মায়ের গানের খাতায় পেয়েছিলাম লাইনটা, ‘বাতাসে ভাসিছে বাতাবী ফুলের গন্ধ। বনে বনে জাগে ঝিল্লি নূপুর ছন্দ। ‘ গানটার শুরুটা ছিল, ‘ জেগে আছি একা, জেগে আছি কারাগারে-‘ গানটা রেকর্ড করেছিলেন সত্য চৌধুরী। ‘ পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়’ এর সেই কালজয়ী শিল্পী। কিন্তু রেকর্ডে আমি এখন গানটা প্রথম শুনি ফিরোজা বেগমের কন্ঠে। কমল দাশগুপ্তের সুরের কিছু কালজয়ী গান আবার গেয়েছিলেন ফরিদপুরের ফেণী, যাঁর পোষাকী নাম ছিল ফিরোজা।
ছোটমাসীর কাছে বায়না করে নৈহাটি সিনেমা হলের পাশের গলিতে ওয়াচ এন টিভির দোকান থেকে ফিরোজা বেগমের ওই লং প্লেইং রেকর্ড টা কিনেছিলাম। এই রেকর্ডে,’ বাতাসে ভাসিছে বাতাবী ফুলের গন্ধ’ শোনবার আগে সত্যিই বাতাবী ফুলের গন্ধে যে বেহেশতের খুশবু আছে— সেটা কখনও অনুভব করবার চেষ্টাই করি নি।
আমার দিদিমার বাড়িতে একটা বাতাবী লেবুর গাছ ছিল। গাছ টা ছিল আমার দিদি ছোট্ট যে খুপড়ি ঘরে, গরমে হাপসাতে হাপসাতে পড়ত, যে ঘরটাকে আমরা ‘ নোতুন ঘর’ বলতাম তার ঠিক সামনে ছোট্ট এক টুকরো জমির উপরে। তার পাশে ছিল ছোট একফালি সিমেন্ট বাঁধানো চাতল। সেই চাতালের বাঁ দিকে ছিল ওই বাতাবী লেবুর গাছটা।
নতুন ঘরের পাশে ছিল আর একটা ছোট ঘর। ঘরের চাল ছিল টিনের। কেন যে এই ঘর দুটো ছোটমামা করিয়েছিল তার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারন ছোটকাল থেকে বুড়ো বেলা পর্যন্ত শুনি নি। তবে ছোটমামার এসব কাজের পিছনে আমার দিদিমাকে তাঁর বিয়েতে পাওয়া তাগা র একটা খেসারত দিতে হয়েছিল। কারন, পাছে ঘর করে দেওয়ার খোটা ছোটছেলে দেয়, তাই দিদিমা নিজের ছেলের কাছেও কখনও এতটুকু ঋণ রাখতে চান নি।
শুনেছি ওই ঘর গুলো তৈরি হওয়ার আগে ওখানটায় ছিল গৈল ঘর। মানে গোয়াল। মধ্যবিত্ত বাড়িতে গরু রাখার বিলাসিতাটা আজ থেকে ষাট – সত্তর বছর আগে মফসসলের বাঙালি বাড়িতে একটু বেশি মাত্রায় ই ছিল। হিন্দু- মুসলমান নির্বিশষে তখন অনেক বাঙালি বাড়িতেই এটা ছিল দস্তুর।
আসলে দেশভাগ তখন একটা সেটেল্ড ফ্যাক্ট। দেশভাগের আগে বা অল্প কিছু সময় পরে ‘ গোরু’ ঘিরে রাজনীতির যে তাপ উত্তাপ তখন সময়ের দাবিতেই তা বেশ অনেকটা মিইয়ে গেছে। সেই জলেভেজা, ন্যাতানো আগুনকে উস্কে দেওয়ার মত অপ রাজনীতি তখন ও চেগে ওঠার সময় পায়নি।
এমন কালে যে শহরে আমি তখনও বড় হয়ে ওঠার সুযোগ ই পাই নি, সেই শহরে বা তার পাশের শহরে ব্রাহ্মণ্যবাদ সমস্ত রকমের মানবিক সম্পর্ক গুলো ঢেকে দেওয়ার জন্যে সবরকমের পাঁয়তারা তখন কষে ফেলেছিল। আমার শহর ভাটপাড়ার বামুন ধারার দুটো স্রোত ছিল মূলত। একটা হল পাশ্চাত্য বৈদিক ধারা। অপর ধারা হলো দাক্ষিণাত্য বৈদিক। এই অবাঙালি বামুনের দল বাঙালিয়ানার অ আ ক খ জানত না। এখনও জানে না।
যাক সে সব কথা। গোরু ঘিরে হিন্দু- মুসলমানের আজকে যে আকচা আকচি তৈরি হয়েছে সেসব ঘিরে তখনও কিছু তৈরি হয়নি। গেরস্ত বাড়িতে গোরু পোষে খাঁটি দুধ খাবে বলে। গোরুর যত্ন আত্তি করে সাধ্য মত। গাঁয়ে গেরস্ত নিয়েই গায়ে গতরে খাটে গোরুকে নিয়ে। একটু পয়সাওয়ালা লোক হলে গোরুর দেখভালের জন্যে লোক রেখে দেয়। গাঁয়ের এতিম ছেলেদের জন্যে এই গোরু -ছাগল দেখার কাজটা অনেক সময়েই নির্দিষ্ট থাকে।
শুনেছি আমার দিদিমার বাড়িতে যখন গোরু ছিল, বাইরের মাইনে করা লোক ছিল দেখভালের জন্যে। খাবার দেওয়া, গোয়ালঘর পরিস্কার করা এসব কাজের জন্যে হিন্দিভাষী একজন ছিল। দুধ দুয়ে দিতো দুবেলা একজন মহিলা। তাঁর নাম ছিল রাধা।
রাধার দাদা ছিলেন আমাদের শহরে রবীন্দ্রনাথকে চেনবার আতস কাঁচ। গোবিন্দ মাষ্টারমশাই। তিনি আমাদের মায়ের মাষ্টারমশাই ছিলেন। আবার আমার ও। যখন ক্লস সেভেনে উঠি, উনি অবসর নেন। সৎ, ভালো মানুষের সজ্ঞা হিসেবে ছোটবেলায় বাড়িতে যে দুএকজনের নাম উচ্চারিত হতো, যাঁদের কে আদর্শকে জীবন গড়ে তোলবার কথা আমাদের শেখানো হতো, গোবিন্দ স্যার ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
গোবিন্দ স্যারের বোন ছিলেন এই রাধা। থাকতেন কৈবত্যপাড়াতে। ছোট্ট বাড়িটা মনেহয় নিজের ই ছিল। ‘ কৈবত্যপাড়া’ নামটা শুনলেই বোঝা যায় জাত্যাভিমানের কি দাপট ছিল আমাদের শহরে সেকালে। জাত্যাভিমানের দাপট থাকলেও সেই ‘ নীচুজাতে’ র লোকেদের জমি জিরেত ছলে বলে কৌশলে হাতিয়ে নিতে কিন্তু কোনও অসুবিধা হতো না এখানকার ভটচার্যি বামুন ঠাকুরদের।
হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ওই কৈবত্যপাড়াতে একটা বিরাট মাঠ নামমাত্র টাকায় কিনে নিয়েছিল। পরে নিজের মেয়েদের মধ্যে সে জমি ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়। নিজের দাদা মরে যাওঢ়র পর ডেড বডির টিপ ছাপ নিয়ে দানপত্র তৈরি করে দাদার হয়ে। সেই দানপত্রে দেখা যায়, ওই ডাক্তারের দাদা, নিজের দুই মেয়েকে নিজের ভাগের বিষয় সম্পত্তির কানাকড়িও দেয় নি। সব দিয়েছে ভাইয়ের ছেলেকে।
সেসব অনেক গল্প। তা এই কৈবত্যপাড়া নামটা এখন আর টিকে নেই। সরকারী দলিল দস্তাবেজে কি আছে কে জানে। তবে লোকের মুখে মুখে সেটা এখন বাবুরাণীপাড়া। তবে পৌরসভা রাস্তার নামের যে বোর্ড সেঁটেছিল বেশ কিছুকাল আগে সেখানে বাবুরাণীপাড়া লেখা ছিল না। ছিল,’ কৈবত্যপাড়া’ । তখন মনে হয়েছিল, এককালে বামপন্থীরা যে সামাজিক জাগরণের একটা কাজ হিসেবেই এই জাতপাত ভিত্তিক নামকরণগুলো কে বদলাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিছুটা সফল ও হয়েছিলেন। সেই বামপন্থীদের হাতে পরিচালিত পৌরসভা কেন এতটুকু সচেতনতার পরিচয় দেবে না এমনতরো সাইনবোর্ড সাঁটবার সময়ে? হ্যাঁ, এমন সাইনবোর্ড লটকাবার কালে আমাদের স্থানীয় পৌরসভাটি ছিল কিন্তু বামপন্থীদের দ্বারাই পরিচালিত।
মুক্তোপুরের খাল, সাধু উচ্চারণে মুক্তারপুরের খাল- তার পাশেই রাসমেলার মাঠ। পাশের শহরের বেশ জমি জিরেতের মালিক মুখার্জীবাবুদের সম্পত্তি । আই সি এস অশোক মিত্র সম্পাদিত পশ্চিমবঙ্গের পূজা পার্বণ ও মেলা গ্রন্থেও এই রাসমেলার কথা আছে। ছয়ের দশকের শেষদিক পর্যন্ত রাসমেলা বসতো জমিয়ে। তারপর কেন যে বন্ধ হয়ে গেল- তার সঠিক ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেন না। তবে যেটা মনেহয় মুখুজ্জেদের শরিকি বিবাদ ই দায়ী মেলাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্যে।
মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অনেককাল পরে ওই মাঠে বানজরার দল মাঝে মাঝেই ভিড় করতো। অস্থায়ী ভাবে বাস করতো তারা ঝুপড়ি করে। এই বানজারাদের মধ্যে কাকমারা থাকতো অনেক। কাকশিকার ছিল তাদের পেশা। সেইসঙ্গে টিয়াপাখিও ধরতো। দেশীয় পাখি ঘিরে আইনকানুন তখন ও হয় নি। ফলে অনেকেই এদের কাছ থেকে টিয়াপাখি কিনতো। আর কাক ঘিরে ছিল এই কাকমারাদের বিচিত্র জীবন যাপন। কাকের পালক, ঠোঁট – এসব দিয়ে তারা তৈরি করতো নানা রকমের জড়িবুটি। দেহাতী লোকেদের মধ্যে সেসব জড়িবুটির বেশ জনপ্রিয়তাও ছিল। নানারকম রোগ থেকে শুরু করে বন্ধ্যাত্ব– সবকিছুর এই জড়িবুড়ি, পশুপাখির হাড়গোড়ের চিকিৎসা ছিল বানজারাদের কাছে মজুত।
বানজারারা এই রাসমেলার মাঠে নিজদের থাকার ঝুপড়ির বাইরে ছোট একটা তাঁবু ফেলতো। বেশ রঙিন কাপড় চোপড় দিয়ে দেখনদারি ভাবেই তৈরি হতো সে তাঁবু। ভেতরটা সুন্দর ঝকমকে কাপড় দিয়ে মোড়া থাকতো। তাঁবুর গায়ে থাকতো নানা মরা পশুপাখির মুখ। কখনো সখনো বাঘের মুখ ও কোনও কোনও দলের থাকতো। বহু রকমের রুদ্রক্ষ, তার মালা। হরেক কিসিমের পাথর। পাথরের মালাও থাকতো। পশুর সিং থাকতো।
এসব ছিল তাদের চিকিৎসার উপকরণ। চটকলের শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরাই কেবল নয়। গেরস্ত ঘরের ছেলেমেয়েরাও ওইসব পশুপাখির মাথা দেখতে ভিড় জমাতো। ছোট্ট হান্ড মাইকে একটা কেমন তরো হিন্দিতে ওই তাঁবুর লোকেরা সব অসুখ বিসুখ সারানোর বিজ্ঞাপন করতো। দেহাতিদের সঙ্গে মেলামেলার দরুণ ভোজপুরি হিন্দি ভালো না বলতে পারলেও কিছুটা বুঝতে পারতাম । কিন্তু ওই বানজারারা যে কি বলতো- তার একবর্ণ ও উদ্ধার করতে পারতাম না। সমবয়ষ্ক দুচারটে দেহাতি ছেলেমেয়েদের কাছে জানতে চাইতাম; কি বলছে ওরা? দেহাতি ছেলেমেয়েরাও ঠিক মত বুঝে উঠতে পারতো না ওইসব কাউয়ামারা লোকজনদের কথাবার্তা। দেহাতিরা কেবল বলতো; সব বিমার কে ইনলোগোমে ইলাজ করেগা। অর্থাৎ; এই লোকেরা সব অসুখের চিকিৎসা করবে।
একটু বড়ো হয়ে বুঝতে পারলাম, চটকলের শ্রমিকদের মধ্যে কেউ কেউ বেপাড়া যাওয়ার দৌলতে নানা রকম রোগে ভোগে। সেসব রোগ ঘিরে ঠিক মত ডাক্তারদের কাছে যাওয়ার ভাবনা তখনও ওইসব কুলি মজুরদের মধ্যে হয় নি। না হওয়ার কারন যে সামাজিক লজ্জা, তা কিন্তু নয়। কারন, স্থানীয় মানুষজনদের সঙ্গে এই চটকলের কুলিকামিনদের দুরত্বটা এতটাই ছিল যে, ওরা বাঁচলো কি মরলো – তা নিয়ে স্থানীয় ভদ্দরলোকেদের এতটুকু মাথা ব্যথা ছিল না। আর একা থাকে এসব কুলি মজুর রা। বৌ থাকে দেহাতে হাজার মাইল দূরে। তাই সুরো ভট্ চাযের গলিতে এরা যাবেই– এটা ছিল সেসময়ের সামাজিক বিন্যাসে একদম টেকন ফর গ্রান্টেড।
বানজরাদের কাছে যৌন চিকিৎসার জন্যে ভিড় করা ভিন রাজ্যের, ভিন ভাষার লোকজনেরা আদৌ কোনও শারীরিক যন্ত্রণা থেকে রিলিফ পেতো কি না কে জানে! তবে ওসব জড়িবুটির কারিকুড়িতে তাদের রোগ আরো জটিল ই হয়েছে বলে মনে হয়।
রাসমেলার মাঠে এই বানজারাদের জীবনটা ছিল হাসিতেই ভরা। দুঃখ কে ঘিরে দুঃখবিলাসের সময় ওঁদের ছিল না। বরংচ দুঃখ মোচনের তাঁদের মত করে চেষ্টাটাই ছিল প্রবল। শহুরে কেতায় পোষাকের শালীনতা ঘিরে যে ধরণের চলতি প্রথা আছে। এই বানজারা মেয়েরা সেসবের একদম ই ধার ধারতো না। শাড়ি পড়ার রেওয়াজ ই তাঁদের মধ্যে বেশি ছিল। কিন্তু বিন্যস্ত আঁচলের প্রতি তাঁদের থাকতো না তেমন নজর। শাড়ি পড়ে আঁচল দিয়ে বুক ঢেকে রাখার যে শহুরে কেতা, যে কেতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রমণীরা তাদের মরদদের রুটি রুজির টানে চটকলিয়া শহরে এসে ভিড় জমিয়েছে, তারাও ক্রমে ক্রমে বাঙালি মেয়েদের মত শাড়ির বিন্যাস শিখে নিয়েছিল। যদিও তাঁদের শাড়ি পড়বার ধরণটা ছিল দেহাতি আঙ্গিকেই।
আঙ্গিকের এই বৈশিষ্ট টা কিন্তু দেখা যেতো না বানজারা মেয়েদের মধ্যে। সেকালে কুঁচিয়ে শাড়ি পড়াকে অনেকে বলতেন, ড্রেস দিয়ে শাড়ি পড়া। তেমন ভাবেই শাড়ি পড়তেন এই বানজারা মেয়েরা। কিন্তু শাড়ি দিয়ে সচেতন ভাবে বুক ঢেকে রাখার চল তাঁদের ছিল না। কাউকে আকর্ষিত করতে এমন ভাবে তরা শাড়ি পড়তো তা কিন্তু নয়। এভাবে যে আকর্ষণ করা যায়- জানি না সেই বোধ বা ধারণা এসব মেয়েদের ছিল কি না। যেটা দেখা যেত ওভাবেই কাঁখে একটা সন্তানকে নিয়ে তারা রাস্তায় চলেছে। কখনো কারো কাছে খাবার চাইছে। পয়সা- কড়ি সাধারণত তারা চাইতো না। চাইতো খাবার। আবার পথচলতি সময়ে কাঁখের বাচ্চাটা কেঁদে উঠলে স্তন অনাবৃত করে, সেখানে শিশুর মুখটিও গুঁজে দিতো। এই স্তনদান ঘিরে কে দেখছে, কে কি বলছে নিজেদের মধ্যে সেসব নিয়ে এঁদের কোনও মাথা ব্যথাই ছিল না।
বানজারাদের বেঁচে থাকা ঘিরে এই ছোটাট মফসসল শহরে কারোর ই তেমন মাথা ব্যথা ছিল না। ওঁদের দরিদ্র এতটাই করুণ ছিল যে, চটকলের বদলি লেবার থেকে শুরু করে রিক্সাওয়ালা — এই গরীব মানুষেরাও ওঁদের বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই দেখতো। উত্তর কলকাতায় পুরনো কোলকাত্তাইয়াদের মধ্যে ‘ নিকিড়ি’ কথাটার বেশ প্রচলন ছিল এককালে। ভিখিরির থেকেও অধম বোঝাতে এই ‘ নিকিড়ি’ কথাটা ব্যবহৃত হতো। পুরনো বাগবাজারীদের মধ্যে এই ‘ নিকিড়ি’ কথার চল এখনও কিছুটা থেকে গেছে। অপছন্দের পাড়াকে ‘ নিকিড়িপাড়া’ বলবার রেওয়াজ বাগবাজারের মানুষদের মধ্যে অনেকের ই আছে।
আমাদের মফসসল শহরের বাঙালি- অবাঙালি হাঅন্ন মানুষজনেরা এই বানজারা, কাকমারাদের নিজেদের আর্থিক- সামাজিক অবস্থানের থেকেও অনেক অনেক নীচে অবস্থিত উদ্ভট জীব বলে মনে করতো। ব্যাপার টা অনেকটা ওই উত্তর কোলকেতার ‘ নিকিড়ি’ লব্জের মত আর কী!
তবে এই বানজারারা যখন নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি তে মেতে উঠতো,তখন সেটা দেখা- উপভোগ করা– এসব ঘিরে ভদ্দরলোক- আর গরীব গুর্বের মধ্যে তেমন একটা ফারাক থাকতো না। কারন, কাকমারাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া অচিরেই রূপ নিতো ভয়ঙ্কর মারামারিতে। হাতের কাছে যা পেলো, তা নিয়ে অপরকে আঘাত, রক্তারক্তি – এগুলো ছিল ওদের ঝগড়ার একটা রোজকারের ঘটনাক্রম।
মারামরি দেখতে যে ভদ্দরলোকেদের এত উৎসাহ, বানজারাদের ঘিরে হইহুল্লোরের আগে আমার জানবার সুযোগ হয় নি।
বানজারাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া যত না হতো, মারামারিটা হতো তার থেকে ঢের বেশি। আর মারামারি মানে রক্তারক্তিটা ছিল ওদের ঝগড়াঝাটির একটা বিশেষ অংশ। মেরেধরে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে একে অপরকে। দুজনে ই দুজনকে কামড়ে, খিমচে একাকার করে দিচ্ছে। কেউ হয়তো অজ্ঞান হয়ে অনেকটা সময় জুড়ে পড়ে আছে রাস্তায়। অনেকক্ষণ ধরে তার নট নঢ়ন চড়ন দেখে ওদের ই মধ্যে কেউ হয়তো একটা বড় গামলা বা হাড়ি করে জল এনে ঢেলে দিচ্ছে সেই রক্তাত্ব লোকটির গায়ে।
আবার বিকেলেই দেখতে পাওয়া যাবে- সেই আহত পুরুষ বা রমণী ওই রাসমেলার মাঠের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ঘোষপাড়া রোডের উপরে বসে আছে। দলের অন্যদের সঙ্গে তাদের ভাষায় আমোদ করছে। কাঁখের সন্তানটিকে স্তন পান করাতে করাতেই আর একটু বড় সন্তানটি খেলতে খেলতে না বাস – লরির নীচে চলে যায়– তীক্ষ্ম নজর রাখছে সেদিকেও।
নগর সভ্যতার অতি আধুনিকতায় এখন আর রাসমেলার মাঠে তাঁবু ফেলে না এইসব কাউয়ামারা সম্প্রদায়ের লোকেরা। রাসমেলার মাঝের অর্ধেকটা এখন নানা বিত্তশালীদের বাড়ি। আমাদের এই শহরের সল্ট লেক বলে লোকের মুখে মুখে ঘোরে।
এই মফসসলী সল্ট লেকের ই বাসিন্দা ছিল চন্দন। রেলে চাকরি করতো। বেশ ভালো ছেলে। আমাদের বাড়িতে এসেছে। আমিও গেছি ওঁদের বাড়ি। খুব স্নেহশীলা ওঁর মা। চন্দনের ছিল বেড়ানোর নেশা। ট্রেকিং ও করতো। একবার দল বেঁধে গেল দীঘাতে। নিস্প্রাণ ফিরে এলো। চন্দনের মৃতদেহের প্রতীক্ষায় ওঁর বাড়ির সামনের রাস্তায় আমরা বন্ধুরা মিলে দাঁড়িয়ে আছি– এটা ভাবতেই বেশ মন খারাপ লাগে।
চন্দন চলে যাওয়ার পরে ধীরে ধীরে ওঁর মা নিজেকে সামলাম। তখনও রাস্তায় টটোর চল হয় নি। অটো সব দু একটা নেমেছে। রিক্সাই সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম।
দেখতাম চন্দনের মা বাজার করে ফিরছেন। দেখলেই একগাল হাসতেন। বেশ কিছুকাল আগে এক পশু চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। উনি একটা দেশি কুকুর নিয়ে এসেছেন দেখাবার জন্যে। ওঁদের বাড়িতেই কুকুরটা থাকে। তারপর আর মাসীমার সঙ্গে দেখা হয় নি। জানি না, উনি আছেন কি না। কী শান্ত পাষাণ প্রতিমা যে ছিলেন তিনি – লিখে বোঝানো যাবে না। চন্দন বেঁচে থাকতে এই মানুষটিই কতো হাসিখুশি ছিলেন। আমরা ওঁদের বাড়ি গেলে কেবল চা নয়, নিজের হাতে কিছু না কিছু তৈরি করে খাওয়াতেন। বাড়িতে যদি তেমন কিছু মজুত না থাকতো তবে সুজি। এমনকি লুচি ভেজে দিয়েছেন গরম গরম । লজ্জা পাওয়া মুখে বলেছেন, দেখো বাড়িতে তেমন কিছু আজ নেই। বাজারে যাই নি। তাই আলুভাজা আর চিনি দিয়েই খাও।
চন্দনদের বাড়িটা ছিল রেল লাইনের ধারে। ওঁদের ছাদে কত চড়ুইভাতি করেছি ইস্কুল জীবনে। কলেজ জীবনেও করেছি। চন্দনের দুই দাদা ছিলেন। শুনেছিলাম, ওঁরা চন্দনের বৈমাত্রেয় ভাই। তবে ওঁদের সঙ্গে ব্যবহারের ক্ষেত্রে চন্দধের মাকে কখনও উনিশ – বিশ দেখি নি। চন্দন চলে যাওয়ার পর ওঁর দাদারা যেভাবে মাসীমাকে প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, তা সত্যিই দৃষ্টান্তমূলক। রাসমেলার মাঠের যে অংশটা ছোট ছোট প্লট করে বিক্রি হয়েছিল, সেখানে খানিকটা জমি কিনেছিল শিউপ্রসাদ সাউ। শিউপ্রসাদ ছিল আমার দিদিমার বাড়ির ভাড়াটে। বিহার থেকে আসা এই লোকটি চাকরি পেয়েছিল আমাদের বাড়ির পাশেই জে এন বিদ্যালয় নামে একটা প্রাইমারি স্কুলে। হিন্দি মাধ্যমের স্কুল। সাতের দশকের গোড়ায় এই স্কুলটা চালু হয়েছিল। মূলত চটকলের শ্রমিকদের ছেলেমেয়েদের জন্যেই তৈরি হয়েছিল স্কুলটা। এই স্কুলটার ও আগে চটকলের কুলিলাইনে একটা প্রাইমারি স্কুল অবশ্য ছিল। সরকার অনুমোদিত কি না- তা ঠিক এখন আর মনে নেই। তবে আন্দাজ হয়,সরকারি অনুমোদন স্কুলটার ছিল না। কারন, সাতের দশকের মাঝামাঝিই সেটা অবলুপ্ত হয়ে যায়। আসলে এই চটকলে কাজ করা কুলি – কামিনদের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো শিখবে- এটা তখনকার সময়ের একটা বড় অংশের সমাজপতিরা মনেই করতো না তেমন ভাবে। ভিন রাজ্য থেকে আসা এইসব মানুষদের জীবনযাপন ঘিরে তখন কি সরকার বাহাদুর, কি সমাজপতি- কারোর ই তেমন একটা মাথাব্যথা মোটের উপর ছিল না।
এইসব কুলিকামিনদের বস্তিজীবন কেমন ছিল সেকালে সমরেশ বসু তাঁর ‘ বি টি রোডের ধারে’ তে লিখে গেছেন। তবে তাঁর ওই উপন্যাসে রয়েছে চটকলে কাজ করতে আসা বিভিন্ন রাজ্যের মানুষদের কথা। হিন্দিভাষী মানুষদের বাইরে আরো বহু ভাষী মানুষদের একত্র যাপনচিত্রের কথা সেখানে আমরা পাই। তাঁদের মধ্যে নানা ধরণের দ্বন্দ্ব – সংঘাতের ভিতরেও আমরা দেখি আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের একটা স্পষ্ট প্রভাব। প্রত্যেকটি মানুষ ই সেখানে নিজের নিজের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে রক্ষা করবার প্রতি যত্নবান। সেই আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি অন্য অঞ্চলের মানুষদের কিন্তু কোনও বীতরাগের ছবি সমরেশের ওই আখ্যানকালে ছিল না। দেশের অতি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের সময়কালের আগে এমনটাই ছিল দস্তুর।
তবে আমার বাড়ির খুব কাছে যেসব কুলিকামিনদের বস্তি গুলো চিল, সেখানে বিহার, উত্তরপ্রদেশের মানুষদের সংখ্যাই ছিল বেশি। হিন্দিভাষীদের মধ্যেও সংস্কৃতিতে, কথা বলার রীতি নীতিতে, ধর্মীয় আচার পালনে যে নানা ধারা আছে– কোনও ইউনিফায়েড ‘ হিন্দি’ নেই, ‘ হিন্দি সংস্কৃতি ‘ নেই, সেটা এইসব গরীবগুর্বো মানুষগুলোর সঙ্গে নিবিড় ভাবে মিশলে খুব ভালো বুঝতে পারা যায়।
হিন্দু বাঙালিরা ‘ ছট পুজো’ আর হিন্দিভাষী মানুষদের এক করে দেখতেই বেশিরভাগ সময় অভ্যস্থ। কিন্তু এই দেখাটা খুব ভুল। ছট পুজো মূলতঃ বেশি প্রচলিত বিহারে। বিভক্ত বিহার, অর্থাৎ; ঝাড়খন্ডেও। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ বা উত্তরাখন্ডে হিন্দিভাষী মানুষদের মধ্যে এই ছট পুজোর প্রচলন নেই বললেই চলে। উত্তরপ্রদেশে যে কোনও কোনও জায়গায় ছট পুজো দেখা যায়, একটু অনুসন্ধান করে দেখলে দেখা যাবে যে, যাঁরা এই পুজো করছেন, তাঁরা কখনও না কখনও বিহারের মানুষ ছিলেন। হয়তো তাঁদের পূর্বপুরুষেরা রুটি – রুজির তাগিদে বিহার থেকে এসে এখন বসবাস করছেন উত্তরপ্রদেশে, উত্তরাখন্ডে। চটকলের শ্রমিকদের ছেলেপিলেদের’ পড়্ হাই ‘ করা দরকার- এই বোধটা চটকলিয়া এলাকার কিছু মুরুব্বি গোছের মানুষদের মাথায় এলো। পাল- মালোদের পাড়ার লাগোয়াই এই চটকল, সেখানকার কুলিবস্তি। কিছু প্রাইভেট বস্তি ও আছে। মানে ব্যক্তি মালিকানাধীন বস্তি। একটা বড় কারখানা চললে, তাকে ঘিরে আরও বহু রকমের রুটি – রুজির কারবার চলে। চায়ের দোকান,ঝুপড়ি হোটেল, তেলেভাজার দোকান, মন্দির, রিক্সা- ভ্যান থেকে বারোদুয়ার।
চটকলে যারা গতর খাটিয়ে খায়, তারা যে প্রত্যেকেই চটকলের কুলি লাইনে ঘর পায়, তা তো আর নয়। আবার অনেকে চটকলের কুলি লাইনের এজমালি থাকার ব্যাপারটাকে ঠিক মন থেকে মেনে নেয় না। আজ থেকে চল্লিশ – পঞ্চাশ বছর আগেও চটকলের বিহারী শ্রমিকের বিদূষী ঘরণী ছিল। এই মুহূর্তে এমন একজনের কথা মনে পড়ছে। দেওসুন্দরী দেবী। যদিও তাঁর পৈতৃক নাম চাপা পড়ে গেছিল, রাজকুমারের মা, এই নামের আড়ালে। এই দেওসুন্দরীর গল্প পরে করা যাবে।
এমনতরো কিছু কিছু মানুষ ছিল, যারা একটু অন্যভাবে জীবন কাটাতে চাইতো। বিহার – উত্তরপ্রদেশের ছাপড়া, সিউয়ান, বালিয়া, মোতিহারির একেবারে গাঁওয়ালি বেরাদর অতিক্রম করে বাংলা- বাঙালি সংস্কৃতির আধুনিকতাকে তারা কিছুটা আত্মস্থ করবার চেষ্টা করতো। এই আধুনিকতার ক্ষেত্রে সবার প্রথমে যেটা তাঁরা আত্মস্থ করবার চেষ্টা করতো,সেটা হলো পরিচ্ছন্নতা। যাকে এককথায় বলা যায়, হাইজেনিক জীবন যাপন।
দেহাতি জীবনযাপনের মধ্যে যে স্বাস্থ্যবিধির অভাব ছিল, সেটা এইসব মানুষেরা কলকাতার উপকন্ঠের শহরতলি গুলোতে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে। প্রথাগত শিক্ষা না থাকলে যে কোনও মানুষ অন্তরের শিক্ষা, যাপনজনিত শিক্ষা বুঝে উঠতে সক্ষম হয় না– শহুরে মানুষদের এই ভুলটা খুব ভালো করে বুঝতে পারা যায় এইসব কুলিকামিনদের পরিবার গুলির দিকে একটু ভালোভাবে নজর দিলে।
আজ থেকে পঞ্চাশ- ষাট বছর আগে সমাজ যাদের ‘ ছোটলোক’ মনে করতো, কুমোর- মুচি- মেথর- রিক্সাওয়ালা- কলকারখানায় খেটে খাওয়া মানুষজন– তাদের কে তো আর তারা ‘ মানুষ’ বলে মনেই করতো না। তাই তাদের ছেলেপিলেদের পড়াশুনো করবার দরকর আছে- এই বোধটাও শহরতলীর ঘাট- আঘাটায় ছিল না।
এই কদিন আগেই সাহিত্য আকাদেমির অনুবাদে পুরস্কার পাওয়া এক অধ্যাপকের কাছে শুনছিলাম; শহরতলীর এক নিম্নবর্গীয় পরিবারের সন্তান হওয়ার দায়ে রোদ থেকে মাথা বাঁচাতে ছাতা ব্যবহার করবার ‘ অপরাধে’ সেই মানুষটিকে তাঁর গাঁয়ে ছোটবেলায় কি ভাবে হেনস্থা হতে হয়েছিল। এক তারকা খচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করতে গিয়ে উচ্চবর্ণের অধ্যাপকদের মুখেই শুনি সেদিন, পুরস্কৃত অধ্যাপকটির পেশাগত কর্মকান্ড ঘিরে বিদূষণ। গোটা হল সেই বিদূষণ উপভোগ ও করলো বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে। কেউ একটাবারের জন্যেও বললো না, ছেলেটি যদি ব্যানার্জী- চ্যাটার্জী- বাগচি- ভটচায বা ঘোষ- বোস- দাশগুপ্ত হতো– তবে বাবুমশাইরা সাহস পেতেন এমন টিটকারি করবার?
আমি যে শহরে বড়ো হয়েছি, আমার বেড়ে ওঠার সময়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের ঠুনকো বেরাদরি এই শহরের হৃদয়টাকে ভেঙে চুড়চুড়ে করে দিয়েছিল তার অনেক আগেই। সমরেশ বসু তাঁর ‘ জগদ্দল’ উপন্যাসে এই শহরের কাঁচাখেঁকো বামুনদের দানবীয়তার কথা লিখে গেছেন। গরীবগুর্বো, ছোটজাতের ছেলেরা, তার সঙ্গে তাদের বাড়ির মেয়েরা স্কুলে গিয়ে পড়াশুনো শিখবে? এটা আবার বামুন ঠাকুরেরা মেনে নিতে পারে নাকি?। এসব বাড়ির বৌ – ঝিয়েরা বামুনদের বাড়ির এঁটোকাটা পরিস্কার করবে। ঘরদোর মুক্ত করবে। বাসি ভাতরুটি খাবে। ফেলাছোড়া খাবে। আর সেসব খেয়েই গায়ে গতরে বেড়ে উঠলে পরে রাতের অন্ধকারে এইসব বামুন ঠাকুরদের বিছানায় সুখ দেবে। সুখ দিতে গিয়ে পেট বিঁধিয়ে ফেললে বামুন মায়েরাই জোগার করে দেবে শেকড়বাকর তাতে হয় পেটেরটা মরবে। নচেৎ নিজে মরবে। আর যদি শেকড় মাটিতে পড়েই যায়, তাহলে কি হতো সেকালে তা বোঝবার জন্যে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে বসা বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়ি, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে যেমনটা ছিল, তার একদম গা ঘেঁসে গজিয়ে ওঠা বস্তিগুলোর মানষজনদের দেখলেই খুব সহজে বুঝতে পারা যেতো। এসব গরীব মানুষদের, বাড়িতে বাড়িতে বাসন মেজে, জামা- কাপড় কেচে- ঘরদোর মুছে, রিক্সা চালিয়ে,ভাটিখানায় মদ বানিয়ে যাঁরা পেটের ভাত জোগার করেন, তাঁদের সন্তান- সন্ততিদের নিয়ে আসতে হবে প্রথাগত শিক্ষার মূল ধারায়।
আমাদের শহরে এইসব বামুনঠাকুরেরা যে অনেককাল আগে কৌতুকে- করুণায় দেখা লোকজনদের শুভঙ্করী আঁক শেখানোর কাল থেকে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান পড়া, ইংরেজি পড়া– এইসব বিষয়ে খুব সদয় মন- মানসিকতা নিয়ে চলতেন তা নয়। টোল- চতুষ্পাঠীর দিকেই ছিল তাঁদের বেশি পক্ষপাতিত্ব। যদিও নবদ্বীপ, গুপ্তিপাড়া বা প্রায় পাশের শহর, হালিসহরে এসব টোল- চতুষ্পাঠীতে যেভাবে দর্শন শিক্ষার চল ছিল, সেরকম পথে আমাদের শহরের বামুন ঠাকুরেরা খুব একটা হাঁটতে চাইতেন না। করন, তেমন পথে হাঁটলে যে একাদশী, নবমী — এমনতরো তিথিতে কি খাওয়া উচিত আর উচিত নয়, তা নিয়ে বিশেষ একটা লোকজনদের প্রভাবিত করবার সুযোগ থাকতো না।
তবে কালের গতিতে বামুনঠাকুরেরা যখন একটু একটু করে বুঝতে শুরু করলেন যে, টুলো বিদ্যেতে যদি আঁটকে রাখি নিজেদের ঘরের ছেলেপিলেদের তবে আগামী দিনে তারা ভাত জোটাতে পারবে না। এসব কাঁচাখেঁকো বামুনদের টিকির বাহার যাই থাকুক না কেন, বিষয় নাড়ী ছিল বেশ ভালোরকমেরই টনটনে।
ইতিমধ্যে শহরে সরকারী স্কুল হয়েছে। টোল পারছে না প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে। প্রাগৈতিহাসিকতার সঙ্গে আধুনিকতার দ্বন্দ্ব ক্রমেই তৈরি করছে সংঘাত। টুলো পন্ডিতদের বাড়ির ছেলেপিলেরাই পড়তে চাইছে না টোলে। যেতে চাইছে সরকারী স্কুলে। পড়তে চাইছে সাহিত্য- ইতিহাস- বিজ্ঞান- ইংরেজি। এই সংঘাতকে সামাল দিতে বামুনঠাকুরেরা প্রায় নাজেহাল।
সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় স্কুল হচ্ছে। কিন্তু সেখানে এই শহরের বামুন ঠাকুরদের ঘরের লোকজন চাকরি প্রায় পাচ্ছেই না। কারন, তাদের যোগ্যতা নেই। আধুনিক কালের পড়াশুনোর সঙ্গে তাদের বেশিরভাগের ই সম্পর্ক তো দূরের কথা। পরিচয় ই ঘটে নি। ফলে স্কুলের চাকরিগুলো টপাটপ দখল করে নিচ্ছে সব বাঙাল দেশের ছেলে ছোকরারা। তারা তো আধুনিক সময়ের স্কুল- কলেজে পড়েছে। বি এ, এম এ ডিগ্রি অর্জন করেছে। সেই ডিগ্রির ই তো দাম চাকরির বাজারে। স্কুল – কলেজে। তর্কলঙ্কার, ন্যায়ালঙ্কার, সার্বভৌম, তর্কবাচষ্পতি– এসব উপাধি দিয়ে তো আর যাই হোক নতুন নতুন তৈরি হওয়া স্কুল- কলেজে চাকরি মিলবে না।
মান্ধাতার ঠাকুর্দার আমলের অচলায়তনকে ভেঙে ছেলেদের স্কুল হয়েছে। হয়েছে মেয়েদের ও স্কুল। কিন্তু শুরুর দিকে এইসব স্কুলগুলোতে শিক্ষকতার চাকরি বেশিরভাগ ই স্থানীয় মানুষজনেরা পান নি। না পাওয়ার পিছনে প্রথম এবং প্রধন কারন ছিল, সরকার অনুমোদিত স্কুলে চাকরি পাওয়ার জন্যে যে যোগ্যতার বিষয়গুলো ছিল, তার বেশিরভাগ ই ছিল না স্থানীয় ভটচার্যি বামুনদের ঘরের পুরুষ বা মহিলাদের। স্থানীয় একটি শতাব্দী প্রাচীন স্কুলে একজন মাস্টারমশাই ছিলেন। ধরে নেওয়া যাক, তাঁর নাম ছিল সোমনাথ। সোমনাথ মাস্টার বলে সমাজে তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। আর দশ জনের সঙ্গে তিনি নিজেকে খানিকটা আলাদা করবার চেষ্টা করতেন তাঁর ‘ মাস্টার’ বিশেষণটাকে কাজে লাগিয়ে।
২০২৪ সালের ভাইফোঁটার দিন নৈহাটি লোকালে করে যাচ্ছি দিদির বাড়িতে। আমার কামরাতেই উঠেছে সোমনাথ মাস্টারের দৌহিত্র। কথায় কথায় তাঁর দাদামশাইয়ের কথা উঠলো। ছোটবেলায় অঙ্কে আমি খুব ই কাঁচা ছিলাম। সোমনাথ মাস্টার ছিলেন আমার দাদুর পরিচিত। তাই মাঝেমধ্যে আসতেন আমাদের বাড়িতে। আমাকে ভারি সুন্দর অঙ্কের কিছু ধাঁধা শিখিয়েছিলেন।
ট্রেনে যেতে যেতে সেকথা ওঁর দৌহিত্রকে বললাম। জিজ্ঞেস করলাম; উনি তো অঙ্কের মাস্টারমশাই ছিলেন।
আমতা আমতা করে সেই ছেলেটি উত্তর দিলো; না, উনি লাইব্রেরী সহায়ক ছিলেন।
পঞ্চাশ বছর ধরে যে মানুষটিকে প্রথাগতভাবে একটি সরকার অনুমোদিত স্কুলের মাস্টারমশাই ভেবেছি এবং সমাজে দেখেছি শিক্ষক হিশেবে সোমনাথ মাস্টার কী সম্ভ্রম আদায় করছেন, সেই মানুষটি আদৌ প্রথাগতভাবে ইস্কুলে ছিলেন একজন গ্রন্থাগার সহায়ক, লাইব্রেরিয়ান ও নন?
বিষয়টাতে আশ্চর্ষ হলেও অবাক হই নি। কারন, যে প্রসঙ্গের কথা বলছিলাম, এখানকার বামুন ঠাকুরেরা নিজেদের পুত্র সন্তানদের প্রথাগত শিক্ষার মধ্যে আজ থেকে সত্তর – আশি বছর আগেও আনতে চাইতেন না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই- সোমনাথ মাস্টারের বিষয়টা হলো, সেই বামুন ঠাকুরদের কৃতকর্মের পরিণতি। আর এইসব বামুন ঠাকুরদের বাড়িতে মাঝে মধ্যে যাও বা প্রথাগত পড়াশুনো নিয়ে ব্যতিক্রম দেখা যেত পুত্র সন্তানদের ঘিরে কিন্তু মেয়েদের বেলা নৈব নৈব চ।
তাই এখানে শতবর্ষ প্রাচীন স্কুল থাকলেও সেসব স্কুলে জন্মলগ্নে স্থানীয় বামুন ঠাকুরদের বাড়ির কোনও প্রতিনিধিই প্রায় ছিল না মাস্টারমশাই বা দিদিমণি হিশেবে। এই জায়গাটাতে অবিভক্ত বাংলার কালে দাপট ছিল পূর্ববঙ্গের মানুষদের। যদিও এসব পাশ্চাত্য আর দাক্ষিণাত্য বামুনদের কাছে ‘ বাঙাল’ ছিল কার্যত অস্পৃশ্য।
হাই স্কুলে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের শহরের সমাজপতি বামুন ঠাকুরেরা বিশেষ সুবিধে করে উঠতে না পারলেও নিজেদের নানা ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একেবারে বামুনপাড়ার ভিতরে তারা একটা আধটা প্রাইমারি স্কুল খুলেছিল। সেসব স্কুলে ধীরে ধীরে বামুনবাড়ির ছেলেরা যেতে শুরু করলো। এমন এক স্কুলের নাম মায়ের কাছে শুনেছিলাম, নিভাননী স্কুল। সম্ভবত কোনও ধনী ডাক্তারবাবুর বদান্যতায় সেই প্রাইমারি স্কুলটি তৈরি হয়েছিল। আমার মা সেই স্কুলেই প্রাইমারি পড়েছিলেন। সেই স্কুলের সরস্বতী পুজোতে প্রতিমার সহ মায়েরা কয়েকজন বন্ধু মিলে ছবি তুলেছিলেন। সে ছবি এখনও আমাদের বাড়িতে আছে।
সেই স্কুলে পড়া কেউ ই বোধহয় এখন আর বেঁচে নেই। শহরের কোথায় ছিল সে স্কুল, মায়ের কাছ থেকে তা জেনে রাখাও হয় নি। তবে আমাদের শহরে চা বাগানে কুলি চালান দেওয়ার একটা ব্রিটিশ মালিকানাধীন কোম্পানীর খুব রমরমা ছিল দেশভাগের আগে। নাম ছিল, টি ডিস্ট্রিকস লেবার অ্যাসোসিয়েশন। সংক্ষেপে টি ডি এল এ। এই সংস্থাটি তরাই, ডুয়ার্সের চা বাগানগুলোতে কুলির জোগান দিতো। আসামের চা বাগানগুলোতেও দিতো। বিহার- উত্তরপ্রদেশ থেকে আড়কাঠিরা নিয়ে আসতো মানুষ ধরে। সেসব মানুষদের প্রধান জড়ো করবার জায়গা ছিল আমাদের শহরের একটা প্রান্ত। যা থেকে এলাকাটার নাম হয়ে গিয়েছিলো, কুলিডিপো। এ নাম এখনও আছে। তবে অবাঙালি বাস কনট্রাকটারেরা অবশ্য এই কুলিডিপো করে উচ্চারণ ভেদে এখন করে দিয়েছে,’ কয়লাডিপো’ ।
বামুনপাড়ার প্রাইমারী স্কুলের মধ্যে পাঁচমন্দিরের আশে পাশে ছিল শিবু মাস্টারের স্কুল। টাক মাথা, মুখটা সব সময়েই বেশ হাসিখুশি, ধুতি আর ফতুয়া পড়া শিবু মাস্টারকে কেউ কখনো রিক্সা, বাস বা সাইকেলে চড়তে দেখেছে কি না সন্দেহ। দুই পা ছিল শিবু মাস্টারের সব সময়ে সচল। চাঁদি ফাটা রোদেও শিবু মাস্টার পদাতিক আবার হাড় কাঁটানো মাঘের শীতেও তেমনিই। আর পোষাকেও বদল নেই কোনও।
শিবু মাস্টারের আর একটা পরিচয় ছিল। সে বাঁ হাতে ঘুঁটে দিতো। এই পরিচয়ে শিবু মাস্টারের পরিচিতির গন্ডি এতোটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে,শিবু মাস্টারের ছেলে গোপালকে তার বাবার বাঁ হাতে ঘুঁটে দেওয়া নিয়ে বন্ধু- বান্ধবেরা ক্ষেপাতে ছাড়তো না। এইরকম দু-একটা প্রাইমারি ইস্কুল শহরের আনাচে কানাচে ছিল। তবেসাতের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সেসব স্কুলে ‘ ছোটজাতে’ র লোকেদের ছেলেমেয়েদের পড়বার ব্যাপারটা খুব একটা জলচল ছিল না। অমরকৃষ্ণ পাঠশালার প্রাইমারি সেকশনটা ছিল হাইস্কুলের একটু আগে। শ্যামলদা, শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির ঠিক পাশে। জমিটা ছিল শ্যামলদাদের পারিবারিক। গত এক যুগে যেভাবে সরকারি স্কুলগুলোর গঙ্গাযাত্রা হয়েছে, সেভাবেই চচ্চড়ি পান্ডার সেই স্কুল ও এখন ইতিহাস।
চচ্চড়ি পান্ডা— নামটা শুনেই পাঠক বেশ শিউরে উঠছেন নিশ্চয়ই। কোনও মানুষের আবার এমন নাম হয় নাকি? তাও আবার স্কুল টিচার। সম্ভবত ওই প্রাইমারি স্কুলটার হেড স্যার ছিলেন এই চচ্চড়ি পান্ডা। লোকটার সত্যিই এমন কিম্ভুতুরে নাম, নাকি লোকে তার অমন নাম দিয়েছে- এ নিয়ে সেকালে নানা পরস্পর বিরোধী কথা ছিল। তবে সে কথার রেশ বয়ে চলা মানুষই প্রায় এখন আর নেই। চচ্চড়ি পান্ডার নাম অনেকদিন পরে সেদিন শুনলাম অশোকদার কাছে। অশোক গাঙ্গুলি। না না সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন না ইনি। আমাদের শহর থেকে একটু দূরে ইনচেকে চাকরি করতেন এই অশোকদা। আমাদের শহরে চচ্চড়ি পান্ডার শেষ ডাইরেক্ট ছাত্র। চচ্চড়ি পান্ডার আসল নামটা এখন অনেকেই ভুলে গেছে। বাঁকুড়ার মানুষ ছিলেন ঈশ্বরী পান্ডা। একা থাকতেন। সম্ভবত বিয়ে থা করেন নি। নিজেই রেঁধেবেড়ে খেতেন। বড় ভালোবাসতেন চুনো মাছের চচ্চড়ি খেতে। তাঁর হাতের চুনো মাছের চচ্চড়ি যাঁরা খেয়েছেন, তাঁরা এখনও সে স্বাদ ভুলতে পারেন না। আর এই চচ্চড়ির প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্বের জন্যেই খোদ বাঁকুড়ার ঈশ্বরী পান্ডার নাম হয়ে গেছিল চচ্চড়ি পান্ডা! একটু মোটাসোটা নাদুস-নুদুস গোছের চেহারা। আমাদের এই শহরতলীর জল আলো বাতাসের সঙ্গে বেশ মিশে গিয়েছিলেন। তাঁর হাতে গড়া কতো ছাত্র হয়তো এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জীবনে অনেকেই তাঁরা বেশ ভালো ভাবেই প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু তাঁদের কজনের আর এখন মনে আছে ছোটবেলার প্রাইমারী স্কুলের সেই মাস্টারমশাইকে? আড়ালে আবডালে ছাত্রেরা যে তাঁর নামকরণ করেছে ‘চচ্চড়ি’, এটা নিশ্চয় ই তাঁর অজানা ছিল না। কিন্তু এজন্যে মনেহয় না তিনি কখনও কোনও ছাত্রের উপর বিরক্ত হয়েছেন। কেবলমাত্র তাঁর নামকরণৃর জন্যে কোনও ছাত্রকে মারধোর করেছেন। আসলে সেযুগে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কটা ছিল একদম অন্যরকমের। ছেলেপিলেরা দুষ্টুমি করতো। আবার ভালোওবাসতো শিক্ষকদের। তেমনটাই ছিল শিক্ষকদের দিক থেকেও ছাত্রদের প্রতি আচরণ।
(চলবে)



