পাতি হাঁস গুলো কেমন হেলতে দুলতে সার বেঁধে ছানা পোনা নিয়ে প্যাঁক প্যাঁক করে জলে নেমে যাচ্ছে, কত দিন পরে যে আবার এমন দৃশ্য চোখে পড়লো! বড়দির বাড়ির পেছনেই পুকুর। পুকুরটা ঘিরে সার সার নারকেল গাছ লাগানো আছে। মাঝে মাঝেই ঝপ করে নারকেল পড়ে। পাড়ার যত দুষ্টু ছেলে পুলে হুড়োহুড়ি করে অমনি জলে ঝাঁপ দিয়ে সে নারকেল তুলে আনে। কাড়াকাড়ি করে, মারামারি করে। বড়রা গিয়ে ওদের শান্ত করে। মিটমাট করিয়ে দেয়। পাকা তাল পড়লেও একই অশান্তি। গ্রাম বাংলার সর্বত্র বোধহয় একটি চিত্র। কতদিন পরে এসব দেখে আমার মনটা ভাল হয়ে গেল। এখন যেখানে বসে আছি সপ্তাহ খানেক আগে সূর্য ওঠার আগে এয়োতিরা এই ঘাটে গঙ্গা নিমন্ত্রণ করতে আসবে বলে দেরি করে এসেছিলাম। আলতা পরা জোড়া জোড়া রাঙা পায়ের চাপে ঘাটের ভিজে নরম মাটিতে ছাপ আঁকা হয়েছিল। ওরা ফিরে যাওয়ার পর বড়দি এবং আরো কয়েক জন বিধবার সঙ্গে চান করতে এসেছিলাম । আজ কেউ কোত্থাও নেই, চুপ করে বসে বসে দেখছিলাম চির পরিচিত গ্রামের প্রকৃতি। আমার খোঁজ করতে করতে বড়দি পাশে এসে বললেন, “হ্যাঁ লো সেজ বউ নাইবি না? কাল একাদশী গেছে চল নেয়ে ধুয়ে দুটো জল বাতাসা মুখে দিবি। ওকি! হাসলি যে বড়?”
বড়দির দিকে হাসি মুখ তুলে চেয়ে বললাম, “এমনিই হাসলাম গো, চল নেয়ে নিই।”
সেই ছোট বেলায় বিনি প্রতি একাদশীতে চুরি করে খাওয়াতে গিয়ে একবার ধরা পড়ে ওর মায়ের হাতে বেদম ঠ্যাঙানি খেয়েছিল। চড় থাপ্পড় আমার কপালেও জুটেছিল ভালো মতো। কিন্তু বিনিকে দমিয়ে রাখা সহজ নয়, তারপর একসময় বড় হয়ে নিয়মটা আমি নিজেই মানতে শুরু করে ছিলাম। বৈধব্যের এই কঠোর সাধনায় পুণ্য নেই, না মানলে পাপ। ছোট থেকে আমি তো এমনটাই শুনেছি।
পেঁচির বিয়েতে গোলমাল কম হয় নি। বিয়ের দুদিন আগে পাত্রপক্ষ ছেলের হাত ঘড়ি, গান শোনার কল আর সাইকেল দাবি করেছিল নতুন করে। যে পরিমান সোনা চাওয়া হয়েছিল তার প্রায় দ্বিগুণ দেওয়া হচ্ছে শুনে তখনকার মতো থেমে গেল বটে কিন্তু বাড়ির সবার মনে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনিয়ে এলো, এদের খাঁই দিনকে দিন বেড়েই চলবে না তো? শৈলেন বাবু হপ্তা খানেকের ছুটি নিয়ে এসেছিলেন, সব শুনে বিয়ের রাতেই বর কর্তাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিলেন যে আর কিছু দাবি করলে বা শ্বশুর ঘরে মেয়ের ওপর নির্যাতন হলে আদালতে টেনে নিয়ে যাবেন। লোকে শাপশাপান্ত করার সময়বলে, ‘তোর ঘরে মামলা ঢুকুক’। আশা করা যায় পেঁচির শ্বশুরবাড়ি কথাটা বুঝবে এবং মনে রাখবে। অবশ্য তিনি নিজের হাতের নতুন দামি ঘড়িটাও নতুন বরকে উপহার দিলেন। ঘড়িটা নাকি তাঁর কোন মক্কেল উপহার দিয়েছিল। ভাগ্নির বিয়ে উপলক্ষে সেটা পরে এসেছিলেন। বাই সাইকেল অবশ্য তারা আর পেল না। আমি বিধবা মানুষ তাই বিয়ের সব আচার অনুষ্ঠান থেকে দূরেই ছিলাম। কনে বিয়ের পিঁড়িতে ওঠার আগে বড়দি আর তাঁর ছেলের বউরা ডেকে নিয়ে গেল আশীর্বাদ করার জন্য। দুধে আলতা রঙের বেনারসীতে মেয়েটাকে যে কী ভালোই লাগছিল! শৈলেন বাবু শহর থেকে স্নো পাউডার এসব নানা সাজের জিনিস গুছিয়ে কিনে এনে দিয়েছিলেন। বড়দিই আনতে বলেছিলেন। সেসবের দাম অবশ্য তিনি নেননি। কে বলে শ্যামলা মেয়ে সুন্দরী হয় না? অমন শ্যাম স্নিগ্ধ রূপ দেখার চোখ থাকতে হয়।
আমার যা দেওয়ার সবই তো বড়দিকে দিয়ে দিয়েছিলাম, তাই ধান দুব্ব দিয়ে খালি হাতেই আশীর্বাদ করতে গেলাম। কিন্তু বড়দির সব দিকে নজর, তিনি আমার দেওয়া সীতা হার খানা হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “বাকি গুলো তো পরিয়ে দিয়েছে, এখানা আমি আলাদা করে সরিয়ে রেখেছিলাম। খালি হাতে আশীর্বাদ করিস নে। মামার বাড়ি থেকে তো একমাত্র তুইই এসেছিস। অন্য মামীরা তো আর এল না।”
বড়দি দীর্ঘশ্বাস লুকোতে পারলেন না।
সত্যিই, আমার বড় জা বা মেজ জা কেউই আসেনি। আসেননি বড় আর মেজ ভাসুরও। ওরা যে গয়না দেবে বলেছিল তাও দেয়নি। শৈলেন বাবুকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে এক বাড়ি থেকে আর কত দেওয়া হবে? সেজ বউ তো মনের সুখে গয়না বিলিয়ে দিয়েছে। সেসব গয়না তো বাড়িরই গয়না। শৈলেন বাবুও পণের টাকা দিচ্ছেন।
ছেলে পুলের ইস্কুলের পরীক্ষার পড়া আছে তাই নাকি তারা আসতে পারল না।
শুভ দিনে চোখের জল ফেলতে নেই, বড়দি সবার অলক্ষে অবাধ্য চোখের জল মুছে গভীর আক্ষেপে বললেন, “ও বাড়ি থেকে আসার সময় ছেলে পুলে গুলো বড় পিসির বাড়িতে আসবে বলে আনন্দে লাফাচ্ছিল। বিয়ে বাড়ির ভোজ খাওয়ার থেকেও ছুটো ছুটি করে খেলা, বিয়ের বাড়ির হাজার রকম মজা দেখার আনন্দ অনেক বেশি। বড় মেজ ওদের খুশির দিকটাও বিবেচনা করে দেখল না। না হয় কিছুই দিত না, তুই যা দিয়েছিস তার পর আর তো কিছু দেওয়ার দরকার ছিল না।”
বউরা বলল, “ছেড়ে দিন মা। ও নিয়ে আর মন খারাপ করবেন না। বিয়ের পর পেঁচি জামাইকে নিয়ে না হয় মামা মামীদের পেন্নাম করে আসবে। বর এখনই মণ্ডপে বসবে। সবাই পেঁচিকে আশীর্বাদ করে নিন। লগ্ন এগিয়ে এসেছে। পেঁচিকে পিঁড়েতে করে নিয়ে যাবে।”
গুরুজনরা পর পর আশীর্বাদ করতে লাগল। মুহুর্মুহু হুলুধ্বনিতে বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠল। আমি আর বড়দি আস্তে আস্তে ওখান থেকে সরে গেলাম।
বাড়ি ফেরার সময় হল, আগের দিন তোরঙ্গটা গুছিয়ে রাখছি। বড়দি ঘরে ঢুকে এক জোড়া খুব মিহি জমির থান হাতে ধরিয়ে দিলেন, “কতটুকু ছিলিস যখন রাঙা বালুচরিখানা দিয়েছিলাম। আজ আবার যখন দিচ্ছি …”
আঁচলে চোখ মুছে বললেন, “আর দুটো দিন থেকে যা না কেন, কি হবে সাত তাড়াতাড়ি সেখেনে গিয়ে?”
আজকাল পোড়ার চোখে বার বার জল কেন আসে জানি না। গয়না দিয়েছি বলে যে বড়দি আদর যত্ন করছেন তা নয়। মানুষটা ওমনই , মনটা ভালোবাসায় ভরা। আমার কিছু না থাকলেও এ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হতাম না। মাথা নেড়ে বললাম,
“না গো বড়দি অনেক দিন বাড়ি ছাড়া হয়ে আছি, মায়ের অসুবিধে তো হচ্ছেই, বল তুমি।”
বড়দি হেসে বললেন, “বলেছিস ভাল, কয় দিন হলো তুই শ্বশুর ঘর করতে এসেছিস? তার আগে মায়ের চলতো কী করে? শোন, তোর বাকি গয়না গুলো আবার মায়ের কাছে রেখে ভালো করিস নি কিন্তু। মেয়ে মানুষের ওইটুকুই তো সম্বল। আজ যদি আমার সেসব থাকতো তোদের কাছে গয়না টাকা ভিক্ষে করতে হতো না।”

আমি বুঝিয়ে বললাম, “নিজের কাছে কোথায় রাখবো বলো? এতদিন তো মায়ের কাছেই জিনিস গুলো যত্নে ছিল। এখন নিজের কাছে রেখে দিলে তাঁকে অপমান করা হতো, তাই না?”
আমাকে নিজের কথা বোঝাতে না পেরে হতাশ হয়ে বললেন, “যাক গে, তোকে একটা অন্য কথা বলি মন দিয়ে শোন … তোর রূপ খানা কিন্তু যেমন তেমন নয়। একটু সাবধানে থাকিস কেমন! মেয়ে মানুষের বিপদ বাইরে যেমন ঘরেও তেমন। বেশি কিছু বলবো না তবে শুনে রাখ, ছোট বউ কিন্তু বিনে কারনে গলায় দড়ি দেয় নি।”
ফিরে প্রশ্ন করার আগেই বড়দি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। ঘরের ভেতরে কার থেকে বিপদ হতে পারে শৈলেন বাবু? ভয়ে হাত পা ছেড়ে দিল, ভগবান তবে আমি যাবো কোথায়!
বড়দির বড় বউ আরও খান কতক কাপড় দিয়ে গেল। বড় জা আর মেজ জায়ের দুখানা মিহি জমির শান্তিপুরী রঙিন শাড়ি, কঙ্কার জন্য থান। মানদার জন্য ডুরে শাড়ি, শৈলেন বাবু আর ভাসুরদের জন্য মিহি ধুতি চাদর। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলোর জন্য পোশাক। এসবই বড়দি কিনে রেখেছিলেন কিন্তু ওরা তো এল না। তাই আমার হাত দিয়েই পাঠানো হচ্ছে।
গরুর গাড়ি করে ইস্টিশনে এসে রেলে চেপে ফেরা । ফেরার সময় সঙ্গী রতন, বড়দির মেজ ছেলে। বড় নম্র ছেলে, আর যাই হোক বড়দি ছেলে পুলেদের খুব ভালো মানুষ করেছেন। ছেলেটা বয়সে আমার থেকে বড় হলেও মামীমা বলে ডাকলে মনটা জুড়িয়ে যায়। বড় মাটির হাঁড়ি করে রসগোল্লা আর পুকুর থেকে পেল্লাই একখানা রুই মাছ ধরিয়ে বড়দি রতনের সঙ্গে দিলেন।
“মাছটা তো মানদা আর ভাই একা খেয়ে শেষ করতে পারবে না আর তুই পথের মিষ্টিও খাবি না। ওসব ভাইকে দিয়ে বড় আর মেজ বউয়ের কাছে পাঠিয়ে দিস। ছেলেপুলে গুলোর কপালে তো বিয়ে বাড়ির আনন্দ আর ভোজ কিছুই জুটল না।”
আসার সময় নিচু হয়ে প্রনাম করতে বড়দি বুকে জড়িয়ে ধরল। হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল। আমার চোখও শুকনো রইল না। এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বাপ মা, নতুন বউ আর বিনির কাছ ছাড়া কারোর কাছে পাইনি। জানি না আবার কবে যে বাড়িতে আসা হবে।
বড়দি যেন আমার মনের কথা পড়ে নিলেন। বললেন, “মন করলেই এক খানা পত্তর দিবি। রতন গিয়ে তোকে নিয়ে আসবে। একটা কথা মনে রাখিস, সংসারে তোর যদি কেউ না থাকে মাথার ওপর ভগবান আর এই মাটিতে তোর বড়দি থাকবে। আমার যদি একবেলা দুটো ভাত জোটে তা তোর সঙ্গে ভাগ করে খেতে পারব।”
আমি তাঁর হাত চেপে ধরে বললাম, “ছেলে আর বৌদের নিয়ে তুমিও এস বড়দি। আমার যে নিজের বলতে কেউ নেই গো। তোমরা আসলে ও বাড়ি ভরে উঠবে।
তিনি বললেন, “দূর পাগলী! সংসার ফেলে ওভাবে বার বার বাপের বাড়ি যাওয়া যায়? তবে একবার পেঁচি আর জামাইকে অবশ্যই পাঠাব। এ সংসার যদি কখনো ছুটি দেয় তবে যাব তোর কাছে। নিজ্যস যাব।”
হাত পা কাঁপছিল, প্রবল জ্বর আসছিল যেন। মাথায় কাপড় টেনে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসলাম। রতনের হাতে মাছ আর মিষ্টি তাই তোরঙ্গটা আমিই বইছিলাম। অনেক কাপড় চোপড় ঢুকে ওটা বেশ ভারী হয়ে উঠেছিল।

গরুর গাড়িতে উঠে মুখ বের করে দেখলাম বউরা তাদের ছেলে পুলে নিয়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু বড়দি নেই। বুঝলাম তিনি ঘরে ঢুকে কাঁদছেন। মেঠো রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলতে লাগল। পথের পাশের গাছ গাছালি আর মাটির নিজস্ব গন্ধ ভরা বাতাস বুক ভরে টেনে নিতে থাকলাম। শহরে শ্বশুরবাড়িতে তো এ বাতাস কোথাও ফিরে পাব না। ভারাক্রান্ত মনে এ কয়দিনের স্মৃতিচারণ করতে লাগলাম।
ফিরে এসেই দেখি সর্বনাশ হয়েছে। শাশুড়ী কিভাবে কে জানে খাট থেকে পড়ে গিয়ে মাজা ভেঙেছেন, কথা বলাও বন্ধ হয়ে গেছে। ডাকলে মুখদিয়ে দুর্বোধ্য শব্দ বের করে সাড়া দিচ্ছেন, বাঁকা ঠোঁটের পাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে আসছে। পক্ষাঘাত! পিসি ঠাকমার এমন হয়েছিল। দিন দশেক হলো এমন হয়েছে, আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য শৈলেন বাবু চিঠিও লিখেছেন। সেই চিঠি পৌঁছানোর আগেই আমি রওনা দিয়েছি।
যেমনই হোন না কেন এই মানুষটার জন্যই এ সংসারে আমার থাকা , এখনই এঁর কিছু হলে আমি কোথায় যাব! বিপত্নীক দেওরের সঙ্গে একা এক বাড়িতে থাকা কখনোই সম্ভব হবে না। এই প্রথম রুগ্ন কটু ভাষিণী শাশুড়ির জন্য চোখে জল এল, নাকি নিজের অন্ধকার ভবিষ্যতের জন্য কে জানে!
কঙ্কা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, “কেঁদোনা সেজবৌ, বাপ মা শ্বশুর শাশুড়ী কী চেরটা কাল কারও থাকে!”
ক্রমশ



