মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস-পর্ব ১

mystery and intrigue on a table

গত শতাব্দীর কাহিনি, ১৯৩৪ সালে লেখা। ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে। লেখিকা আগাথা ক্রিস্টি। আধুনিক গোয়েন্দা কাহিনীর অন্যতমা পথিকৃৎ। পৃথিবী বিখ্যাত এই উপন্যাসটি একাধিকবার একাধিক ভাষায় সিনেমা, সিরিয়াল এবং সিরিজ ইত্যাদি হয়েছে। এবার সমগ্র উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ পেতে চলেছে আবর্ত অনলাইন পত্রিকায়।

স্থান সিরিয়া। এই সময় সিরিয়া ফ্রান্সের অধীনস্থ একটি উপনিবেশ। সেখানকার এক সামরিক গোলযোগের কারণে ডিটেকটিভ এরকুল পোয়ারো এসেছেন সিরিয়ায়। তিনি ফেরত যাবেন লন্ডনে।

সময় আন্দাজ ভোর পাঁচটা। সবে শীত শুরু হয়েছে। ভোর হতে শুরু হয়েছে। এই দিকটাতে ঠান্ডা সবে পড়তে শুরু করেছে, যদিও পূর্ব ইউরোপের অনেক জায়গা ইতিমধ্যেই বরফের তলায় চলে যেতে শুরু করেছে। তুষার ঝড়ও একটু আধটু শুরু হয়েছে। সেই সময় সিরিয়ার আলেপ্পো স্টেশনে ট্রেন ধরার জন্য এরকুল পোয়ারো এসে দাঁড়িয়েছেন। এখান থেকেই এই কাহিনীর সূত্রপাত।

যে সময়ের কথা বলছি সেই সময় পৃথিবী এখনকার মতো বিমান পথে যুক্ত ছিল না। যাতায়াতের ব্যবস্থার মূল ব্যবস্থাই ছিল জলপথ। জলপথে যাতায়াত ছিল অনেক সময়সাপেক্ষ এবং বিপদসংকুলও। এরই জন্য বিভিন্ন আন্ত:মহাদেশীয় রেলপথই সমাজের উচ্চশ্রেণির ব্যস্ত মানুষজন যাতায়াতের জন্য ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। ডিটেকটিভ এরকুল পোয়ারো একে বিখ্যাত তায় ব্যস্ত মানুষ, তাঁকে লন্ডন ফিরতে হবে। সিরিয়া থেকে লন্ডন ফেরার জন্য সেকালের বিখ্যাত ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের কানেক্টিং ট্রেন ধরতে এসেছেন স্টেশনে।

ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের ভিতর দিয়ে একেবারে লন্ডন পর্যন্ত যাবার জন্য সে যুগে সব থেকে জনপ্রিয় ছিল ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, দ্য সিম্পলন ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস। সেই ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের কানেক্টিং ট্রেন টরাস এক্সপ্রেস ধরার জন্য এসে দাঁড়িয়েছেন সিরিয়ার এই আলেপ্পো স্টেশনে। তুলে দিতে এসেছেন ফরাসি সেনাবাহিনীর একজন পদস্থ অফিসার।

ইস্তাম্বুল থেকে ফ্রান্সের ক্যালে হয়ে লন্ডন যাবার পথে বলকান অঞ্চলে দ্বিতীয় দিনেই প্রচণ্ড তুষারপাতে আটকে পড়ে এই ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস। আটকে পড়া ট্রেনের কুপেতে আবিষ্কৃত হয় আমেরিকান ধনকুবের মিঃ রাশেটের মৃতদেহ। প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে খুনি লুকিয়ে আছেন যাত্রীদের মধ্যেই। নেই কোনো বাইরের বিশ্বের সাথে যোগাযোগের রাস্তা, নেই কোনো তদন্তের আধুনিক সরঞ্জামও। আটকে পড়া ট্রেনের যাত্রীরাও সব সমাজের উঁচু তলার মানুষ। নেই ইন্টারোগেশনে কোনো রকম ট্র্যাডিশন্যাল পদ্ধতি প্রকরণ প্রয়োগের সুযোগও। প্রচণ্ড আতঙ্ক যাত্রীদের মধ্যে, নেমে আসবে কী আর কারও উপরে রাশেটের পরিণতি?

কিন্তু না, আছেন এরকুল পোয়ারো এবং তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘গ্রে ম্যাটার’—কীভাবে হল রহস্যের সমাধান? আসুন জানা যাক টানটান রহস্য ও উত্তেজনায় ভরা ‘মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ এর কাহিনি।

পর্ব-১

পূর্ব দিগন্তে তখনও রঙের ছোপ লাগতে শুরু করেনি। হাড় কাঁপানো শীত। সময় তখন ভোর পাঁচটা। স্টেশনে রাজকীয় সমারোহে দাঁড়িয়ে টাউরাস এক্সপ্রেস। ট্রেনটা যে খুব বিরাট এমনটা নয়, একটি স্লিপার কোচ, খান দুয়েক জেনারেল কম্পার্টমেন্ট এবং একটি কিচেন কাম ডাইনিং কোচ, কিন্তু বেশ জমকালো।

স্লিপার কোচের দরজায় দু-জন লোক দাঁড়িয়ে। একজন জমকালো ফরাসি সামরিক পোশাকে দীর্ঘকায় এক তরুণ সামরিক অফিসার, ইনি লেফটেন্যান্ট দুঁবো। অন্যজন ছোটখাটো চেহারার বয়স্ক এক ব্যক্তি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক বেশ শীতকাতুরে। এই প্রবল ঠান্ডার জন্য তাঁর আপাদমস্তক ঢাকা গরম পোশাকে। চোখে পড়ছে কেবলমাত্র গোলাপি নাকের ডগাটুকু এবং তার পাশে সযত্নে পাকানো পেল্লায় গোঁফের দুই প্রান্ত, ইনি এরকুল পোয়ারো, বিশ্ববিখ্যাত ডিটেকটিভ।

winter night at the train doorway

এই ঠান্ডায় কাউকে বিদায় জানাতে আসা বেশ কষ্টকরই, তবু লেফটেন্যান্ট দুঁবো আসতে বাধ্য হয়েছেন তাঁর বড় কর্তার নির্দেশে। এই ভদ্রলোকের সিরিয়া আসার কারণ কিন্তু দুঁবো সঠিক জানেন না। আন্দাজ করেছেন ইনি একজন কেউকেটা। ইনি আসার পরই বাহিনীর মধ্যে ক্রমান্বয়ে ঘটে যাওয়া নানা রকম অস্বাভাবিক ঘটনা বন্ধ হয়ে যায়।

ইনি আসার আগে হঠাৎই একজন উচ্চপদস্থ অফিসার আত্মহত্যা করেন, আর একজন পদত্যাগ করে বসেন, সব মিলিয়ে বেশ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। জেনারেল-সহ বাহিনীর উপর মহলের কর্তাব্যক্তিদের চোখেমুখে তখন মাত্রাছাড়া টেনশন ও ভয়ের কালো ছায়া। এই ভদ্রলোক আসার পরই যেন ম্যাজিকের মতোই সব আবার আগের অবস্থায় ফিরে এল, কর্তাব্যক্তিদের উদ্বিগ্ন মুখগুলোয় আবার প্রশান্তি ফিরে এল। তাছাড়া বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত বাহিনীপ্রধানের সাথে এই ভদ্রলোকের কথাবার্তাগুলোও দুঁবোর কানে এখনও বেশ টাটকাই। আবেগে থরথর বাহিনীপ্রধান বলছিলেন, ‘ওহ, শুধু একটা অনুরোধে আপনি এসে পড়েছিলেন বলেই এ যাত্রায় ফরাসি বাহিনীর সম্মানটুকু বাঁচল, বহু রক্তপাতের হাত থেকে আপনি আমাদের বাঁচিয়ে দিলেন। কী বলে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাব, বুঝতে পারছি না।’

প্রত্যুত্তরে এই ছোটখাটো ভদ্রলোক স্বভাবসুলভ বিনয়ে জানালেন, ‘এ তো আমার কর্তব্য, তাছাড়া আপনিও একসময় আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।’ বিনয়ের মোড়কে প্রচ্ছন্ন অহংবোধও খানিক ফুটে বেরুচ্ছিল।

এ হেন ভদ্রলোক কেউকেটা ছাড়া কিছু হতেই পারে না। পদোন্নতির আশায় বাহিনী প্রধানের এ হেন বিশেষ অতিথির মনোরঞ্জনে লেফটেন্যান্ট দুঁবো বাঘা শীত উপেক্ষা করেই তোষামোদের কোনো খামতি রাখছিলেন না। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয় তাই করছিলেন। ট্রেন ছাড়া অবধি সঙ্গ দেওয়ার অছিলায় ইউরোপের আবহাওয়া থেকে যাত্রাপথের নানান প্রসঙ্গের অবতারণা করে চলেছিলেন।

দুঁবো— আজ রবিবার, আশা করছি আপনি কাল সন্ধ্যার মধ্যে ইস্তাম্বুল পৌঁছে যাবেন।

পোয়ারো— তাই তো মনে হচ্ছে।
দুঁবো— ওখানে কদিন কাটাবেন নিশ্চয়?

পোয়ারো— ইস্তাম্বুল কখনও যাইনি। ইচ্ছা আছে শহরটা একটু ঘুরেঘুরে দেখার। খুব সুন্দর শহর শুনেছি। আসা হয়নি কখনও।

লা সেঁ সোফি-ও খুব সুন্দর। আমিও গেছি বারদুয়েক ওই দিকে। তবে ঘুরে দেখা হয়নি। শুনেছি খুবই সুন্দর।

এই সময় কনকনে এক দমকা বাতাস স্টেশন চত্বর দিয়ে বয়ে গেল, দু-জন তাতে কেঁপে গেলেন। লেফটেন্যান্ট ঘড়ির দিকে তাকালেন।

night at the train station

দুঁবো— পাঁচটা বাজতে পাঁচ, আর মিনিট পাঁচেক পরেই ট্রেন ছাড়বে। (স্লিপিং কোচের বন্ধ কামরাগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে) বছরের এই সময়টাতে খুব কম যাত্রীই যাতায়াত করেন।

পোয়ারো— ঠিকই বলেছেন।

দুঁবো— ঠান্ডা যা পড়েছে, ঈশ্বর করুন লাইনে বরফ জমে না আবার ট্রেন ফেঁসে যায়।

পোয়ারো— এমনটাও হয় নাকি?

দুঁবো— আগে দু-একবার হয়েছে। এ বছর অবশ্য এখনও একবারও এমনটা হয়নি।

পোয়ারো— দেখা যাক, তার পর কপালে যা আছে। ইউরোপের ওয়েদার রিপোর্ট কী বলছে?

দুঁবো— খবর যা পাচ্ছি তা বেশ খারাপই। বলকান অঞ্চল তো ইতিমধ্যেই বরফের তলায় যেতে শুরু করেছে।

পোয়ারো— হ্যাঁ, খবর তেমটাই পেয়েছি। জার্মানিতেও নাকি বরফ পড়া শুরু হয়ে গেছে।

দুঁবো— খবর ঠিকই। (একটু থেমে) সব ঠিকঠাক চললে আপনি কাল সন্ধ্যা ৭টা ৪০-৪৫ নাগাদ কনস্টান্টিনোপল পৌঁছে যাবেন।

পোয়ারো— দেখা যাক, এবার লা সে সোফি দর্শন বারাতে জোটে কি না। শুনেছি খুবই সুন্দর।

দুঁবো— অপূর্ব, লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট।

ওনারা যখন কথাবার্তা চালাচ্ছিলেন, লক্ষ্য করা গেল যে স্লিপার কোচের একটি জানলা ধীরে ধীরে খুলে গেল। জানলা দিয়ে মাথা বাড়ালেন একজন তরুণী। ইনি ইংরেজ, মেরি ডেবেনহ্যাম, আসছেন বাগদাদ থেকে।

গত বৃহস্পতিবার বাগদাদ থেকে রওনা দিয়েছেন। সেখান থেকে কিরকুক আসার ট্রেনে বা পথে, মসুলের রিটায়ারিং রুমে কিংবা গতকাল রাতে এই ট্রেনে, কোথাও ভালোভাবে ঘুমোতে পারেননি। বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা কিন্তু ট্রেনের ভিতরটা ফায়ারপ্লেসের কল্যাণে বেশ গরম এবং একই সাথে বেশ ভ্যাপসা, হাঁফ ধরে যায়। এক ঝলক মুক্তবাতাসের সন্ধানে ভদ্রমহিলা একটু জানলা খুলতে বাধ্য হয়েছেন। লক্ষ্য করলেন আলো-আঁধারিতে ঘেরা একটা স্টেশন, বোর্ডে লেখা স্টেশন আলেপ্পো। আরবি ভাষায় কিছু সাইনবোর্ড-পোস্টারও নজরে পড়ল। আর নজরে পড়ল কোচের ঠিক দরজায় দু-জন দাঁড়িয়ে, একজন বেশভূষায় ফরাসি সামরিক অফিসার, অন্যজন আপাদমস্তক শীতবস্ত্রে মোড়া ছোট্টখাটো একটি মানুষ। নাকের ডগা আর জাঁদরেল গোঁফ ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।

কন্ডাক্টরকে দুজনের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়েছে। টুপি খুলে ছোটখাটো মানুষটি ট্রেনে উঠে পড়লেন। টুপি খোলা অবস্থায় পোয়ারোকে দেখে মেরি ডেবেনহ্যামের খুব হাসি পেয়ে গেল। ডিমের মতো গোল মাথাটা।

ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টি বাজল। লেফটেন্যান্ট দুঁবো চর্চিত ফরাসিতে এরকুল পোয়ারোর উদ্দেশ্যে মুখস্থ করা বিদায়বাণী আউড়ে গেলেন। পারস্পরিক হাত নাড়ানাড়ির মধ্য দিয়ে টউরাস এক্সপ্রেস ছেড়ে গেল।

মালপত্র-সহ কন্ডাক্টর পোয়ারোকে নির্ধারিত সিটে এনে হাজির করলেন। অভ্যস্ত ব্যস্ততায় জিনিসপত্র গুছিয়েও দিলেন। বখশিস লাভের আশায় ইঙ্গিতপূর্ণভাবে হাত বাড়িয়ে জানালেন,

কন্ডাক্টর— ‘স্যার, এই আপনার সিট, জমিয়ে বসুন।’

এরকুলও বিনাবাক্যে প্রাপ্যমিটিয়ে সিট দখল করলেন।

কন্ডাক্টর— আপনার পাসপোর্ট-টিকিট সব আমার কাছেই আছে, আপনি সরকারি অতিথি। ইস্তাম্বুল যাবেন নিশ্চয়ই।

পোয়ারো (ঘাড় নেড়ে)— হ্যাঁ, ইস্তাম্বুল। খুব বেশি যাত্রী এখন নেই বোধহয়।

কন্ডাক্টর— ঠিকই ধরেছেন। মাত্র দু-জনই আছেন। দু-জনই ইংরেজ, একজন কর্নেল ভারত থেকে ফিরছেন, অন্যজন ইংরেজ তরুণী, মেরি ডেবেনহ্যাম, আসছেন বাগদাদ থেকে।

পোয়ারো— গরম কিছু পাওয়া যাবে? একে তো এই শীতের ভোরে ট্রেন ধরা, তার ওপর যা ঠান্ডা! হাড় পর্যন্ত কেঁপে যাচ্ছে।

কন্ডাক্টর— অবশ্যই।

পানীয় আসতেই পোয়ারো ঢকঢক করে প্রায় গোটা বোতলটাই গলায় ঢেলে দিলেন। ফরাসি সেনাবাহিনীর এই গোপন মিশনটায় নার্ভের ওপর খুব চাপও গেছে কদিন, তাছাড়া ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটেছে ভালোই। পানীয় শেষ করে পোয়ারো গুটিসুটি মেরে নিজের বার্থে শুয়ে পড়লেন, ঠিকঠাক সকাল হতে এখনও ঘন্টা দুয়েক বাকি।

ঘুম যখন ভাঙল প্রায় বেলা সাড়ে নয়টায়। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে গরম কফির সন্ধানে পোয়ারো পা বাড়ালেন ডাইনিং কোচের দিকে। ডাইনিং কোচ ফাঁকাই, শুধু একজনই বসে আছেন। ভোরে দেখা সেই ইংরেজ তরুণী। এবার পোয়ারো ভালো করে লক্ষ্য করলেন। ইনিই তাহলে মেরি ডেবেনহ্যাম। লম্বা, স্লিম এবং গায়ের রং একটু চাপা। বয়স আন্দাজ ২৮-৩০। চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস প্রবল এবং ভাবভঙ্গিমায় বেশ চটপটে। পরনে ডার্ক ট্রাভেলিং স্যুট। কফির জন্য বেয়ারাকে যে ভাবে অর্ডার দিলেন তাতে বোঝা যায় যে, মহিলা একাকী ট্রাভেলিং-এ অভ্যস্ত।

বেয়ারাকে ডেকে পোয়ারো ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিলেন। হাতে তেমন কোনো কাজ নেই। এরকুল মেতে উঠলেন তাঁর ফেবারিট হবিতে, চেহারা দেখে চরিত্র আন্দাজ করার খেলায়। খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন মেরি ডেবেনহ্যামকে। গভীর, শীতল বাদামি কিন্তু উদাসীন চোখ। মাথায় একরাশ কালো ঢেউ খেলানো রেশমি চুল। চোখ-মুখ চোখা। ব্যক্তিত্ব প্রখর, ডমিনেটিং, দেখে মনে হচ্ছে হারা ম্যাচও খেলতে নেমে জেতারই চেষ্টা করে থাকেন। সব মিলিয়ে বেশ আকর্ষণীয়ই।

mystery at the vintage dining car

এরই মধ্যে আর একজন ডাইনিং কোচে প্রবেশ করলেন। সুগঠিত, মেদহীন, তামাটে চেহারা। দৃঢ় সুগঠিত চোয়াল, চওড়া কপাল, কপালের দুপাশে এন্ডোজেনিক টেম্পোরাল ব্লান্ডনেস। বয়স ৪০-৪৫ হবে।

পোয়ারো— (স্বগতক্তি করলেন) ও, ইনি তাহলে কর্নেল, কর্নেল আবার্থনট

সোজা গিয়ে হাজির হলেন মিস ডেবেনহ্যামের টেবিলের কাছে। তরুণী ঈষৎ ঝুঁকে অভিবাদন জানালেন। প্রত্যুত্তরে কর্নেলও মাথা ঝোঁকালেন।

কর্নেল— গুড মর্নিং, আমি কি আপনার সাথে টেবিল শেয়ার করতে পারি?

মেরি— স্বচ্ছন্দে। বসুন বসুন। কোনো অসুবিধা নেই।

এরপর কর্নেল একবার পোয়ারোর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, মনোযোগ দিলেন বলে মনে হলো না। বেয়ারাকে হাতের ভঙ্গিতে ডেকে ডিম আর কফির অর্ডার দিলেন।

এরকুল পোয়ারোর কাজ বাড়ল, একের জায়গায় দু’জন ‘স্টাডি সাবজেক্ট’ জুটল। আপাত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ওই জোড়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভদ্রমহিলা এবং কর্নেল দু-জনেই ইংরেজ। কাজেই খুব জমিয়ে গল্প-টল্প করতে পারেন বলে মনে হলো না। টুকটাক কথাবার্তা চলছিল।

কিছুক্ষণ পরে মেরি ডেবেনহ্যাম বিদায় নিয়ে উঠে পড়লেন, গেলেন স্লিপিং কোচের দিকে।

এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল দুপুরের খাবার সময়ও। টুকটাক কথাবার্তাই চলতে লাগল কর্নেল এবং মেরির মধ্যে। ঘরের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ পোয়ারোর উপস্থিতি সম্পর্কে তারা যে সচেতন, এমনটা মনে হচ্ছে না। তবে দু-জনের মধ্যেই সকালের থেকে আলাপ-আলোচনায় খানিকটা সহজভাব লক্ষ্য করা গেল। জানা গেল যে মেরি বাগদাদে গভর্নেসের কাজ করেন এবং ছুটিতে বাড়ি ফিরছেন। আবার্থনটও তাঁর কাজের জায়গা ইন্ডিয়ার পাঞ্জাব প্রদেশ নিয়ে টুকিটাকি আলোচনা করছিলেন। দু-জনেরই চেনা লন্ডনের কিছু পরিবার নিয়েও তাদের আলোচনা বেশ জমেই উঠেছিল। কর্নেল এবার তাদের ফেরার প্রসঙ্গ পাড়লেন।

কর্নেল— আপনি কি সরাসরিই ইংল্যান্ডে ফিরছেন, না কদিন ইস্তাম্বুলে কাটিয়ে তারপর?

মেরি— না না, আমি সরাসরিই ফিরব।

কর্নেল— সত্যিই?

মেরি— একদমই তাই। বছর দুয়েক আগেই এমনই এক ফেরার পথে আমি ইস্তাম্বুলে দিন তিনেক কাটিয়েছি, তাছাড়া–

কর্নেল— এ তো বেশ ভালো ব্যাপার। আপনার মতো সহযাত্রী পেলে বর্তে যাই। (কর্নেলের মুখেচোখে হাজার ওয়াটের বাল্বের ঝলকানি লক্ষ্য করা গেল।)

পোয়ারো— (স্বগতক্তি করে) হুঁ, কর্নেল ফেঁসেছেন মনে হচ্ছে। এ তো দেখছি দূরপাল্লার ট্রেনযাত্রাও সমুদ্রযাত্রার মতোই চার চোখের খেলার লীলাক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াল।

মেরি— তবে বেশ ভালোই হবে। (আড়ষ্টতা এরকুলের নজর এড়াল না।)

লাঞ্চের শেষে মেরির সাথে কর্নেল ডাইনিং কোচ ছেড়ে স্লিপারের দিকে রওনা দিলেন। এরকুল সবই লক্ষ্য করলেন, কিন্তু ওরা এরকুলের উপস্থিতিকে পাত্তা দিল বলে মানে হল না।
লাঞ্চের পর আরও ঘনিষ্ঠ ভাবেই ওদেরকে ট্রেনের করিডরে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেল। টউরাসের খোলা জানলা দিয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে মেরি মাঝে মধ্যেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন, কর্নেল স্বভাবসুলভ চুপচাপই সঙ্গ দিচ্ছিলেন। হঠাৎই নয়নাভিরাম এক দৃশ্য দেখতে দেখতে উত্তেজিত মেরির মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,

mountain views from the moving train

মেরি— ‘ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে?’

কর্নেল— কী?

মেরি— ইচ্ছে করছে এসবের মধ্যে হারিয়ে যেতে।

কর্নেলের শক্ত চোয়াল শুধু আর পর্দা শক্ত হল।

কর্নেল— ঈশ্বরের দোহাই, আপনি এসব থেকে বেরিয়ে আসুন।

এরকুল ওদের কাছাকাছিই ছিলেন। সেদিকে ইঙ্গিত করে মেরি ডেবেনহ্যাম বললেন,

মেরি— চুপ। আপনি ও কথা উচ্চারণও করবেন না।

কর্নেল— ওকে ওকে, অল রাইট। (এরকুলের দিকে বিরক্তি নিয়ে একবার তাকিয়ে) তবে আমি বারবারই বলছি, আপনি ওই গভর্নেসের কাজটা ছাড়ুন। দজ্জাল মা আর দস্যি ছেলেপুলে সামলানো কি কম ঝক্কির!
মেরি— (স্বভাববিরুদ্ধ প্রগলভতার হাসি হেসে) ওসব নিয়ে চিন্তা করবেন না। সেসব দিন আর নেই। অত্যাচারী মা আর নিষ্পেষিত গভর্নেসের কাহিনির দিন শেষ। এখন বাপ-মায়েরাই আমাদের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে, সমঝে চলে।
আবার্থনট চুপ করেই রইলেন।
পোয়ারো— (স্বগতক্তি করে) কী সব নাটকের সাক্ষী হচ্ছি রে বাবা!
রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ ট্রেন এসে পৌঁছাল কোনিয়ায়। দুই ইংরেজ যাত্রী পায়ের আড় ছাড়তে স্টেশনে নামলেন। জানলা দিয়েই পোয়ারো স্টেশন চত্বরের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। একটানা অনেকক্ষণ বসে আছেন, ভেতরটাও বেশ ফায়ারপ্লেসের আগুনে গুমোট গরম লাগছে। মিনিট দশেক পরে ভালো করে শীতবস্ত্র জড়িয়ে এরকুল একটু হাঁটাহাঁটি ও মুক্ত বাতাসের জন্য প্ল্যাটফর্মে নামলেন। যাচ্ছিলেন ইঞ্জিনের দিকেই। ইঞ্জিনের ছায়ায় স্টেশনের আলো-আঁধারিতে লক্ষ্য করলেন দুটি ঘনিষ্ঠ ছায়ামূর্তি। বুঝতে পারছিলেন ওরা কারা, হঠাৎই কানে এলো পরিচিত গলা।

কর্নেল— মেরি!

মেরি শশব্যস্ত হয়ে তাঁকে থামালেন।

মেরি— না না, এখনই এসব নয়। আগে সব ভালোয় ভালোয় মিটুক। মাথায় এত চাপ নিয়ে—

পোয়ারো ওদিক আর পা বাড়ালেন না। মিস ডেবেনহ্যামের গলার স্বর বুঝতে তাঁর কোনো অসুবিধাই হয়নি।

পোয়ারো— (স্বগতক্তি) কী অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার!

পরের দিনটায় তেমন নতুন কিছু ঘটল না। তবে কর্নেল ও মেরি জুটি বেশ চুপচাপ, একে অপরের সাথে কথাবার্তাও বিশেষ বলছে না; মনকষাকষি হয়ে থাকতে পারে। মেরির চোখের নীচের ডার্ক সার্কেল স্পষ্ট, হয়তো রাতে ভালো ঘুম হয়নি। বেলা আড়াইটে নাগাদ হঠাৎই ট্রেন দাঁড়িয়ে গেল। জানলা দিয়ে যাত্রীরা সব উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। রেললাইনের পাশে ডাইনিং কোচের কাছে একটা ছোট জটলা, সবাই কোচের তলায় হাত বাড়িয়ে কিছু একটা দেখানোর চেষ্টা করছে। কন্ডাক্টর হন্তদন্ত হয়ে করিডর ধরে যাচ্ছিলেন, পোয়ারো নিজের সিট থেকে ঝুঁকে গোলমালের কারণ জানতে চাইলেন। পোয়ারোকে উত্তর দিয়ে কন্ডাক্টর ফিরতে গিয়ে দেখলেন পিছনে প্রায় ঘাড়ের ওপর উদ্বিগ্ন মুখে মিস ডেবেনহ্যাম।

mystery aboard the vintage train

মেরি— (প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে) কী হয়েছে মিস্টার কন্ডাক্টর? ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ল কেন?

কন্ডাক্টর— (আশ্বস্ত করে) সিরিয়াস কিছু নয়। ডাইনিং কোচের নীচে কিছু একটা আগুন ধরে গিয়েছিল। আগুন নেভানোও হয়ে গেছে, এখন মেরামতির কাজ চলছে। ভয়ের কিছু নেই, নিশ্চিতে থাকুন।

মেরি— সে না হয় বুঝলাম, আগুনের ভয় নেই কিন্তু সময়? সময়ের কী হবে?

কন্ডাক্টর— সময়?

মেরি— এই সব মেরামতির কাজ তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, এতে তো দেরি হয়ে যাবে।

পোয়ারো— সেটা অবশ্য একটা ব্যাপার, দেরি তো হতেই পারে।

মেরি— কিন্তু আমার পক্ষে দেরি করা সম্ভব নয়। এই ট্রেনের পৌঁছানোর সময় ৬.৫৫, তার পর বসফরাস প্রণালী পেরিয়ে তবে রাত ৯-টার সিম্পলন ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস ধরা। দু-চার ঘণ্টা দেরি হলেই ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস মিস করব, সেটা অসম্ভব।

কন্ডাক্টর— (অনিশ্চিতভাবে) তার একটা সম্ভাবনা অবশ্য থেকেই যায়।

মেরির উদ্বেগের পারদ চড়ল। এক প্রকার টলে গিয়ে জানলার রড ধরে সামলালেন। হাত থেকে ঠোঁট সবই তখন তিরতির করে কাঁপতে শুরু করেছে। মেরির এই উদ্বেগ দেখে…

কন্ডাক্টর— ম্যাডাম, আপনি এত উদ্বিগ্ন হচ্ছেন কেন? এতে কি আপনার বিরাট কিছু ক্ষতি হয়ে যাবে?

মেরি— (হিস্টিরিয়াগ্রস্তভাবে) বিরাট! বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। আমাকে যে কোনো মূল্যে ওই ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসই ধরতেই হবে।

এক প্রকার টলতে টলতে করিডর ধরে কর্নেলের দিকে চলে গেলেন। কার্যত দেখা গেল মেরি মিথ্যাই টেনশন করছিলেন। দশ মিনিটের মধ্যে ট্রেন আবার চলতে শুরু করল। গন্তব্যে পৌঁছাতে মাত্র ৫ মিনিট দেরি হল। বসফরাস প্রণালী এদিন ছিল বেশ বিক্ষুব্ধ। লঞ্চে পার হতে সবার বেশ কষ্টই হল। লক্ষ্য অবশ্য ট্রেনের ওই দুই ইংলিশ যাত্রীর সাথে পোয়ারোর আর দেখা হয়নি। প্রণালী পেরিয়ে লন্ডন থেকে নামলেন গ্যালান্ট ব্রিজে। এরপর গাড়ি নিয়ে এরকুল সোজা গিয়ে উঠলেন ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত হোটেল তোকাৎলিয়ানে।

poirot arrives at the tokatlian hotel

ক্রমশ

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস-পর্ব ২


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top