সকালের ঘুম ভাঙার পরেই অনেকের মতন আমার আঙুল স্ক্রিনে চলে যায়। একের পর এক ছোট ছোট ভিডিও আর, রিলস দেখতে দেখতে সকালের ঘুমটা ভাঙ্গে কিন্তু আজকে যেটা দেখে চোখ টা আটকে গেল সেটা হল শোলে সিনেমার সেই বিখ্যাত দোল সংক্রান্ত সংলাপ টার রিলস এর কাছে মনে করুন সেই সংলাপ—“হোলি হ্যায় ভাই, হোলি হ্যায়। বুরা না মানো, হোলি হ্যায়।” দৃশ্যটিতে দেখা যায় বয়স্ক সঞ্জীব কুমার-এর গায়ে মেয়ের বয়সী জয়া ভাদুড়ি বিনা অনুমতিতে রং দিচ্ছেন। এই দৃশ্য আমাদের সকলকেই নস্টালজিক করে তোলে; মনে করিয়ে দেয় দুষ্টুমি ভরা ছেলে বেলার কথা। পিচকিরির জলে গোলা রং, বেলুনে ভরা রং—কারও সম্মতি ছাড়াই তার গায়ে ঢেলে দেওয়া। সেই দৃশ্য যেন আমাদের শিখিয়ে দেয়—উৎসব মানেই অনুমতি-ছাড়া একটু ছোঁয়া, একটু বাড়াবাড়ি, একটু বাড়তি সাহস।
কিন্তু বড় হয়ে বুঝেছি—এই সংলাপটি নিছক সিনেমার সাধারণ সংলাপ নয়; এটি একটি সামাজিক বাক্যবিন্যাস এর ভেতর লুকিয়ে আছে এক গভীর তাৎপর্য।। “বুরা না মানো”—মানে আগেই এখানে বলে দেওয়া হচ্ছে, তোমার আপত্তির কোনো জায়গা নেই। আজ উৎসবের দিন। আজ নাকি সকলের শরীরের চারপাশের অদৃশ্য সীমানাগুলো আলগা। আজ ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করা অভদ্রতা।
এই ধারণাটাই আজ আমাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলে। আমাকে বহু প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
গল্প এক
তখন আমরা উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র, বলাগড় উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ি। সেই সময় “মাথা ফাটা রঙ” নামে এক ধরনের বিশেষ রঙের জনপ্রিয়তা হয়েছিল। এর বৈশিষ্ট্য ছিল—মাথায় একটুখানি ছড়িয়ে দিলে কিছুক্ষণ পর ঘামের সঙ্গে জলের মতন গলে লাল রং রক্তের মত মাথা থেকে গড়িয়ে গায়ে নামত। জল দিয়ে যত ঘষা হত বা তোলার চেষ্টা করা হতো, ততই রং আরও ছড়িয়ে পড়ত সারা শরীরে।আমরা শ্রেণিকক্ষের মধ্যেই বিনা অনুমতিতে আমরাই অন্যায় কাজটা আমাদের কয়েকজন বান্ধবীর মাথায় দিয়েছিলাম। তখন সেই বয়স ন্যায়-অন্যায়ের স্পষ্ট বোধ ছিল না। আবেগেই চলতাম। সেদিন আমাদের কোনো শাস্তি হয়নি। প্রধান শিক্ষক শুধু বলেছিলেন, “দোল যদি খেলবিই, আগে থেকে জানালে তোদের জন্য বসন্ত উৎসব এর ব্যবস্থা করতাম।”
নব্বই দশকে দোল ধীরে ধীরে প্রথার সীমা ভেঙে ফেলছিল। সম্মতি না নিয়ে আগাম রং দেওয়া-নেওয়া শুরু হয়ে যাচ্ছিল—যা তখনও অনেকের চোখেই ছিল অস্বাভাবিক আজ সেই অস্বাভাবিকতাই যেন পাকিস্তানি স্বীকৃতি পেয়ে গেছে।
গল্প দুই
আমি গ্রামের দোলে দেখেছি—নেড়া পোড়া, কীর্তন, বড়দের পায়ে আবির দেওয়া, প্রণাম, মঠ ফুট কড়াই—সবই ছিল, এখনো আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল আরেকটি চেহারা—দখল দারির মেজাজ। আমাদের দোল গুলোর মধ্যে এক ধরনের আধিপত্যের মনোভাব কাজ করত।অনেকেই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের ধরে টেনে রঙ মাখাত। কেউ গালে রং দেওয়ার অজুহাতে গোপনাঙ্গে হাত দিত, কেউ পেছন থেকে হঠাৎ চেপে ধরত। এই অসভ্যতাগুলোও উৎসবের আড়ালে চলত। কেউ প্রতিবাদ করলে উত্তর আসত—“উৎসবের দিন এত ভাবছিস কেন?” তখনই সেই শোলে সিনেমার ডায়লগের মর্মার্থ বেরিয়ে পড়ত—“বুরা না মানো, আজ হোলি হ্যায়।”
অনেকেরই পাড়াগাঁয়ের লোকদের কাছে মনে থাকবে গ্রামের দোল গুলোতে কোথাও গায়ে আলকাতরা মাখিয়ে দেওয়া । কারও মাথায় নর্দমার জল ঢেলে দেওয়া। চিটে গুড় গায়ে মাখানো এগুলো ছিল অত্যন্ত মামুলি ব্যাপার। ওমকার দিনে দুপুর অব্দি অপেক্ষা করতে হয় না সকালবেলাতেই বেরোচ্ছে মদের বোতল। মাতলামির দাপটে রাস্তাঘাট দখল। ডি যে নাম ক শব্দ দানবের চিৎকার রঙের নামে কাদা, কাদা থেকে কদর্যতা।
এই সব দৃশ্যে গুলো ভাবলেই আমার মনে হয়েছে—এটাই কি সেই বসন্ত উৎসব বা দোল উৎসবের সার্থকতা? নাকি এটি শরীর দখলের মহড়া?
দোল বা হোলি বসন্তের উৎসব। বৈষ্ণব পদাবলিতে না রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলা, রঙের উচ্ছ্বাস, আবিরের মেঘ—সবই এক কাব্যিক উত্তরণ। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান আমাদের মনে করায়—উৎসব কখনোই ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে নয়। শ্রেণি, লিঙ্গ, বয়স—সব সম্পর্কই উৎসবের মধ্যে নতুন বিন্যাস তৈরি করে।সমষ্টিগত উচ্ছ্বাসে মানুষ ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে ফেলে। মনোবিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘ব্যক্তিসত্তা বিলোপ’—সেই অবস্থায় মানুষ এমন কাজ করে, যা একা থাকলে করত না। তখন “আজ নিয়ম নেই”—এই ধারণা অঘোষিত নীতিতে পরিণত হয়। হাসির আড়ালে, রঙের ছটায়, মাইকের আওয়াজে অনেক সময় সম্মতির প্রশ্নটি চাপা পড়ে যায়।
ফরাসি দার্শনিক ফুকো তাই বলেছিলেন, ক্ষমতা কেবল উপরের দিক থেকে নেমে আসে না; তা প্রথমে শরীরের উপর সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। তারপর ক্ষমতা শরীরকে স্পর্শ করার অধিকার চায় এটা কেও আমরা সামাজিক ক্ষমতা দখলের রাজনীতি বলে অভিহিত করব ।
দোলের দিনে জোর করে রঙ মাখানো আপাতদৃষ্টিতে দুষ্টুমি মনে হলেও গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, উৎসবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাবানরা দুর্বল মানুষের শরীরের উপর কর্তৃত্বের অনুশীলন করে। “বুরা না মানো”—এই কথাগুলো যেন সেই কর্তৃত্বের পূর্ব-অনুমোদন।
দোল বা বসন্ত উৎসবকে সামনে রেখে অনেকেই অনধিকার স্পর্শকে বৈধতা দিতে চায়। প্রতিবছর লাঞ্ছনার খবর আসে। ভিড়ের আড়ালে হিসেব চুকিয়ে নেওয়ার হিংস্রতা বাড়ে। দুর্বল শরীরের ওপর শক্তির পরীক্ষা সহজ হয়ে যায়। আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রতিটি শিশুর শরীরেরও সম্মতির অধিকার আছে। কিন্তু আমরা এই মৌলিক সত্যটিকে দোলের উচ্ছ্বাসে ভুলে যাই।এই জায়গায় এসে মনে পড়ে কবি জয় গোস্বামী র কবিতা—
দোল : শান্তিনিকেতন
১
বকুল শাখা পারুল শাখা
তাকাও কেন আমার দিকে?
মিথ্যে জীবন কাটলো আমার
ছাই লিখে আর ভস্ম লিখে –
কী ক’রে আজ আবীর দেবো
তোমাদের ওই বান্ধবীকে!
২
শান্ত ব’লে জানতে আমায়?
কলঙ্কহীন, শুদ্ধ ব’লে?
কিন্তু আমি নরক থেকে
সাঁতরে এলাম
তখন আমার শরীর থেকে
গরম কাদা গড়িয়ে পড়ছে
রক্ত-কাদা
হঠাৎ তোমায় দেখতে পেলাম
বালিকাদের গানের দলে
সত্যি কিছু লুকোচ্ছি না।
প্রাচীন তপোবনের ধারে
তোমার বাড়ি
কখন যাবো? – ঘুম পাচ্ছে –
বলো কখন মুখ রাখবো
তোমার কোলে!
বারণ করবে?
এই “বারণ করবে?” প্রশ্নটাই এই প্রবন্ধের আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। প্রবন্ধের আত্মা। এখানে স্পর্শের আগে থামা লক্ষণীয়। আকাঙ্ক্ষার আগে সংকোচ আছে। এখানে দখল নেই, সংলাপ আছে।“বুরা না মানোর” আপত্তিকে তাই নিষ্ক্রিয় করে দেয়।“বারণ করবে?বললেএখানে আপত্তির সম্ভাবনাকে স্বীকার করে।
আজ যখন দেখি পাড়ায় পাড়ায় বসন্ত উৎসব গড়ে উঠছে, সেখানে চলছে শক্তি-প্রদর্শন—শোভাযাত্রা, পতাকা, মাইকের দাপট, প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক রং—তখন মনের মধ্যেপ্রশ্ন জাগে। আর বলিবাজারই বা বাদ যায় কেনো; বাজার রঙকে পণ্য বানিয়েছে। রঙ, পার্টি, নেশা—সব মিলিয়ে শরীর ভোগের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তখন উৎসবের ভাষা পাল্টে হয়ে যায় আধিপত্যের ভাষা ।
এত কিছুর পরও আমি আশাবাদী। পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখি। তরুণ প্রজন্ম অভয়া কাণ্ডের পর “না মানে না”—এই নৈতিক স্পষ্টতাকে সামনে এনেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সম্মতির ভাষা ধীরে ধীরে সামাজিক অভিধানে জায়গা করে নিচ্ছে। এ এক নতুন আশাবাদ।
তাই দোলের শেষে যখন আমরা গায়ের রঙ ধুয়ে ফেলি, আয়নার সামনে দাঁড়াই—সেখানে যদি নিজের মধ্যে সামান্য অস্বস্তি খুঁজে পাই, তবে বুঝব সেই অস্বস্তিই আসলে আমার ভেতরের মানবিকতার বীজ। উৎসবের পরে পৃথিবীতে যে নীরবতা নামে, সেখানে বোঝা যায়—দোল কেবল রঙের নয়; এটি আমাদের বিবেকের পরীক্ষা ও বটে। নিজের সঙ্গে নিজের মুখোমুখি হওয়ার দিন।
সন্ধ্যার দিকে যখন রঙের ধুলো থিতিয়ে যায়, তখন কানে ভেসে উঠে কবীর সুমন-এর গান এর কয়েকটা লাইন—
আশা নিয়ে ঘর করি,
আশায় পকেট ভরি,
পড়ে গেছে কোন ফাঁকে চেনা আধুলি।
হিসেব মেলানো ভার, আয়-ব্যয় একাকার,
চলে গেলো সারাদিন, এলো গোধূলি।
সন্ধ্যে নিবিড় লুটে,
অনেকটা চেটেপুটে,
অন্ধকারের তবু আছে সীমানা।
সীমানা পেরুতে চাই,
জীবনের গান গাই,
আশা রাখি পেয়ে যাবো বাকি দু’আনা।
আমার কাছে ‘সীমানা পেরোনো’ মানে সব সীমা ভেঙে ফেলা নয়; বরং সীমাকে স্বীকার করে, পারস্পরিক সম্মতির ভিতর দিয়ে তাকে অতিক্রম করাই শিক্ষা ও সংস্কৃতির লক্ষণ। আমরা যে এখনো অসম্পূর্ণ, আমাদের নির্মাণ বাকি—এই স্বীকারোক্তিই আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। যে জানে সে অপূর্ণ, সে-ই অন্যের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়। দোলের দিন যদি সত্যিই সবার হয়, তবে তা কেবল তখনই—যখন প্রতিটি শরীর নিজের উপর নিজের অধিকার ধরে রাখতে পারবে।
রং দেওয়ার আগে একটু থামুন। আপনি যদি চোখে চোখে সম্মতির আলো দেখতে পান , তবে ইশারাই যথেষ্ট। সেই নীরব সম্মতিতেই উৎসবের জন্ম। সেই পারস্পরিক স্বীকৃতিতেই আজ কে গণতন্ত্র অর্থবহ হয়ে উঠবে।
সম্মতি?




বেশ ভালো লাগলো
খুব সুন্দর লেখা। ভাল লাগল।