পাপ- পর্ব ১২

intimate conversation

সেই ছোট বেলায় পিসি ঠাকমা বলতেন বেধবা মানুষ যতবার খোঁপা করার জন্য চুলে পাক দেবে তত যুগ তার মৃত স্বামী আর শ্বশুর কুলের সবাইকে নরক বাস করতে হয়। সেই কারনেই বিধবার চুল রাখতে নেই। পরে অবশ্য স্বীকার করেছিলেন যে লোভী পুরুষদের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্যই বিধবার সব রূপ নির্মম ছেঁটে ফেলতে হয়, সব রঙ ধুয়ে দিতে হয়। শরীর গরম আর উত্তেজিত হয়ে যাতে কোন ব্যাভিচার না ঘটে তাই আমিষ খাবার থেকে তাদের শত যোজন দূরে রাখা হয়। 

বাপের ঘরে থাকতে বাড়িতে নাপিত এলে ওর কাছ থেকে কাঁচি চেয়ে নিজেরাই নিজেদের চুল ছেঁটে নিতাম। এবাড়িতে এসে দেখলাম সে সবের বালাই নেই। কঙ্কার মাথায় এক ঢাল চুল আর আমার শাশুড়ির মাথাতেও বড়ির মতো হলেও একটা খোঁপা। কঙ্কা রোজ তাঁর মাথায় জবাকুসুম তেল দিয়ে মালিশ করে বিনুনি করে বেঁধে দিতো । নিজের চুলও যত্ন করে বাঁধতো নারকোল তেল দিয়ে। চুল কাটার প্রসঙ্গ তুলতে সে বলেছিল, “ওসব ইল্লুতে কান্ড তোমাদের গ্রামে গঞ্জে চলে, এ বাড়িতে চলে না। আমরা তো শহরে থাকি।”

এখন আমার চুলও কাঁধ ছাড়িয়ে পিঠের দিকে নেমেছে। এত বছর মাথায় চিরুনি দেওয়ার দরকার পড়তো না কিন্তু এখন দু বেলা তার প্রয়োজন হয়, নইলে মাথায় জট পড়ে। সংসারে থাকলে মাথায় সন্ন্যাসীর মতো জট রাখলে চলে নাকি! প্রথম বোঝা গেল আমারও চুল খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে আর খুব ঘন রেশমের মতো।

এবাড়িতে বিয়ে হয়ে কয়টা রাত্রিবাস করেছিলাম মাথা খুঁড়লেও সে স্মৃতি উদ্ধার হবে না। তারপর বাপ মা হারিয়ে আবার যখন এলাম তখন প্রায় অচল সংসারের হাল ধরতে। নিতান্ত কেজো সম্পর্ক ছাড়া ভালোবাসার সেতু কারোর হৃদয়েই জুড়তে পারিনি। ওই গয়না কটা বড়দিকে না দিলে তাঁর কাছ থেকে যা পেলাম হতেই পারে সেটুকুও হয়তো জুটতো না। বা হয়তো জুটত। আমি আজও আমার শাশুড়িকে মায়ের জায়গার সামান্য অংশও দিতে পারিনি বা বলা ভালো তিনিও পেতে চান নি। কোনো দিনই যেচে পরে কারোর সঙ্গে আলাপ করতে পারি না, আলাপ চালিয়ে যেতেও পারি না। নতুন বউ আমার কাছে শিক্ষার দুয়ারটা একটু খানি ফাঁক করে আলোর দীপ্তিটুকুর আভাস দিয়েছিল। এবাড়িতে আসার পর শৈলেনবাবুও কিছু কিছু বই এনে দিচ্ছিলেন। কিন্তু বড়দি পর্যন্ত তাঁর সম্বন্ধে যে ইঙ্গিত করলেন তাতে তাঁর সঙ্গে বিরাট দূরত্ব রচনা হলো। আমি নিজেকে অনেক গুটিয়ে নিলাম। আজকাল তাঁর চায়ের কাপ মানদার হাত দিয়ে পাঠাই। মাসান্তে তাঁর কাছ থেকে আর টাকা নিই না, দরকারও পড়ে না। বড়দির ছেলে রতন আজকাল মাঝে মাঝেই আসে দিদিমার খোঁজ নিতে। শৈলেন বাবুর এ ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে।

reflective moment

কিন্তু রতনের যে আত্মসন্মানে লাগছে না তা দেখে আমারও বিরক্ত লাগছিলো। পেঁচির বিয়েতে যে সাহায্য মামার বাড়ি থেকে পেয়েছে বারবার সে সাহায্য পাবে না এই কথাটা কেন বোঝে না। ও বিবাহিত, সন্তানের বাপ, ওদের সংসার যে ওদেরকেই ঘাম ঝরিয়ে চালাতে হবে এ কথা বোঝেনা কেন? তবে পরে আমার সে ভুল ভেঙেছিল। ওকে যা মনে করেছিলাম ও তার থেকেও অধম। কোন না কোন ছুতো ধরে মাসে অন্তত দুবার আসছিলো, এবারে এল এক ঝাঁকা আম নিয়ে। আম এবাড়িতে কম কেনা হয় না। একটা ঘরের মেঝেতে চটের বস্তার ওপরে আম সাজানো থাকে, এছাড়াও শৈলেন বাবুর মক্কেলরা উপঢৌকন হিসেবে মাছ, মিষ্টি, ফল এসব দিতেই থাকত। আমের ঝাঁকা নিয়ে এসে প্রথমে বলল, “সেজ মামী, আম গুলো রেখে দাও। মা পাঠিয়ে দিয়েছে।” 

পরে তাকে দুপুর বেলায় খাবার সময় যখন আম দেওয়া হলো ও সে আম খেয়েই বললো, “মামী এ তো আমারই আনা মধুকুলি, আমি যে শুধুই তোমার জন্য হাট থেকে কিনে এনেছি। এমন আম আমাদের বাগানেও হয় না। খুব দামি আম।”

কথাটা বলেই ওর মুখটা লাল হয়ে গেল, সাফাই দিয়ে আবার বললো,”না মানে মা তোমার জন্য পাঠিয়েছে। তুমি আম খেতে ভালোবাস কিনা, তাই।”

মিথ্যে কথার এক দুর্গুন হল মানুষ মিথ্যে বলে মনে রাখতে পারে না। রতন একবার বলল ওদের বাগানের আম মা পাঠিয়েছে, আবার বলল হাট থেকে কিনে এনেছে। আমি একটু কঠোরভাবেই বললাম,”বড়দিদিকে আমি চিঠি লিখে জানিয়ে দেব যে আম খেতে আমি ভালোবাসি না। বাবা রতন, এবার ভাল করে সংসারে মন দাও দেখি। এখানে এতবার আসার কোন দরকার নেই। তোমার ছেলে মেয়ে তিনটেকে মানুষ করতে হবে তো? এখন খাটাখাটনীর সময়, যত খাটবে তত রোজগার হবে। এ সময়ে এমন করে ঘুরে বেড়ালে চলে?”

আমার তিক্ত অথচ কঠিন সত্য কথা গুলো শুনে ওর মুখটা নিমেষে সাদা হয়ে গেল, কিছু না বলে মুখ নিচু করে আধপেটা খেয়ে উঠে পড়ল।

quiet night

সেদিন গুমোট গরমের পর সন্ধে বেলায় অঝোরে বৃষ্টি নামলো। বাতাস বইলে আমার ঘরের দক্ষিণের খোলা জানালা দিয়ে ভারি মিষ্টি ঠান্ডা বাতাস আসে। জানলাটা আমার খাটের পায়ের কাছে। রোগীর কাজ আর সংসারের সব কাজ সেরে খেয়ে দেয়ে শুতে রাত এগারোটা বাজত। রান্না ঘরের কাজ সেরে উঠোন পার হয়ে ঘরে আসতে প্রবল বৃষ্টিতে একেবারে ভিজে গেলাম। ভেজা কাপড় ছেড়ে অন্য জানলা গুলো খুলে ঘুমিয়ে পড়লাম। বৃষ্টির ছাট আসবে বলে দক্ষিণের জানলাটা বন্ধ ছিল আগে থেকেই। মশারি টাঙিয়ে শোয়ার অভ্যেস ছোট থেকেই নেই, বাপের বাড়িতে মশারির চল তেমন ছিলও না। পরে যখন চল হল তখনও আমি মশারিকে আপন করতে পারিনি, কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে বলে। যাই হোক মাঝ রাত্তিরে কী যেন একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল, চোখ সোজা পড়লো পায়ের কাছের জানলার দিকে।

ক্রমশ

পাপ- পর্ব ১১


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top