কমলিকা ভট্টাচার্যের তিনটি কবিতা

chandranath seth

মিথ্যেটুকু থাক

যদি না থাকে প্রেম, নাই বা থাকুক,
তবু তোমার মিথ্যেটুকু
তাকে একটু বাঁচিয়ে রাখুক।

তার ওই একলা মনে
দিলেই না হয় একটু সময়
নাইবা রাখলে হিসেব
কী-ই বা এমন ক্ষয়?

ওর দিনটা নাহয় যাক গলে
তোমার দুটো কথার ছলে,
রোজ রোজ সে কষ্ট কেনে,
রাত জেগে সে কবিতা বোনে।

তুমি না হয় থেকো চুপ,
শুনে যেও তার এলোমেলো রূপ।
তার কথারা যাক ভেসে
তোমার নীরবতার দেশে।

সে তো চায়নি কিছুই বেশি,
চায়নি কোনো প্রতিশ্রুতি,
শুধু চেয়েছে কান্নার ফাঁকে
তুমি একটু রোদ হয়ে
আঁকো রামধনু তারই আকাশে।

যদি ভালোবাসা নাই থাকে,
তবু মায়ায় বেঁধে রেখো তাকে।
সব সত্যিই কি বাঁচায় মানুষ?
কিছু মিথ্যেও তো কখনও
জ্বালে বাঁচার ফানুস।

পারবে কি এমন করে
বাসতে তাকে ভালো?
দূর ছাই—
এও কি কোনো প্রশ্ন হলো?


অসময়

ঘড়ির কাঁটা ছুটছে শুধু,
আমরা ছুটছি তারই পিছে,
মুঠো ভরা দিন ফসকে যায়
অদৃশ্য অসময়ের নিচে।

কেউ বা বেচে সকালবেলা,
কেউ বা কেনে রাত,
হিসেব কষে জীবন কাটে,
বেহিসেবেই ফুরোয় প্রভাত।

বালুঘড়ির বালুকণা
ঝরে নীরব, শব্দহীন,
উল্টে দিলেই কি আর ফেরে
হারিয়ে যাওয়া সেই দিন?

দেয়ালে পড়ে দীর্ঘ ছায়া,সন্ধ্যা নামে ধীরে,
ফিরতে চাইলেও পথ কি ফেরে
ফেলে-আসা পায়ের চিহ্নের তীরে?

শেষ প্রদীপটা নিভে গেলে
বোঝা যায় কি ছিল পাশে—
তরল জীবন ধরতে গিয়ে মুঠোয়,
গড়িয়ে গেল অবশেষে।


আমার ভূমি

বালিয়াড়ির বালি ভরেছে আমার চুল,
বয়ে যাওয়া বাতাস এঁকে দিয়েছে
চামড়ায় অগণিত ভুল।
গনগনে তাপ নিয়েছে তার নিজের মতো পরীক্ষা,
তবু রয়ে গেছে সেই পাহাড়ি বাঁকের অপেক্ষা।

ফায়ারপ্লেসে সেদিন পুড়েছিল কাঠ,
বরফে ঢেকে গিয়েছিল মাঠ।
ঝড়ের রাত পেরিয়ে পাহাড়ি পথের বাঁকে
যে ফুল ফুটেছিল নিঃশব্দে—
তোমার চোখ এড়ায়নি তাকে।

ঠান্ডা বাতাস হয়ে ছুঁয়েছিলে সেদিন,
সেই ছোঁয়ার ঋণ বেড়েছে প্রতিদিন।
শোধ হবে না জেনেও এই বেলা
খেলে চলেছি সেই রেফারিহীন খেলা।

হাঁফ ধরে আসে পথ চড়তে,
জানি না কত পথ বাকি পড়তে।
ঢালের গায়ে ঝরনা যায় বলে
কত ঋতু এসে,গেছে চলে।

আমি হাঁটি বাঁক পেরিয়ে বাঁকে,
ক্লান্তি জমে পাথরের ফাঁকে।
শেষ বাঁকের ওপারে, আলো হয়ে তুমি—
আছ কি এখনও আমারই ভূমি?


3 thoughts on “কমলিকা ভট্টাচার্যের তিনটি কবিতা”

  1. ভালোবাসা মেখে আছে সমুদ্রের ফেনার মত পংক্তিতে পংক্তিতে। এই দুর্দিনে জীবনকে অক্টোপাসের মত বেঁধে রাখে অহংকার। তাকে এড়িয়ে লেখক যে নিয়েছেন এই তারাভরা মায়া পথ চিনে সেটা এক প্রাপ্তি।

  2. শ্যামল মজুমদার

    দুঃখের ফল্গুধারা বয়ে চলেছে পরতে পরতে, তবুও বড় সুখী এ দুঃখগুলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top