যখন আমি হয়েছি, তখন আমি এতই ছোট যে— তখনকার কোনো কথাই আর মনে নেই। সে কী আদরের কথা! আমার বাবা-মার মনে আছে। কিন্তু আমার বাবা ও মা এখন আর নেই।
আমি হয়েছিলাম আমাদের নবদ্বীপের বাড়িতে একটি নিমগাছের তলায়— না না সেই নিমগাছতলায় বাড়ির অন্যরা একটা চালা বেঁধে দিয়েছিল আমাকে এ পৃথিবীতে আনার জন্য। সেই চালার তলায় থাকত আমার মা— কীভাবে বলছি আমি এইগুলো? এগুলো শুনেছি আমার মার কাছে, সেই মা-র কাছে যে মা ফরিদপুর রাজবাড়ী টাউনের মহাকালী বিদ্যালয়ে পড়ত, স্কুলে যেত ফিটন গাড়ি চেপে আমার দুধফর্সা গান গাইয়ে মা-টি। সেই মা যে মা ১২-১৩ বছরেই দুর্দান্ত গান গাইছে কিন্নরকণ্ঠীর গলায়… না না এগুলো তো আমি জানি না, বলেছে জ্যেঠামশাই বাবা দিদিমা মামা এরা সব। একটা মজার ব্যাপার হলো সামান্য চিন্তা করলেই কিন্তু প্রতিটি মানুষ তার জন্মের আগের অনেক বিষয়ের মধ্যে দিয়ে চলতে পারেন।… ওসব যাক গে হচ্ছিল আমার হওয়ার কথা, আমি তো হবো, রয়েছে আমার চেয়ে ৭/৮ বছরের বড় দাদা, খুব ফর্সা টিকালো নাক নম্রভাবী— দাদা হওয়ার এত বছর পরও মা’র পেট থেকে আমি হচ্ছিলাম না বলে পাড়ার লোকজনরা নাকি ফিসফিস করত— দ্যাখো দ্যাখো আমাদের পন্ডিত মশাইয়ের আর ছেলেপেলে হয় না, সাত আট বছর হতে চলল… জ্যেঠা বলতেন নাকি, না হোক গে আমার বাড়ির ছোট বউয়ের আর ছেলেপেলে, তাতে শ্রীরামপুরের মানুষজনের কী! মা দু:খ পেত তখন।
এই যে শ্রীরামপুর বলছি এই শ্রীরামপুর কিন্তু নবদ্বীপের শ্রীরামপুর অথচ নবদ্বীপে তো কোন শ্রীরামপুর নেই তাহলে এই শ্রীরামপুর প্রকৃত প্রস্তাবে বর্ধমান জেলায়। অথচ আজও বাসিন্দারা বলেন নবদ্বীপ ওই যে মালঞ্চ পাড়া ওখান থেকে সোজা এসে হাঁটতে হাঁটতে কালনা কাটোয়া রোডে পড়বেন ওই রাস্তার পাশেই উত্তর শ্রীরামপুর বর্ধমান জেলার মধ্যে পড়ছে অতএব আমার জন্ম বর্ধমান জেলায়। বহুবছর আগে যখন আমরা থাকতাম ওখানে তখন নবদ্বীপের বুড়ো শিবতলার সামনে দিয়ে সোজা এসে থমকে যেতে হতো, এখানে ছিল একটা দোয়া। দোয়া মানে বড়খাল বিশেষ। নদীরই অংশ ছিল একসময় সেই দোয়ার উপরে ছিল বেশ শক্তপোক্ত বাঁশের সেতু। আমাদের জায়গার লোকজনেরা তার ওপর দিয়ে চলাচল করতেন। বাবা জ্যাঠা মামারা সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে যেত। নড়বড় যে করতো না তা কিন্তু নয় আমি আমার প্রথম যৌবনেও তা দেখেছি এখন সেই দোয়া আর নেই। ওই যে আমি হলাম মার দ্বিতীয় সন্তান, বাবার নাম মণীন্দ্রনাথ তাই ‘ম’ দিয়েই নাম রাখা হলো মলয়। আর কোন নাম নেই আমার অথচ আমার দাদা মিন্টুর ভালো নাম মৃণালকান্তি তা হোক দাদা নয় আর একটা নাম নিক। আমার আজও অন্য কোন নাম নেই তবে একাধিক ছদ্মনামে এক সময় প্রচুর লিখেছি। একটা বিষয় বলে নিই, আমার কিন্তু দু’বছরের একটু বেশি মানে আড়াই বছরের স্মৃতি কিন্তু আজও টাটকা আছে, প্রচুর স্মৃতি সেইসব বয়সের আছে আমার, এইরকম সুদীর্ঘ স্মৃতির আধিকারিকদের অনেক কষ্ট হয়। আড়াই বছর বয়সে যখন আমার ছোট ভাই মৃন্ময় পৃথিবীতে এসেছে তখন আমি ধীরে ধীরে দৃষ্টিহীন হয়ে গেলাম। শ্রীরামপুরের বাসিন্দারা বাবাকে বলতেন, “কষ্ট পাবেন না আপনি মলয়ের দুই ভাই ওকে ঠিক চালিয়ে নিতে পারবে”। আমি অন্ধ হয়ে গেলাম।
ওই যে অন্ধ হয়ে গেলাম তার পথটি বেশ রোমাঞ্চকর। একটা ঘরে খাটের উপর বসে আছি কেমন আবছা দেখতে পাই, সেই সময় একদিন বাবা এসে বলল, মলয় তোর জন্যে নতুন জামা কিনে আনবো। পোড়ামাতলার ওখান থেকে, তুই কী রংয়ের জামা নিবি? আমি বললাম তাহলে হলুদ জামা এনো। বাবাকে আবছা দেখছিলাম তখন। আমার দাদা মিন্টু ওই ঘরের মেঝেতে একটা কাঠের খেলনাবাসে দড়ি বেঁধে চালাচ্ছে শব্দ হচ্ছে খড়খড় খড়খড়। এর পরের অংশটুকু মনে পড়ছে না। এক সময় আমার ছোট মাসিমা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিছু খাবি?” আমি যেন বুঝতে পারছিলাম আমাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত। আমাদের পাশের পাশের বাড়িতে থাকতেন তরণিবাবু। জ্যাঠা বাবা সবাই বলতেন তরণীবাবু। উনি ডাক্তার ছিলেন। এখন বড় হয়ে লিখছি, সম্ভবত এল এম এফ ছিলেন। তিনি একবার আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “কিরে, কেমন আছিস?” আমার বয়স তখন আড়াই হলেও বেশ বুঝতে পারছিলাম আমার যেন কিছু হয়েছে। এরপরেই যা মনে পড়ছে— বাবা ঘরের দরজায় এসেছে, বলছে, “এই দেখ তোর জামা এনেছি” মাখন রংয়ের। তখন কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি না বাবাকে কিন্তু যেন দেখতে পাচ্ছি বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে, বাবার হাতে একটা জামা হলুদ রঙের, বাবা সেটা আমার হাতে দিলো। যেন দেখতে পাচ্ছি আমি সেই জামাটা কোলের ওপর রেখে হাত বোলাচ্ছি, যেন দেখতে পাচ্ছি হলুদ রং, মা আমার বাঁ দিক থেকে বললো, “ভালো হয়েছে?” আমি বললাম, ‘হ্যাঁ খুব ভালো হয়েছে’ হলুদ রঙের… ঠিক সেই সময় ঘরের মধ্যেই মা যেন কেঁদে উঠলো, শব্দ পেলাম, মা কেঁদে বলছে, “গৌরীরে মদন গোপাল এ কী করলেন!”
গৌরী আমার ছোট মাসির নাম, বড় মাসির নাম হল দুর্গা। আমার মার নাম উমা। বড় মাসিকে কোনদিন আমি দেখিনি ফরিদপুরে থাকে, বড় মাসিরা কখনো এখানে আসেনি। তা যাই হোক, অন্ধ তো হয়ে গেলাম কিন্তু সবই যেন দেখতে পাই। তবে সবাই আমাকে ধরে ধরে নিয়ে যায়, কেন যে নিয়ে যায়! আমি তো সব দেখতে পাই, কী আশ্চর্য!
আমাকে নিয়ে বাবা, মামা নবদ্বীপের বুড়োশিবতলায় যায়, চোখ টেনে দেখেন ডাক্তার তাও যেন আমি দেখতে পাই। মনে পড়ছে ডাক্তার বাবু বলছেন, ঠিক আছে ঠিক আছে? সেই ৬৯/৭০ বছর আগের ডাক্তারবাবুর আঙুল দিয়ে আমার চোখ টেনে টেনে দেখার স্পর্শ যেন আজও আছে। ডাক্তারবাবুর আঙুল খুব ঠান্ডা ছিল ।
ডাক্তারবাবু বলছেন, পন্ডিত মশাই আমি চিকিৎসা করব পোড়ামাকে বলুন। আমাকে বললেন, “তোমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো? আমি বলি, ‘না’ হা:হা:হা: এইজন্যই কি জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন অন্ধরাই বেশি দেখে আজ? ওয়ান ফাইন মর্নিং আমি সত্যিই দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম আমাদের বাড়ির নিমগাছ সামনের বাঁশ বাগান ও কয়েকটা গোদা হনুমান। দেখতে পেলাম মহাপ্রভুর মাসির বাড়ি, এই বাড়ি আমাদের বাড়ির গায়েই। সীতানাথের মন্দির, মহাপ্রভু নবদ্বীপ থেকে হাঁটতে হাঁটতে এসে এখানে একবার বিশ্রাম নিয়ে আবার রওনা হতেন। পড়তেন বিদ্যানগরের এক টোলে। ওই বয়সেই দেখেছি একটা মাটির ঢিপির উপরে বসে আমার মা গেয়ে চলেছে একটা গান। কী গান মনে নেই। মা-র পিঠে ঝুলছে বিনুনি, এখন বুঝি, আমি তরুণী মা-কে দেখেছিলাম। আজও মনে আছে…
আড়াই বছর পার হয়ে যাচ্ছি তিন হয়ে যাচ্ছে, এই যে বয়স বাড়ছে আমি কি আর তা বুঝতে পারি! তখন আমি দাদার সেই কাঠের বাস টেনে নিয়ে বেড়াই, শব্দ হয় খড়খড় খড়খড়। সেই শব্দ এই বুড়ো বয়সেও স্পষ্ট ভেসে আসে। আমাদের বাড়ি থেকে কখনো কখনো সবার চোখের আড়ালে জ্যাঠার বাড়িতে চলে যাই, সেই বাড়িটা অনেক উঁচু অনেক সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠতে হয়, বড় হয়ে জেনেছি নবদ্বীপের গঙ্গার বন্যার জন্য ঐরকম উঁচু বাড়ি। সেই সময় মনে আছে একদিন দেখিকি, আকাশে শব্দ হচ্ছে বাবা মামা জ্যাঠারা বলে উঠলো, “হেলিকপ্টার হেলিকপ্টার” আমি আকাশে তাকিয়ে দেখলাম, কী যে বুঝলাম কে জানে!
হঠাৎ দেখি সবাই ছোটাছুটি করছে এদিকে ওদিকে… জ্যেঠার বাড়ির পাশে একটা ইস্কুল তারপরে অনেক উঁচু একটা বাড়ি। তখনই বুঝতে পারি উঁচু জায়গা নিরাপদ। বাবা জ্যাঠা পাড়ার অন্যান্য বড়রা সব মিলে পৌঁছালো সেই জায়গায়, আমিও রয়েছি। ওই উঁচু জায়গায় একটা ইঁদারা আছে ইঁদারা যে কি তা জেনেছি, উপরের হেলিকপ্টার ঘুরছে। সবাই বলছে, “সরে যাও সরে যাও” সবাই চারদিকে সরে যাচ্ছে। মনে আছে বাবা আমার হাত ধরে দালান বাড়ির বারান্দায় নিয়ে গেল। হেলিকপ্টার থেকে চালের বস্তা চিঁড়ের বস্তা ফেলা হচ্ছে। হঠাৎ একটা বস্তা ইঁদারার ওপরে পড়লো। সবাই বলে উঠলো ভেঙে গেছে ভেঙে গেছে…
এইসব যে বলছি আমি তা মাত্র তিন বছরের একটি শিশুর চোখ দিয়ে দেখা ছবি আসলে বন্যা হয়েছে, ইদারাঅলা বাড়িটি ঘোষপাড়ায় ওই বয়সেই বুঝতে পারছি সবার খুব কষ্ট সবাই বলছে জল ঢুকছে, জল ঢুকছে সবাই ছোটাছুটি করছে বন্যা বন্যা…
মনে পড়ছে একটা ছবি, এখনই যেন দেখতে পাচ্ছি কিন্তু সেই তিন বছরের আমির মনে কোন ভয় নেই এখন মনে পড়ছে, বুঝিবা ওই বয়সে তেমন ভয় জোগাড় করতে পারিনি আমি।
আমাদের বাড়ির ছবি— আমার মামাকে দেখেছি কোথা থেকে কাদা এনে আমাদের একটা চাঁচের বেড়ার (এখন বুঝি তা চাঁচ) তলার দিকে জমা করছে যেন জল আটকাবে, তখন আমার সেই তরুণী মা চিৎকার করে বলছে,” ওরে খোকা উঠে আয় জলের যা স্রোত তাতে ওই বাঁধে কোন লাভ হবে না” আর একটা ছবি আসছে— একটা বাড়ির উঁচু জায়গা, মাটির, তার চারপাশেই জল। এই উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার মা মাসিমা পাশে দাদা, দাদার হাতে ধরা সেই কাঠের বাস, ছবিটি মনে আছে আমার। জলের মধ্য দিয়ে মামা হাঁটছে মামার কাঁধে আমি, মামা জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমাকে পৌঁছে দিল সেই উঁচু জায়গায়…
এই যে নবদ্বীপের বড় বন্যার দৃশ্য আমি বুড়ো হয়ে বর্ণনা করছি বর্ণনা করছি, তিন চার বছরের মলয়ের চোখ দিয়ে, তা বেশ জটিল। বড় হয়ে শুনেছি সেই বন্যায় আমার মামা বুক জলে হাঁটতে হাঁটতে মাথায় চালের বস্তা নিয়ে প্রায় ভেসেই যাচ্ছিল… বন্যার আর কোন দৃশ্য আমার মনে পড়ছে না। শুধু মনে পড়ছে এই ডাক্তার তরণীবাবু মামাকে তার বাড়ি থেকে চিৎকার করে বলছেন, “খোকা সাপখোপ বেরিয়েছে কিন্তু”
তা যাগ্গে বন্যা তো চলে গেল অনেক দাপাদাপি করে, এবার আমার কাছের একটা সাপের কথা বলি। তখন মেঝেতে শুতাম, দিদিমার ঘরে। দিদিমা মশারি টাঙিয়ে একদিন আমাকে নিয়ে শুয়েছে, আমার নাকি ঘুম আসছে না, এই ঘটনাটি মায়ের কাছে শোনা আমার স্মরণে নেই… ঘরের এক কোণায় তখন একটা লণ্ঠন জ্বলছে, দিদিমা গান গেয়ে গেয়ে আমার পিঠে থাবা দিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে। তখন দিদিমা লক্ষ্য করে আমার পিঠে খাবার দেওয়ার প্রতিটি শব্দের ছন্দে ছন্দে মশারি নড়ছে। দিদিমা ভাবলো (এই ঘটনাটি বড় হয়েও দিদিমার কাছ থেকে শুনেছি) আমি মনে হয় দিদিমার গানের তালে তালে পা ফেলছি আর মশারিটাও তালে তালে নড়ছে। দিদিমা বলল, “অ্যাই মলয় পা নাড়ানো বন্ধ কর ঘুমো”।




মলয় গোস্বামীর ভাঙা দিনের ঢেলা প্রথম পর্ব পড়লাম। খুব শান্ত ধীর স্থির ভাবে শুরু হয়ে হঠাৎ অনেক গুলি চলচ্ছবি মানস চক্ষে ফুটিয়ে তুলল। বড় আকর্ষণ অনুভব করলাম পরবর্তী পর্বগুলি পড়ার জন্য।
ভাল লাগল