
এরকুল : প্রথমেই একবার ওনার সেক্রেটারি ম্যাককুইনের সাথে কথা বলা জরুরি, কিছু মূল্যবান তথ্য পেলেও পেতে পারি। সেগুলোর উপর দাঁড়িয়ে পরের পরিকল্পনা করা যাবে।
বুঁ : আপনি যেমনটা ভালো বুঝবেন। (সেফের দিকে ঘুরে) ম্যাককুইনকে একটু ডেকে আনো।
সেফ বেরিয়ে গেলেন, কন্ডাক্টর মিশেল একগাদা টিকিট আর পাসপোর্ট নিয়ে ঢুকলেন। বুঁ সেগুলো নিলেন।
বুঁ : ঠিক আছে মিশেল, এখন তুমি আসতে পারো। সাক্ষ্য নেওয়ার সময় তোমায় আবার ডেকে নেব।
মিশেলঃ ঠিক আছে, আমি আসছি।
এরকুল : ম্যাককুইনের সাথে কথা বলার পর ডাক্তার কনস্ট্যানটাইনকে সঙ্গে নিয়ে একটু মিস্টার রাশেটের কুপেতে যাব।
বুঁ : ঠিক আছে।
এরকুল : তারপর—
এই সময় সেফের সাথে ম্যাককুইন এসে হাজির হলেন। মশাই বুঁ উঠে নিজের জায়গা ম্যাককুইনের জন্য ছেড়ে দিলেন।
বুঁ : একটু সমস্যার কারণেই আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি, আপনি আমার জায়গায় বসুন।
ম্যাককুইন বসলেন—এরকুল পোয়ারোর মুখোমুখিই।
এর পর সেফের দিকে ফিরে—
বুঁ : ডাইনিং কোচটা ফাঁকা করে রাখো যাতে করে ওখানেই উনি বসে সবার সাথে কথা বলতে পারেন। মশিয়ে পোয়ারো, কী বলেন? ওটাই ভালো হবে না?
এরকুল : একেবারেই ঠিকঠাক। ডাইনিং কোচটাই ওই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হবে। ম্যাককুইন কৌতূহলী হয়েই সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন।
এরকুল : অবিশ্বাস্য, কিন্তু এমনটাই ঘটেছে।
ম্যাককুইন: অবিশ্বাস্য। (সবার মুখগুলোয় আরো একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে) ঠিক বুঝতে পারছি না, ট্রেনে কি কিছু ঘটেছে?
এরকুল: ঘটেছে তো বটেই, অত্যন্ত দুঃখের সাথে আপনাকে জানাতে বাধ্য হচ্ছি আপনার অন্নদাতা মিস্টার রাশেট আর নেই।
ম্যাককুইন: (একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) শেষ পর্যন্ত তারা তাহলে ব্যাপারটা ঘটিয়েই ছাড়ল!
এরকুল: (একটু চোখ কুঁচকে) মানে, কারা কী ঘটালো?
ম্যাককুইন: (একটু ইতস্তত করে) না মানে—
এরকুল : আরে বলুন, বলুন, খুলেই বলুন না, আপনি ভাবছেন যে আপনার মনিবকে খুন করা হয়েছে—এই তো?
ম্যাককুইন : (একটু অবাক হয়ে) ওহ, অন্য কোন ভাবে? হঠাৎ মৃত্যু কিনা, আমি ভেবেছিলাম ওনাকে হয়তো খুনটুন—তবে কি ঘুমের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাকে চলে গেলেন? শরীরটির তেমন খারাপ কিছু তো ওনার দেখিনি।
পোয়ারো: না না, আপনার ধারণাই সঠিক, ওনাকেই ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। শুধু একটা জিনিস আমার খটকা লাগছে, আপনি এত নিশ্চিত হলেন কী করে যে উনি মারা গেলে সেটা অস্বাভাবিক মৃত্যুই হবে?
ম্যাককুইন (ইতস্তত করে) কিছু যদি মনে না করেন, আমি এই ব্যাপারে আপনাদের সাথে আলোচনা করতে রাজি আছি, কিন্তু তার আগে আপনাদের পরিচয়গুলো যদি একটু দেন, খুনটুনের মতো ব্যাপার—
পোয়ারো: আমি এরকুল পোয়ারো। একজন ডিটেকটিভ, এই রেল কোম্পানির তরফে এই খুনের তদন্তে নিযুক্ত হয়েছি। ইনি (ঐ দিকে ফিরে) এই রেল কোম্পানির অন্যতম ডিরেক্টর এবং ইনি ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন।
ম্যাককুইনঃ ওহ, আচ্ছা আচ্ছা।
পোয়ারো: এবার কাজের কথায় আসি। এই মিস্টার রাশেটের সাথে আপনার কতদিনের চেনা? কোন আত্মীয়তা—
ম্যাককুইন: না না, আমি আত্মীয়টাত্মীয় নই, আমি ওনার সচিব হিসাবেই কাজ করতাম।
পোয়ারো: কদ্দিন আছেন?
ম্যাককুইন: এই বছর খানেক।
পোয়ারো: একটু খুলে বলুন।
ম্যাককুইন: বছরখানেক আগে ওনার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় পারস্যে।
পোয়ারো: পারস্যে? এর আগে আপনি ওখানে তখন কী ধরনের কাজ করতেন?
ম্যাককুইন: ওই সময় পারস্যে একটা তেল কোম্পানির কাজে আমি আর আমার একজন বন্ধু গিয়েছিলাম। যাই হোক, একটা সমস্যার কারণে আমাকে সে কাজ ছেড়ে দিতে হয়। আমি যে হোটেলে থাকতাম মিস্টার রাশেট ঘটনাচক্রে সেখানেই উঠেছিলেন। আমি তখন বেকার, উনি আমাকে অফার করলেন। আমারও একটা ভদ্রসভ্য কাজের প্রয়োজন ছিল, নিয়ে নিলাম।
পোয়ারো: তখন থেকেই—
ম্যাককুইন: হ্যাঁ, তখন থেকেই। মিস্টার রাশেটের খুব দেশ ভ্রমণের শখ, কিন্তু ইংরেজি ছাড়া আর কোনো ভাষাই জানতেন না। আমি ওনার দোভাষীর কাজ করতাম। সত্যি বলতে কী, আমি যতটা না সচিব ছিলাম, তার থেকে দোভাষীর কাজই বেশি করতে হতো। কাজটা অবশ্য আমি বেশ উপভোগই করতাম।
পোয়ারো: মানুষ হিসেবে উনি কেমন ছিলেন?
ম্যাককুইন: (একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে) মানুষ হিসেবে? বলা শক্ত।
পোয়ারো: ওনার পুরো নাম?
ম্যাককুইন: স্যামুয়েল এডওয়ার্ড রাশেট।
পোয়ারো: আমেরিকান সিটিজেন?
ম্যাককুইন: হ্যাঁ।
পোয়ারো: আমেরিকার কোন দিকের?
ম্যাককুইন: সঠিক জানি না।
পোয়ারো: ঠিক আছে, আর কী জানেন—ওনার সম্পর্কে?
ম্যাককুইন: উনি খুব ইন্ট্রোভার্ট টাইপ, নিজের কথা প্রায় কিছুই বলতেন না।
পোয়ারো: এমনটা কেন ছিলেন, সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা?
ম্যাককুইন: সঠিক কারণটা জানি না, তবে অনেকেরই অতীত গৌরবোজ্জ্বল হয় না, হয়তো তাই।
পোয়ারো: আপনার কি মনে হয় এটাই একমাত্র কারণ?
ম্যাককুইন: আমার ধারণা বললাম, সত্যি আমি জানি না; ব্যক্তিগত কথাবার্তা এত কম হতো—
পোয়ারো: ওনার কোনো আত্মীয় পরিজন—
ম্যাককুইন: না, তেমন কারুর কথা কখনো ওনাকে বলতে শুনিনি।
পোয়ারো: আচ্ছা ঠিক আছে, এই যে উনি খুন হলেন, আপনার কী মতামত? আমি বলতে চাচ্ছি আপনি এই ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন?
ম্যাককুইন: দেখুন, আমার মনে হয় রাশেট ওনার প্রকৃত নাম নয়। উনি হয়তো আমেরিকা ছেড়েছিলেন কোন অতীতের কোন পাপের হাত থেকে রেহাই পেতে। সপ্তাহকয়েক আগে পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলছিল, তারপর—
পোয়ারো: তারপর কী হল?
ম্যাককুইন: উনি হুমকি চিঠি পেতে শুরু করেন।
পোয়ারো: হুমকি চিঠি? তেমন কোন চিঠি আপনি দেখেছিলেন?
ম্যাককুইন: হ্যাঁ, ওনার চিঠিপত্রের ব্যাপার দেখাটাও আমার কাজের মধ্যেই পড়ত। প্রথম চিঠি আসে এই ধরুন দিন পনেরো আগে।
পোয়ারো: চিঠিগুলো আছে না নষ্ট করে ফেলা হয়েছে?
ম্যাককুইন: দাঁড়ান, দেখছি। আমার ফাইলে দু-একটা পেলেও পেতে পারি, একটা অবশ্য উনি আমার সামনেই রাগে কুচিকুচি করে ছিড়ে ফেলেছিলেন। আমি কি ওগুলো নিয়ে আসব?
পোয়ারো: অবশ্যই।
ম্যাককুইন ডাইনিং কোচ ছেড়ে বের হলেন, মিনিট খানেক পরেই খান দুয়েক চিঠি এনে টেবিলে রাখলেন।

পোয়ারো: (ধীরে ধীরে পড়তে লাগলেন) ‘দু নৌকায় পা দিয়ে চললে ফল ভালো হয় না; রাশেট তুমি ধরা পড়ে গেছ। ধরে তোমায় আমরা ফেলবই。’ না—যথারীতি কোন সই দেখছি না। হ্যাঁ আর একটা, এটায় ‘রাশেট তোমার সাথে খুব শীঘ্রই মোলাকাত হচ্ছে, তৈরী থেকো, এটাই শেষ সম্ভবতঃ’। না এটাতে কোন সই নেই। না—এগুলো যেমন হয়ে থাকে, গতানুগতিক কোন বৈচিত্র্য নেই। (ম্যাককুইনের দিকে তাকিয়ে) আর দেখুন, হাতের লেখার ছাঁদ দেখেও চিঠির লেখককে চেনার উপায় নেই। কত কসরৎ না করেছে। একই চিঠিতে দু-তিন জনের লেখা শব্দ, মধ্যে আবার কিছু কিছু খবরের কাগজ থেকে কেটে বসানো শব্দ, পারে ও বটে! সে যাগে—আপনি কি জানেন মিস্টার রাশেট এই হুমকি চিঠির জন্য প্রাণ বাঁচাতে আমারও সাহায্য চেয়েছিলেন?
ম্যাককুইন: (প্রচণ্ড অবাক হয়ে) আপনার?
পোয়ারো: বোঝাই যাচ্ছে আমার সাহায্য চাওয়ার ব্যাপারটি আপনার সাথে ওনার কোনো কথা হয়নি। যাই হোক, হয়তো খুবই ভয় পেয়েছিলেন—আচ্ছা, একটা কথা—প্রথম যখন উনি এই ধরনের চিঠি পান, ওনার রিঅ্যাকশন কী ছিল?
ম্যাককুইন: (একটু ইতস্তত করে) বলা মুশকিল। প্রথম চিঠিটা পেয়ে তো হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু আমার মনে হয়েছে ভিতরে ভিতরে ভয় খানিকটা উনি পেয়েছিলেন, মুখে না বললেও, হাবেভাবে সেটা প্রকাশ পেত।
পোয়ারো: হুঁ। (মাথা নেড়ে) একটা প্রশ্ন সরাসরি উত্তর চাইছি। মনিব হিসাবে মিস্টার রাশেটকে কি আপনি শ্রদ্ধা করতেন?
ম্যাককুইন: (একটু থমকে গিয়ে) না, করতাম না।
পোয়ারো: কারণটা জানতে পারি কী?
ম্যাককুইন: আপাতদৃষ্টিতে তেমন কোন কারণই নেই। উনি আমার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহারও করতেন না। কিন্তু আমি ভেতর থেকে ওনাকে কখনো পছন্দ করতে পারিনি। ঠিক বোঝাতে পারব না হয়তো—আমার সব সময়ই ওনাকে কেমন জানি ভয়ংকর নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক বলেই মনে হতো। আবারো বলছি এটা আমার ধারণা, আমার সাথে কিন্তু উনি কখনোই দুর্ব্যবহার করেননি।
পোয়ারো: আর একটা প্রশ্ন, এটাই সম্ভবত শেষ, আপনি শেষ কখন ওনাকে জীবিত অবস্থায় দেখেন?
ম্যাককুইন: গতকাল রাত্রে, এই ধরুন দশটা। একটা চিঠিপত্রের ব্যাপার ছিল।
পোয়ারো: কী ব্যাপারে?
ম্যাককুইন: উনি পারস্যে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিসপত্র কিনেছিলেন। ডেলিভারি পাওয়ার পর দেখলেন তার মধ্যে দু-একটা জিনিস বদলে গেছে—সেই সংক্রান্ত।
পোয়ারো: ওটাই আপনার শেষবারের মতো মিস্টার রাশেটকে জীবিত অবস্থায় দেখা—তাই তো?
ম্যাককুইন: যতদূর মনে করতে পারছি, সেটাই।
পোয়ারো: মি. রাশেট শেষ হুমকি চিঠিটা কবে পেয়েছিলেন?
ম্যাককুইন: যেদিন আমরা ইস্তাম্বুল ছাড়ি, সেই দিন সকালে।
পোয়ারো: আর একটি প্রশ্ন। (সন্দেহে চোখ ছোট করে) আপনার সাথে আপনার মনিবের সম্পর্ক কেমন ছিল?
ম্যাককুইন: জানি, ডিটেকটিভদের ‘আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার’ প্রথম ধাপই হল প্রাইভেট সেক্রেটারিকে সন্দেহ করা, সুতরাং এমন প্রশ্ন যে আমাকে শুনতে হবে, সেটা জানি। আপনার প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে রাখি, এখান থেকে কিছু বেরোবে না। ওনার সাথে আমার সম্পর্ক বরাবরই ভালো ছিল।
পোয়ারো: হুঁ। আপনার পুরো নাম ও ঠিকানা?
ম্যাককুইন: হেকটর ইউলিয়ার্ড ম্যাককুইন, নিউ ইয়র্ক।
পোয়ারো: (একটু ঝুঁকে) আপনার কাছে একটা অনুরোধ ছিল। এই মিস্টার রাশেটের হত্যা, সেই সম্পর্কে আপনার সাথে আলোচনা—এই ব্যাপারটা যদি আপনি বাকি যাত্রীদের কাছে আপাতত একটু গোপন রাখেন, তাহলে তদন্তের স্বার্থে সেটা ভালো হয়।
ম্যাককুইন: কিন্তু তার চাকর মাস্টারম্যান, সে তো জেনে যাবেই।
পোয়ারো: মাস্টারম্যান সম্ভবত জানে, তাকেও যদি তদন্তের স্বার্থে বাকি যাত্রীদের কাছে এটা গোপন রাখতে বলেন, তো ভালো হয়।
ম্যাককুইন: সেটা খুব একটা কঠিন হবে না। মাস্টারম্যান একে মুখচোরা, তায় ব্রিটিশ, কারোর কাছে মুখই খোলে না।
পোয়ারো: অনেক ধন্যবাদ সহযোগিতার জন্য।
ম্যাককুইন ডাইনিং কোচ ছেড়ে চলে গেলেন।
বুঁ : আপনার কী মনে হয়, এই আমেরিকান ছোকরা কোনভাবে যুক্ত থাকতে পারেন?
এরকুল : এখনই কিছুই বলার মতো অবস্থা আসেনি। এই ছোকরা সোজাসাপটা, কথাবার্তায় সততার ছাপ আছে। মালিককে যে অশ্রদ্ধা করত সেটাও সোজাসুজিই জানিয়ে দিতে পিছপা হয় না। আমাকে যে মিস্টার রাশেট নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন সেটা সত্যি সত্যি হয়তো ওর সাথে আলোচনা করেনি। রাশেটের মতো লোকেরা রহস্যময়ই হয়, এই ধরনের কাজ নিজের হাতেই রাখে, কারুর সাথে সাধারণত আলোচনা করে না।

বুঁ : তাহলে আপনার মতে এককে বাদ দেওয়া যায়, একজন অন্তত সন্দেহভাজন কমল।
পোয়ারো: আরে না না, এত সহজে কি আর হয়। সন্দেহ করাটাই আমার কাজ। যতক্ষণ না সমাধান হচ্ছে, কেউই সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। একটা কথা বলতে পারি, আবেগের বশে কাউকে খুন করার জন্য এলোপাথাড়ি ছুরি চালানোটা ম্যাককুইনের মতো ঠান্ডা মাথার ছেলের সাথে ঠিক যায় না।
বুঁ : (একটু চিন্তা করে) এ ব্যাপারে আমি আপনার সাথে একমত। হঠকারী কাজ করার বান্দা এই ছোকরা নয়। বলছি না, এমন হঠকারী কাজ যায় আসলে ল্যাটিন টেম্পারামেন্টের সাথে যায় অথবা আমাদের সেফ যেমনটা বলেছেন, কোন প্রতিহিংসাপরায়ণ মহিলাও থাকতে পারে এর পিছনে।
ক্রমশঃ
মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব- ৫


