জানলা কিভাবে যে খুলে গেছে কে জানে, পর্দাও সম্পূর্ণ গোটানো। খোলা জানলার ওপারে একটা মানুষের অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে, জানলার লোহার শিক দুহাতে ধরে মুখ নিচু করে আমাকে দেখছে। বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল! আমি গ্রামের মেয়ে আবাল্যের সংস্কারের বসে প্রথমেই ভুত প্রেতের কথা মনে হলো। বৃষ্টি কখন থেমে গেছে কে জানে। কিন্তু তখনও মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আবার মেঘ ফুটো করে চাঁদও উঠেছে। ভয়ে গলার আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেলেও বিদ্যুৎ আর চাঁদের আলোয় অবয়বটাকে খুব ভাল ভাবেই চিনতে পারলাম। বিছানার ওপরে ধড়মড় করে উঠে বসতেই সে জানলা ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। চোরের মতো এলেও সে সাধারণ চোর নয়, তার চেয়ে অনেক বড় অপরাধী।
আমিও কোন রকম শব্দ না করে খাট থেকে নেমে কমিয়ে রাখা হ্যারিকেনটার সলতে বাড়িয়ে দরজা খুলে বের হলাম। ঘর থেকে বের হয়ে দরজা বন্ধ করে চুপ করে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সে যদি এ বাড়ির কেউ হয়, যদিও জানি সে অবশ্যই এ বাড়িরই কেউ, তাকে আমার সামনে দিয়েই ঘরে ঢুকতে হবে। হলও তাই।
খিড়কির দুয়ার আটকে সে যখন ঘরে ঢুকছে তখন আমি হ্যারিকেন হাতে তার ঘরের দুয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে। আলো হাতে আমাকে দেখেই চমকে বলল, “একি তুমি এখনো ঘুমাওনি?”
মাথায় আগুন জ্বলছিলো, কড়া গলায় বললাম, “বাগান থেকে এলে, মনের নোংরা কালি তুলতে না পারো পায়ের কাদা তো ধুয়ে আসতে হয়। সকাল হলেই ফিরে যাবে, আর কোন দিন যদি এ বাড়িতে আসো তোমার ছোট মামাকে দিয়ে চাবুক লাগাবো। আর নিজে গিয়ে তোমার মা আর বউকে তোমার কুকীর্তির কথা বলে আসব।”
ও মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে দিল।
পরদিন যাওয়ার সময় হইহই করে সবাইকে জানিয়ে আমাকে প্রনাম করতে এলো, কাছে আসতেই নিচু স্বরে বললাম, “খবরদার আমাকে ছোঁবে না! আর একটা কথা না বলে দূর হও!”
ও নিজেও চাপা স্বরে ফিসফিসিয়ে বললো, “ছোট মামার সঙ্গে তোমার খুব ভাব ভালোবাসা হয়েছে তাই না? বেশ বেশ, খুব ভালো। তবে জেনে রাখ আমিও এখানে আসা ছাড়বো না, এ বাড়ি শুধু ছোট মামার নয়, অন্য মামারাও এর মালিক। তুমি আমায় কিছুই বলতে পারবে না, লোকে তোমাকেই দুয়ো দেবে। তোমার গায়েই কলঙ্কের কালি লাগবে।”
তার পর গলা তুলে বললো, “তুমি জাম খেতে ভালোবাস বুঝি? আর কাঁঠাল? বেশ বেশ এবার ওগুলোও আনবো শুধু তোমার জন্য। এ বাড়ির আর কারোর জন্য আনবো না।”
আজ নিজের মনে বসে ভাবছি পৃথিবীর সব কল্যাণকর যদি অর্ধেক মানবীর অবদান হয় তাহলে তার ওপরে এত অত্যাচার হয় কেন? কেন পুরুষ তার প্রাপ্য থেকে তাকে বঞ্চিত করে? কেন তার জীবনের এবং মরণের দেবতা হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নেয়? যারা তাকে এবং তার সন্তানদের গর্ভে পালন করে এত স্নেহে যত্নে বড় করে তাদের প্রতি এত নিষ্ঠুর কী করে হতে পারে! এই তো এক বা দেড় শতক আগেও যুবতী বালিকা নির্বিশেষে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারতো বিধবা হলেই। কেবল মাত্র শারীরিক ভাবে দুর্বল বলেই এত অত্যাচার! নারী কি সত্যিই শারীরিক ভাবে দুর্বল? তাহলে জীর্ণ শরীরেও বছরের পর বছর প্রসব বেদনা সহ্য করে কী করে? আঁতুর উঠলে ওই শরীরে আবার সংসারের বোঝা কাঁধে তুলে নেয়, আবার নিজেকে সাজিয়ে রাখে স্বামীর পায়ের কাছে নতুন বংশধরের আগমন সুনিশ্চিত করতে।
সেদিন দুপুরে পোস্ট কার্ড খানা মানদা আমার হাতে এনে দিয়েছিল।
“সেজ বউ ছোট কত্তার চিঠি এইছে দেখ আমার হাত জোড়া। পোসটো কাড খানা তার ঘরে একটু রেখে আসবে?”
দুপুরে খাওয়ার পর মানদা এঁটো ফেলতে গিয়ে পাড়ার লোকজন আর অন্য ঝিয়েদের সঙ্গে গল্প গাছা করে একতাল গোবর বাম হাতে নিয়ে ফেরে । এই সময়টুকু ওর মুক্তি, বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য ওর প্রাণটা হাঁকপাক করে। শৈলেন বাবুর ঘরে গিয়ে চিঠিটা রাখার ধৈর্য আর তার নেই। মাস খানেক আগেও খেয়ে উঠে এলো সময় যত্ন করে শাশুড়ির জন্য ছোট হামানদিস্তায় পান ছেঁচে দিতাম। এখন সে বালাই নেই। মুখ ধুয়ে উঠোনের দড়িতে মেলে দেওয়া নিজের গামছায় হাত মুছে বললাম, “দাও রেখে আসছি।”
এমন চিঠি এ বাড়িতে প্রায়ই আসে । সবই তো শৈলেনবাবুর। কতদিন হলো বাপের বাড়ি থেকে এসেছি, কেউ একটা পত্র দিয়েও খোঁজ নেয় নি। চিঠিটা হাতে নিতেই প্রেরকের লেখার ওপর চোখ পড়ল। হাতের লেখাটা চেনা চেনা লাগল, উল্টে দেখলাম মেজদাদা লিখেছেন ওঁকে। কৌতূহল হলো, ওঁর কাছে কি আমার খবর জানতে চেয়েছে? পরের চিঠি হলেও পড়লাম আর পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। লতা আমার মেজ জ্যাঠামশাইয়ের বেশি বয়সের সন্তান। এখন ওর তেরো চোদ্দ বছর বয়স হবে, সামান্য এক আধটু লেখা পড়া শিখেছে। শৈলেন বাবুর সঙ্গে মেজদাদা ওর সম্বন্ধ পাকা করে ফেলেছে। সম্ভবত আমি যে কদিন ছিলাম না তারই মধ্যে মেয়ে দেখাও হয়েগেছে। অথচ কোন পক্ষই আমাকে এই ঘটনার বিন্দু বিসর্গ জানায়নি। এতদিন এ বাড়িতে আছি, পাত্র কেমন তাও মেজদাদারা আমার কাছে জানতে চাইলো না!
চিঠি খানা নিয়ে এই প্রথম ওঁর ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকলাম। কাচ লাগানো তিনখানা আলমারি বইয়ে ঠাসা, বেশিরভাগই বোধহয় আইনের বই। চওড়া পালঙ্কের পাশে একটা চৌকো টেবিল। তার ওপরে নক্সা করা সাদা ঢাকনা, একহাত ঝোলা কোণ হাতে নিয়ে দেখলাম লাল গোলাপের ওপর পাখা মেলা প্রজাপতি। পুরোটাই ভরাট সেলাই, দক্ষ হাতের নিখুঁত কাজ। এত যত্ন করে কে করলো এই সেলাই? শৈলেন বাবুর মৃতা স্ত্রী? টেবিলে বেশ কয়েকটা চিঠি একটা গোল রঙিন কাচ দিয়ে চাপা দেওয়া। তুলে দেখলাম তার মধ্যে অনেক গুলোই মেজদাদার লেখা। আমাকে এবাড়িতে দিতে এসে সেই যে শৈলেন বাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তখনই নাকি বিপত্নীক জেনে মালতী লতার জন্য পছন্দ করে গিয়েছিল। গভীর অভিমানে যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে এল , এখন ওঁর বাড়ি ফেরার সময় । চোখের জল মুছতে মুছতে নিজের ঘরে ফিরে এসে ছিলাম।
(ক্রমশ)



