মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস – পর্ব ৭


gemini generated image cxxhn0cxxhn0cxxh

​ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন ও মিশেলকে নিয়ে এরকুল পোয়ারো নিহত মি. রাশেটের কূপের দিকে রওনা দিলেন। কন্ডাক্টর মিশেল তার মাস্টার কি দিয়ে কূপের দরজা খুললেন; তিনজনে কূপেতে ঢুকলেন।

​পোয়ারো:

ঘরের জিনিসপত্র কতটা নাড়াচাড়া করা হয়েছে?

​ডাক্তার: না না, তেমন কিছুই না। আমি মৃতদেহ পর্যন্ত সরাইনি, জাস্ট উপর-উপর দেখেছি। কূপেতে প্রবল ঠান্ডার স্রোত বইছে, জানলাও খোলা।

​পোয়ারো জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।

​পোয়ারো: হুঁ

​ডাক্তার: জানালাটা খোলাই ছিল, আমি সেটাও বন্ধ করিনি।

​পোয়ারো: (জানালাটা পরীক্ষা করতে করতে) আপনার কথাই ঠিক, এই জানলা দিয়ে আততায়ীর পালানোর সম্ভাবনা নেই। যে সময় খুনটা হয়েছে বলছেন, তখন যা তুষারঝড় চলছিল, তাতে করে এখান দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে ওই বরফের স্তূপেই তারও মৃতদেহ পাওয়া যেত।

​এরপর এরকুল পকেট থেকে একটা ছোট কৌটো বের করে জানলার ফ্রেমে ছড়িয়ে দিয়ে দেখতে লাগলেন।

​পোয়ারো: ফিঙ্গার প্রিন্ট, ফিঙ্গার প্রিন্ট! না, না, এগুলো মনে হয় হত্যাকারীর নয়; হয় রাশেটের, নয়তো ওর চাকরের। এখনকার দিনের খুনিরা সব সেয়ানা হয়ে গেছে, এসব কাঁচা কাজ আর কেউ করে না। যাই হোক, জানালাটা খুলে রেখে এখন আর লাভ নেই; এটা তো দেখছি এখন কোল্ড স্টোরেজে পরিণত হতে চলল।

​পোয়ারো একমনে বাঙ্কে পড়ে থাকা মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে রইল। স্থির নিশ্চেষ্ট দেহ, পরনে পায়জামা ও শার্ট। শার্টের বিভিন্ন জায়গায় বাদামি বাদামি ছোপ, সম্ভবত শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। শার্টের বোতাম খোলা।

​ডাক্তার: আপনি স্ট্যাব উন্ডগুলো একটু পরীক্ষা করলেই বুঝবেন যে কীভাবে এলোপাথাড়ি ছুরি চালানো হয়েছে।

​পোয়ারো: (ঝুঁকে ক্ষতগুলো দেখতে দেখতে) হ্যাঁ, তাই তো দেখছি। কেউ বা কারা ওর বাঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে এলোপাথাড়ি ছুরি চালিয়েছে। কতগুলো ‘স্ট্যাব ইনজুরি’ পেয়েছেন?

​ডাক্তার: খান বারো তো হবেই। এর মধ্যে খানদুয়েক আঁচড়ের মতো, কিন্তু গোটা তিনেক বেশ গভীর; ওগুলোতেই মৃত্যুটা ঘটেছে বলেই আমার ধারণা। (মৃতদেহটাকে আরও গভীর ভাবে লক্ষ্য করতে করতে) কিন্তু এগুলো, এগুলো—

​এরকুল: কোনগুলো?

​ডাক্তার: আরে এই স্ট্যাব ইনজুরিগুলো দেখুন! গভীরতা বেশ বেশিই, কিন্তু রক্তপাত তো তেমন দেখছি না।

​এরকুল: মানে?

​ডাক্তার: মানে তো একটাই। এই আঘাতগুলো যখন করা হয়, তখন মি. রাশেট ‘অলরেডি ডেড’। শুধু ডেড নয়, বেশ কিছুক্ষণ আগেই তার মৃত্যু ঘটেছে; তা না হলে রক্তপাত ঘটতই। কিন্তু, সেটা কীভাবে হওয়া সম্ভব?

​পোয়ারো: (চিন্তিতভাবে) সেটা একভাবেই হওয়া সম্ভব, তা হলো খুন করেও খুনি নিশ্চিত ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ পরে আবার ফিরে আসে এবং নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবারও ছুরি চালায়।

​ডাক্তার: আরও একটা খটকা?

​পোয়ারো: কী?

​ডাক্তার: এই ক্ষতটা দেখেছেন? ডান দিকের বগলের নিচে, একেবারে কাঁধের কাছে। আপনি আমার এই পেনসিলটা নিন; দেখুন তো এই জায়গায় অমন গভীর ক্ষত তৈরি করার মতো আঘাত করতে পারেন কি না?

​পোয়ারো: (পেনসিলটা নিয়ে) ওঃ, ডান হাত দিয়ে ওই জায়গায় ওই রকম গভীর আঘাত করা অসম্ভব। ডানহাতি হলে হয় পিছন থেকে, অথবা বাঁহাতি হলে সামনে থেকে ওই রকম আঘাত করা সম্ভব।

​ডাক্তার: ঠিক এটাই বোঝাতে চাইছি, খুনি বা খুনিদের কেউ বাঁহাতিও হতে পারে।

​পোয়ারো: হত্যাকারী বাঁহাতি— কেস তো আরও জটিল হয়ে গেল!

​ডাক্তার: কিন্তু বেশ কিছু আঘাত এমন— তা কেবল ডানহাতির পক্ষেই করা সম্ভব।

​পোয়ারো: (স্বগতোক্তির মতো) তা হলে তো দাঁড়াচ্ছে যে, হত্যাকারী এক নয়, একাধিক! আচ্ছা, আলো জ্বালা ছিল না নেভানো?

​ডাক্তার: বলা শক্ত। কন্ডাক্টর এমনিতেই সকালের দিকে সব কূপেরই আলো বাইরের মাস্টার সুইচ দিয়ে অফ করে দেয়।

​পোয়ারো: সুইচগুলো থেকে একটা ধারণা করা যেতে পারে।

​ডাক্তার: (সুইচগুলো পরীক্ষা করতে করতে) সিলিংয়েরটা দেখছি নেভানো ছিল, সুইচ অফ করা আছে। বেডেরটা— হ্যাঁ, বেডের পাশেরটাও তো অফই।

​পোয়ারো: তা হলে কী দাঁড়ালো? ব্যাপারটা কল্পনা করা যাক। সাধারণ ভাবে নাটকে মানে শেক্‌সপিয়রের নাটকে যেমন হয়ে থাকে, সেভাবেও যদি ভাবা যায়— ধরা যাক প্রথম হত্যাকারী এলো, এলোপাথাড়ি ছুরি চালিয়ে আলো নিভিয়ে চলে গেল। পরের জন অন্ধকারেই কূপেুু ঢুকল; ফলে সে জানতেও পারল না যে কাজ ইতিমধ্যে সারা হয়ে গেছে। বারকয়েক প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়ে অন্ধকারেই ছুরি চালিয়ে চলে গেল।

​ডাক্তার: (সোল্লাসে) অপূর্ব! এমনটাই মনে হয় ঘটেছে।

​পোয়ারো: (চোখ কুঁচকে) আপনার এই ব্যাখ্যাটা যথাযথ মনে হচ্ছে; কি জানি, এত সোজা—

​ডাক্তার: আপনার কি অন্য রকম কিছু মনে হচ্ছে?

​পোয়ারো: সেটাই তো ভাবছি— এই একাধিক খুনি ব্যাপারটা আদৌ বাস্তবসম্মত কি না?

​ডাক্তার: কিন্তু ক্ষতগুলোর প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। কিছু আঘাত যেমন খুবই শক্তিশালী, কিছু আবার বেশ দুর্বল। সেটা থেকেই একাধিক খুনির থিওরিটা মাথায় আসছে। বিশেষ করে যেগুলো হাড়মাস ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে—

​পোয়ারো: সেগুলোকে কি আপনার মনে হচ্ছে কোনো যুবকের কাজ?

​ডাক্তার: সেটাই তো মনে হচ্ছে। প্রচুর ক্ষমতা দরকার এ ধরনের জোরে ছুরি চালাতে।

​পোয়ারো: কোনো মহিলার পক্ষে কি এই রকম ছুরি চালানো নিতান্তই অসম্ভব?

​ডাক্তার: না না, তা কেন? কোনো শক্তিশালী অ্যাথলেটিক চেহারার যুবতী নারী এমন জোরে আঘাত করতেই পারে, তবে তার মনের জোরও থাকতে হবে। তবে যাই বলুন না কেন, ওই প্রাণঘাতী আঘাতগুলো কোনো মহিলার পক্ষে সম্ভব বলে আমার মনে হচ্ছে না।

​এরকুল: (চিন্তিতভাবে মাথা নেড়ে) হুঃ, সেটাই ভাবছি—

​ডাক্তার: কী বলতে চাইছি, সেটা আপনাকে ঠিকঠাক বোঝাতে পারছি কি?

​পোয়ারো: বুঝতে পারছি, ব্যাপারটা এক্কেবারে জলবৎ তরলং। দুজন খুনি; প্রথমজন পুরুষ, বেশ শক্তিশালী, তার আঘাতেই মূলত মৃত্যুটা হয়েছে এবং অন্যজন মহিলা— তার আঘাতগুলো বেশ দুর্বল এবং সে আবার বাঁহাতি! এই তো? (একটু থেমে এবং একটু ব্যঙ্গের সাথে) আর এই গোটা সময়টাতে অর্থাৎ যখন ছোরাছুরি চলছিল, তখন মি. রাশেট বাধ্য ছেলের মতো খুন হতে সহযোগিতা করছিলেন, কোনো রকম ছটফট বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেননি— এটাই আপনি বলতে চান বোধ হয়?

​এরপর দ্রুত রাশেটের বালিশের তলায় হাত চালিয়ে একটা স্বয়ংক্রিয় রিভলবার বের করলেন।

​—আর এটা দেখুন, ফুললি লোডেড। অর্থাৎ ভালো মানুষের মতো খুন হওয়াটা মি. রাশেটের একেবারেই পছন্দের ছিল না।

​ঘরের মধ্যে প্রচণ্ড নিস্তব্ধতা। রাশেটের খুলে রাখা পোশাক-আশাকগুলো বাঙ্কের পাশের হুক থেকে ঝুলছে। ওয়াশিং বেসিনের কাছে ফলস দাঁত বাটিতে রয়েছে। মাথার দিকে টিপয়ে দুটো গ্লাস; একটা ফাঁকা, অন্যটা ভর্তি। এক বোতল মিনারেল ওয়াটার। পাশের অ্যাশট্রেতে একটা আধপোড়া সিগার গোঁজা আছে, কিছু আধপোড়া কাগজ এবং দুটো আধপোড়া দেশলাই কাঠি। দুটো গ্লাসের মধ্যে ফাঁকাটা হাতে নিয়ে ডাক্তার একটু শুঁকলেন, তারপর ঈষৎ শ্লেষ মিশিয়ে—

​ডাক্তার: এই গ্লাসটা শুকুন, তাহলেই বুঝবেন কেন উনি ভালো মানুষের মতো খুন হতে সাহায্য করেছিলেন।

​এরকুল: (গ্লাস শুঁকে) আচ্ছা, এই ব্যাপার! ওনাকে আগেই ড্রাগ দিয়ে অবশ করা হয়েছিল।

​ডাক্তার: সেটাই তো হবে মনে হচ্ছে, সেই কারণেই মৃতদেহে প্রতিরোধের কোনো চিহ্নই নেই।

​পোয়ারো নিঃশব্দে পোড়া দেশলাই কাঠি দুটো হাতে নিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন।

​ডাক্তার: নতুন কিছু পেলেন নাকি?

​এরকুল: এখনো পাইনি— দেখছি। এই দুটো দেশলাই কাঠি দু-ধরনের— একটা গোল অন্যটা চ্যাপ্টা।

​ডাক্তার: কই দেখি? (দেশলাই কাঠি দেখে)— আরে এই চ্যাপ্টাটা ট্রেনে হরবখত বিক্রি হয়, কাগজের তৈরি।

​এরকুল: (রাশেটের পকেটে হাত চালিয়ে দেশলাই বের করে) এই গোল কাঠিটা দেখছি মি. রাশেটের ম্যাচবক্সের। অন্য কোনো ম্যাচবক্স কি আর কূপেতে আছে— দেখুন তো সবাই?

gemini generated image 5i77d25i77d25i77

পোয়ারো শ্যেনদৃষ্টিতে কূপের চারিদিকে লক্ষ্য করতে লাগলেন। আর কোনো ম্যাচবক্স পাওয়া গেল না। হঠাৎই মেঝে থেকে একটা জিনিস তুলে পোয়ারো দেখতে লাগলেন।

​পোয়ারো: (প্রায় স্বগতোক্তির মতো) একটা মেয়েদের ছোট্ট রুমাল; বেশ দামি ও আভিজাত্যপূর্ণ। কোনায় আবার লেখা— কী? ‘এইচ’।

​ডাক্তার: দেখলেন তো, প্রথম থেকেই বলছি না— কোনো মহিলা এই খুনের সাথে যুক্ত! মিলছে কি না বলুন।

​এরকুল: হ্যাঁ, সেটাতেই আরও অবাক হচ্ছি। ঠিক একেবারে ক্রাইম থ্রিলার বা সিনেমায় যেমনটা হয়; খুনি আসিল, খুন করিল এবং যাইবার সময় কোনায় নামের আদ্যক্ষর ছাপানো একটি রুমাল তদন্তের সুবিধার্থে ক্রাইম সিনে ফেলিয়াও গেল—

​ডাক্তার: খুনি অসাবধানে ফেলে গেছে এবং আমরা ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেছি, এমনটাও তো হতে পারে।

​এরকুল: কত কিছুই পারে, আবার পারেও না। (একটু ঝুঁকে আর-একটি বস্তু মেঝে থেকে তুলে হাতে নিয়ে) এই দেখুন আর-একটা। এটা পাইপ ক্লিনার।

​ডাক্তার: এটা মি. রাশেটের হতে পারে।

​এরকুল: (ঘর ও পকেট খুঁজে খুঁজতে) কিন্তু মি. রাশেটের হতে গেলে ভদ্রলোকের নিদেনপক্ষে একটা পাইপ তো থাকতে হবে। পাইপ তো দূরের কথা, তামাকের পাউচ অবধি কোথাও দেখছি না।

​ডাক্তার: (চিন্তিত ভাবে) তাহলে এটা বাইরের কারোরই। সেক্ষেত্রে এটাও একটা ক্লু হতে পারে?

​পোয়ারো: ক্লু আর ক্লু। চারিদিকে এত ক্লুর ছড়াছড়ি যে মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। মশাই, কেউ কমপ্লেন করতে পারবে না যে ক্লুর অভাবে এই কেসের সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। একটাই ভাবছি কেন এত ক্লু? কেন এত— আচ্ছা, এত ক্লু থাকাটাও কোনো ব্লু নয় তো? দেখা যাক—। খুনের অস্ত্রটার অর্থাৎ মার্ডার ওয়েপনের কি কোনো সন্ধান পাওয়া গেছে?

​ডাক্তার: না, আমার মনে হয় ওটা খুনি সঙ্গে নিয়ে গেছে।

​পোয়ারো: (নিজের মনে) তাই কি—

​ডাক্তার: (পায়জামার পকেটে খুঁজে) এখানটায় অবশ্য আমি দেখিনি। বুকের বোতামগুলোই শুধু খুলে স্ট্যাব উন্ডগুলো দেখেছিলাম।— না, কিছুই নেই।

​এরপর বুক পকেট হাতড়ে একটা সোনার চেন দেওয়া ঘড়ি বুক পকেট থেকে বের করে—

​ডাক্তার: দেখেছেন যা বলছিলাম! সময়টা দেখুন— ঘড়িটা ঠিক সোয়া একটায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বলছিলাম না বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে খুনটা হয়েছে, মিলে গেল তো। ঘড়িটা যে সময় থেমে গেছে, সেই সময়টা খুনের সময়ের একটা ক্লু হতে পারে? পারে কি না বলুন?

​এরকুল: হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

​ডাক্তার: কী বলছেন আপনি? আপনি বুঝতে পারছেন না, ‘টাইম অফ ক্রাইম’-এর ক্ষেত্রে এটা একটা স্ট্রং এভিডেন্স।

​এরকুল: সত্যি আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। যত বেশি ক্লু পাচ্ছি, ততই আমার সংশয় বেড়ে যাচ্ছে। (ছোট টেবিলটার উপর ঝুঁকে কিছু পোড়া জিনিসপত্র হাতে নিলেন এবং এরকুল, স্বগতোক্তি করে) দেখি আবার কী ক্লু বেরিয়ে আসে? একটা পুরনো দিনের মেয়েদের হ্যাটকেস এক্ষুনি দরকার, সেটা পেলেই কিছু একটা দাঁড় করানো যায়।

​ডাক্তার উদগ্রীব হয়ে পরবর্তী আলোচনার অপেক্ষায় ছিলেন। এরকুল সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে নিজেই কূপের বাইরে বেরিয়ে গেলেন এবং একজন কন্ডাক্টরকে ডেকে নিয়ে এলেন।

​পোয়ারো: এই কোচে কতজন মহিলা যাত্রী আছেন?

​মিশেল: (হাতের আঙুল গুনতে গুনতে) এক, দুই… মোট ছয়জন মঁসিয়ে।

​পোয়ারো: ঠিক আছে, ওদের সবারই হ্যাটকেস আছে নিশ্চয়ই।

​মিশেল: আছে তো নিশ্চয়ই।

​পোয়ারো: ওগুলো আমার চাই, নিয়ে এসো। সুইডিশ মহিলা আর মহিলা পরিচারিকারটা— ম্যাচ করতে পারে। ওদুটোই নিয়ে এসো। হ্যাঁ— যদি কেউ বাধা দেয় বলবে, কাস্টমসের প্রয়োজন, তাই—

​মিশেল: মনে হয় না সমস্যা হবে, কেউই এই মুহূর্তে নিজের কূপেতে নেই।

​পোয়ারো: তবে তো সমস্যাই নেই, দৌড়ে যাও।

gemini generated image 3qv3tq3qv3tq3qv3

কন্ডাক্টর দৌড়ে চলে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরে দুটো হ্যাটবক্স নিয়ে ফিরে এলেন। পোয়ারো প্রথমে মহিলা পরিচারিকার বাক্সটা খুললেন, হতাশ হয়ে বন্ধও করে দিলেন। পরেরটা সুইডিশ মহিলার; ভেতরটা দেখে সন্তুষ্ট হলেন।

​পোয়ারো: বাহ্! এটাই চাইছিলাম। আজ থেকে পনেরো বছর আগে এই রকমই তারজালিতে হ্যাটপিন দিয়ে টুপিগুলোকে আটকে রাখা হতো। আমার এই দুটো লাগবে (অত্যন্ত যত্ন করে তারজালির একটা অংশ খুলে নিলেন)। যাও মিশেল, এগুলো এবার যে যার জায়গায় রেখে এসো।

​মিশেল হ্যাটকেসগুলো নিয়ে কূপ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

​এরকুল: ডাক্তার সাহেব, শুধু ক্লু আর এক্সপার্টের উপর নির্ভর করে সব সমস্যার সমাধান হয় না। অপরাধ ও অপরাধীর মনস্তত্ত্ব বোঝাটুকু সমান জরুরি। এই গোয়েন্দা তদন্তে সিগারেটের ছাই আর পায়ের ছাপের দিন আর নেই; অপরাধীরাও অনেক সেয়ানা হয়ে গেছে। এই যে কূপেতে এত ক্লুর ছড়াছড়ি, কোনটা আসল আর কোনটা তদন্ত ঘুলিয়ে দিতে ফেলে রাখা হয়েছে সেটাও আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এখন আমরা সম্ভবত একটা সত্যিকারের ক্লু আবিষ্কারের পথে; তার জন্য একটা ছোট্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্য আমাদের নিতে হবে।

​ডাক্তার: আমি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।

​এরকুল: উদাহরণ দিই, বুঝতে সুবিধা হবে। আমরা ক্রাইম সিনে একটা মেয়েদের রুমাল পেয়েছি— প্রশ্নটা হলো, কে ফেলে গেল? কোনো মহিলা না কোনো পুরুষ? ধরুন কোনো পুরুষ খুনটা করল, ইচ্ছা করে কিছু স্ট্যাব ইনজুরি দুর্বল আঁচড় কাটার মতোই করে রাখল এবং একটা মেয়েদের রুমাল ফেলে গেল— উদ্দেশ্য পরিষ্কার, যাতে তদন্তের সময় সন্দেহের অভিমুখ কোনো মেয়ের দিকে যায়— ঠিক কি না? আবার কোনো মহিলা খুনটা করে পাইপ ক্লিনারটা এখানে ফেলে গেল— উদ্দেশ্য কোনো পুরুষকে ফাঁসানো— এটাও একটা সম্ভাবনা— তাই না? আবার এটাও হওয়া সম্ভব যে কোনো পুরুষ ও কোনো মহিলা যৌথ ভাবেই এই খুনের সাথে যুক্ত এবং দুজনেই অসাবধানে রুমাল ও পাইপ ক্লিনার ফেলে গেছে; কিন্তু এমন সম্ভাবনা কমই। এবার পরিষ্কার হলো?

​ডাক্তার: কী যে বুঝছি! যাই হোক, কিন্তু হ্যাটকেসের ব্যাপারটা কিছুই বুঝলাম না।

​পোয়ারো: সে ব্যাপারে আসছি। এই যতগুলো ক্লু আমরা পেয়েছি, যেমন মেয়েদের রুমাল, পাইপ ক্লিনার কিংবা নিহিতের বুকপকেটের ঘড়ি— আসলও হতে পারে নকলও হতে পারে, সেগুলিই আমরা দেখব। কিন্তু মনে হচ্ছে এখন যে ক্লুটা আমরা পেতে চলেছি সেটা জেনুইন, একেবার খাঁটি; কারণ এটাকে নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল। তদন্তের সময় এটা তদন্তকারীর হাতে পড়ুক হয়তো খুনি সেটা চায়নি। দেখা যাক—

​এরকুল এরপর কূপ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন এবং একটু পরেই একটা স্পিরিট ল্যাম্প ও দুটো ছোট চিমটে নিয়ে আবার কূপেতে প্রবেশ করলেন।

gemini generated image uqb67yuqb67yuqb6

পোয়ারো: এই চিমটে দুটো আমার গোঁফের ডগাগুলো সূচালো করতে কাজে লাগে; দেখি এখানে কাজে লাগে কি না।

​এরপর এরকুল স্পিরিট ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে উপরে হ্যাটকেসের তারজালিটা রাখলেন। ক্রমে তারজালিটা তেতে লাল হয়ে উঠল। এরপর চিমটে দুটো দিয়ে পোড়া একখণ্ড কাগজের টুকরো ধীরে ধীরে তপ্ত তারজালির উপর নামালেন। ধীরে ধীরে খুব অস্পষ্ট কয়েকটা শব্দ পোড়া কাগজের উপর ভেসে উঠতে লাগল। পোয়ারো পড়তে লাগলেন।

​পোয়ারো: ‘…মনে পড়ে ছোট্ট ডেইজি আর্মস্ট্রংয়ের কথা।’— ওহ্! এই কেস! (প্রচণ্ড উচ্ছ্বাসে)

​ডাক্তার: কিছু একটা সূত্র পেলেন মনে হচ্ছে।

​এরকুল: (চিমটে ও কাগজ নামিয়ে রেখে, উচ্ছ্বাসে চোখদুটো চকচক করছিল)— প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য অবশ্যই পেয়েছি। এতক্ষণে লোকটার আসল নাম জানতে পারলাম, আর জানতে পারলাম তার আমেরিকা ছেড়ে পালানোর কারণটাও।

​ডাক্তার: কী নাম ওর?

​এরকুল: কাসেত্তি।

​ডাক্তার: কাসেত্তি! দাঁড়ান দাঁড়ান, নামটা মনে হচ্ছে আমারও শোনা। বেশ কয়েক বছর হয়েও গেল, সঠিক মনেও পড়ছে না; সম্ভবত আমেরিকার কোনো কেসের সাথে যুক্ত— ঠিক বলছি কি?

​এরকুল: হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, আমেরিকারই কেস। এখানে আর দেরি করে লাভ নেই, চলুন বাকিদের সাথে কথা বলাটা জরুরি।

​কূপ থেকে বেরোনোর আগে এরকুল দ্রুত একবার নিহত রাশেটের পকেট হাতড়ালেন, কিন্তু কিছুই পেলেন না। রাশেটের কূপের সাথে অন্য কূপের যোগাযোগের দরজাটা ঠেলে দেখলেন— বন্ধ আছে।

​ডাক্তার: একটা জিনিস কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। এই কূপের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, অন্যদিকের কূপের সাথে যোগাযোগকারী দরজা ওদিক থেকে বন্ধ। এই জানলা দিয়েও পালানো সম্ভব নয়— সেটাও বুঝতে পারছি— তা হলে খুনি পালালো কোথা দিয়ে?

​পোয়ারো: হাত-পা বাঁধা কোনো লোককে বন্ধ বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়ার পর— গিলি গিলি গে বলে যখন ম্যাজিশিয়ান বাক্সের ঢাকনা খোলেন এবং দেখান লোকটা ভ্যানিশ, তখন দর্শকরাও এই একই কথা বলে— লোকটা ভ্যানিশ হলো কোথা দিয়ে?

​ডাক্তার: মানে—

​এরকুল: সব বন্ধ রেখে জানলাটা খুলে রেখে খুনি বোঝাতে চেয়েছিল জানলাটাই ওর পালানোর রাস্তা। কিন্তু সে গেছে এই বন্ধ দরজা পেরিয়েই; কিন্তু কীভাবে এটাই এই ম্যাজিকের ট্রিকস। আমাদের কাজ এই ট্রিককে খুঁজে বের করা— দেখা যাক। (অন্য কূপের সাথে যোগকারী দরজার দিকে তাকিয়ে) চলুন এখানে আর দেরি করে কোনো লাভ নেই, মঁসিয়ে বু-র কাছে যাই; পরবর্তী মিশনে ওনাকে লাগবে। এতক্ষণে বোধ হয় মিসেস হুবার্ড এই রোমহর্ষক খুন নিয়ে মেয়েকে দিস্তাখানেক লম্বা চিঠি শেষ করে ফেললেন।

ক্রমশঃ

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব – ৬


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top