দশ বছর আগে আমার সেই চেন কাটা ব্যাগ, মরা সাহেবের কোট নিয়ে দার্জিলিং যাওয়া। পায়ে সেই বিখ্যাত পুঁতি বেল্ট জুতো! নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার বিদ্যা ভালো জানা থাকে, যাদের কিছু নেই। সুতরাং বলতে লাগলাম, বেশি শীত একদম করছে না। তাছাড়া গরমের দেশের লোকেদের বিশেষ শীতবস্ত্র থাকে না। কতক্ষণ আর নিজেকে কাঁচা নির্জলা মিথ্যে শোনানো যায়? প্রথমে একটু একটু কাঁপুনি। চড়াই রাস্তায় উঠতে হাঁটু কাঁপছে। বুকের মধ্যেটা মনে হচ্ছে ফাঁকা বালির চর। চড়চড় করে বালি উড়ছে। মুখে একটা হাসি বজায় রাখতে প্রাণান্ত হচ্ছে। হাত দুটো মনে হচ্ছে মচমচে বিস্কুট—এখনই ভেঙে যাবে। বেইজ্জত ঠান্ডাটা উঠছে জুতো থেকেই। জুতোর একটা ক্যালকুলেটিভ তাপ থাকে। সেটা জায়গা বুঝে চরম হয়। চিরকাল জুতো আমায় স্থানমাহাত্ম্য চাখিয়েছে।
পাড়ার কালু নামকরা জুতোচোর। মঠ-মন্দিরের ছড়াছড়ি এলাকায়, বিকেল নাগাদ গিয়ে চোখ বুজে, গম্ভীর স্তোত্রপাঠের মাঝখানে বসে পড়লেই হল। মাঝে মাঝে বুকে হাত, যেন ভক্তি টনটন করছে। তারপর পিটপিট করে দেখে নেওয়া— লোকজন বেশ মজে এসেছে। টুক করে উঠে, বাইরে ডাঁই জুতো থেকে পছন্দ করে নাও। এই জুতোর নাম হল ‘ধর্মবাটা’। ভালো মতো কালেকশান হতে সপ্তাখানেক। তারপর কামাহাটিতে ভ্যান নিয়ে বসে যেত কালু।
মোচার খোলার মতো একটা শুটকো রোগা পামশু এক বিহারিকে নব্বই টাকায় গছিয়ে, আমার দিকে ঢুলুঢুলু হাসল। তলা থেকে ঝেড়ে-ঝুড়ে শাঁসালো বের করল একটা। একেবারে চুমকি-চামেলি দেখতে। দার্জিলিং পাহাড়ে জ্বলছে তারার কুচি, আমার জুতোও জ্বলছে। কালুর ‘ধর্মবাটা’ জুতো।
কিছুক্ষণের মধ্যে শ্বাসকষ্ট। ১৩১.৯ নটিক্যাল মাইল দূরত্ব থেকে ব্লিজার্ডের ঝাপটা এসে লাগছে যেন। ফুসফুসে ফুটো হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস কোনো ছিদ্রপথে ভসভস বেরিয়ে যাচ্ছে। ভুটানি পশমউলি অচেনা ভাষায় হাত নেড়ে কী-সব বলতে লাগলো। আমার কানে বহুদূর জলস্তর পেরিয়ে বৃষ্টির ছাঁটের মতো ঝাপসা কথার ধাক্কা লাগতে লাগলো।
বন্ধুরা খিল্লি মারতে ব্যস্ত থাকায় আমার ভগ্নদশা বুঝতে পারেনি। শীত যেন রোগা লম্বাটে নাছোড়-গেছো ব্যাঙ, আঁকড়ে আছে। আমি অনুভব করছি, কান দুটো ক্রমশ লম্বা হয়ে অনন্তের দিকে উঠে যাচ্ছে। ঘাড়ের ওপর শুঁয়োপোকা আর ডেয়োপিঁপড়ে হাত ধরাধরি করে পরামর্শ করছে। আমার তো বরাবরই ‘শুকনো পেছনে আকন্দের আঠা’। যা সয় না, তাই সয়াতে যাওয়া। দু-একবার বলার চেষ্টা করলেও তারা পাত্তা দেয়নি। নাটুকে বলে গাল দিয়েছে। ‘ড্রামাবাজ’ বলে নাম ছিল এককালে। “সিলের ছাল ছাড়িয়ে, শুকিয়ে নিয়ে ফ্রক বানাও না…”, “না না, বল্গা হরিণের লেজের লোম দিয়ে ম্যাঙ্কি ক্যাপ করো একটা…” ইত্যাদি বিবিধ কুটকুটে খিল্লি। ভুতুরে অন্ধকারে কুয়াশার চুল উড়িয়ে ১৭০ টাকার টিউশনি করা আমার দিকে বরফের ছিটের মতো আসছেই সে খিল্লি।
কাঁধে আমার স্টাইলের লেসের ফ্যাঙ্গবেনে মাফলার। মুখ হাঁ, চোখে ম্যালের টুনি আর পপকর্নের ফোয়ারার ছায়া। চন্দননগরের লাইটিং মারা কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল আমি। আলোর হাসি একটু করে চওড়া হচ্ছে, আবার নিভে যাচ্ছে। আমি অভ্যস্ত হচ্ছি, মানিয়ে নিচ্ছি, আরো গভীর সুড়ঙ্গপথে ঢুকে মানিয়ে নিচ্ছি। মাঝে মাঝে জুতো ঠুকছি অবাধ্য ঘোড়ার মতো।
ওরা যাচ্ছে জলা পাহাড়ের দিকে। আকাশে উজ্জ্বল স্ফটিক তরঙ্গমালা! নক্ষত্রের বর্ণময় ফ্লুরোসেন্ট ডানা থেকে নামছে বেদম নাছোড়-বিশীর্ণ জলবিন্দু। টাউটেরা ছেঁকে ধরে— “হ্যালো ম্যাম, সব মিলেগা! ভেরি চিপ, বেস্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ”।
পাকদণ্ডি পথে বড়ো বড়ো কমলার ঝুড়ি নিয়ে তিনটা ভুটানি ওভারটেক করে যায়। মাথার ভেতর ফাঁপা, সাড়হীন, বিষন্ন বরফপোকা লাফায়, চিৎকার করে। “অবসাদজনিত অসুখ আর আত্মহত্যার রমরমা এখানে।” জুনিপার কাঠের ধোঁয়ার মধ্যে বসে কে এক ঘোটকের লেজে ছড়ি টেনে সুর বাজায়, খামখেয়ালি উড়ন্ত হাওয়ায়।
কিছু না থাকলেও অনেক কিছু জুটে যায়। কেউ লক্ষ্য করেছিল, চড়চড়ে হলদে আলোর মধ্যে আমায় কাশফুলের মতো সাদা দেখাচ্ছে। মাথায় বিচিত্র টুপি-সজ্জার হুড়োহুড়ি দেখি। কখনো ইতিহাস বইয়ের আকবর, কখনো শিবাজীর পাগড়ি শোভিত সে কী বিবাগী হাসিময় টুপি! গলিঘুঁজি ঘুরে কম পয়সায় থুকপা, খাদের ধারে কেঠো গুমটিতে কোঁচকানো চোখ চ্যাপ্টা নাক নেপালি বুড়ির মোমো খাই। পার্ক বিফ কিছু বাদ নেই, চিকেন-মাটনের চেয়ে সস্তা।
দশ বছর আগেও পাতলা ক্যানভাসের জুতো থেকে ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে থাকতো অনিশ্চয়তা। আর আমার পায়ের বদনাম— আমার নাকি সহনশক্তিহীন, ব্যাঁকা, দুর্বল, অনিচ্ছুক পা। হায় রে! জুতোগুলো যে ভয়ঙ্কর খারাপ। নইলে আমার ইচ্ছার শেষ নেই।
জুতোর ইতিহাস বড়োই করুণ আমার। পৌষের শেষ। ধানকাটা মাঠ। খড়ের চুটকি উঠে আছে। সুন্দরবনের বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ শুলো সর্বত্র। আমার পায়ে পুঁতি বসানো ধর্মতলার ফুটপাতের ষাট টাকা দামের চটি। পিছিয়ে পড়ছি। ঘ্রামঘ্রাম করে বুট-পরা ছেলেগুলো এগোচ্ছে। “কী রে!” বলে হুঙ্কার… “এত ল্যাদালে টি-সি লিখবি কখন তুই!” পায়ে লাগছে ভীষণ। সৌখিন ধর্মতলার ফুটের চটি বিষ হয়ে ফুটছে তখন। ওই যার কিছু থাকে না, কেউ এগিয়ে আসে, “নে নে খোল, ফেল ওটা, আমারটা পর।” “আর তুই কি পরবি পুঁতিওয়ালা চটি!!?” “আর একটা আছে আমার।” “দুইটা জুতো! কী বড়োলোক রে বাবা!”
দার্জিলিং-এ মুদি দোকানে শুকনো লঙ্কা কিনতে গেছি। একা একা আলুভাতে মেখে, কেরোসিনের গন্ধভরা সংকীর্ণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে গ্লেনারিজের ‘কন্টিনেন্টাল’ দেখছি। খারাপ জুতো, পা টোস্ট-বিস্কুটের মতো কড়মড় করছে। ওলংদাজুর কফির দোকানে নিভন্ত কাঠের উনুনে ম্যাগি সেদ্ধ করতে দিয়েছি। বব মার্লের বিরাট ছবির নিচে কাঁচা কাঠ, গাঁজার ধূমায়িত অন্ধকারে টোকো কমলালেবু, ফ্রিতে কফি খাই। নেপালি বুড়ি চুটা ধরিয়ে, উনুনের নিচ থেকে বের করে এনেছে অল্প সেঁকা বিফ। পর্ক সসেজকে জলে সেদ্ধ করা লাল ঝোল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো মোটা কালো চশমা-পরা একটা লোক সসেজ বানায়। তার আতিথ্যে আমি ডিমের ঝুড়ির মতো পুবেপশ্চিমে বিস্তৃত হয়ে গেছি। ঝলসানো মরুভূমির মতো কী রুটিয়াল হাসি তার! আগুনের পাশে আমি ঠান্ডা হাত-পা গুলো নিয়ে বসি। চার্চ বেলের শব্দ আরো সাইলেন্ট করে তোলে বুড়ির দোকান। বুড়ির শাগরেদ টুম থাপা দোকান বন্ধ করার জন্য উসখুস করছে। আমি তো গেঁড়ে বসেছি। আগুন ছেড়ে ওঠার অবস্থা, ইচ্ছে কোনোটাই নেই। বন্ধুরা সোমরসে মত্ত হয়ে আর্ট ফিল্ম আর কমার্শিয়াল ফিল্ম, সাহিত্য-ফাহিত্য নিয়ে বিশ্রীরকম চেঁচামেচি করে এখন ঝিমোচ্ছে। থাপা বলছিল, সাহেবরা যখন প্রথম আলুবাড়ি আর লেবং-এ চা-বাগান করল, তখন তার নানা-দাদারা নেপাল থেকে এসে ভিড় করেছিল। ঠান্ডায় কড়া পরিশ্রম আর কম খাবারের জন্য অনেকেরই টিবি হত। মাথায় ফেট্টি বেঁধে ভারী মাল বইত পাহাড়ে। পায়ে জুতো থাকত না অনেকের। বাঙালিরা কোনোদিন সমতল ছেড়ে চা-বাগানে কাজ করতে এল না কেন, কে জানে। অবশ্য বাঙালি ম্যানেজার অনেক আছে, পরিবার নিয়ে হিমেল রূপোলি নির্জনে বছরের পর বছর রয়েছে। সিকিমের সেই গোর্খা গ্রামই আজ দার্জিলিং। ‘দোরজে লিং’ নামে তিব্বতি গুম্ফা ছিল— তার নামেই গ্রামটার নাম।
থাপার দাদুর তিব্বতি জুতো পরে রাত করে হাঁটতে থাকি ম্যালে। পুরো পাটাই চামড়া পশম দিয়ে মুড়ে দড়ি-দড়া দিয়ে বেঁধে দিয়েছে। উথাল-মথিত শীত শীত কুয়াশার গন্ধ, চিকচিক জরিদার পাহাড়ের মাঝখানে গির্জার বেল, মেপল আর পাইনের গুঁড়ি বেয়ে আমায় নিচের গহীন খাদের দিকে গড়িয়ে দেয়।
ক্রিসমাস আসছে, তারাগুলো যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে। রাতের মায়াবী ছায়ায় রহস্যময় পাইনবনে ফেলে দিয়েছি কালুর ‘ধর্মবাটা’ অনিশ্চিত জুতো। গোলাপি স্ট্র্যাপ, সাদা পুঁতি। কত জায়গায় যে জুতো ফেলে আসতে হয়েছে আমায়। ভুটান রাজার রাজবাড়ির পেছনে খাদের নিচে আজো পড়ে আছে আমার ধর্মবাটার জুতো। শিমূলতলায় লাট্টু পাহাড়ের নিচে দিলীপের চায়ের দোকানে বেঞ্চির তলায় ছেঁড়া হাওয়াই কে জানে আকাশের দিকে মুখ করে তারা গুনছে কিনা! কঠিন, শীতল, অনাবৃত, অদম্য, নিরানন্দ, একঘেয়ে ঠান্ডা। মোবাইল জানাচ্ছে তাপমাত্রা দুয়ের নিচে নামব-নামব করছে। হিমালয়ের সাত হাজার ফুটের ওপর আবছা বিচ্ছিন্নতা আমায় মুড়ে নেয়। নিঃসঙ্গতা বেদনার সমুদ্র থেকে রঙিন মাছের ঝাঁকের মতো ওপরে উঠে আসি। আরো ওপরে ভিজে পাহাড়ের দেওয়াল থেকে হিম-জলবিন্দুর ভেতর সবুজ ফুঁড়ে ওঠে।
নেপালি ব্যান্ড বাজছে। কলকাতার বাবু তার স্ত্রীকে বলে, “দ্যাখো দ্যাখো, পেছনে কী?” স্ত্রী ঘুরে তাকায়— গ্লেনারিজ! তার দাঁত বিস্ময়ে ঝুলে পড়ে। যেন বরফে স্ট্যাচু অব লিবার্টি গজিয়েছে। বিন্দু বিন্দু সব খুশি জুড়ে হয়ে যায় আনন্দ! জুতো আমায় জুতিয়ে লাট করেছে। বুঝিয়েছে আলেকবাজি!



