স্প্যানিশ থেকে বাংলা

Dynamic blue abstract painting with expressive brushstrokes in acrylic on canvas.

এক সকালে লোকটা ফোন করেছিল। যে করেছিল সে বলল যে বিরাট এক বিপদে আছে। স্বাভাবিকভাবেই আমি প্রথমেই প্রশ্ন করলাম- “কে বলছেন? উত্তরে শুনলাম যে “আমাদের কখনও দেখা হয়নি এবং কখনও দেখা হবেও না”। এরকম সময়ে কী করা যায়? অতএব বলতে হল যে নির্ঘাত ওঁর নম্বর ভুল হয়েছে। বলেই ফোন রেখে দিলাম। কয়েক সেকেন্ড পরে ফোনটা ফের বেজে উঠল। আমি বেশ জোর দিয়েই বললাম যে উনি যেন ঠিক নম্বর দেখে ডায়াল করেন। এটা অবধি বলে ফেললাম এটা রসিকতা করার সময় নয়, উনি যেন আর ফোন করে বিরক্ত না করেন।
তখন বেশ উদ্বিগ্ন গলায় ভদ্রলোক বললেন আমি যেন ফোন না ছাড়ি। আর উনি কোনো ইয়ার্কি করবার চেষ্টাও করছেন না। উনি কোনো ভুল নম্বরও লিখে রাখেন নি। যদিও এটা নিশ্চিত যে আমরা কেউ কারোকে চিনি না। আমার নম্বর উনি টেলিফোন ডিরেক্টরি থেকে হঠাত পেয়েছেন। যাতে নতুন করে কোনোরকম বাধা ওঁকে না দিই সেইজন্য তড়িঘড়ি করে বললেন যে সমস্ত কিছু ঘটছে ওঁর মুখের জন্য। কেননা ওঁর মুখে এমন কিছু একটা উস্কানিমূলক ব্যাপার আছে যে লোকজন দেখলেই হতাশ হয়ে পড়ে। মনে করে কিছু একটা খারাপ ব্যাপার ঘটবেই। স্বীকার করছি ব্যাপারটা শুনে আমার আগ্রহ হল। একই সঙ্গে ওঁকে বললামও যে এত ভেঙে পড়ার কিছু নেই। এ জীবনে সমস্ত কিছুর উপায় আছে।
-না- বললেন- এ এমন এক মন্দ ব্যাপার যা থেকে বেরোবার কোনো পথ নেই। মানুষ আমার জীবন থেকে ছেড়ে গিয়েছে, এমনকী আমার নিজের বাবা মা বহুদিন হল আমায় ত্যাগ করেছেন। মানুষ জাতির মধ্যে সবচেয়ে ন্যুনতম সংখ্যক মানুষ নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে যাচ্ছি, বলা যেতে পারে চাকর নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছি… নিজেকে একলা বাড়ির ভেতর গুটিয়ে নিয়েছি। বাড়ি থেকে প্রায় বেরই হই না ইদানীং। ফোনই হল একমাত্র সান্ত্বনা। কিন্তু মানুষের কল্পনা শক্তি এত কম… সবাই, ব্যতিক্রম ছাড়া একেবারে সক্কলে আমাকে পাগল ঠাওরায়। কেউ কেউ গালাগাল দিতে দিতে ফোন রেখে দেয়। আবার কেউ কথা বলাই বন্ধ করে দেয়। আর আমার পুরষ্কার জোটে জোর গলায় অট্টহাসির শব্দ। এমনকী কাছাকাছি যারা থাকে তাদেরও এরা ডেকে নেয় যারা এই দুঃখী পাগলার ফোন নিয়ে মজা করতে পারে। এমনি করে একজনের পর একজন হারাতে হারাতে আমি সবাইকে হারিয়ে ফেলছি চিরকালের মত।
শুনতে শুনতে আমার মনটা কেমন যেন করতে লাগল। সেইসঙ্গে এটাও মনে হল যে লোকে আমাকে এই পাগলের সঙ্গে দেখতে পাচ্ছে। গলার স্বরে এতটা মরীয়া ভাব, এতখানি কষ্ট মাখানো ছিল যে ওই অট্টহাসিগুলোতে কান দিলাম না। চেঁচিয়ে ফোন রেখেও দিলাম না। নতুন এক সন্দেহ মনে পাক খেয়ে গেল। আচ্ছা, এটা কোনো ফাজিলের ফোন না তো? কিংবা কোনো বন্ধুর ফোন নয় তো যে আমার কল্পনয়াশক্তি চাগাতে চাইছে এরকম ফোন করে? (আমি একজন উপন্যাস লিখিয়ে)। যেহেতু আমার মুখে কোনো আগল নেই শেষ পর্যন্ত রিসিভারটা পাশে রেখে দিলাম।
…উমম- নিজেকে দার্শনিকভাবে বললাম- আমি তো মাথা থেকে এমন আইডিয়া বের করতে পারিনি, আপনারা যদি আমার উপর ভরসা রাখতে না পারেন ওটা সুবিচারই হবে। তবুও যদিই বা আমায় ভরসা করেন, আর আপনাদের করুণায় এ পরিস্থিতি যদি থেকেই যায়, আর নিজেকে তেতো সত্যিটা বুঝিয়ে ফেলতে পারি যে ভদ্রলোককে বিশ্বাস করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না… সেক্ষেত্রে আরো নানা অছিলায় নতুন নতুন বাধা দেখিয়ে সময় নষ্ট না করে বলে উঠলাম-
এখন আমি আপনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছি। আপনিই বলুন। এখন কী হবে? – ভয়ে বিড়বিড় করল লোকটা- অট্টহাসি? কিংবা একটা চিৎকার?
না না – তড়িঘড়ি উত্তর দিলাম- আপনাকে এমন আহত অবস্থায় ফেলে যাব না। আপনি আমার মধ্যে কৌতূহল জাগিয়ে তুলেছেন। ঠিক আছে আমায় আপনি ফোন করতে পারেন। হ্যাঁ হ্যাঁ- আরো জুড়ে দিলাম- সপ্তাহে কেবল দুবার আপনার সঙ্গে কথা বলব। আমার প্রচুর কাজ থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার মুখটা অবশ্য, হ্যাঁ, আমার মুখ সবাই দেখতে চায়, প্রায় সবাই আর কী। আসলে আমি একজন লেখক। আর আপনি তো বোঝেন এর অর্থ কী।
দোহাই- কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বললেন- আমি ভয় পাচ্ছি বিষয়ের অভাবে আমাদের মধ্যে যেন কথা থেমে না যায়। আমাদের দুজনের ভেতর কিছুই যেহেতু সাধারণ বিষয় নেই, অথবা সাধারণ কোনো বন্ধু নেই, নির্ভর করবার মতন পরিস্থিতিও দুজনের এক নয়, আর তাছাড়া আপনি কোনো মহিলাও নন (লোকে জানে যে মহিলারা টেলিফোনে প্রেমিক পেতে পছন্দ করেন), আমার তো মনে হয় কথা শুরু করবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হব।
আমিও এমনটাই ভেবেছি- ওঁকে উত্তর দিলাম- এটা বিপজ্জনক যে দুজন মানুষের মধ্যে যোগাযোগ চলবে অথচ কেউ কারো মুখ দেখতে পারবে না … আচ্ছা- উনি ফিসফিস করে বললেন- একবার প্রমাণ করে ফেলবার পরে কিছু আর হারায় না, বলুন?
কিন্তু আপনি- বাধা দিয়ে বললাম- আমরা যদি ব্যর্থ হই, আপনার তো খুব খারাপ লাগবে। বুঝতে পারছেন তো অসুখের চেয়ে ওষুধ আরো বেশি খারাপ?
ভদ্রলোকের এই সন্ত সুলভ পরিকল্পনা শুনে নিজেকে বিরত রাখতে পারা সম্ভব হচ্ছিল না। ওঁর মাথায়ও একই ভাবনা এলো। প্রস্তাব দিলেন পরস্পরের উপর প্রভাব পড়ে কীরকম সেটা আমরা নানা দিক দিয়ে নীরিক্ষা করে দেখব। শুরুতেই এমন প্রস্তাব শুনলে অবধারিত ভাবেই আমার বিরক্ত লাগার কথা। আগ্রহ একেবারে চলে যাবার উপক্রম হচ্ছিল। উদাহরণ হিসাবে বলি- ধরুন উনি বললেন কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে এট নি্দিষ্ট চলচ্চিত্র দু একসাথে দেখবেন… সেক্ষেত্রে কী হবে! সিনেমা হলে অসংখ্য লোক যারা দাঁড়িয়ে থাকবে তাদের মাঝখানে ওই মুখটা, ওই ভয় ধরাবার মত, উস্কানি দেবার মত মুখটা দেখতে পারব এমনটাই আন্দাজ করবার আশা করছিলাম। একেক সময় তো আমার কল্পনা এত জোরদার হল যে কল্পনা করছিলাম হল থেকে বের হবার সমস্ত দরজা পুলিশ আটকে রেখেছে। তারা খুঁযে দেখছে এমন কোনো লোক ওই সিনেমা হলে রয়েছে কী না যার মুখ এমন ধরনের উস্কানিমূলক আর ভয়ার্ত। কিন্তু এটা কী সাধারণ একজন কনস্টেবলের জন্য নির্ভুল কোনো ক্লু হতে পারে? হলে কোনো মায়াবী তরুণও তো থাকতে পারে যে কীনা জঘন্য হত্যাকারী এবং তারও একই রকম মুখটা এমন উস্কানিমূলক আর ভয়ংকর। ভাবতে ভাবতে শান্ত হয়ে গেলাম। আলাপচারিতায় ফিরে এলে ওঁকে এসব বৈপ্লবিক কথাবার্তা বলতে লাগলাম। কাঁদো কাঁদো গলায় মিনতি করতে লাগলেন যেন খেলাচ্ছলেও ওঁর মুখ দেখবার চেষ্টা না করি। যদি ওঁর মুখ দেখি তাহলে নিশ্চিতভাবে ওই “জঘন্য” মুখটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়বার আর কখনও দেখতে চাইব না। কারণ উনি জানেন যে সেটা দেখামাত্র নিশ্চল হয়ে পড়ব, হয়ত ওঁর সঙ্গে আর দেখা করতে নাও পারি। যদি ওঁকে অসহায় মানুষ বলে সামান্যও মনে করি তাহলে ওঁর মুখকে যেন একটুও গুরুত্ব না দিই। বিচলিত হয়ে অনুমতি চাইলেন ভবিষ্যতেও যেন কোনোভাবেই আমরা মুখোমুখি না হই।
ইয়ে- ওঁকে উত্তর দিলাম- ঠিক আছে তাই হবে। এমন যদি চান তাহলে তাই হবে। কখনই একসঙ্গে দেখা করব না। তবে সেক্ষেত্রে শর্ত থাকবে …
শর্ত থাকবে… – বিড়বিড় করে বললেন উনি- আপনি আমার উপর শর্ত দিচ্ছেন আমি তো চাপে পড়ে যাব। বুঝতেই পারছি এর ফল আমার উপর কিভাবে পড়তে চলেছে। সেক্ষেত্রে আপনি কী শর্ত দেবেন? যে কোনো পরিস্থিতিই কল্পনা করুন না কেন সব সময়ই আমায় তা ভয় পাওয়াবে।
অনুনয় করে বললাম- কিছু সিদ্ধান্তে আসার আগে ভেবে নিন। তাছাড়া- আরো যোগ করলাম- স্রেফ ফোনের তার বেয়েই আমরা এত নিশ্চিত হয়ে কথা বলছি… আপনার ফোন শয়তানের দোরে যাক!- প্রায় চিৎকার করে উঠলাম- আপনার সঙ্গে দেখা করবার একান্ত প্রয়োজন আমার।
না , দয়া করুন!- আমাকে মাফ করবেন, ইয়ে মনে হচ্ছিল আমার মাথা ঘুরে প্রায় অজ্ঞান হবার দশা
না, না না আমি একথা বলতে চাই না যে আপনার মুখ আমায় দেখতেই হবে! কখনই আমি তা দেখবার সাহসও করছি না। জানি আপনার আমাকে প্রয়োজন। যদিও আপনার মুখ দেখবার ইচ্ছেয় মরে যাচ্ছি আমি তবুও আপনার নিজের নিরাপত্তার জন্যই সে ইচ্ছে ত্যাগ করব। শান্তিতে বাঁচুন। … মুখ দেখবার বাসনা যদিও রয়েছে তবুও যদি চান সে বাসনা ছাড়তে পারি।
বুঝতে পারছি… হারামী মুখ কোথাকার! লুকিয়ে রাখলেও আমার খারাপ অতীত খুঁড়ে আনবেই ও! ওহ! আন্দাজ ক্রতে পারছি ওটা দেখবার জন্য আপনি কত মরীয়াই না হচ্ছেন!
একটা দীর্ঘ নীরবতা চলল। কথা বলতে বড্ড ইচ্ছে করছিল। শেষমেশ উনিই নীরবতা ভাঙলেন। – এখন আপনি কী করবেন?
যতদিন পারি নিজেকে সামলাব। মানুষ যতখানি পারে নিয়ন্ত্রণ করতে ততদিন…
হ্যাঁ যতদিন আপনার কৌতূহলের বাঁধ আপনি বশে রাখতে পারবেন- বাঁকা গলায় থামিয়ে বললেন তিনি। – আপনার করুণার চেয়ে আপনার কৌতূহলের ক্ষমতা ঢের বেশি।
দুটোর কোনটাই নয়- প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাম- দুটো জিনিষের একটাও নয়! …আপনার প্রতি কোনো ”বিশেষ” করুণা থেকে সেরকমটা ভাবছি না। আপনার প্রতি সহমর্মিতা হচ্ছে। – তিক্ত গলায় যোগ করলাম- দেখুন, আমিও ঠিক আপনার মতই হতভাগ্য একজন মানুষ।
ঠিক তখনই বিচক্ষণ মানুষের মত উত্তেজনা প্রশমনের জন্য রসিকতা করে উঠলেন। কিন্তু তাঁর ফলে আমার মধ্যে উল্টো হতাশা আরো চেপে বসল। নিজেকে বললাম আমাকে “বদ্ধ জগতের চৌখুপি থেকে বের করার জন্য” ওঁর মুখের ওই নির্দিষ্ট ক্ষমতা যদি থেকেই থাকে, তবে ওঁকেই এই আলাপচারিতা শেষ করতে হবে। এর পরে ওঁকে অন্য কোনো মানুষ খুঁজে বের করতে হবে যার মধ্যে ওঁর মুখ দেখবার এই অসুখ না থাকে। তারপর কাকুতিমিনতি করে বললাম- এমনটা করলে মরে যাব। এখনকার মতই আমাদের কথাবার্তা হতে থাকবে। ওই বিষয়টা… মানে আমি যে আপনার মুখ দেখতে চেয়েছি দয়া করে সেকথা ভুলে যান।
আমি কিছু করতে পারব না- উনি উত্তর দিলেন- আপনার তরফ থেকে ব্যর্থতা এলে সেটাই শেষ দিন হবে।
তাহলে আমাকে অন্তত আপনার কাছে যেতে দিন- অনুরোধ করলাম- ধরুন আমিই আপনাকে প্রস্তাব দিচ্ছি আমার বাড়ি আসুন…
আপনি এখন রসিকতা করছেন। এখন আপনার পালা রগড় করবার। ওরকম কেন হবে? এটা একটা মজা, তাই তো?
শুনুন, আপনি আমার বাড়ি আসুন। অথবা আমি আপনার বাড়ি যাই। আমরা অন্ধকার জায়গায় দুজনে মুখোমুখি বসে কথা বলি।
দুনিয়ার কোনো কিছুর বিনিময়েই এমন হবে না! আপনি টেলিফোনে কথা বলতে গিয়েই এতখানি মরীয়া, আমার মুখের দু আঙুল দূরে থাকলে না জানি কী করবেন।
কিন্তু আমি ওঁকে রাজি করালাম। আমাকে আর নাকচ করতে পারলেন না, যেমন করে আমি নিজেকে নাকচ করতে পারি না। আমাদের “সাক্ষাৎ” হল ওঁর বাড়িতে। আমি চেষ্টা করলাম যাতে ওঁর খারাপ অতীত নিয়ে খেলা না করি। যখন বাড়িতে গেলাম একজন চাকর এসে আমাকে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল।
আসুন, স্যার আপনাকে আসতে বলেছেন- বলল।
না। আমার সঙ্গে কোনো দেশলাই বা টর্চ কিছুই ছিল না। এতটা জোর করে কারো বিরুদ্ধে কিছু করিও নি কোনদিন। কিন্তু ওঁর মনে এতটা ভয় ছিল আমায় হারিয়ে ফেলবার যে ওঁকে বিচার করে দেখবার মত বাজে কাজ আমিও করিনি। কাজের লোকটাকে একবার মাত্র নিশ্চিত করলাম যে সঙ্গে আলো জাতীয় কিছুই রাখিনি আমি। সে আমার হাত ধরে একটা কৌচে বসিয়ে দিয়েছিল। ঘন অন্ধকার ছিল। একটু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল বটে, তবে যাই হোক ক্রমে তা সয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ফোনের তারে নয় আমি ওঁর গলা সরাসরি শুনতে পেতে চলেছি। সবচেয়ে আবেগপ্রবণ লাগছিল যখন ভাবছিলাম যে শেষ পর্যন্ত হাতের দু আঙুলের দূরত্বে ওঁর সঙ্গে কথা হতে চলেছে। উনি উল্টো দিকের একটা কৌচে বসেছিলেন। আমি উঠে যাইনি ওঁর কাছে। ওঁকে “দেখবার” ইচ্ছেটাকে পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। বিষয়টা ছিল আমি ছিলাম, উনিও ছিলেন, কৌচে বসেই ছিলেন। নাকী ঘরে ঢুকতে তখনো ওঁর দেরী হচ্ছিল? তবে কি অনুতপ্ত হতে আরম্ভ করেছিলেন আর তাই শুধু কাজের লোক দিয়ে আমায় সেকথা বলতে পাঠালেন? আমার যন্ত্রণা হতে শুরু করছিল। কথা বলতে শুরু করলাম-
আপনি কী আছেন?
আপনার অনেক আগে থেকেই আছি- ওঁর গলা পেলাম। মনে হল আমার কৌচ থেকে সামান্য দূরেই আছেন- কিছুক্ষণ ধরে আপনাকেই দেখে যাচ্ছি…
আমিও আপনাকে ইয়ে “দেখছি”। এর চেয়ে বেশী সৌভাগ্য আর কিসে হবে?
ধন্যবাদ- কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলেন- এখন আমি জানি আপনি আমায় বুঝেছেন। এখন আর আমাকে অবিশ্বাস করেন না।
হ্যাঁ সেরকমই। – ওঁকে বললাম। ওঁর মুখের এই ঘন কালো সংকুচিত মুখটাই পছন্দ করি। মনে হয় আমরা এখন এই বিন্দুতে পৌঁছেছি যেখানে আপনি আপনার মুখ সম্পর্কে সব ব্যাখ্যা বলবেন।
হ্যাঁ নিশ্চয়! – নিজের আসনটা মনে হয় একটু সরিয়ে বসলেন।
আমার মুখের ইতিহাসের দুটো পর্ব রয়েছে। প্রথমটা হল আমি যখন ওর সহযোগী। যখন শত্রু হবে তখন ওটা আরো রক্তাক্ত হয়ে উঠব। প্রথম পর্বে আমরা এত নৃশংস কাজ করেছি সেটার তুলনা করা যাবে গোটা একটা গোটা মিলিটারি বাহিনীর সঙ্গে। ওর জন্য আমি হৃৎপিণ্ডে ছুরি বসিয়েছি, পাকস্থলীতে বিষ ভরেছি, অসম যুদ্ধে মারতে চেয়ে অনেক দূর দেশেও চলে গেছে কেউ কেউ। আর বাকীরা বিছানা নিয়েছে যতক্ষণ না মৃত্যু এসে তাদের কাছে দাঁড়ায়। এর বৈশিষ্ট্য আমায় বজায় রাখতে হবে। মুখের কারণে সমস্ত অসুখ শেষ হয়। এমন কেন হয় যে একটা মুখের জন্য সবাই ভয়ে সরে যায়, আবার একই সঙ্গে সে মুখ তাদের শেষ সৌভাগ্যের বস্তু হয়ে দাঁড়ায়?
অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন উনি। যেন উত্তর পাবার নিরর্থক একটা চেষ্টা করছেন। শেষ অবধি নিজের গল্পটা আবার শুরু করলেন।
এই রক্তাক্ত খেলাটা (প্রথমে আবেগহীন ভাবে) বদলে যাচ্ছিল। একটু একটু করে। আমার আমিত্বের ওপর ভয়ানক এক ভয়ানক অত্যাচার। দ্রুত বুঝতে পারছিলাম আমি একা হয়ে যাব। জানতাম আমার মুখই আমার প্রায়শ্চিত্ত। আমার মনের বরফ গলে গিয়েছে। আমি মুক্তি পেতে চাইছি। কিন্তু বদলে ও আরো বেশি করে সংক্রামিত হচ্ছিল। ওর বরফ আরো বেশি করে জমাট বাঁধছিল। যতক্ষণ আমি প্রাণপণে নিজের মানবিক কোমলতা ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, আমার মুখ ওর অপরাধগুলো দ্বিগুণ বেগে বাড়িয়ে চলছিল। শেষ অবধি আপনি যেমন করে আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছেন ও আমাকে সেই অবস্থায় এনে ফেলেছে।
উনি উঠে দাঁড়ালেন। পায়চারী করতে শুরু করলেন। শান্ত হতে বলার চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারলাম না। উনি আমায় ওই ধ্বংসস্তূপে বসে কফি খাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেললেন। বাস্তবে বুঝলাম আমি এক কাপ কফি আদায় করে ফেলেছি। আবছা আলোয় বুঝলাম যে জল গরম করার পাত্রটাকে একটা গরম করার যন্ত্রে চাপিয়ে দিয়েছি। দপ দপ করে জ্বলা আলোটার দিকে তাকিয়ে আছি। স্রেফ প্রতিবর্ত ক্রিয়াতেই তাকিয়েছিলাম যদিও। তাছাড়া উনি এমনভাবে বসেছিলেন সামান্য সিল্যুয়েট ছাড়া আত্র কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমার চোখ কিন্তু বেড়ালের মতন… এমনটা বলে একটু ঠাট্টা করবার চেষ্টা করলাম। বদলে উনি জবাব দিলেন … বেড়ালও যদি কুকুরকে দেখতে না তাহলে চায় তাহলে তার দৃষ্টি ছুঁচোর মত হয়ে যায়… আমাকে ওঁর বাড়িতে নিয়ে যাবার তৃপ্তিতে উনি এত খুশি ছিলেন, মুখমন্ডলা ছাড়াও, উনি যে একজন মানুষ, আতিথেয়তা জানানোর সম্ভ্রম জানাতে পেরে এত খুশি যে আমার করা ঠাট্টাকে একটা ঠাট্টা দিয়েই জবাব দিলেন। বললেন কফি হতে যেহেতু একটু সময় লাগবে ততক্ষণ সময় কাটানোর জন্য আমি আমার নাগালের মধ্যেই রাখা লাল টেবিলটায় যেখানে হ্যাম রাখা আছে প্লেটে, ওখানে রাখা পত্রপত্রিকাগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে পারি…
সেটার ফলাফল এক বিরাট শূন্য হয়ে দাঁড়াল। বাস্তবে এসব কিছু হতই না যদি আমরা পরস্পরের মুখ দেখবার উপর নিষেধাজ্ঞা না চাপাতাম। কী গুরুত্ব ছিল এতে? সবকিছুর পরেও এটা তো সামান্য এক শারীরিক দুর্ঘটনা বই কিছু নয়? তাছাড়া যদি ওঁর মুখ দেখতেও পারতাম, তবে হয়ত নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম।আর সেই অনুষঙ্গে ওঁকেও হয়ত হারিয়ে ফেলতাম। এই দেখাটা আমার মনে কতখানি ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারল? কিছুই না।
আমাদের পরবর্তী সাক্ষাতে এসব কারণ বললাম। বললাম যে আমি আন্দাজ করতে পারিনি যে শেষ অবধি উনি ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেবেন। তবে যেটা আমায় আশ্চর্য করল না তা হল ওঁর কথা। উনি বললেন-
আপনি সবকটা সম্ভাবনার কথা ভেবেছেন। কিন্তু ভুলে গেছেন একমাত্র যেটা বাতিল হতে পারে সেটার কথা।
কীরকম!- চেঁচিয়ে উঠলাম- এখনও কোনো সম্ভাবনা রয়েছে নাকী?
নিশ্চয়ই রয়েছে। আমি তো নিশ্চিত নই যে যদি আমার মুখ আপনি আক্রমণ করেন তাহলে ওটা বাঁচাতে মন সায় দেবে কী না।
নিজেকে সেই জাহাজটার মত মনে হচ্ছিল যে কীনা তাকিয়ে তাকিয়ে অন্য জাহাজকে চলে যেতে দেখে। কৌচে আরো সেঁধিয়ে গেলাম। আরো আরো গভীরে। সেই ভয়ংকর সম্ভাবনার থকথকে কাদার ভেতরে আরো তলিয়ে যেতে লাগলাম। বলে উঠলাম-
তাহলে, আপনার মন… সেটি বিশুদ্ধ করেননি?
হ্যাঁ সেটা খাঁটি বটে। তাতে এতটুকু সন্দেহ নেই। মুখ যদি দেখা যায় জানি না মনটা সেটার বিপরীতে থাকবে না পক্ষে থাকবে।
আপনি বলতে চাইছেন- আমি জোর গলায় বলতে চাইলাম- আপনার মন নির্ভর করে আপনার মুখের উপর?
তাই যদি না হবে- ফিসফিস করে উত্তর দিলেন- তাহলে আমরা এই অন্ধকারে এভাবে বসে থাকতাম না। ঝলমলে সূর্যের আলোর নিচে মুখোমুখি বসতাম।
কোনো উত্তর দিলাম না। একটা শব্দও আর যোগ করা বাহুল্য মনে হচ্ছিল। তার বদলে ভেতরে ভেতরে ওঁর সেই মুখের মুখোশ পরা চেহারাটার দিকে তাকালাম। এতক্ষণে আমি জানি কীভাবে ওটাকে হারানো যায়। ওটা আমায় আত্মহত্যার দিকেও নিয়ে যাবে না কিংবা আমি ওটার সঙ্গে লেগেও থাকব না। আমার পরের সাক্ষাতটি নিশ্চিতভাবেই হবে ওঁর পাশে বসে থেকে। ওঁর পাশে, কোনো ভাঙাচোরা জায়গা না থেকে, আলো ঝলমলে কোনো এক ঘরে দুজনে মুখোমুখি।
বলবার আর কিছুই তেমন বাকি নেই। কিছকাল পরে ওঁর বাড়িতে আবার গিয়েছিলাম। একবার আমার বসবার ঘরেও আমরা বসেছিলাম। চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছিলাম যাতে ওঁর মুখ আমাদের মন দুটোকে আলাদা করতে না পারে। সেইসঙ্গে এটাও যোগ করেছিলাম ধ্বংসস্তূপ যেহেতু বিশাল, আলোও তাই আরো বেশি বেশি করে জ্বালাতে হবে।

জন্ম ১৯১২ সালে কিউবার মাতান্সা প্রদেশে। কবি ঔপন্যাসিক গল্পকার ভির্খিলিও কিউবার সাহিত্যে এক বিশিষ্ট নাম। বিখ্যাত কবিতা La isla en peso (1943),শোকগ্রস্ত দ্বীপ। বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ   Cuentos Fríos (1956) বা শীতল গল্প থেকে উপরের গল্পটি নেয়া হয়েছে। অন্যান্য বিখ্যাত উপন্যাসের মধ্যে  La carne de René (1952) y la obra Electra Garrigó (1941).উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৯ সালে প্রয়াত হন।

জয়া চৌধুরী স্প্যানিশ ভাষার অনুবাদক, কবি ও লেখক। বাণিজ্যের স্নাতক। স্প্যানিশ শেখান সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয় ও রামকৃষ্ণ মিশনের স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজে।  প্রকাশিত বইয়ের কয়েকটি গাব্রিয়েলা মিস্ত্রালের নির্বাচিত রচনা (২০১৬, চিলে দূতাবাস), গুন্তেরের শীতকাল (খুয়ান মানুয়েল মার্কোসের উপন্যাস) এবং কার্লা ফাব্রির কবিতা ( ২০১৪ প্যারাগুয়ে দূতাবাস), নিকানোর পাররার কাব্যগ্রন্থ, লাতিন আমেরিকার গল্পগুচ্ছ, ম্যাজিক রিয়ালিজমের গল্প, মারিও ভার্গাস ইয়োসার ছটি গল্প ও একটি নাটক ইত্যাদি। নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয় স্প্যানিশ ও বাংলা ভাষায় ভারত, বাংলাদেশ, স্পেন, প্যারাগুয়ে, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশের পত্রিকা, ব্লগ ইত্যাদিতে। বাংলা আকাডেমী লীলা রায় পুরষ্কার সহ কয়েকটি পুরষ্কারে সম্মানিত।


3 thoughts on “স্প্যানিশ থেকে বাংলা”

  1. Albert Siraj Banerjee

    চারদিকে জলের এই অভিশপ্ত পরিস্থিতি / আমাকে কফির টেবিলে বসতে বাধ্য করে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top