বিপাশার তীরে – ৩য় পর্ব

bipashar tire 3rd issue

দশটা দিনে বিপাশা দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গিয়েছে। চন্দ্রাবলীর স্বামী রাজার আইন বিভাগের প্রধানের জেরার কাছে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে স্বীকার করেছে যে চন্দ্রাবলীকে সে ছেড়ে দিলে তার পিতার সম্পত্তিতে ভাগ পেত না কিন্তু দুর্ঘটনা বা অপঘাতে চন্দ্রাবলীর মৃত্যু হলে সেই অর্থ পেতে অসুবিধা হত না। তার প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। ইংরেজ বণিকদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে তার। জাহাজ কিনে নতুন ব্যবসা করতে চায়। চন্দ্রাবলীকে বহুবার বলা সত্ত্বেও সে বিদেশী বণিকদের বিশ্বাস করতে রাজি নয়। তাছাড়া দেশভ্রমণ, গরীব দুঃখী প্রতিপালন, দুঃস্থ আত্মীয়দের সাহায্য এসব করে তার স্ত্রী প্রচুর অর্থ নষ্ট করে তাই পথের কাঁটা দূর করার দারুণ সুযোগ সে পেয়েছিল দেশ ভ্রমণে আসার অছিলায়। কিন্তু প্রতিবারই অলৌকিক ভাবে বেঁচে গিয়েছে সে। আকেশের মুখে এসব শুনে রূপচাঁদ, সোমরাং, চামেলি হতবাক হয়। মানুষ এত নিষ্ঠুর হতে পারে? বন্দী করা হয়েছে সেই শয়তানকে। কিন্তু ওকে সাহায্য করতে চেয়েছিল যারা তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি এমনকি ভীম শর্মাও গায়েব। রূপচাঁদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আকেশের কাছে।

-ভাই তোমার কি মনে হয় এ কাজে কোনো ভাবে এলাকার লোকে জড়িত? কারণ ভিনদেশীদের আশ্রয় দিয়ে এক ধরণের ব্যবসা কিন্তু শুরু হয়েছে। যা অনেকের অপছন্দ।

আকেশ বলে, দেখো চাঁদ যুগে যুগে কালে কালে মানুষ দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছে এবং স্থানীয় মানুষের সাহায্য পেয়েছে। আজ সেই পরিসেবার বিনিময়ে কেউ যদি দুটো অর্থ উপার্জন করে তাতে ক্ষতি কি? তবে আমার মনে হয় এই ঘটনায় স্থানীয় মানুষের যোগ নেই। ওরা দস্যু অর্থের লোভেই এসব করেছে। আকেশের কথায় স্বস্তি পায় রূপচাঁদ। ধর্মরাজ বাড়ি ফিরলে, চন্দ্রাবলীও তার ধর্মভাইয়ের সাথে নিজের দেশে ফেরার জন্য অনুমতি চায়। যাওয়ার দিন খুব কেঁদেছে সে। সোমরাং, চামেলি দেবীও চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। চামেলি দেবী আসমানী রঙের পাত্তু বেঁধে দিয়েছে চন্দ্রাবলীর কাঁধে। দিয়েছে পশমের চাদর, অনেক প্রবদর, দারিম আর সেবফল। সুজন কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে ফেলে। ওদের সাথে এলাকার দুটি ছেলে দেওয়া হয়, যারা ওদের সাথে হরিদ্বার পর্যন্ত যাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।সে রাতে ধর্মরাজের বাড়ি আকেশ আর সুজনের দাওয়াত। খেতে বসে ধর্মরাজ বলেন, তোমরা জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছো রাজার দরবারে কী হল? রাজা জগৎ সিং সুলতানপুর আসতে চলেছেন। কিন্তু তার মনে অশান্তি অন্য কারণে। এক ব্রাহ্মণের অভিশাপ তার উপর পড়েছে বলে তার অনুমান। তিনি দেবতা স্থাপন করতে চান। মন্দির নির্মাণ করতে চান। সকলের সিদ্ধান্তে স্থির হয় অযোধ্যা থেকে রঘুনাথকে আনা হবে। মহারাজ মাণ্ডিতেও মন্দির নির্মাণ করে দশেরার উৎসব পালন করতে চান। আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাণ্ডিতে যাওয়ার জন্য। জমি, বসতবাড়ি সব দেবেন মহারাজ। ধর্মরাজের কথা শুনে খাওয়া বন্ধ করে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে রূপচাঁদ।

-মানে? আপনি হলেন এই গ্রামের অভিভাবক, আপনি চলে যাবেন মানে?

চমকে গিয়েছে সকলেই কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। কেবল অনর্গল বকে যায় রূপচাঁদ। কেঁদেও ফেলে আবেগের তোড়ে। আকেশ বোঝে এই কান্না সঙ্গী হারানোর। গত কয়েক দিনে রূপচাঁদের কাছে সে শুনেছে সোমরাং এর কথা। শুনেছে কোন ছোটোবেলা থেকে তারা পরস্পরের সঙ্গী। তাদের নাকি আর কখনও কোনো বন্ধু হয়নি। মানে দরকার হয়নি। সুস্বাদু খাবার গলা দিয়ে নামে না আকেশের। নিজের মা বাবা বোন পরিজন সেই সুদূরে নাগ্গরে। রাজার সৈণিক সে। যখন যেখানে যেতে বলবে যেতে তাকে হবেই। তবু যেন এই সুন্দর গ্রামটিকে সে ভালোবেসে ফেলেছিল।এর প্রকৃতি, রূপ, রস গন্ধের জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে? মানে অন্য কারো উপস্থিতির কারণে সে জানে না। কখন সোমরাংদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে রূপচাঁদকে পিছনে ফেলে হনহনিয়ে শিবিরের দিকে চলে এসেছে সে জানে না। সৈণ্যশিবিরে এসে একটা তোড়জোড় অনুভব অরে আকেশ। এমনিতে এই এলাকা পরিদর্শন করে তাদের মনে হয়েছে রাজধানীর পাশ্ববর্তী এলাকা হিসেবে এটি যথেষ্ট শান্ত। তাহলে এই তোড়জোড়ের কী কারণ সে বুঝে উঠতে পারেনা। ডাক দেন সেনাপতি। জলদগম্ভীর কন্ঠে বলেন, তোমার আজকাল কী হয়েছে আকেশ? আমার বীর সৈণিক এমন চমকে ওঠে সহজেই? আকেশ মাথা নামিয়ে হাসে। সেনাপতি বলেন, প্রস্তুত হয়ে নাও আকেশ। আগামীকাল তোমরা দশজন মহারাজের অযোধ্যা যাত্রার সঙ্গী হবে। পঁচিশ জনের একটি দল এখানে থেকে যাবে। বাকিরা সুলতানপুর যাবে। যাও প্রস্তুত হয়ে নাও। মনে মনে আকেশ হাসে। এই তবে নিয়তি। দুজনের বিচ্ছেদ এত তাড়াতাড়ি আসবে এই তবে পূর্ব নির্ধারিত। তাকে তো জানা হল না, বলা হল না কিছুই। নিঃশব্দে নিজের তাবুতে ঢুকে আসে আকেশ। সবকিছু প্রস্তুত করে। আবার তাবু ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আকাশে চাঁদ আবছা হয়ে আসছে। দ্রুত পা চালায় আকেশ। একবারটি কথা না বলে সে যেতে পারবে না। প্রবদর গাছের মায়ায় শান্তিতে ঘুমাচ্ছে গ্রাম। ঝিঁঝিঁর ডাক একটা ঘোর তৈরী করছে। গ্রাম সুরক্ষার ছেলেদের লন্ঠনের আলো মৃদু দেখা যাচ্ছে। তাদের চোখ বাঁচিয়ে সোমরাংদের বাড়ির পিছন দিকে চলে আসে সে। এই কদিনে সে জেনেছে পিছনের দিকের ঘরে থাকে সোমরাং। অন্ধকার চোখ সওয়া হয়ে এসেছে। তাই সহজেই তার চোখে পড়ল একটি ছায়ামূর্তি। পিছনের একফালি বারান্দায় জড়োসড়ো হয়ে বসে দুলছে। কে হতে পারে বুঝতে পারে না আকেশ। প্রেত হবে না কারণ যে বাড়িতে পণ্ডিত ধর্মরাজ বিরাজমান সেখানে প্রেত আসতে পারেনা। আকেশ ডাক দেয়, সোমরাং! লাফিয়ে ওঠে মূর্তিটি, চাপা হিসহিসে গলায় বলে, কে? কে ওখানে? আকেশ এগিয়ে বলে, আমি ভীতু সৈণিক। দুজনে নিঃশব্দে খানিকটা হেঁটে যেখানে একটা বড় পাথর ফাটিয়ে দুটি পাইনগাছ বেড়ে উঠেছে সেখানে এসে দাঁড়ায়।

-এতো রাতে এভাবে আসার কারণ?

-আমি আগামীকাল ভোরে আরও কয়েকজনের সাথে অযোধ্যা চলে যাচ্ছি সোমরাং। আজ শিবিরে গিয়ে নির্দেশ পেলাম। যদি সকালে আসতে না পারি তাই একবারটি দেখা করে গেলাম।

সোমরাং চুপ করে থাকে। আকেশ ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে একথা বুঝতে পারে স্পষ্ট। খানিকপর সোমরাং বলে, আমায় ক্ষমা করবেন, আপনাকে না জেনে অনেক খারাপ কথা বলেছি। পারলে ভুলে যাবেন আমায় এবং আমার কটু কথা। আকেশ ওর দিক থেকে চোখ সরায় না। রাতের পোষাকে কিছুটা আলুথালু সোমরাংকে সে অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তবু এত মোহময়ী? যে নারী অন্যের বিপদে ছটফট করে ওঠে, সমাধান খোঁজে সমস্যার, জ্ঞান, বিচারবোধ সব যার স্পষ্ট সে নিশ্চই কোনো বড় স্থান পাওয়ার যোগ্য। তারমতো সাধারণ সৈণিকের ভাগ্যে এই পরম ধন থাকবে কেন? তাই বোধহয় ভাগ্যের এই খেলা। কিন্তু তাহলে দেখা হল কেন?

-তোমায় ভুলতে তো পারব না সোমরাং। আর তোমার বলা কথাও নয়। আমি কোনোদিন ভীতু নই তবু আমারও যে দুর্বলতা আছে, সে আমি টের পেয়েছি তোমার কাছে এসে।

-কিন্তু তা তো দুর্বলতা নয়। সে তো বিচক্ষণতা। একটি অপ্রীতিকর ঘটনা আপনি যে ভাবে সামলেছেন। পিতাজি বলেছেন, আপনি ছাড়া ওইস্থানে চাঁদ থাকলে একটা দুটো মৃত্যু হতোই হত।

-তবে চাঁদ আমার চেয়েও তীব্র, ক্ষীপ্র। আমাকে শত্রু ভেবে সে ধরাশায়ী করতে পেরেছিল সহজেই।

বড়বড় চোখ করে তাকায় সোমরাং, সে কি কবে কোথায়? হাসে আকেশ, সে সব কথা অপ্রাসঙ্গিক। মূল কথা হল চাঁদ এক বিস্ময়কর যুবক। শুধু তাই নয় সে তোমার একজন অনুরাগী। চমকে তাকায় সোমরাং। এই কথা বলতে কি এত রাতে সে এসেছে? সোমরাং বোঝে না, কী চায় কী চায় এই সৈণিক? আকাশের প্রেক্ষাপটে পাহাড় পাইনগাছ কালো রেখায় ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। এত রাতে কেও বাঁশীতে ফুঁ দিয়েছে। ঝিঁঝিঁর ডাক ব্যাকুল করছে মন।

-আপনি এই কথা বলতে এসেছেন?

-না, আমি বলতে এসেছি, তুমি আমার চোখে দেখা এক অনন্য নারী। আমি চাই যদি আপনি আপনার জীবনসঙ্গী স্বাধীন ভাবে নির্বাচন করার সুযোগ পান তাহলে আমার কথা একবার ভাববেন। আমি আকেশ। নাগ্গরে আমার মা বাবা আর বোনকে নিয়ে থাকি। সামান্য জমিজমা, একটি সেবফলের বাগান আর পাঁচটি ঘোড়া আছে আমাদের। আমি দেশের সেবা করতে সৈণিক হয়েছি কিন্তু নিজের জন্য এমন কাউকে চাই যে আমায় শুধু স্বামী না ভেবে বন্ধু ভাববে, সঙ্গী ভাববে।

সোমরাং কেঁদে ফেলে মুখ ঢেকে। ফুলে ফুলে ওঠে তার কান্না। আকেশ হতভম্ব, হাত বাড়িয়েও স্পর্শ করতে পারে না। সোমরাং কী করে বোঝায় সেই কবে থেকে সে লুকিয়ে দেখে আকেশকে। বিপাশার জলে শরীর ভাসিয়ে দেওয়া আকেশকে পাওয়ার ইচ্ছা তাকে কতটা প্লাবিত করেছে কী করে বোঝায়? শরীরের আকর্ষণ মুখ ফুটে এক নারী নাই বা জানাল সে যে বীর আকেশের স্থীতধী, ন্যায় পরায়ণ মনটির কাছেও নিজেকে সঁপেছে একথাই বা বলে কী করে? আকেশ ওর মাথায় হাত রাখে, নরম করে ডাকে, সোম! চোখ মেলে চায় দুজনা দুজনার দিকে।

-তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে?

-করব।

-আমি তোমার কাছে ফিরে আসব শিগগিরই।

-আমরা তো এখানে থাকব না।

-মাণ্ডি আমার হাতের তালুর মতো চেনা সোম। আমি প্রশিক্ষণ নিয়েছি সেখানে। তিন বছর ছিলাম।

-মাণ্ডি কি আমাদের গ্রামের মতো সুন্দর?

-নাহ্! তবে সেখানেও তোমার বিপাশা আছে, পাইন আছে, চেরীগাছ আছে কয়েকটা।

-চেরীগাছ?

-প্রবদর!

আরও কিছুক্ষণ ঠাণ্ডার ভিতরেই দুজনে বসে থাকে। তারপর উঠে দাঁড়ায় আকেশ। ফিরে যাবার অনুমতি চায়। সোমরাং বলে, ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিতে অনুমতি দিলাম। নিজের সাহস প্রমাণ করতে আকেশ সোমরাংকে বুকে জড়িয়ে ধরে। থরথর কাঁপতে থাকা নরম সুন্দর সুগন্ধী সোমরাং। আকেশ ছাড়তেই চায় না। তবু শেষ পর্যন্ত চলে যেতেই হয়। সোমরাং আজ সারারাত কাঁদবে নাকি সুখে ভাসবে জানেনা। আকেশ দ্রুত পা চালায়। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে। কেউ তার পিছু নিয়েছে। এই মুহূর্তে তার কাছে একটা খাঞ্জার ছাড়া কিছু নেই। কোমর থেকে সেটিই বের করে হাতে নিয়ে হাঁটে। বিপাশার পাড় ঘেঁষে এবার রাস্তা। দূরে আলোর বিন্দুর মতো সৈণ্য শিবির। খোলা এই প্রান্তরে এসে আকেশ হুঙ্কার দেয়। 

-কে আছো বেরিয়ে এসো।

পাইনের জঙ্গল থেকে অতি ধীরে একজন বেরিয়ে আসে। তার হাতে ভালা। লম্বা কাঠের মাথায় ধারালো লোহার ফলা। দূর থেকে আক্রমণ করার অস্ত্র। আকেশ বিস্মিত হয় না। বরং খুব স্থির ভাবে বলে, মারলে না কেন? সে উত্তর দেয়, পারলাম না। অথচ আজ এই মুহূর্তে তোমায় বিপাশায় ভাসিয়ে দিতে পারলে আমার শান্তি। আকেশ হাসে। বলে, এসো বসি। রূপচাঁদ চুপচাপ এসে বসে পড়ে। ওর মুখখানা ঝাপসা চাঁদ আলোয় বিপাশার মতোই সকরুণ। দুজনে বিপাশার পাড়ে থাকা বড় পাথরের উপর বসে। 

-তুমি চমকালে না যে।

-আমার মন বলছিল তুমি সোমদের বাড়ির আশেপাশে আছো। হয়তো আমায় দেখেছো।

-তুমি ওকে সোম বলে ডাকো? কই আগে তো বলোনি।

-সে অধিকার এতদিন তো পাইনি বন্ধু।

-আজ বুঝি সব অধিকার পেয়ে গেলে?

আকেশ চুপ করে যায়। রূপচাঁদকে সে পছন্দ করে। সেনাপতির কাছে তার কথা বলেও রেখেছে। আর দু বছর পর সেও যোগদান করতে পারবে সেনায়। কিন্তু ওর গলার স্বরের এই কান্না আকেশকে চুপ করিয়ে দেয়। রূপচাঁদ বলে, কিসের আকর্ষণে একজন আর একজনকে পছন্দ করে জীবনসঙ্গী রূপে আমি জানি না। আমাদের এখানে বাবা মায়েরা যার সাথে বিয়ে দেয় সেই আমাদের জীবনসঙ্গী হয়। সোমরাং এর পিতাজি এক আশ্চর্য মানুষ, তিনি আমাদের পাঠদান কালে বলেছিলেন, দুজন মানুষ যদি পরস্পরকে না জানে, না বোঝে, না শ্রদ্ধা করে, না ভালোবাসে তাহলে দাম্পত্য জীবন ব্যর্থ হয়। সংসার সুখময় হয় দুটি মানুষের গভীর বন্ধনে। আকেশ সম্মতি দিয়ে বলে, পণ্ডিতজি যথার্থ বলেছেন। রূপচাঁদ গম্ভীর ভাবে বলে, কিন্তু তুমি কি সোমরাংকে জানো? কতটুকু বোঝো ওকে? ওর পছন্দ অপছন্দ, রাগ, আনন্দ কতটুকু জানো বলো? আকেশ মৃদু হাসে।

-ভাই চাঁদ, আমি তাকে খুব অল্প জানি কিন্তু তাকে জানার আকাঙ্খা অপরিসীম। তার মুখের হাসি দেখার জন্য আমি সব করতে পারি। 

-এসব কথার ফানুস। আজ সে তোমার কাঙ্খিত বলে একথা বলছো, অভ্যাস হলে আর এই মোহ থাকবে না। তখন!

-এত পরের কথা আমি তো জানিনা ভাই। তাছাড়া এই মুহূর্তে আমরা বিচ্ছিন্ন। আগামীকাল থেকে আমি তাকে দেখতে পাবনা। চলে যাব সুদূর অযোধ্যায়। তুমি তার কাছে থাকবে অন্তত আরও বেশ কয়েক মাস। আমার অনুপস্থিতিতে সে আমায় মনে নাও রাখতে পারে।

রূপচাঁদ একটু বেভুল হয়ে যায় যেন। পাথর থেকে লাফিয়ে নেমে হনহন করে বনের পথে ফিরে যায়। আকেশ সৈন্যশিবিরে পৌঁছে যায় অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে। সোমরাং আর আকেশকে কেবল রূপচাঁদ দেখেনি, দেখেছিল আরও একজন। চামেলি দেবী। মেয়ে ঘরে এসে চুপচাপ শুয়ে পড়লে তিনিও দরজার আড়াল থেকে সরে যান। তার মন ব্যাকুল হয় রূপচাঁদের জন্য। চাঁদের সোমরাং এর প্রতি অনুরক্ততা তিনি জানেন। বয়েসে ছোটো চাঁদকে দেখে বোঝা না গেলেও বয়সচিত কারণেই সে বড্ড ছটফটে, আবেগপ্রবণ। এই ঘটনা জানলে হতে পারে অনেক কিছু। নানা দুঃশ্চিন্তায় ঘুমিয়ে পড়েন চামেলি। সে রাতে ঘুম এলো না কারো কারো চোখেই।

(ক্রমশ)

আগের পর্বের লিঙ্ক bipasar tire dwityo parbo


1 thought on “বিপাশার তীরে – ৩য় পর্ব”

  1. গল্পটা যেভাবে এগোচ্ছে, সত্যিই খুব ভালো লাগছে। আকেশ আর সোমরাংয়ের সম্পর্কের মধ্যে যে ধীরে ধীরে একটা টান তৈরি হচ্ছে, সেটা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিস। বিশেষ করে বিপাশার পাড়ে রাতের দৃশ্য, পাইনগাছ, চাঁদের আলো আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের বর্ণনাগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল যেন সবটা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। আর চরিত্রগুলোর আবেগগুলোও খুব স্বাভাবিকভাবে এসেছে, কোথাও বাড়াবাড়ি মনে হয়নি। পরের অংশে কী হয়, সেটা জানার জন্য অপেক্ষায় রইলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top