বিপাশার তীরে – ২য় পর্ব

bipasar tire dwityo parbo

সৈন্য শিবির থেকে আকেশ বেরিয়ে পড়েছে যখন তখন আকাশে নরম আলো। আজ তার পরনে সাধারণ পোষাক। জঙ্গলের রাস্তা পেরিয়ে দ্রুত গ্রামের দিকে আসে। বিপাশার তীর ছুঁয়ে এই গ্রামের শুরু, যেন এক নব যৌবনবতী। গৃহস্ত বাড়িতে মেয়েরা সাংসারিক কাজে মগ্ন। আকেশ চোখ কান খোলা রেখে এগোতে থাকে। সহসা চোখ যায় একটি বাড়ির উঠোনে সভা মতো বসেছে। চুপচাপ ভীড়ের ভিতর বসে পড়ে আকেশ। পরিস্থিতি সবটুকু নিঃশব্দে অনুভব করে। মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে সোমরাংকে। ওর কাঁধের উপর উজ্জ্বল নীল রঙের পাত্তু যেন গোটা উপত্যকার আকাশকে জড়িয়ে রেখেছে।নির্ভয়ে সকলের সামনে কথা বলে চলছে। ওর অনুভূতি প্রবণ মন যেন প্রবদর গাছের মতোই সুন্দর। সকলে যখন বেরিয়ে আসছে ওদের বাড়ি থেকে তখন আকেশে উঠে পড়ল। তবে ধর্মরাজ মানুষটিকেও তার বেশ লেগেছে। সোমরাং তার পিতাজির যথার্থ প্রতিচ্ছবি। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে পিছু নিয়েছে ভিনদেশী মানুষ দুজনের। তাদের সাথে ভীম নামক স্থানীয় লোকটিও রয়েছে। কিছুদূর যাবার পর ভীমকে পারিশ্রমিক দিয়ে তারা বিদায় জানাল। এদের ভাষা আকেশের জানা। মহারাজ জগৎ সিংহ দিল্লীশ্বর ঔরঙ্গজেবকে সহায়তা করতে মাঝেমাঝেই সৈণ্য প্রেরণ করেন। একবার আকেশ গিয়েছিল যুদ্ধে। মাসখানেক থাকার সময় এই প্রদেশের ভাষা তার জানা হয়েছে কিছুটা। গঙ্গানদীর তীরে শস্যশ্যামল এই প্রদেশেই রয়েছে কালীমাতার প্রাচীন মন্দির বহু মানুষ এখানে আসে, মুক্তির আশায়। মিষ্টি, মাছ বড় প্রিয় এখানকার মানুষের আর তেমন সাহস। আকেশ শোনে অপহৃত মেয়েটির স্বামী রাগত স্বরে বন্ধুকে তীব্র ভাষায় আঘাত করতে উদ্যত।

-কী চাস তুই? মনে রাখিস প্রাণ নিয়ে ফিরতে চাইলে চুপ থাক।

লোকটি নিশ্চুপ হয়ে হাঁটা লাগল বিপাশার দিকে। শ্বাপদের মতো উল্টো পথে মেয়েটির স্বামী। আকেশ নিজের কাজে এগোয়। সোমরাং দের ছোট্ট গ্রামটি যেন সহসা দিশেহারা। মিলেমিশে থাকা মানুষ তারা কঠিন পাথুরে মাঠি ফাটিয়ে চাষবাস করতে করতেই তাদের দিন চলে যায়। ঈশ্বর ভজনা, গান, সুর, মনের আনন্দে কখনও বা নৃত্য এই তাদের জীবন। কিন্তু কেন হল এমন? নারী তাদের কাছে সম্ভ্রমের, সেখানে এমন গর্হিত কাজ! সূর্য মাথার উপর উঠতে শুরু করেছে। আকেশকে আবার গ্রামের পথে দেখা যায়। এবার তার গতি বাজারের দিকে। গ্রামে সকলের বাড়িতেই সব্জিপাতি হয় তবে চাল, গম, বাজরা, মশলার জন্যেই ছোট্ট বাজার আছে। আকেশ ঘুরে ঘুরে এটা সেটা দেখে আর মানুষের কথা শুনতে থাকে, বুঝতে থাকে। খানিকপর ফেরার রাস্তা ধরে। পরাশর মন্দির ছাড়িয়ে ডানদিকের ঢালের রাস্তায় আসতেই পথ আটকে দাঁড়ায় রূপচাঁদ ও তার দুইসঙ্গী। হুঙ্কার দেয় রূপচাঁদ।

-কে তুমি? কী চাই এখানে? আগে তো দেখেনি।

আকেশ উত্তর দেওয়ার আগেই পাথরের পিছন থেকে কেউ বলে ওঠে, আমি চিনি। বেরিয়ে আসে সোমরাং। আকেশের চোখে চোখ রেখে বলে, মহারাজের সৈণ্যদলের এক ভীতু সেপাই। যে বিপদ দেখলে লুকিয়ে পড়ে। চোখ বড় বড় করে রূপচাঁদ বলে, সেকি তবে যে শুনি, রাজার সৈণিকরা দিল্লীশ্বরের সৈণ্যদলের সাথেও যোগদান করে? সোমরাং তেরছা হাসে, তারা সাহসী, যোদ্ধা। সবাই তাই হবে এমন ভাবা ঠিক নয়। আকেশ কোনো জবাব দেয় না। নমস্কার জানিয়ে ঢালের রাস্তা দিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে। মন তার ভার হয়ে আসে। মাত্র কয়েক মুহুর্ত তাতেই এত অনুমান করে নিল মেয়েটি। নিজের ভাবনার উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মানুষ ভুল করে বেশি। আকেশ মৃদু হাসে। ওর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে সোমরাং ভিতরে ভিতরে জ্বলতে থাকে। শরীর দেখে আকৃষ্ট হয়েছিল সে? ওই পেশীবহুল চেহারার পিছনে এক ভীতু মানুষ আছে সে ভাবতেই পারেনি। রূপচাঁদ ওর ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক।

-কী নিয়ে এত ভাবছ তুমি? ভয় পাচ্ছ নাকি? আমরা আছি গ্রামের কোনো ক্ষতি হবে না। নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোমরাং। বাজার থেকে মায়ের বলে দেওয়া জিনিসপত্র নিয়ে ফেরে। ওদের ক্ষেতে লাগানো হয়েছে কোষাতকী(ঝিঙে) আর তুম্বী(লাউ)। নিড়ানি নিয়ে ক্ষেতে চলে যায়। পাখির ডাক, নদীর ঝরঝর শব্দে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। থেকে থেকে নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসে। রূপচাঁদ কোমড়ে হাত দিয়ে সোমরাংকে দেখতে থাকে। মেয়েটা কিছু একটা ভাবনায় গভীর ভাবে ডুবে রয়েছে। 

-আবার তুমি চিন্তা করছো?

সোমরাং একটু ঝাঁঝিয়ে বলে, কী হয়েছে তোর? আমার পিছনে ঘোরা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই? বাবা তোকে গ্রাম পাহাড়া দিতে বলেছে আমায় নয়। রূপচাঁদ চোখ নামিয়ে নেয়। কিন্তু জায়গা ছাড়েনা। সোমরাং বিরক্ত হয়ে ওঠে। ক্ষেতের কাজ ছেড়ে বিপাশার দিকে এগোতে থাকে। মুখ ঘুরিয়ে বলে, খবরদার চাঁদ আমার পিছনে আসবি না। এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে নদী যেখানে বিস্তার লাভ করেছে সেখানে এসে থামে।অসংখ্য নুড়ি ছড়ানো তীর ঘেঁষে, পাইন গাছগুলো প্রবল আগ্রহ নিয়ে চেয়ে রয়েছে নদীর দিকে। ছায়ায় বসে নদীর দিকে চেয়ে রইল সোমরাং নিজেও। আকাশে গনগনে সূর্য। 

-আমার আওয়াজ শুনে চলে যাবেন না। আমি ভীতু সৈণিক সুতরাং আপনার ক্ষতি করব না।

সোমরাং ফিরে তাকায়। বুঝে উঠতে পারে না তার হৃৎপিণ্ডটা এতটা দ্রুত শব্দ করছে কেন? ওর থেকে একটু দূরে পাথরে বসে আছে আকেশ। মুখে ব্যথা নাকি কৌতুক? সোমরাং বিচলিত হয়। কাউকে আঘাত করা ওর স্বভাব নয় তবু এই অচেনা মানুষটিকে সে বোধহয় বেশিই আঘাত করে ফেলেছে।

-যে মানুষটিকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন তাকে তার স্বামীর সাথে যেতে দেবেন না আপনি, এই বিশ্বাস আমার আছে। তবে আপনাকে বুঝতে হবে, সময় বদলাচ্ছে। নাগ্গর থেকে রাজধানী সুলতানপুরে স্থানান্তরিত হবার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনাদের অঞ্চল মোহাল এখন আরও বেশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক তাই না! ফলে আপনাদের এলাকা নানা ভাবে পরিবর্তন হবে।

-তার সাথে এই ঘটনার কী সম্পর্ক?

-আছে। কিছু মানুষ চাইছে না এখানে পর্যটক আসুক। 

-রাজধানীর সুরক্ষা চেয়ে রাজার লোক এমন কাজে প্ররোচনা দিচ্ছে?

চমকে ওঠে আকেশ। এই নারী বড় বেশিদূর ভেবে ফেলার ক্ষমতা রাখে ঠিকই কিন্তু তাড়াহুড়ো সঠিক সিদ্ধান্তের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গম্ভীর ভাবে সে বলে, মহারাজকে এত দুর্বল ভাবার কোনো কারণ দেখি না। এই কাজ কিছু দুষ্টু প্রকৃতির লোকের। যদিও এর সাথে আরেকটি গল্প অদ্ভুত ভাবে জুড়ে গিয়েছে। সোমরাং কৌতুহলী হয়ে চেয়ে রয়। আকেশ খুব সহজ ভাবে বলে, সেদিন রাতে আমি আপনাকে যেতে দিইনি এবং নিজেও যাইনি কারণ সেই মুহূর্তে দুষ্কৃতিদের হাতে আগ্নেয় অস্ত্র ছিল। না কামান বা ম্যাচলাক নয় এর নাম পিস্তল। এর সামনে তলোয়ার নিয়ে লড়তে যাওয়া মূর্খামি। দ্রুত আগুনের ছোট্ট সীসে বুকে বিঁধে মুহূর্তে প্রাণ কেড়ে নেবার ক্ষমতা রাখে। এই অবধি বলে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় আকেশ। দ্রুত মাথা নাড়ে। হাহাকারের মতো বলে, না, না, আপনি ভাববেন না আমি সাফাই দিচ্ছি। হয়তো সত্যিই আমি ভীরু। সৈণিক হয়ে দুষ্কর্ম দেখেও ঝাঁপিয়ে পড়িনি। শতধিক আমায়। আকস্মিক বিপরীত দিকে ঘুরে প্রায় দৌড়ে চলে যায় আকেশ। সোমরাং ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যায়। আটকাতে চেয়েও পারে না। চোখের কোণদুটো বেয়ারা রকম জ্বলতে থাকে। যেন কোটরে কেউ তীব্র বিষ ঢেলেছে। দূর থেকে দৃশ্যটি আরেক জন দেখে। চোখে তারও তীব্র জ্বালা। দূরে থেকে সে চোখে চোখে রাখে সোমরাংকে। দেখে পাহাড়ের প্রথম আলোর মতো সে মেয়ে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সময় বয়ে চলেছে, কোনো দিকে হুশ নেই তার। বেশ কিছু সময় পর বাড়ির দিকে অভিমুখ ফেরে। নিজেকে গোপন রেখে রূপচাঁদ বাড়ির সীমা অবধি আসে। সোমরাং ভিতরে গেলে মুখের কাছে হাত এনে মুখে আওয়াজ করে। ওদের বাড়ির দুই প্রান্ত থেকে গুঁড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে দুই যুবক। ইশারায় জিজ্ঞাসা করে কেউ এই বাড়ির ধারেকাছে এসেছিল কিনা! মাথা নেড়ে না বলে তারা। রূপচাঁদ হাত নাড়তেই তারা আবার পাহাড়ায় ফেরে। এবার চাঁদকে যেতে হবে দোভাষী ভীমের বাড়ি। ধর্মরাজ আসার আগে সৈণিকটির হদিশ আনতেই হবে। ভীমের ঘরের কাছাকাছি এসে সে বুঝতে পারে তাকে চোখে রাখছে কেউ। চকিতে লাফিয়ে পিছন ঘোরে কিন্তু আগন্তুক আরও ক্ষিপ্র। মুহুর্তে লুকিয়ে যায়। তবে তার আবছায়া চোখে পড়ে রূপচাঁদের সেও নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে সেই দিকেই ছুটে যায়। খানিক লুকোচুরির পর আকেশকে ধরে ফেলে রূপচাঁদ। গলায় বড় ভোজালি ধরে বলে, সৈণিক না অন্য কেউ তুই! সোমরাং এর সাথে তোর সম্পর্কটাই বা কী? মৃদু হাসে আকেশ।

-আমি তোমার পিছনে আসিনি, তবে চাইনি তুমি আমায় দেখো।

-কেন? কী লুকাচ্ছিস তুই?

-আমার গলা থেকে অস্ত্রটা নামিয়ে নাও। বলছি সব।

আকেশের বলার ধরণে রূপচাঁদ প্রভাবিত হয়, অস্ত্র নামালেও সতর্ক থাকতে ভোলে না। পাইনের জঙ্গলের ভিতর উঁচু পাথরে দুজনে বসে। দুজনের মুখ ভীমের বাড়ির দিকে। আকেশ বলে, তুমি আমার খোঁজেই এসেছো বোধহয় ভীমজির বাড়ি! আমিই সেই রাতে ভিনদেশী পর্যটকদের সাথে তাদের অপহৃত স্ত্রীকে অনুসন্ধান করি। দেখো রূপচাঁদ তোমার আর আমার কাজটা কিন্তু এক, তুমি গ্রাম রক্ষা করো আমি দেশ। রূপচাঁদ বিদ্রুপের আওয়াজ করে বলে, সোমরাং এর ভাষায় তুই ভীতু। আকেশ মাথা নীচু করে। চাঁদের ভাষায় তখনও বিদ্রুপ, তাচ্ছিল্য। তবু চাঁদকে সবটাই জানাতে হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় আকেশ। তারপর ধীরে ধীরে সেই দুর্ঘটনার রাতটির কথা বর্ণনা করে। সবটা শুনে বিচলিত হয়ে পড়ে রূপচাঁদ।

-এসব কথা আমার থেকে গোপন করেছে সোমরাং! কী আশ্চর্য! ছোটো থেকে আজ পর্যন্ত ওর সব কথা কেবল আমিই জানি।

আকেশ একবার দেখে নেয় পাহাড়ী সাহসী তরুণটিকে। চকিতে বুঝতে পারে কত না বলে কথা! তারপর বলে, শোনো চাঁদ, সেদিন সোমরাংকে ছেড়ে আমি শিবিরে ফিরতে পারিনি। কেবলই মনে হতে থাকে সোমরাং এর আর্তি। এক বিপদগ্রস্থ মানুষকে বাঁচানোর কী ভীষণ ইচ্ছে। আমি ফিরে যাই বনে। ভিনদেশীদের রক্তাক্ত অবস্থায় পাই, আর সন্দেহটা হয় তখন থেকেই। যার প্রিয়জন অপহৃত তার কেবল দুই হাতে চোট অথচ তার বন্ধুর মাথা ফেটে গিয়েছে? চোখের নীচের কালসিটে অবশ্য পরে দেখেছি। কিন্তু এমন কী করে হয়? তাহলে নারীটিকে বাঁচানোর চেষ্টা কে বেশি করেছিল? 

-মানে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

-দুষ্কৃতিরা তাকেই বেশি মারবে যে বাধা দেবার বেশি চেষ্টা করবে। অথবা যার প্রতি তাদের রাগ আছে। যাইহোক এরপর খোঁজার সময়েও নারীটির নাম ধরে ডাকা, পাগলের মতো ছুটে চলা সবটাই করেছে মেয়েটির স্বামীর বন্ধু। বলো কী বুঝতে পারছ এবার?

ভুরু কুঁচকে বসে থাকে রূপচাঁদ। তার বিস্ময় মুখের ভিতর ফুটে ওঠে। আকাশে সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তকে দেখবার জন্য ব্যস্ত।

-অর্থাৎ এই ঘটনার সাথে নারীটির স্বামী যুক্ত?

-সঠিক বুঝেছো। শুধু তাই নয় এই ঘটনার দুষ্কৃতিরা তোমাদের এলাকার লোক নয় বলেই আমার অনুমান।

-অনুমানের কারণটা বলা যাবে?

আকেশ কিছুক্ষণ চুপ করে যায়। সকালে সোমরাং দের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে ভিনদেশীদের পিছু নিয়েছিল তারপর অপহৃত নারীর স্বামীর বন্ধুর পিছু নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল বিপাশার তীরে। লোকটি একাকী নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে মৃদু গুণগুণ করছিল। আকেশ যতটুকু বুঝেছে সেই গানের অর্থ এই রকম-

“হেথা শূন্য সব, আকাশ বাতাস মনে বড় ভয়

হারাতে চাইনা যারে হারাই বারেবারে

কী জানি কী সে কয়

মনে বড় ভয়, বড় ভয়

হেথা শূন্য সব” 

আকেশের উপস্থিতি টের পেয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানায়। আকেশ ভাঙা ভাঙা শব্দে তাকে বলে তাদের ভাষা কিছুটা সে জানে। তার এবং তার বন্ধুর কথোপকথন সে শুনেছে। কোনো সাহায্য দরকার হলে আকেশ যে তাকে সাহায্য করবে এই প্রতিশ্রুতি দেয়। লোকটি হাত জোড় করে বলে, মহাশয় আমরা দুই বন্ধু হরিহর আত্মা। ছোটো থেকে একসাথে বেড়ে  ওঠা আমাদের। আমার বন্ধু একটু বেপরোয়া। আমি একটু ভীতুই বলতে পারেন। তবে আমার এই পৃথিবীকে দেখার বড় শখ। বিভিন্ন পুঁথিপত্র বই পড়ে আমার মনে শখ জাগে ইউয়েন সাং এর মতো পরিব্রাজক হবার। আমার বন্ধু যে মেয়েটিকে বিবাহ করে সে আমার ধর্ম বোন। ধর্ম বোন বোঝেন? আকেশ মাথা নেড়ে না বলে। সে বলে, নিজের বোন নয় তবে ধর্মকে সাক্ষী রেখে তাকে বোন বলে গ্রহণ করেছি। তারও দেশ দেখার শখ। ইতিমধ্যে আমার বন্ধুর চরিত্রে কিছু পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন ভাবে টাকা উপার্জন করতে শেখে সে। বলতে দ্বিধা নেই সবটা সৎ পথ নয়। এই নিয়ে বোনের সাথে ঝগড়া বেশ বাড়তে থাকে। আমি নিজের জগতে ব্যস্ত। আমার একটা ছোট্ট কাপড়ের দোকান আছে। বিধবা মা ছাড়া কেউ নেই। তাই কিছু অর্থ জমিয়ে দেশ ভ্রমণে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিই। আমার বন্ধুও সস্ত্রীক আমার সাথে জুড়ে যায়। এই অবধি সব ঠিক ছিল জানেন। এরপর বিপদ যেন আমাদের পিছু ছাড়ে না। বিহারে রয়েছি তখন আমরা। একটি টিলার উপর থেকে নিসর্গ দেখছি হঠাৎ বোনকে ধাক্কা দিয়ে ছুট্টে পালিয়ে যায় কেউ। আমরা দৌড়ে খাদের ধারে গিয়ে দেখি, একটা ছোট্ট পাথর পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে রয়েছে সেখানেই আটকে রয়েছে বোন। আমার বন্ধু এই ঘটনার পর কেমন যেন গুম মেরে যায়। বোন ওর থেকে দূরত্ব রাখতে শুরু করে। 

-তারপর!

-এর পরের দুর্ঘটনা ঘটে হরিদ্বারে, একসাথেই তিনজন ছিলাম, আমি ডুব দিয়ে উঠে দেখি বোন স্রোতের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। একজন সাধু ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে উদ্ধার করে। আর বলে, ঘরে ফিরে যাও, তোমার খুব বিপদ। 

-সেকি!

-আমার বন্ধু অদ্ভুত এক কথা বলে আমায়, বলে, আমি নাকি ওর বউকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছি। আমার নাকি কু নজর ওর স্ত্রীর প্রতি।

একথা বলতে বলতে গলা ধরে আসে লোকটির। ওর নাম সুজন। আকেশ সুজনের চোখে জল দেখে। ভাবে এমন ঘটনার পরেও এরা ফিরে গেল না কেন? সুজন বলে, আমার বোনের বড় ইচ্ছে ছিল বরফের পাহাড় দেখার। সে বলে, দাদা আজ না হোক কাল মরে তো একদিন যাবই তার আগে একবার বরফের পাহাড় দেখাও। ওর আর্তিতে আমার মন নরম হয়ে যায়। সারা পথ আমার বন্ধু কোনো খারাপ কথা আমায় বলেনি। আপনাদের এখানে আসার পর থেকে ও কেবল রাজার খবর, এলাকার খবর, ব্যবসা এসব নিয়ে বিভিন্ন লোকের সাথে মত্ত হয়ে পড়ে। আমি বোনকে সব জায়গায় নিয়ে নিয়ে যেতাম। চেরি গাছের সৌন্দর্য ওকে পাগল করে দেয়। রোজ চেরি গাছের কাছে আসা চাইই চাই। আকেশ ভুরু কুঁচকে বলে, চেরি গাছ কোনটা? লোকটা আঙুল তুলে সুন্দরী প্রবদরের দিকে নির্দেশ করে। এরপর অনুনয়ের সুরে লোকটি বলে, আমার বোনকে বাঁচান। আমার বন্ধু বোধহয় ওকে মেরে ফেলতে চায়। ওই ভীম শর্মাকে চেপে ধরুন ও কিছু একটা বোধহয় জানে।

-কী হল কী ভাবছো?

রূপচাঁদের ডাকে সম্বিত ফেরে আকেশের। এত কথা সে জানায় না ওকে। বলে, ভীম শর্মাজী কে আমি একটু চোখে রাখতে চাই চাঁদ, মনে হচ্ছে এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা শ্রেয়। হঠাৎ বাতাসে তীক্ষ্ণ শিস্ ভেসে আসে। চঞ্চল হয়ে ওঠে চাঁদ। লাফ দিয়ে উঠে বলে, সোমরাং দের বাড়ি এখনি যেতে হবে। হাওয়ার বেগে ছুটতে থাকে দুজনে। সন্ধ্যা তখন ঘনিয়ে এসেছে প্রায়। সোমরাং দের বাড়ি একটা ঢালের বাঁহাতে। ফলে অন্যান্য বাড়ি থেকে একটু আড়ালে। চারজন জোয়ান পুরুষ নিয়ে আশ্রিতা মেয়েটির স্বামী দাঁড়িয়ে সোমরাং দের বাড়ির উঠোনে। ঘরের মূল দরজা আটকে মা ভবানীর মতো সোমরাং। তার পাত্তুর রঙ আজ আগুনের মতো উজ্জ্বল। হিসহিস করছে লোকটা, আমার স্ত্রীকে আমি নিয়ে যাব। এতে কারো কিছু বলার থাকে না। দোভাষী একজন কথা গুলো অনুবাদ করলে গর্জে ওঠে সোমরাং, চলে যান। আমার পিতাজির কথা অমাণ্য করে না কেউ। শেয়ালের মতো হাসে সে, একটা বুড়ো পুরোহিতের যার কোনো ছেলে পর্যন্ত নেই তার কথা আমি মানব কেন? এই অবধি শুনে লাফিয়ে পড়ে চাঁদ। গলার টুটি চেপে ধরতেই পিস্তল বার করে সঙ্গের লোক দুটি। বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় আকেশ। চোখ তার ধিকিধিকি জ্বলছে। চাপা গলায় বলে, আমি মহারাজ জগৎ সিং এর সৈণিক। খবরদার সংযত হও, আমি হুঁশিয়ারি দিচ্ছি। বাড়ির দুই দিক থেকে দশ বারো জন গ্রামের জোয়ান ছেলেরা লাফিয়ে আসে। ভয়ার্ত হয়ে ওঠে শ্বাপদের মুখ। সোমরাং দেখে ভীতু সৈণিকের চোখ জ্বলছে ধিকিধিকি হাতে তলোয়ার, খাণ্ডা। লড়াইটা শুরুর আগেই থেমে যায়। আকেশকে চিনতে পারে পিস্তলধারী দুজনেই। তাদের মুখ বাঁধা থাকলেও চোখ বলে দিচ্ছিল তারা ভীত। পিস্তল উঁচিয়ে তারা পিছু হটতে লাগল। সঙ্গের আর দুজনে পালাতে থাকে। আকেশ তীব্র হুঙ্কার দিল, কেউ অযথা ওদের আটকাতে গিয়ে বিপদ ঢেকে আনবেন না। ওদের হাতে পিস্তল। লোক চারটে পালালেও, আশ্রিতা মেয়েটার স্বামী ধরা পড়ল। পিছ মোড়া করে ওকে বাঁধা হল। সবাই ওকে মারতে চায়। আটকায় রূপচাঁদ।

-না কেউ মারবে না। আমরা দেবতার ভূমিতে বাস করি। এখানে অযথা রক্তপাতে আমরা বিশ্বাসী নই। আকেশ ভাই যা নির্দেশ দেবেন আমরা সেই মতো চলব।

সোমরাং বিমূঢ়। ছবির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। চাঁদ কেন এত ভরসা করছে? আকেশ এগিয়ে আসে। কঠিন গলায় বলে, তিনবার আপনি আপনার স্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা করেছেন। আমার কাছে প্রমাণ আছে। আপনাকে তুলে দেব রাজার বিচারালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্তদের হাতে। এই বিপাকে পড়েও হাসে লোকটি। সোমরাং দের ভাষাতেই বলে ওঠে, আমি ভিনদেশী আমার বিচার তোর রাজা করবে কী করে? সোমরাং দু পা এগিয়ে আসে। 

-অপরাধ যে এলাকায় হয় সেই এলাকার শাসক প্রাথমিক ভাবে সব বিচার করতে পারেন। সে অধিকার তার আছে। কিন্তু আপনার বিচারের জন্য মহারাজকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী? আপনার স্ত্রী করুক আপনার বিচার।

ভিতর থেকে মেয়েটি আসে। কাঁপতে থাকে তার ঠোঁট। কান্নার জল বাঁধ মানে না, তবু রিনরিন করে বলে চলে কথা। ওর কথা কেউ বোঝে না আকেশ ছাড়া। আকেশ চমকে যায় ওর কথায়।

-তোমায় আমি ভালোবেসেছি। তাই যতবার বিপদে পড়েছি ভেবেছি আমি ভুল দেখেছি, ভুল ভেবেছি, তুমি আমায় কেন মারবে? কিন্তু এবার ওই লোকগুলো আমায় ছিঁড়ে কুটে ফেলার সময় বারবার কী যেন ইঙ্গিত করছিল, খুব হাসছিল। আমি ব্যথায় ডুবতে ডুবতে বোঝার চেষ্টা করছিলাম কী বলছে ওরা? ওদের ইঙ্গিত দেখে বুঝলাম ওরা তোমার কথা বলছে। তুমি চাও আমায় নষ্ট করতে? যাতে লজ্জায় ঘৃণায় আমি নিজেই আত্মহনন করি? আমায় ওরা মেরে ফেলেনি, সে হয়তো তোমার নির্দেশ কিন্তু আমিও নিজেকে মারব না এই প্রতিজ্ঞা করলাম। আমার তো কোনো দোষ নেই তাহলে কেন মরব আমি। 

থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ে মেয়েটি। ছুটে আসে সোমরাং। লোকটার গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়ে। থাপ্পড়টা মারে আকেশ। চিৎকার করে বলতে থাকে তার ইচ্ছে করছে এই জঘন্য লোকটাকে ছিঁড়ে ফেলতে। সবাইকে জানায়, এই লোকটা এমন সুন্দর, নিরীহ একটি নারীকে মেরে ফেলতে চেয়েছে বারবার। আমি চাই এই ঘটনার তদন্ত হোক। কেন করল সে এমন? একথার উত্তর জেনে তবে আমার শান্তি। বলেই হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলল। সাথে চলল রূপচাঁদ ও তার দলের কিছু ছেলে। বাকি ছেলেরা রয়ে গেল সোমরাং দের বাড়ির উঠোনে। যতক্ষণ সব অপরাধী ধরা না পড়ছে, আশ্রিতা মেয়েটির সুরক্ষা প্রয়োজন। অন্ধকার ঢাকতে থাকে পাইন, বরফের পাহাড়, চরাচর। দূর থেকে ভেসে আসছে মন্দিরের মৃদু ঘন্টা ধ্বনি। বাবার জন্য সোমরাং এর মনটা কেঁদে ওঠে। বড় শান্তিপ্রিয় মানুষ তিনি। এসব শুনলে কত ব্যথাই না পাবেন। আশ্রিতা মেয়েটি সোমরাং কে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছি। চামেলি দেবী আলো নিয়ে রাখে বারান্দায়। দীপের নরম আলোয় মেয়েটিকে আরও মায়াময় লাগে। চামেলি ওর মুখ মুছিয়ে ঘরে যেতে ইঙ্গিত করেন। নিজের মেয়েকে বলেন, বিটিয়া হাতে হাত দিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না। চলো  খাবারের আয়োজন করি। সোমরাং নিজেকে ঘষটে তোলে। ভিতর থেকে লুগডি এনে দিল বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা চার যুবককে। সে নিজে বার্লি থেকে তৈরী এই পানীয় কোনো দিন ভালোবাসে না কিন্তু গ্রামে প্রায় সকলেই খুব পছন্দ করে। ভিতরে চামেলি ডালের পুর ভরছে আটার লেচিতে। আশ্রিতা মেয়েটিও হাত লাগিয়েছে কাজে। সোমরাং বোঝে মা বাবরু বানাচ্ছে চাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতায়। ও যে বড়ো ভালোবাসে বাবরু। আশ্রিতা মেয়েটির নাম জানতে খুব ইচ্ছে করে সোমরাং এর। এই দুদিনেই ওর সাথে বড্ড মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছে। ওর কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসে। ওর ডালমাখা হাতটা ধরে। নিজের বুকে রেখে বলে, সোমরাং, তারপর মায়ের দিকে ঘুরিয়ে বলে চামেলি। এত বুদ্ধিমতী এই মেয়ে, হাতটা নিজের দিকে এনে বলে, চন্দ্রাবলী। সোমরাং এর চোখ বড় বড় হয়ে যায়। পিতাজির কাছে সে যে কিস্‌নার গল্প। চন্দ্রাবলী বৃন্দাবনের ব্রজবালা। সে গেয়ে ওঠে, চন্দ্রা সে পুছে রাধা, কোন হ তুম? ম্যায় তু হু কিস্‌না কি আধা/ বলে হাসকে চন্দ্রাআআআ ম্যায় কোয়ি নেহি জগমে/ ব্যাস্ মেরা সব কুছ হ্যায় কিস্‌না মে/ ম্যায় অভাগন্ কুছ নেহি হু কিস্‌না কি/ উস্ বিন মুঝমে কুছ নেহি বাকি/কোয়ি নেহি ম্যায় জগমে। সোমরাং কে জাপটে ধরে মেয়েটি। চামেলির কাছে ইশারায় দুধ, সুগন্ধী চাল আর গুড় চেয়ে নেয়। চুলার সামনে বসে তৈরী অপূর্ব এক খাবার। বাটিতে বেড়ে এগিয়ে দেয় সোমরাং এর দিকে। বলে, পায়েস, তোমার কিস্‌নার ভোগ। ভাষা অন্তরায় হয় না দুটি হৃদয়ের মাঝে। ঘরের ভগবানের পায়ের কাছে পায়েস রাখে সোমরাং। ওর পিতাজি বলেন, তুমি অন্তর থেকে দিলেই ঈশ্বর গ্রহণ করেন। বাইরে আকাশের বুকে জেগে ওঠে চাঁদ। তিন নারী চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা জানায়। রাত গভীর হলে রূপচাঁদ ফেরে। সোমরাং তখন চন্দ্রাবলীর গানে মগ্ন।

(ক্রমশ)

আগের পর্বের লিঙ্কঃ bipasar tire dwityo parbo


4 thoughts on “বিপাশার তীরে – ২য় পর্ব”

  1. koushik mukherjee

    Proti-ti shobde ar bornonate je aabohawata toiri hoyechhe. Bhashar ekta alada mishti taan aar chhondo aachhe, ja khub shohojei amay golper pahari jaygatar modhye niye jay. Porar shomoy mone hoy jeno kono shundor cinemar drishyo dekhchhi.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top