আমাদের এই গ্রামের নামটি

আমাদের এই গ্রামের নামটি ইদ্রাকপুর।

আমাদের এই গ্রামের নামটি ইদ্রাকপুর।

মিষ্টি জলের ইঁদারা ছিল গ্রামে। সেই জলই সারা গ্রামের জীবন। ঠাকুরদা বলতেন, এই ইঁদারা থেকেই গ্রামের নাম হয়েছে ইদ্রাকপুর। ইঁদারা মানে কুয়ো। তার মেঝেতে ছিল বাঘ-বকরি খেলার ছক। বেলা পড়ে এলে কুয়োতলায় গল্প করতে বসত মেয়ে-বউরা।  খেলাও চলত অনেক।বাঘ-বকরি, লুডো,  রুমালচুরি, টেপু।

কুয়োর দেয়ালে

চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, ঝনঝন শব্দে কুয়োর দেয়ালে ঠোকর খেতে খেতে জল আনতে ছুটছে একটা সোনালী রঙের বালতি। কতবার সে জল আনতে গিয়ে আর ফেরেনি ।দড়ি ছিঁড়ে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকত ঠান্ডা জলে। কত কী পড়ে যেত! আর টুপুস করে ডুবে যেত কুয়োর জলে  আঁকশি নামিয়ে তাকে খোঁজা হত।  তাতেও না পাওয়া গেলে পাশের গ্রাম থেকে ছুটে আসত দয়াল দাস। যার যা কিছু হারিয়েছে সে খুঁজে দিত। দড়ি বেঁধে  নেমে যেত কুয়োতে।

আমায় একবার খুঁজে দিয়েছিল সোনালী হেডের  উইলসন কালিকলম। খুঁজে দিয়েছিল  ছোট কাকিমার ঝুমকো কানের দুল,ননীগোপাল জ্যাঠামশাইয়ের চশমা, বিশু গোয়ালার ঘটি।

সোনালী হেডের  উইলসন কালিকলম

 সেই কুয়োটা আর নেই। যার যা কিছু হারিয়েছে তা খুঁজে দেবার মানুষটিও হারিয়ে গেছে। সেই কালি কলম কোথায় গেছে কে জানে!  না, না, কিছুই হারায়নি।

আজও চোখ বন্ধ করলেই সব দেখতে পাই।

আঁকা বাঁকা একটা রাস্তা

আঁকা বাঁকা একটা রাস্তা। হেলে সাপের মতো। সেই রাস্তা ধরে হাঁটলেই তিনখানা পুকুর পেরিয়ে একখানা চালতা গাছ, আর অজস্র আমগাছ। তারপর একটিয়ে দুখি তালগাছ পেরিয়েই মস্ত একটা মাঠ। সেই মাঠের গায়ে আমাদের মাটির প্রাইমারি ইস্কুল।

 স্কুলের একটাই ঘর

 স্কুলের একটাই ঘর। ঘরের মাথায় টিনের ছাদ। দেয়ালে আলকাতরা লেপা। বৃষ্টি এলে ভেসে আসে ঝম-ঝমাঝম গান । জানলা বেয়ে বৃষ্টির ছাট আমাদের চটের আসনে ভেজায়। 

স্কুল ঘরের ছ’টা মস্ত জানলার একটাতেও পাল্লা নেই। উত্তর খুঁজে না পাওয়া খুব কঠিন শূন্যস্থান পূরণের মতো ছিল দেখতে । 

তারা চার দেয়াল থেকে আমাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত। যেন ফিসফিসিয়ে ডাকত। জানলার কাছে গেলেই চমকে দিত। কোনও জানলা দেখাত, আকাশে রঙের খেলা কিংবা তিরতির করে কাঁপা কচুরিপানা ফুল, লাল ফড়িংয়ের দল, বক উড়ে যাচ্ছে অন্য মাঠে, কচর-মচর শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে গরুর গাড়ি । এমন অনেক দৃশ্য! যতবার জানালার কাছে যাই ছবি যায় পাল্টে।

স্কুলের সামনে সবুজ খেলার মাঠ

স্কুলের সামনে সবুজ খেলার মাঠ।  বিকেলে বেশ কয়েকদল ছেলে ফুটবল খেলে। একপাশে গাদন,গোল্লাছুট। 

 জমি থেকে ধান গৃহস্থের খলায় গেলে মাঠেই চলে ক্রিকেট।

  এতসব খেলার মাঝে  আকাশ শেখায়  আঁকা। সে মেঘ দিয়ে আঁকে হাতি,পাখি,গাছ,মাছ,  ঘোড়া। মাঠ শেখায়, ধানের দুধ কী করে খেতে হয়, হাওয়া দেখায়, কচুরি পানার ফুল বাতাসে কেমন নাচে!  সব মুগ্ধ হয়ে  দেখি। আকাশ  আঁকে আবার মুছে দেয়। ঝরা পাতা নাচতে নাচতে নেমে আসে  মাটিতে।

তালগাছ আমাদের শেখাল দৌড়

তালগাছ আমাদের শেখাল দৌড়। পাকা তাল পড়ার শব্দ পড়লেই ‘দে ছুট’।

 পকেটে কাগজের ভাঁজে থাকা লবন নিয়ে ছুটি মাঠে। আলু পুড়িয়ে লবন ছড়িয়ে জিভে জল আসা দুপুরে দেখেছি স্কুলের দিকে সাঁই-সাঁই    করে এগিয়ে আসছে রুটিকাকুর সাইকেল। আমরা পাউরুটি পাই স্কুলে। বন্ধু লখা খবরের কাগজ দিয়ে  পাউরুটি মুড়ে সাবধানে ব্যাগে রাখে।খুব যত্নে। তার ছোট বোনের জন্য।

সুব্রতকাকু প্রতিমা বানান।

সুব্রতকাকু প্রতিমা বানান। লক্ষ্মী,কালী, মনসা, শনিদেব,সরস্বতী। যখন যা বায়না পান।আমাদের পুকুরের দক্ষিণ পাশে  কাঁঠাল গাছের নিচে  কাঠাম গড়েন, সুতলি দিয়ে খড় বাঁধেন,তার পর একমাটি, দুইমাটি, খড়িমাটি।

কাঠাম বানানো থেকে  রঙ,  চুল, সাজ সেটিং চালির গায়ে নকশা আঁকা দেখতে দেখতে মনে হত মানুষটা যাদুকর।

 ভাবি কবে বড় হব। বড় হয়েই প্রতিমা গড়ব।

 খড়িমাটি করার কাজ দিলেন

আমায় চমকে দিয়ে সুব্রতকাকু একদিন প্রতিমা রঙ মানে খড়িমাটি করার কাজ দিলেন। কালী প্রতিমা। অমন আনন্দের দিন কম এসেছে জীবনে। তেঁতুল বীজের আঠা দিয়ে গোলা খড়িমাটি, বারো নম্বর তুলি। এই কাজে খুব আনন্দ হল। এখন বুঝি সেই আনন্দের নাম শান্তি।

পরেরবার পেলাম মুন্ডমালা, অপরাজিতা ফুল রঙের কাজ। প্রতিমা সম্পূর্ণ  হলে ঢাক বাজিয়ে নিয়ে যায়। তারপর খাঁ খাঁ করে আমাদের সেই কাঁঠাল গাছতলা, পুকুরপাড়, সুব্রতকাকুর চোখ। আমি ঝাপসা দেখি। আড়াল করি চোখ। কান্না পায় খুব।

অনেক পরে বুঝেছি, মানুষ শূন্যতাকে  সহ্য করতে পারেনা।

ডবল হাঁসের ডিমের বনভোজন

পৌষ মাসের কনকনে ঠান্ডার রাতে হত ডবল হাঁসের ডিমের বনভোজন। নির্দেশাবলী এইরকম,  বাড়ি থেকে এইসব জিনিসপত্র প্রত্যেককে আনতে হবে।

এক, চাল (পেট বুঝে)

দুই, তেল (চায়ের কাপে হাফ কাপ)

তিন, নুন ও হলুদ ( দুই চামুচ করে)

চার, হাঁসের ডিম( মাথা পিছু দুইটা)

পাঁচ, মশলা( আন্দাজ মতো)

ছয়, তেজপাতা( মাথা পিছু একটা)

সাত, পেঁয়াজ ও রসুন( মাথা পিছু দুইটি করে)

বি: দ্র: প্রত্যেকে বিবেক অনুযায়ী প্রতিটি জিনিস জমা দেবে।

রাতে খাবার সময় হয় উল্টো কান্ড, সুতো দিয়ে  কাটতে হয় ডিম। বেশ কিছু জন জুড়ে যায়। আমরাই ডেকে আনি  তাদের। তারা যে বিবেক অনুযায়ী জিনিসপত্র জমা দিতে পারেনি বলে মুখ লুকিয়ে ছিল বাড়িতে। তাদের টেনে আনা আনলে কিসের আনন্দ!

আকাশে ঝকঝক করে তারা। তারা ভরা আকাশের নীচে  আমরা খেতে বসি। দেখি ডিমের ঝোল হয়েছে চমৎকার। কলাপাতায় গরম ভাত আর ডিমের ঝোলই যথেষ্ট। এ বিষয়ে সবাই একমত।

রবীনকাকু যাত্রা করত

রবীনকাকু যাত্রা করত।

রাজা সাজলে মনে হত সত্যি রাজা, ভিখারি সাজলে মনে হত সত্যিকারের ভিখারি। দুষ্ট লোক সাজলে খুব রাগ হত। যাত্রার পরদিন তার সাথে দেখা হলে বলতাম,  দুষ্টু লোকের পার্ট আর কোর না।

রবিনকাকু আকাশ বাতাস কঁপিয়ে হাসত।সে হাসিতে কাকডুমুরের মস্ত পাতার আড়াল থেকে উড়ে যেত দোয়েলপাখি।

এবার যাত্রার কথা বলি, কিছু বাড়ি থেকে চৌকি এনে হত স্টেজ। খড়ের উপরে চট বিছিয়ে  দর্শকদের বসার জায়গা। মাথার উপরে পলেথিন। ঢং ঢং করে তিনবার ঘন্টা বাজলে আমরা পড়িমড়ি করে বাড়ি থেকে ছুটতাম। যেতে যেতেই ফুল কনসার্ট পড়ে যেত। সেবার বাইরের দলের যাত্রা জমে উঠেছে। অশ্রুসজল সামাজিক যাত্রাপালা। ঘন ঘন চোখ মুছছে সবাই। বিবেকের কথাবার্তা শুনে প্রায় প্রত্যেকের বিবেক জেগে উঠেছে। এমন সময় প্রবল আনন্দে নায়িকা 

নাচ শুরু করতেই হল বিপত্তি। স্টেজ গেল ভেঙে পড়ল নায়িকা। নায়িকাকে উদ্ধার করতে পাশের জল ঢালা শুরু হল।মাথায় জল  ঢালতেই ভেসে গেল নায়িকার মস্ত চুল। মেকআপ উঠতেই চিনতে পারল তাকে সবাই। অজয় দাস।পতিরামহাটে কাঁচামালের দোকান দেয়। চৌকির মালিক বনমালী এবার চিল চিৎকার জুড়ল তাঁর এক্ষুণি চৌকির ক্ষতিপূরণ চাই।

তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বিষ্টু চরণ মহন্ত। সে স্টেজ ভাঙ্গার কয়েক মিনিট আগে  গম্ভীর গলায় বলল,  ছেলেদের নায়িকার সাজিয়ে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। এ মানা যায় না। 

গ্রীনরুমে গিয়ে দেখা গেল কেউ নেই। যাত্রাদলের ম্যানেজার সহ সবাই পালিয়েছে।

গরুরগাড়ি

মেলায় যাচ্ছি। গরুরগাড়ি করে। গাড়িতে মেলার জন্য বাহারি টোপর লাগানো হয়েছে।

মাঠে ফেটে  চারপাশের গাঁয়ের মানুষও ছুটছে । গাড়িতে দুটো  টুপটুপে তেল ভরা লন্ঠন নেওয়া হয়েছে। ফেরার সময় রাত হতে পারে। গাড়োয়ান জেঠু বলেছে গোপন কথা,

গাড়িতে আছে হলুদ পোড়া। তাই ভয় নেই। ভূত ধারেকাছে আসতে পারবে না। সে সময় গ্রামের মানুষজন গরু-মহিষের গাড়ি করে মেলা দেখতে যেত। চারপাশের গাঁয়ের মানুষ। গাড়িতে থাকত বাহারি টোপর।

মেলার কাছে এসে গরু বা মহিষের কাঁধ

মেলার কাছে এসে গরু বা মহিষের কাঁধ থেকে গাড়ির জোয়াল নামত মাটিতে। আনন্দে ভাসতে ভাসতে পুরো পরিবার নামত মেলায়। মেলার ধুলো মাথায় দিত বয়স্করা। বড়ই পূন্যের কাজ।

পুরো পরিবার মেলায় মেশে যাবার পর গাড়োয়ান উদাস চোখে তাকিয়ে থাকত মেলার দিকে। সারা মেলা ঘুরে ক্লান্ত হয়ে মনিবের দল ফিরলে তবে গাড়োয়ান সামান্য সময়ের জন্য মেলাটা ঘুরে আসতে পারবে।

কিশোর গাড়োয়ানের ইচ্ছে বাড়ির জন্য বাইরে কালচে সবুজ আর ভিতরে লাল টকটকে তরমুজ কিনবে। তরমুজের পিঠে খোদাই করা আছে তার ওজন। একখানা বাঁ

মেলার কাছে এসে গরু বা মহিষের কাঁধ থেকে গাড়ির জোয়াল নামত মাটিতে। আনন্দে ভাসতে ভাসতে পুরো পরিবার নামত মেলায়। মেলার ধুলো মাথায় দিত বয়স্করা। বড়ই পূন্যের কাজ।

পুরো পরিবার মেলায় মেশে যাবার পর গাড়োয়ান উদাস চোখে তাকিয়ে থাকত মেলার দিকে। সারা মেলা ঘুরে ক্লান্ত হয়ে মনিবের দল ফিরলে তবে গাড়োয়ান সামান্য সময়ের জন্য মেলাটা ঘুরে আসতে পারবে।

কিশোর গাড়োয়ানের ইচ্ছে বাড়ির জন্য বাইরে কালচে সবুজ আর ভিতরে লাল টকটকে তরমুজ কিনবে। তরমুজের পিঠে খোদাই করা আছে তার ওজন। একখানা বাঁশিও কিনে নিতে পারে।

লাঙল-জোয়াল

বর্ষার সময় ঘুম থেকে উঠে দেখতাম,   লাঙল-জোয়াল, মই আর হালের গরু নিয়ে কৃষক চলেছে মাঠে। কাঁধে গামছায় বাঁধা চিড়া-গুড়, মুড়ি মুড়কির জলপান।

পাকা কাঁঠাল দিয়ে পান্তা খেয়ে মনের সুখে চুটি জ্বালিয়ে বড় বড় পা ফেলে চলছে কেউ।

আঠেরো  ইঞ্চি ফাল আর তেত্রিশ ইঞ্চি খুঁটির লাঙল। কুড়াল আর বাটালি দিয়ে অন্তত পাঁচ ঘন্টার টানা পরিশ্রমে একটা গুঁড়ি থেকে  বেরিয়ে আসে লাঙল।

এখন গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙে ট্রাক্টরের শব্দে। ধান ঝাড়াই-মাড়াই করার যন্ত্র চলে এসেছে। লাঙল- জোয়াল আর বাঁশের মই যেন শুধুই স্মৃতি।

পাকা ফসল

মাঠ বাঁচিয়ে রাখে মানুষকে। সে দিতে জানে। পাকা ফসল গৃহস্থের খলায় চলে আসবার পর সে নিঃস্ব হয়ে অপেক্ষা করে। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করে। আবার  নতুন ফসল ফলাবে বলে।  পৃথিবীটাই বড় অদ্ভুত জায়গা।সবাই এখানে হারায়। যেন হারাতেই এই পৃথিবীতে আসে। মাঠ যেমন হারিয়েছে, অনেক বেশি ধান, পোকামাকড়, জংলা মাছ,শ্যাওলা, শামুক, ব্যাঙ-ব্যাঙাচির কলতান।

নামাবলীতে মোড়া নতুন ধান

ফসল ঘরে এলে নবান্ন হয়। গ্রামের সবচেয়ে বড় উৎসব । কুটুমে ভরে যায় বাড়ি। উঠোন থেকে আলপনা চলে যায় ঘরে। নামাবলীতে মোড়া নতুন ধান। উঠোনে বসেছে সবাই। সূর্যের দিকে মুখ করে।

দুপুরে চলে কলা গাছের ভুর বানিয়ে মাছ ধরা।

 মা

প্রতিবার গ্রাম থেকে ফিরে আসবার সময় মা কড়ে আঙ্গুল আলতো করে কেটে বলেন, সাবধানে যাস।  আবার আসিস।

দেখি মায়ের চোখে ভেসে উঠেছে আমাদের গ্রাম।


2 thoughts on “আমাদের এই গ্রামের নামটি”

  1. সৌম্য রায়

    পড়ে বড়োই আনন্দ পেলাম।
    লেখককে ধন্যবাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top