পাথর আমার ডাকনাম – পর্ব ১

পাথর আমার ডাকনাম - পর্ব ১

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছেই তার শৈশব অমূল্য সুন্দর এক সম্পদ। যে সম্পদের, যে সৌন্দর্যের কোনও তুলনা হয় না। কেননা শৈশব হল সেই স্বর্গকাল যখন মনের চরাচর জুড়ে থাকে কেবলই নির্মলতা, কেরলই সারল্য। কিন্তু সেই সারল্য, সেই নির্মল ফুলের মধ্যে জীবন যখন ঢুকিয়ে দেয় কু-নিঃশ্বাস, যখন সেই ছোট্ট নির্মল শরীরকেও দংশন করতে ছাড়ে না যৌনতার বিষধর কালসাপ, তখন?

আমার শৈশব আমার কাছে এক আশ্চর্য রহস্যের মহাকাশ— যার অসীম অনন্ত মহাশূন্যে আটকে আছে বহুবিধ বিস্ময় আর অসহায় করুণ কান্নার জলকণারা। সেই অনন্ত অশ্রুই আমাকে বারবার ভেতর থেকে টেনে আনে কলমের কাছে। আমার কান্নারাই আমাকে সাদা পৃষ্ঠা পেতে দেয়, বলে, লেখো, লিখে রাখো তোমার নারীজন্মের অত্যাশ্চর্য সব ইতিহাস। যাতে আগামীতে আর কোনও নিষ্পাপ শিশুর শৈশবকে রক্তাক্ত হতে না হয়। যেন তাকে নিষ্ঠুর, নৃশংস ভাবে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করতে না পারে কোনও বিকৃতকাম পুরুষের যৌনতা — যার গায়ে পরমাত্মীয়ের নাম লেখা।

মানুষের জীবনে যে কত রকমের রোদ্দুর ওঠে! একেক দিনের রোদ্দুরের রং রূপ গন্ধ অনুভূতি ও চরিত্র একেক রকম। একেক দিনের রোদ্দুরের গায়ে লেখা থাকে জীবনের একেক সময়ের বা অবস্থার ইতিহাস। সেই সব ইতিহাসের গায়েও খোদিত থাকে কত রঙবেরঙের সত্য ও স্মরণযোগ্য আলো অন্ধকার! না, অন্ধকার মানেই কিন্তু মিথ্যে নয়। বরং কিছু অন্ধকার আছে যা সত্যের চেয়েও চরম সত্য হয়ে আমাদের জীবনের পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকে। জীবনভর থেকে যায়। অন্ধকারেরও থাকে সেই আশ্চর্য আলো। হ্যাঁ, থাকে। সে আলোটা কেমন? সে-আলো অনেকটা গায়েপড়া মানুষের মতো, পায়ে পায়ে ঘোরা আলতো বেড়ালের মতো সর্বক্ষণের সঙ্গী। ইচ্ছে হলেই মানুষ সেই আলোকে উপেক্ষা করবে বা ভুলে যাবে তারও উপায় থাকে না। কেননা ওই যে বললাম রোদ্দুর! রোদ্দুর ওঠে যে! আর রোদ্দুর এমন এক আশ্চর্য আলো যা মানুষের মনের সমস্ত চরাচরের সঙ্গে সংযুক্ত। সে চরাচরে কখনও কুয়াশা, কখনও ঝকঝকে বিকিরণ কখনও আবার ঘোর দুর্বোধ্যতার খেলা। এই সবকিছুই একজন সচেতন মানুষকে উদ্দীপ্ত করে তোলে নানান অনুভবের আনুষঙ্গিকতায়। যেন বা ফাঁদ পেতে পাখি ধরা! যেন ঘুনি! মানুষের মন যেন ঝাঁক ঝাঁক মাছ! তাকে করায়ত্ত করে, তাকে জাগিয়ে তুলে জোর করে তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া সেই সব দিনের কথা, যেসব দিনের কথা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়াই সুস্থ সুন্দর জীবনের জন্য শ্রেয়।

বাঁচোয়া যে, তেমন রোদ্দুর রোজ দিন ওঠে না। উঠলে যে কী হতো কে জানে! তবে একেক দিন ওঠে। যেদিন ওঠে, সেদিন মনে পড়ে যায়। আবার নতুন করে স্মরণে এসে পৌঁছায় যত কুৎসিত পাঁক আর দুর্গন্ধের একেকটি নর্দমার কথা। মনে পড়ে সেই সব নর্দমার সঙ্গে, সেই সব নর্দমার ধারে কাছে এবং ঘোর অনুষঙ্গে বেড়ে ওঠা আমার শৈশব কৈশোরের নিষ্পাপ দিনগুলোর কথা। খেঁকশিয়ালের মতো, হায়নার মতো, নেকড়ের মতো একেকটি সম্পর্কের হাত থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানো, নিজেকে লুকিয়ে লুকিয়ে আড়াল করে রাখা কি চাট্টিখানি কথা! একটি নিষ্পাপ শিশু কি কখনও অতসব ঘোঁট পাকানো পথে প্রান্তরে সাবধানতার মুখোশ পরে চলতে ফিরতে পারে? মানুষের শিশুকাল তো ঠিকঠাক জীবনকেও চেনে না! চেনে না পালানোর পথ ও পথের নিশানা। সেসব চিনতে গেলে তো বড় হতে হয়! বড় না হলে কি সাবধানতার নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে দাঁড়ানো যায়! মারের বদলা মার সে তো অনেক অনেক পরের খেলা। সে-খেলা শিখতে শিখতে কত কিছুই যে নীরবে নিঃশব্দে হারিয়ে যায়! পবিত্র-অপবিত্র বোধ, ভালোলাগা, ভালোবাসাও কি হারায় না! ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় না আগামী জীবনের অনুপম পথঘাট! হয়তো বা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে শুরু করে স্বপ্নের রাস্তাগুলোও। অন্তর্গত ভাবে, একদম ভেতরে, চেতনার গভীর গভীরতম প্রদেশের মাটির উপাদান ও উর্বরতাও একটু একটু করে ওলোট পালোট হতে হতে পথ ভুল করে চলে যায় অন্য কোনও পথে, যেখানে যাবার কথা ছিল না তার। কে জানে! হয়তো বা তাই হয়! কিংবা হয় না! বিদ্ধস্ত হতে হতে, চাবুক খেতে খেতে, বিস্মিত অবাক হতে হতে হয়তো আরও শক্ত হয়, দৃঢ় হয় চলার পথের মাটি! হয়তো জীবনের লক্ষ্য আরও সুস্থির ও সুগঠিত হয়ে ওঠে! পাথরের মতো অবিচল অচঞ্চল শান্ত ও পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে বিদ্ধস্ত মানুষটির জীবন ও যাপনের যাবতীয় পথ ও পন্থার পরিক্রমণ! কেননা তখন সে ইতিহাস লেখে না, তখন ইতিহাস তাকে লেখে। তাকে পাঠ করে জীবনের যত সৃজনশীল চোখ ও চেতনা। তখন সে আর কোনও আলোর আশায় পথ চেয়ে বসে থাকে না। কেননা তখন আপনাআপনি আলো এসে পড়ে তার মুখের উপর, আর আলো তাকে আশ্রয় করে নিজেই ধন্য হয়ে ওঠে।

মানুষের শরীর বেয়ে যেসব সারমেয়, কেঁচো, কেন্নো, ঘেয়ো, কুৎসিত পোকামাকড় উঠে আসে, মানুষেরই অসাবধানতার সুযোগে কিংবা একটি শিশুর নিষ্পাপ সারল্যের গলিঘুঁজি আর অসহায়তার সুযোগে যেসব দুর্গন্ধ এসে শরীরে মেশে, তার সঙ্গে পবিত্রতা অপবিত্রতার কোনও সম্পর্ক থাকে কি না, সে ভাবনার হদিস মেলা ভার। আর থাকবেই বা কেন! মানুষের শরীর তো নিছকই এক মৃৎপাত্র মাত্র। মন তার চিরন্তন দোসর। সেই মৃৎপাত্রের জলে কোনও লোভাতুর সারমেয় যদি কখনও মুখ ডোবায় তাতে এমন কী আসে যায়! বরং জীবনবোধের গভীরে যেন কোনও চতুষ্পদ কখনও না ঢোকে সেদিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি।

মানুষের জন্ম তো তার নিজের হাতে থাকে না! কে কার ঘরে জন্মাবে, কার শৈশব কোন অনুষঙ্গে কীভাবে কাটবে, কে তাকে ভালোবাসবে, কে তাকে আঁচড়াবে কামড়াবে, কে তার কচি যৌনাঙ্গকে আশ্রয় করে হাত পাকাবে নিজের যৌনবিকৃতির চাতুর্য-খেলা, কে তাকে আলোয় নিয়ে যাবে, আর কে নিয়ে যাবে অন্ধকারে— তার আগাম আভাস কিংবা পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্ঘণ্ট জানা কারও পক্ষেই কি সম্ভব?

                                                                      [চলবে]


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top