পের অনুরাগীর চেয়ে বেশি তাদের ধর্মের প্রতি অনুরাগী। শিল্প এদের ধর্ম নয়।

–        কিন্তু আমার কাছে তো শিল্পই ধর্ম। আমার কাছে তো শিল্প ছাড়া আর অন্য কোনও ধর্মের কথা জানা নেই গো। আমি কি কেবলই পংখ পদ্মলতা ফুলবল্লী, রাম রাবণের কাহিনি আর নয় তো দুর্গা এঁকে যাব? এখানকার জমিদাররা যেভাবে গ্রামের মানুষগুলোর উপর অত্যাচার করছে, এখানকার শাসকরা যেভাবে মানূষকে প্রবল ভাবে অত্যাচার করে মেরে ফেলছে, এসব সত্য যদি আমি আমার শিল্পের মধ্যে না আনতে পারি, তাহলে আমি কীসের শিল্পী?

শিবচরণ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেল সূত্রধরের ভিতরকার অস্থিরতাকে সে বুঝতে পারছে। কিন্তু এমন অস্থিরতা এই পোড়ামাটির গ্রামে আগুন জ্বালাতে পারে, তাও সে বুঝতে পারছে। কারণ সুলতান, জমিদার বা ব্রাহ্মণদের বিরোধিতা যদি তারা করতে শুরু করে, তাহলে পোড়ামাটির গ্রামকে গুঁড়িয়ে দেওয়া কয়েক মিনিটের কাজ এই সব মহাপরাক্রমশালী শক্তির।

তাহলে কি এমনভাবেই কাজ করতে হবে, যাতে কেউ বুঝতে না পারে। তবে কি আমাদের শিল্পকে একপ্রকার ছদ্মবেশ পড়াতে হবে? যেভাবে শোনা যায় বৌদ্ধরা তাদের কবিতায় কথা বলে? একটা কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু তার আসল কথা আছে ভিতরে। সেই কথাটি সহজ সরল ভাবে বলা হচ্ছে না। কিন্তু তা কাব্যের ক্ষেত্রে যেভাবে আসতে পারে, সেভাবে কি আসতে পারে শীল্পের ক্ষেত্রেও?

–        সূত্রধর, একটা কথা মনে হচ্ছে।

–        হ্যাঁ, বলো।

–        আমাদের অন্য একটা ভাষা আবিষ্কার করতে হবে।

–        ভাষা?

–        মানে বলার ভাষা। শিল্পের ভাষা। কীভাবে দেখাচ্ছি, তার ভাষা।

–        বড় ভাল কথা বললে। এতদিন পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, যা আছে, আমরা তাই যেন করে যাচ্ছি। কিন্তু এখন থেকে যদি এমনটা হয়… যদি এমন হয়…

–        এমনভাবে শিল্পনির্মাণ করতে হবে, যা সহজে মানুষের বোধগম্য না হয়। তারা দেখবে এক, আর বুঝবে আরেক।

–        তুমি এখন কী করছ?

–        আমি এখন বাংলার নৌবহর যে আছে, তার জন্য এমন একটা জাহাজ করছি, যেখানে অসংখ্য নাবিক এবং শ্রমিক সেই নৌকাটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

–        ওহ। তুমি তাম্রলিপ্ত বন্দরের নৈবাহিনীর কথা বলছ?

–        হ্যাঁ। আমি সেই নৌবাহিনী এবং বাংলার নৌকা জাহাজ এসবের কথাই এঁকে যেতে চাইছি।

–        কিন্তু শুনেছি তাম্রলিপ্ত বন্দর নাকি বেশিদিন থাকবে না। সমুদ্র নাকি পিছিয়ে যাচ্ছে।

–        এসব আবার কোথা থেকে শুনলে?

–        গঙ্গে থেকে কজন এসেছিল, তারা বলল, তাম্রলিপ্ত বন্দরের আয়ু আর বড়জোর কুড়ি বা তিরিশ বছর। কারণ সমুদ্র পিছিয়ে যাচ্ছে। চরা পড়ছে। বড় জাহাজ নাকি ঢুকতে পারবে না আর।

–        এসব শুনিনি। তাম্রলিপ্ত বন্দর চলে গেলে, বাংলার বেনিয়ারা কী করবে?

–        সে সব তো ভাবার বিষয়। তবে আমরা হলুম গে আদার ব্যাপারী। এ সত্যই জাহাজের খবর নেওয়ার মতো ব্যাপার।

–        তা বটে। কিন্তু এসব কিছুকেই শিল্পের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। কারণ তা না হলে আমাদের কাজ আগামী দিনের লোকেরা কেন দেখবে? অন্তত আমরা নিজেদের জীবনযন্ত্রণার কথা, নিজেদের সময়কে তো খোদাই করে রাখি।

সূত্রধর সে সময় জানত না, তারই সঙ্গে দেখা করার জন্য অন্য একটা সময় থেকে পাড়ি দিয়ে তার সময়ে হাজির হয়ে গেছে মৃন্ময়।

গিয়াসউদ্দিন জানত না, তার প্রেমের কবিতাগুলি একটা দিন সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে। গিয়াসউদ্দিন এও জানত না, সময় তাকে কেবলই একজন শাসকের ভূমিকাতেই মনে রাখবে।

চন্দন জানত না, তাদের লেখা কাব্য একটা সময় অন্ধকার যুগের কাব্য বলে বিবেচিত হবে। হারিয়েও যাবে। এই সময়ের কোনোকিছুই আর পরবর্তী সময়ে পাওয়া যাবে না।

হৈমন্তীও জানত না, যে, যে শিবচরণকে অগ্রাহ্য করে সে পালিয়ে এসেছিল নদীর ধারে, তাকে ফের যেতে হবে সেই শিবচরণেরই কাছে। আর তাকে হয়ে উঠতে হবে আগামী সময়ের পোড়ামাটির শিল্পের এক প্রধান মডেল।

কেউ কিছুই জানত না। কেউ কিছুই জানতে পারে না। কিন্তু সময়ের স্রোতে একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে।

মাঝেমাঝে কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটে যায়। ঠিক যেমন ঘুমের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয়েছে শান্ত ভিক্ষু এবং মৃন্ময়ের।

এই সম্পর্কের সুতো ছিঁড়বে না কোনোদিন।

(ক্রমশ)

আগের পর্ব poramatir gram 5th


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top