“মাথার ওপর কোজাগরীর আলো
পায়ের পদ্মে জলের যন্ত্রণা।”
“কে চায় দুঃখ? জীবন দুঃখ নহে। জীবন বীরত্ব। এপারে কি নাই? আছে, দেখিয়াছি, পূজা করিয়াছি। কিন্তু আমি ছোটবেলায় সেই রূপকথা- চোখে দেখিতে পাইতেছি না। সেটি হারাইয়াছি। সেটি না থাকিলে তো বাস্তব হইতে নতুন রূপকথা তৈরী করিতে পারা আমার সাধ্য নাই। এখন যুক্তি হইবে, ট্রাজেডি হইবে, কমেডি হইবে, বয়ঃপ্রাপ্তদের খণ্ডাংশ শিল্প হইবে। যদি অবশ্য অত অবধি পৌঁছাইতে পারি।
কিন্তু রূপকথা, সরল রূপকথা যাহা দেখিলে যুক্তি চুপ, বড় বড় থিয়োরী মাথা চুলকাইতে আরম্ভ করে, ছোট ছোট ডানপিটের দল রুদ্ধাশ্বাস গল্পের জন্য চাগাড় দিয়া উঠিয়া বসে—তাহা কোথায়? আমার চৌহদ্দীর মধ্যে নাই।
আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা এইটাই। কাজ আরম্ভ করিবার পূর্বেই আমি সীমিত হইয়া গেছি”।
তাই তিনি অসম্পূর্ণ? ব্রোকেন? চূড়ান্ত প্রতিভা কিন্তু ডানা ভাঙ্গা পাখির মতো তাঁর যন্ত্রণা তাঁর সৃষ্টির পরতে পরতে লুটিয়ে আছে। আর এই জন্যই আমিও পালাতে চাই ঋত্বিক ঘটকের কাছ থেকে? আমি পালাতে চাই দেশভাগ হয়ে যাওয়া, দেশ থেকে বিতাড়িত, নিজভূম থেকে পরবাসে চলে যাওয়া প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকে। তাদের চলমান যন্ত্রণা হৃদয়ে ক্ষত করতে করতে যায়। তিনি যে রূপকথার কথা বলতে চাইতেন সেখানে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। শ্রেণি বিভাজন থাকবে না। ধর্মে- জাতে লড়াই থাকবে না। দেশভাগ- যুদ্ধ- মন্বন্তরের ক্ষত যতদিন থাকবে তাঁর ছবি মনে করিয়ে দেবে ছিন্নমূলের ইতিহাস। শরণার্থী হওয়ার যন্ত্রণা যাঁরা ভুলতে পারেন না তাদের কি হয়? তাঁর প্রবন্ধের কিছু অংশ পড়ে আমার মনে হয় এমনই দমবন্ধ অনুভূতি নিয়েই তিনি বেঁচেছিলেন, “পদ্মায় শরতে নৌকা লইয়া পালাইতে গিয়া একবার ঢুকিয়া আর বাহির হইতে পারি না–তিনমাথা সমান উঁচু কাশবন হইয়াছে কাতলামারীর চরটার কাছে, সেই ডাকাতিয়া কাশের ঝোপে সাদা রেণু উড়িয়া উড়িয়া দেহমন আচ্ছন্ন করিয়া শ্বাস প্রায় আটকাইয়া দিয়াছিল”। আর একবারও একইরকম পরিস্থিতি হাওরবিলে… “দু ঘন্টার পথ সারারাত্রে পার হইতে পারিতেছি না, পাক খাইতেছি। সেই রাত্রে দাঁতে দাঁত লাগা হিমে সে এক অদ্ভুত হতাশার অনুভূতি।” ছিন্নমূল হওয়ার ইতিহাস তাঁর কাছে কি এরকমই? তিনি ভাঙা ডানা নিয়ে পাক খেয়েছেন হাওরে। অথচ ফুটন্ত অঙ্গার ছিল তার মধ্যে। সমুদ্রের মতো অপার প্রতিভা আবার নিজমনোভূমে ততই ঢেউ, প্লাবন, ধ্বংসের ইঙ্গিত।
প্রথমে তিনি গল্প লিখেছেন। প্রায় একশোর বেশি ছোটোগল্প, তারপর নাটক লেখা এবং অভিনয়, দশ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে তিনি অভিনয় করেছেন। তারপর চলচ্চিত্র। কারণ, বেশি মানুষ দেখে। “কালকে বা দশ বছর পর যদি ভালো কোনো মিডিয়াম বের হয় তাহলে চলচ্চিত্রকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাব। চলচ্চিত্রের প্রেমে মশায় আমি পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্মস”। এই ওয়েব প্ল্যাটফর্মের যুগে বারবার এই কথা মনে হয় যে তিনি নিজের মতো করে ছবি বানাতে পারেতেন এই যুগে। কত স্বাধীন মাধ্যম এখন! সিনেমার কৌলিন্য নিয়ে তিনি বসে থাকতেন না। কত জটিল যন্ত্রণা আমাদের আজ, তিনি নিশ্চয় তুলে ধরতেন বিনা প্ররোচনায়, নিজের শর্তে। বাম দল থেকে ছিন্ন হতে হয়েছিল, হয়তো ডানপন্থী শাসকের চক্ষুশূল হতেন, কিন্তু নিজের কথাটুকু বলা থামাতেন না। ‘এভরিথিং ইজ বার্নিং, এভরিথিং উইল বার্ন’। তাঁর হৃদয়ে অগ্নিবীণার ঝঙ্কার পিনাকের টঙ্কার… তাঁকে অস্থির করে তুলত। তাঁর জীবন অবলম্বনে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিতে বিজন ভট্টাচার্যের মুখে একটি সংলাপ ছিল “তোর ভেতরের আগুনটা একটু কমা”। ঋত্বিক বোধহয় আগুন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন… কাজী নজরুল ইসলামের মতো। স্বল্প জীবন কিন্তু আগ্নেয়গিরির মতো সে আগুন উচ্চতায় পৌঁছয়। দেশজ আত্মায় ভরপুর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের, দর্শকের হৃদয়ে। ঋত্বিক ঘটক নিজেকে ব্যর্থ ভেবেছেন কখনো, তাঁর ছবিতে মেলোড্রামার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। নজরুল ইসলামের সৃষ্টি নিয়েও একই রকম কাঁটাছেঁড়া। আবেগের আতিশয্য দুজনেই মেনে নেন কিন্তু কেউ পিছপা হন না নিজের বলার ধরণটি থেকে। “মানুষকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসি। সর্ব শিল্পের শেষ কথা হচ্ছে মানুষ” বলেছিলেন ঋত্বিক। কাজী নজরুল ইসলাম একইভাবে… “মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।” দেশ, মানুষ, তাদের সংগ্রাম, তাদের শিল্প, আবেগ, প্রেম, পথ খুঁজে নেওয়া, হতাশা, যন্ত্রণা তাঁর মধ্যে অবিরাম বসত করত। বঙ্গবালা আর নচিকেতা তাঁর নিজেরই অস্তিত্ব। আর যা কিছু সবই যেন বহিরাগত। বঙ্গবালা বাংলাদেশের প্রতীক হলে নচিকেতা পশ্চিমবঙ্গ। তিনি বুকের মধ্যে লালন করেন মিলনের আশ। সুরমা ঘটক একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশে যখন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি, তাঁকে হেলিকপ্টার করে আনা হচ্ছিল, পদ্মা নদীর ওপর ভাসমান হেলিকপ্টারে শায়িত ঋত্বিক সহযোগীদের বলেন তাঁকে তুলে জানলার কাছে নিয়ে বসিয়ে দিতে, তারপর পদ্মা নদী দেখতে দেখতে কেঁদে ফেলেন। এই মহৎ আবেগ, এই বিপুল পিছুটান তাঁর আধার। তাই তাঁর ছবিতে দেশজ উপাদান প্রতীক হয়ে ওঠে। তিনি পাশ্চাত্য প্রভাব বর্জিত এক মৌলিক সত্ত্বা। এখানেও যেন মিলে যান ঋত্বিক ঘটক এবং কাজী নজরুল। দেশজ উপাচারে কালজয় সৃষ্টি। সত্যজিৎ রায় স্বীকার করেছিলেন। “ আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে হলিউডি প্রভাব ঢুকে পড়েছিল কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে ঋত্বিক সে প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল। ঋত্বিকের প্রধান গুণ ছিল তার বৈশিষ্ট্য, তার মৌলিকতা এবং মেধা। যা সে শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছিল।”
তাঁর বিশৃঙ্খল জীবন, এলোমেলো পথচলা যতখানি ক্যানভাস জুড়ে ছিল, ততখানি কি জানা যায় তাঁর কাজের প্রতি একাগ্রতার কথা, তাঁর পড়াশোনার কথা, তাঁর লেখা, ছবি দেখা, পড়ানোর আখ্যান? প্রাচ্যের, পাশ্চাত্যের সঙ্গীত নিয়ে এনসাইলোপিডিক নলেজ ছিল তাঁর। নবারুন ভট্টাচার্য বলেছেন একটি বক্তৃতায়, ক্রিকেট নিয়ে এমন বক্তব্য রেখেছিলেন ঋত্বিক বসুশ্রী কফি হাউসে, সকলে বিস্মিত। সুরমা ঘটকের স্মৃতিকথাতেও পাই আমরা যে, উনি মাঝরাত অবধি পড়াশোনা করতেন। বুদ্ধ, লেনিন, ইয়ুং, মার্ক্স, সিনেমা, নাটক, সঙ্গীত নান্দনিক তত্ত্ব, আগাথা খ্রিস্টি এসব প্রিয় বিষয় ছিল পড়ার। সেতার বাজানো শিখতেন বাহাদুর খানের কাছে। বাঁশি বাজাতে জানতেন। উনি কি কি জানতেন আর কি কি জানতেন না… সেসব ভাবতে বসলে তল খুঁজে পাওয়া যাবে না। যা করেছেন, যেটুকু করেছেন মন দিয়ে। খালি হয়তো মন দেননি নিজের ব্যাপারে। অথচ নিজের কাজের ব্যাপারে তাঁর আত্মবিশ্বাসের অভাব তো ছিল না। কেবল তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেলেন এবং তাই জন্যই বোধহয় রয়ে গেলেন আরো বেশি করে। যে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল তা পাচ্ছেন না তবু নিষ্ঠা কমেনি কাজের প্রতি। মদ খাচ্ছেন, নেশা করছেন, অসুস্থ হয়ে পড়ছেন কিন্তু নতুন কাজের সুবাস নিয়ে ফিরে আসছেন। ছবি করার সময়ে সমস্ত নোটস লিখে রাখতেন, তুলে রাখতেন অনেক শটস, তারপর এডিটিং টেবিলে রাত জেগে সম্পাদনা করছেন। অযান্ত্রিকের সময়ে ১১টি রাত জেগেছিলেন সুস্থ শরীরে। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি যে ঘরে এডিটিং হত ওই ঘরেই থাকতেন। অবাক হতে হয় এই ভেবে যে যখন ঋত্বিক ঘটক গণণাট্য সঙ্ঘ করছেন বা ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন তখন তিনি স্টুডিওতে মদ্যপান বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। স্টুডিওর মধ্যে মদ্যপান হল এক অসহ্য বেলেল্লাপনা। এমনই মনে করতেন ঋত্বিক। সে এক প্রবল পরিস্থিতি। মৃণাল সেন তখন ছিলেন ঋত্বিকের পাশে পাশেই। স্তডিওর কর্মকর্তারা তুমুল খাপ্পা হয়ে ওঠেন, ওদিকে ঋত্বিকও উত্তপ্ত। মদের প্রতি নিষম ঘৃণা। কিন্তু নিষ্ঠুর পরিহাস সময়ের! এই মদই ঘুরে আসে টর্নেডো হয়ে পরবর্তীকালে আর গিলে খায় ঋত্বিককে।
প্রত্যেকটা ফ্রেম, শট, মুহূর্তের সঙ্গে তাঁর আদর্শ, ভিশন, মেধা, রাজনৈতিক বোধ জড়িয়ে থাকত। আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচাবার আদর্শেই তাঁর বিশ্বাস ছিল। তাঁর উক্তি আমাদের কন্ঠস্থ। টি শার্টে তাঁর উক্তি বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় শহুরে বাঙালি। যদিও সেসব তিনি দেখে যেতে পারেননি। তাদেরকেও হয়তো বলে যেতেন “ আমার থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি। যদি আপনি আমার ছবি দেখে সচেতন হয়ে ওঠেন ছবি দেখে যদি বাইরের সামাজিক বাধা বা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টকে যদি আপনার মধ্যে চারিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।” তিনি আমোদিত করার অভিপ্রায় নিয়ে ছবি করতে আসেননি। শিল্পের জন্য শিল্পকর্মে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না, দেশের সঙ্কট, অসঙ্গতি যদি না শিল্পের মাধ্যে তুলে ধরা হয় তাহলে সেই শিল্পকর্ম নির্মাণের যুক্তি নেই। এই ছিল তাঁর দর্শন। সঙ্কট থেকে পলায়নকে তিনি ঘৃণা করতেন। সঙ্কট ঘনিয়ে আসবেই, সংগ্রামও চলবে আপসহীন। বিবেক ও আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে সঙ্কটের কাছে আত্মসমর্পন তিনি কখনও করতে চাননি। নিজের জীবন-দর্শন-শিল্পে তিনি একটাই সত্তা। পৃথক অস্তিত্ব তাঁর ছিল না। সেইজন্যই তাঁর যন্ত্রণা খণ্ডিত নয়, এক বিপুল তরঙ্গের মধ্যে ডুবে যাওয়া, ভেসে ওঠা এক ডানার সিন্ধু পাখি। প্রকৃত শিল্পী আনন্দের মধ্যে বাঁচে না। যা চায় তা নির্মাণ করতে পারে না। অর্থের জন্য তাঁকে নির্মাণ-শ্রমিক হতে হয় কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে। ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়ে কমার্শিয়াল ছবির পোস্টার আঁকতে হয়। গ্রাম বাংলার এক স্নিগ্ধ গৃহবধূকে হয়ে যেতে হয় গণিকা পেটের দায়ে, বাঁচার তাগিদে এবং একদিন সন্ধেবেলা ঘরের দরজা খুলে সে দেখে তার আপন দাদা কিচ্ছু না জেনেই এসেছে খরিদ্দারের বেশে… তিনি হাতুড়ি মারেন দর্শকের চেতনে… আমরা তাই তো পালিয়ে বেড়াই হ্যাপি এন্ডিং, নিটোল গল্পের দিকে। আমরা ভয় পাই ঋত্বিক ঘটককে। তিনি ছারখার করে দিতে পারেন এই মিনমিনে মেকি মেনি বিড়াল মার্কা তপস্বী আত্মাদের, যারা পুঁজিবাদ আর মার্কসবাদ দুই নিয়ে লোফালুফি খেলছি… যখন ইচ্ছে হচ্ছে এক দিকে ঢলছি। এখনকার চলচ্চিত্র নির্মাণে তুচ্ছ ঘটনাগুলোকে জোর করে ফানুশের মতো ফুলিয়ে দিয়ে, বিজ্ঞাপনের ছবির মতো কিছু আরামদায়ক দৃশ্য দিয়ে ভরিয়ে, চমকে, প্রচারে, কিনে ফেলা রিভিউ দিয়ে সাজানো হচ্ছে বাংলা বাজার। এ এক অন্য মেরু দেশ। এখানে ঋত্বিক ঘটক বেমানান। তাঁর ছবির ঘরানা কেন তৈরি হল না, এসব ব্যাপার নিয়ে বাঙালি মাথা ঘামায় না। যদিও তাদের প্রিয় স্লোগান- ‘ভাবো, ভাবা প্র্যাক্টিস করো’। কী মারাত্মক আইরনি! তাঁর মুখ আঁকা জামার চাহিদা বোধহয় চে গেভারার মুখ আঁকা জামার সমান। এই ফাঁপা সময়, মানুষের নিমজ্জমান বোধ দেখতে পেলে তিনি আরো উন্মাদ হতেন। আরো নেশাগ্রস্ত। অ্যাসাইলামকেই হয়তো তাঁর স্বর্গ মনে হত। নবারুণ ভট্টাচার্য আরো বলেছিলেন, ঋত্বিক ঘটক এবং তাঁর বন্ধু সহচর, যারা এক একজন দিকপাল তাঁরা আসলে এখন উদ্বৃত্ত। বিস্মৃতির অতলে তাঁদের তলিয়ে যাওয়াকে না রুখতে পারার মধ্যে হয়তো এখন নিশ্চিন্তি আছে। দর্শন নেই, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নেই, দিন বদলানোর দিক নির্দেশ নেই, সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরে না এমন ছবি তৈরির হিড়িক এখন মস্ত পরিচালকদের প্রবাহ পরম্পরা। “আমি কোনো সময়েই একটা সাধারণ পুতু-পুতু মার্কা গল্প বলি না- যে একটি ছেলে একটি মেয়ে প্রেমে পড়েছে, প্রথমে মিলতে পারছে না, তাই দুঃখ পাচ্ছে, পরে মিলে গেল বা একজন পটল তুলল— এমন বস্তাপচা সাজানো গল্প লিখে বা ছবি করে নির্বোধ দর্শকদের খুব হাসিয়ে বা কাঁদিয়ে ঐ গল্পের মধ্যে ইনভলভ করিয়ে দিলাম, দু’মিনিটেই তারা ছবির কথা ভুলে গেল, খুব খুশি হয়ে বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল— এর মধ্যে আমি নেই।” তাঁর ছবিতে মানুষ সত্য। মানুষের সত্য জীবন প্রতিভাত। মানুষকে জানার অনন্ত তাগিদ এই হওয়া উচিত শিল্পের উৎস মুখ আর শিল্পীর সাধনা। এই বিভক্ত বাংলা তাঁর কাছে ফসিলের মতো। হারিয়ে যাওয়া মুল্যবোধের বিরোধিতা না করাকে তিনি বুজরুকি বলে মনে করেন। তিনি জানতেন এর অন্যথা হলে সব হারিয়ে যাবে। এখন রূপকথা আর বিনোদন সত্য, বাকি সব তারপরে। তৎকালীন সিনেমা ও সাহিত্য নিয়ে তিনি যা বলেছিলেন ৪০ বছর আগে তা আজ আরো বহুগুণ প্রকট। “Both are boring and slow and packed with sentimental stuff. They harp endlessly on certain family relationships and complications which are nonexistent in reality. They mouth the same kind of pedestrian morality. They strike poses which are patently false, and even insulting to the intellect.”
আবার এও দেখেছি ঋত্বিক নিয়ে যাঁরা আলোচনা করেন, সভা করেন তাঁর কাজ নিয়ে, তারাও কেমন হেয় করেন অপর মানুষকে। ঋত্বিককে বোঝা যেন সকলের কম্ম নয়। কিংবা তাঁরাও নিজেদের একেকজন ঋত্বিক ভাবেন। তাঁর জীবনের ধ্বংসাত্মক দিকটাকেও এমনভাবে ডিফেন্ড করেন যেন ওই বোধ বা মেধার জন্মের উৎস না হলে থেমে যেত। অসুস্থ-অ্যাালকোহলিক হয়ে ওঠার মধ্যে এক প্রছন্ন অহমিকার মিশ্রণ পরিবেশিত হয়। তাঁকে “ব্যতিক্রমী” তকমা দেওয়ার মধ্যেও কি এক সাজিশ থাকে? সাধারন মানুষের গণ্ডি থেকে তাঁকে এমন জ্যোতিষ্কলোকে পাঠিয়ে দেওয়া, নাগালের বাইরে… সেখান থেকে তাঁর আলো আসে কিন্তু পৌঁছনো যায় না তার সীমার কাছাকাছি! সর্বহারাদের নিয়ে যিনি ভেবে গেছেন সারাজীবন তাঁকেই এলিট ইন্টেলেকচুয়াল বানিয়ে দেওয়ার এক প্রবণতা দেখলেও হতাশ হতে হয়।

তাঁর যে যন্ত্রণা ছিল সে বড়ো কঠিন। তিনি চাইছেন পরিবার, সংসার… স্ত্রীর প্রতি অবহেলা তাঁকে পীড়িত করছে কিন্তু তিনি পারছেন না শৃঙ্খলিত হতে। দুই বাংলার ভাঙা কপালের মতো ভেঙে পড়ছেন রোজ একটু একটু করে। এত বাধা, ব্যর্থতা তাঁকে নষ্ট করছে নিষ্ঠুর পদক্ষেপে। স্ত্রী সুরমার প্রতি ঋত্বিকের অপার শ্রদ্ধা ছিল এবং ঋত্বিকের প্রতিও সুরমা আমরণ শ্রদ্ধাশীল- তাঁর কাজ, পড়াশুনো, লেখা, বোধ সুরমাকে আবিষ্ট করে রেখেছিল কিন্তু ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়ালদের বারবার ছিন্নমূল হওয়াই ভবিতব্য যেন! সুরমা ঘটক বাঁচতে চাইছিলেন নীতার মতোই। আর নীলকন্ঠ বাগচীর মতো পুড়তে চাইছিলেন ঋত্বিক।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘তেরো নদীর জল’ কবিতাটি মনে পড়ে যায়–
স্বপ্নে আমি দেখেছিলাম তাকে
মাটির সরায় আঁকা আমার মা
মাথার ওপর কোজাগরীর আলো
পায়ের পদ্মে জলের যন্ত্রণা।
অসহ্য এক চেতনার উন্মাদ
আদেশ ক’রল, ওকে প্রণাম কর!
আমি বললাম, ও-যে আমার মা–
আমার এখন সারা অঙ্গে জ্বর!
কোলের ওপর লুটিয়ে দিলাম মাথা
মা গো কোথায় শান্তি কোথায় সুখ?
দেখিস নে তুই অনাহারের জ্বালা
চোখ চাইতে কাঁপে না তোর বুক?
স্বপ্ন ভাঙ্গল; তেরো নদীর জলে
বুক ডুবিয়ে ক্ষুধার মিছিল চলে।
‘সারি সারি পাঁচিল’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন কিন্তু তাঁর স্বপ্নের দিনের কথা, সাম্যের জয়গান আবার গাওয়া হবে এই আশা তাঁর ছিল। “ আমাদের পেট ভরানোর সমস্যাই হচ্ছে মূল সমস্যা। যার জন্য এত ক্লেদ, এত পাপ। অথছ মানুষের পেট ভরানো হচ্ছে তার জন্মগত অধিকার। সেই অধিকার থেকে সে বঞ্ছিত হয়েছে- যেদিন সে আদিম সাম্যের স্তর সে অতিক্রম করেছে। … সেদিন যে আসবেই তার প্রমাণ আদিম সাম্যেই রয়ে গেছে।… সেদিন রাস্তায় এত গুলি চলবে না, এত মা-ও কাঁদবে না। আর আমরা চুটিয়ে ছবি করবই। কারণ, বহু পাঁচিল সেদিন ধসে যাবেই।’’
আরোপিত কিছুই করতে পারেননি তিনি। না ছবি না নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া। নিজের শেষ যেন নিজেই দেখতে পেতেন। বলতেন সে কথা কাছের জনেদের। এতবার অসুস্থ হয়েছেন, হাসপাতাল আর বাড়ি। সুস্থ হলেই আবারও সেই নেশা। কী অসহায় বোধ হয় এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলেই, যাঁর মস্তিষ্ক অমন সচল, প্রখর, যাঁর প্রতিভা প্রশ্নাতীত, নিজেরই বৃত্তে ঘুরে মরছেন তিনি। বুকের ভেতর ভাঙা দেশ, ঠাঁই-নাড়া মানুষ, হাহাকার আর এক রাক্ষুসে আগুন । আগুন সৃষ্টি ও ধ্বংস দুই ডেকে আনছে মানুষটার ভেতরে। তাঁর অস্তিত্ব, ইহকাল পরকাল জুড়েই ওই আটটা ছবি… আর আটটা ছবিতেই তিনি উপস্থিত খণ্ডে, পলে, অনু পরমাণুতে। জুড়ে দিলে এক প্রকাণ্ড মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে এবং ছবিগুলো যতবার মানুষ দেখবে শুনতে পাবে ঋত্বিক ঘটক বলছেন- “পুদভকিন একটা কথা আমাকে বলে দিয়েছিলেন সে দিন, সেটা আমার শিক্ষার বেসিস। সেটা হচ্ছে যে ফিল্ম ইজ নট মেড। ফিল্মমেকিং কথাটা বাজে কথা। ফিল্ম ইজ বিল্ট। ব্রিক টু ব্রিক। যে-রকম ভাবে একটা বাড়ি তৈরি হয়, ফিল্ম তেমনই শট বাই শট কেটে-কেটে তৈরি হয়। ইট ইজ বিল্ট, ইট’স নট মেড।” চলচ্চিত্রের সঙ্গে কোনোদিন এক ইঞ্চি সমঝোতা তিনি করেননি, যা চেয়েছেন আদর্শগতভাবে, ততটুকুই নির্মাণ করেছেন নিজের নিষ্ঠা ও মনন দিয়ে। তাঁর নির্মাণের ধরণ, তাঁর চিন্তার তুমুল গতিস্রোতের সঙ্গে দর্শকের ভাবনা হয়তো সমানতালে চলতে পারেনি। তাঁর অভিমান বেড়েছে। তাঁর মূল্যায়ন আজও ব্রোকেন এবং অসমাপ্ত।
একের পর এক ব্যর্থতা ক্রমশ তাঁকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিংবা ধ্বংস ক্রমশ এগিয়ে এসেছে তাঁর দিকে। তবু নিজের মার্গ থেকে সরে যাননি। বারবার বলে গেছে স্ত্রীকে “ লক্ষ্মী টাকা থাকবে না, কাজটা থেকে যাবে।” এ এক অমোঘ সত্য কিন্তু এই কথা মেনে চলে না পরিক্রমার চক্রপথ। জীবন, শিল্প, সংসার, সমাজ, প্রতিভা সবকিছুই সাফল্যের সূত্রে গাঁথা। নতুন কাজের উদ্যম তিনি হারিয়ে ফেলেননি কিন্তু চলে যাচ্ছেন সৃষ্টি থেকে ধ্বংসের পথে। আত্মশক্তিতে ভরপুর মানুষটি হয়ে উঠছেন স্বেচ্ছাচারী। বড়ো বেদনার মতো বাজে এই ব্যাপারটিই। নিজেকে ধ্বংসের আবর্তে ফেলার আয়োজনেরও ঋত্বিক তিনি। কাজের নেশা, পড়ার নেশা, মদ্যপানের নেশার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে তিনি জিতিয়ে দেন হলাহলকে। নীলকন্ঠ হয়ে ওঠেন এমন এক বয়সে যখন অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়তো শুরুই করেননি চলচ্চিত্র নির্মাণ। তাঁর মৃত্যুর পর মালায়ম চলচ্চিত্র নির্মাতা জন আব্রাহাম বলেছিলেন,
“I know that you are no more.
But I am, alive for you
Believe me.
When the seventh seal is opened
I will use my camera as my gun
and I am sure the echo of the sound
will reverberate in your bones,
and feed back to me for my inspiration.”
তাঁর মৃত্যুর পর বন্যাত্রাণ তহবিলে সাহাযার্থে সুবর্ণরেখা ছবিটির প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। নিমেষের মধ্যে তিনটি প্রদর্শনের টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এই মাটিতে মৃতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে কখনো ত্রুটি হয়নি। মৃত্যুর পর বিদেশেও তিনি সমাদৃত হন প্রবল উচ্ছাসের সঙ্গে। বিদেশের বাহবা কিছু আগে হলে এই দেশেও তাঁর নাম, খ্যাতি, অর্থ দিগন্ত ছুঁত, আমরা তো বসে থাকি বিদেশি সমালোচকদের মূল্যায়নে কার কৌলিন্য প্রাপ্তি হল দেখার জন্য।

তথ্য সুত্র-
ঋত্বিক কুমার ঘটক- সম্পাদনা অতনু পাল
চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু- ঋত্বিককুমার ঘটক
ঋত্বিক- সুরমা ঘটক
ঋত্বিক কুমার ঘটক (গ্রন্থমালা ১) – চণ্ডী মুখোপাধ্যায়
অন্যান্য পত্রপত্রিকা
*ঋত্বিক ঘটকের উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।




অসাধারণ লেখা গো।
তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। ভালো লাগলো।
পুষ্কর যাবার পথে বাসে বসে পড়লাম মহান পরিচালক সম্মন্ধে তথ্যসমৃদ্ধ এক লেখা। লেখার মধ্যে কবিতার উদ্ধৃতির প্রয়োগ লেখাকে আলাদা মাত্রা এনেছে। অভিনন্দন লেখিকাকে।
আমার কী যে আনন্দ হল! প্রাণিত হলাম। ধন্যবাদ জানালাম।
nice one