দশমীর গদ্য

elderly woman with letter and flowers

জীবনের দশমীতে বিসর্জন নেই। থাকতে পারে নতুন কিছু আয়নার জন্মকথা। তেমন চারটি আয়না ধরি মন-মণ্ডলে।

 ১

দশমীর ফুলগুলো 

দশমীতে মেঘ এল। মা এসে বসল বারান্দায়। বেঁটে মানুষ তো! পা পুরো পাদানি ছোঁয় না। লক্ষ্মী পা দোলে। গাছ পাখি আর ফুল দেখতে খুব ভালোবাসে মা। একদম তদগত হয়ে দেখে। স্থির চোখের পাতা। বাবা চলে যাওয়ার পর বারান্দায় আরো গাছ এনেছি। জল দিই মগে করে। বৃষ্টিও জল দেয়। দুইয়ের জল ছই ছট্টি হয়। গাছ বাড়ে। বাবার হাসি মনে পড়ে মায়ের। ভুরু কুঁচকানি মনে পড়ে। মধ্যবয়সে গায়ে পাউডার লাগিয়ে বড়ো আলু দিয়ে পাঁঠার মাংস খাওয়ার কথা মনে পড়ে। 

ফের ফনীমনসা দেখে মা। কানের লতিতে টুক করে নীল অপরাজিতা এসে লাগে। হাওয়াও চলছিল আজ। ফুলগুলো গাছে থেকেও দৌড়াদৌড়ি করছিল। ওই যেমন কেউ কেউ ঘরে আটকে থেকে, আইসক্রিম চাওয়ার মতো মুক্তি চেয়ে যায়। করুণ লাগে অল্প দোলা ফুলকে। এই বারান্দায় বসে, কোনো—এক কালে বাবার লেখা প্রেমপত্র পড়ে শুনিয়েছিল মা। আমি প্রেমপত্র বলাতে নাকে একটা চড় মেরে আমার শিশুর মতো সরল মা বলেছিল— শয়তান মেয়ে। এটা বউপত্র। যখন তোর বাবা চিঠিটা লিখেছিল আমি তখন তোকে পেটে পুরে দিল্লীতে  তোর দাদুর কাছে চলে গেছি। তু্ই হবি।

চিঠির শেষ লাইন ছিল— আমাদের মেয়ে হলে নাম রাখব আলোকমালা। 

মায়ের সিস্টার আজ একটা বড়ো থলিতে বাসমতী চাল, নুন, তেল, ঘি, মশলা, সব নিয়ে এসেছেন। ঘাম ঝরছিল ভদ্রমহিলার। তার মধ্যেই তাঁর কালো শরীরটা হাসল—

দিদি দু-দিন বাদে আমার মায়ের কাজ। আপনারা তো যেতে পারবেন না। আমি নিজের হাতে আপনাদের জন্যে সব বাজার করে এনেছি। আপনারা খাবেন, এবং  আপনাদের ঘরে যাঁরা কাজ করেন তাঁরাও যেন সমানভাবে খান। আমি তো কাজের জন্যে দু-দিন আসব না। তাই দিয়ে গেলাম। 

শাস্ত্র আমি বুঝি না। তাই তাকে স্বীকার অস্বীকার করার দায় আমার নেই। কিন্তু এক পরিশ্রমী দরিদ্র মানুষের সবাইকে সমানভাবে খাওয়ানোর কথায় অবাক হয়ে গেলাম। এই সিস্টারের পায়ের পাতাদুটো মাত্র ছ—মাস বয়সে পুড়ে চ্যাপটা হয়ে গেছে। একসঙ্গে দুটো পা টেনে চলতে এঁকেই দেখি। সেই পা নিয়েই মধ্যমগ্রাম থেকে কাঁচাবাজার করে এনেছেন। 

হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।

যে দেশে এত মহান দরিদ্র, সে দেশের আলোকমালাকে মলিন করে, এমন সাধ্য কারও নেই।

যাওয়ার সময় ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকা মায়ের চোখ দুটো নিজের দিকে টেনে ফেরালেন সিস্টার…

মা তুমিও  খাবে কিন্তু। টিউবে নয়। জিভ দাঁত দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে। এই রকম করে… এই দেখো এইরকম করে খাবে…

নিজের জিভ দাঁত খুলে রোগীকে দেখাচ্ছেন সিস্টার। 

দশমীর মেঘ বললে, এবার একটু রোদ খাই।

সেদিন ডিয়ার পার্ক 

ইদানীং আশ্বিন খুব গরম হয়েছে। 

আমাদের  যুবকবেলায় সে বড়ো কোমল। তার আনন্দ বিষাদ কোনোটাই প্রবল নয়। বাবা তখন সল্টলেকে বাড়ি করেছেন। তখন বিধাননগরের মধ্যবিত্তরা ভোর থেকেই হাঁটাহাঁটি করেন। আমি চিরকেলে অলস। হাঁটতাম কেবল আশ্বিনে, পুজোর ক-দিন আগে থেকে। 

ভোরের রোদে আশ্বিনের নাম লেখা থাকত হয়তো। আমাদের বাড়ি পুব, দক্ষিণ খোলা। রোদ ঢোকে সাতসকালে। নিজের শ্রমে নতুন বাড়ি করার দারুণ গর্ব  ছিল বাবার! এই গর্ব ফেঁপে উঠত আশ্বিনে। খালি দাবি 

sunlit serenity in a bengali home

করতেন— এ বাড়িতে সূর্য সবার আগে ঢোকে। এই যে পুজো আসছে! দেখছিস রোদ কেমন বিভিন্ন ঘরে ঢুকে পড়েছে, নিজেদের গুছিয়েও  নিচ্ছে। কোনোটায় চৌকো হয়ে পড়েছে! কোনোটায় ছায়ার ওপর আসনপিঁড়ি করে বসেছে! দেশহারা বাঙালির বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়িতে লুকিয়ে হাসলেও রোদের টানে হাওয়াই পরে ছুটতাম ডিয়ার পার্ক। আমাদের বৈশাখী অঞ্চলে ওই একটিই টিকিটহীন বেড়াবার জায়গা। বেশি দূর না গিয়ে হরিণগুলোর গায়ে লেগে থাকব, এই থাকত আমার আশ্বিনী ইচ্ছে। পথে হাওয়াই চটিতে সুড়সুড়। কেঁচোর মতো দেখতে সরীসৃপ খেলছে পায়ের পাতায়। পুজোর মাসেই এদের দেখা যেত বাগানে। অল্প অল্প মাটি তুলত। সাদাটে রং, গায়ে ভিজে ভিজে ভাব। চামড়ায় লাগলেই অস্বস্তি হত। অনেকসময় এঁকেবেঁকে চলত পিচ ঢালা রাস্তায়। চটি দিয়ে চটকাতে চটকাতে হরিণমেলায় ছুটতাম। এগুলোকে মেরে তৃপ্তি হত খুব! হরিণের কাছে যাওয়ায় বাধা দিত বলে নাকি কুৎসিতকে ক্ষতিকর ভাবার চিরকালীন ভ্রম থেকে! 

তখন ডিয়ার পার্কে কত হরিণ। এক একটা গাছের পেছনে একটা করে হরিণ। গাছ, হরিণ, সবার গায়ে গাঢ় হলুদ দুর্গাসূর্য। এতটি রোদ মেখে একটাকে আরেকটার গালে চুমু খেতেও দেখেছি। হরিণ বোধহয় প্রেমের ব্যাপারেই যা একটু সাহসী। প্রকাশ্যে জড়াজড়ি করতে দেখেছি কতদিন! পুজোর কালে মানুষের ভিড় তাদের বেলাজ করেছিল কিনা জানি না। তখন সল্টলেকে ঠাকুর দেখতে এসেও, আগে ডিয়ার পার্ক দেখতেন। 

একবার দশমীর সন্ধেতে ফিরছি ডিয়ার পার্ক সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে। দশমীর চাঁদে গা ভর্তি করে কৃত্রিম জলাশয়ের ধারে দাঁড়িয়ে দুটো হরিণ। সে জলেও চাঁদ। হরিণ কিন্তু চোখ রেখেছিল কালো গাছে ঘেরা বিশালকার আঁধারে। আজ মনে হয় আঁধারে নিজেদের রূপ বুঝতে চাইছিল দ্রুতগামী জীবদুটি।  পরীক্ষা করছিল, কোন চাঁদে রুপো বেশি! নিজের শরীরের না জলের! কেউ কেউ  রূপ  দেখে। কেউ রূপ বোঝে।  যে  বোঝে সেই  ঈশ্বর! আজও দশমী এলে দুটি ঈশ্বরকান্তি হরিণ আমার সঙ্গে খেলতে আসে। 

ও হ্যাঁ। বেশ কয়েক বছর ওই সরীসৃপগুলোকে আর আশ্বিনের ভোরে ঘুরতে দেখি না। উষ্ণায়নে তারা খতম কিনা তাও জানি না। শুধু আমাদের ঝন্টু মালি হাহাকার করে – মাটিতোলা জীব বড়ো উপকারী গো দিদি।

আঁটো মাটির মধ্যে টাটকা বাতাস চালান করে। বুঝলে দিদি, শেকড়েরও শ্বাস লাগে। ভালো গাছ যদি চাও, বাগানে ঢুকে আগে মাটিতে গড়ানে জীবের খোঁজ নাও। 

আশ্বিন দ্বন্দ্ব বাড়ায়!
কাকে খুঁজব গো!
রূপের ঈশ্বর নাকি মাটির কুচ্ছিত সেবক! 
শয়তান ঝন্টু! 
মৌলিক প্রশ্ন তুলে পালায়!

একটি-দুটি রাঙা পা 

পা-দুটো ছোট্ট ছিল তো ভীষণ৷  সরু তারে তুলো লাগিয়ে তাতে যখন আলতা পরতাম, চামড়া শিরশির করত৷ ছোটোকালে বাঙালি মেয়ের লালের লোভ সামলানো মুশকিল৷ ফলে বিজয়ার দিন পায়ের লালকরণ নিয়ে কী যে দশা হত! একদিকে তারে বাঁধা তুলোর সুড়সুড়িতে উরি বাবা উরি বাবা করে লাফাচ্ছি আরেকদিকে মন চাইছে পায়ে আমার লালের আঁকি পড়ুক৷ মা দুগ্গা দেখুক তার একটা মেয়ের সবচেয়ে সুন্দর পা৷ কে কবে যে বলেছিল, এ মেয়ের লক্ষ্মী পা! সেই থেকে মনে করতাম আমার পা সেরা পা৷  এক পরতের পর আরেক পরত… আবার আর এক পরত৷ গাঢ় লাল থেকে পোড়া লাল, লালের নানা ঘনত্বে ভরত আমার  এবং মা-ঠাকুমার পা৷ ওঁদের পায়েও আলতা পরাতাম আমি৷ ড্রইংয়ে ফেল  এই মকবুলরাণী আলতা আঁকত নিপুণভাবে৷ সব শেষে পায়ের মাঝে পট করে গোলাকারে আলতা ফেলা৷ তখন মনে হত আমি একটা আলতাগাছ৷ আমার পায়ে লাল শিশির ফেলছি৷ চিরকাল ঘাসে মাখা শিশিরের পরিবর্তে  মাথার ওপরে টুপটাপ শিশিরের ফোঁটা পছন্দ ছিল৷ দশমীতে আমাদের বাড়িতে ছুকরি থেকে বুড়ি, সবার এই আলতা সাজটুকুই ছিল৷ দশমীতে নতুন জামা, নতুন শাড়ি এসব আজো পরি না৷  যাকে মা ভাবি, যে মা চলে যাবে বলে শেষবারের মতো পান সন্দেশ খাওয়াতে যাই, তার চলে যাবার দিনে আবার  নতুন শাড়ি জামাও পরব– বাঙালির এই মনটাকে দ্বিচারী মনে হয় আজও৷ তখন আবার  মাটির গড়া মায়ে ঘোর ভালোবাসা৷ আজকের মতো নাস্তিক হয়নি মন৷ বাঙালির মনোজগতে  দেবী দুর্গা বিজয়ায় ঘরের মেয়ে হন৷ পুরোনো যা হোক কিছু পরে ঘরের মেয়েটাকে বাপের কাছে পাঠিয়ে দিতাম৷ বাগবাজারের গঙ্গায় দুর্গা ডুবত৷ আমি ভাবতাম শিবের ঘর সবাই পর্বতকে বলে কেন! জলের নীচে বসে আছে দুগ্গাদির বর৷ খুব সুন্দর দেখতে সে বর, নীল নীল চোখ, ঠোঁটের ফাঁকে দম মারো দম৷ দুর্গা যখন সন্দেশ-টন্দেশ খেয়ে নদীর তলে যেত, জল ছলবল করত৷ কিশোরকালে যখন ছেলেমেয়ে নারীপুরুষ সম্পর্ক শরীরকে টের পায়, তখন জলের এই ছলবলানি  দেখে আনন্দে কাঁপতাম৷ জামাইবাবু দিদি পেয়ে জড়ামড়ি করছে বোধহয়!  কেলো চলছে জলে! ডাঙার  দামড়াগুলো কেঁদে মরছে!

traditional alta painting on feet

ফিরে এসে অনাথদেব লেনের ভাড়াবাড়ির বারান্দায় দশমীর চাঁদ দেখতাম৷ বারান্দাটা ছিল বাড়ির ভেতর দিকে৷ সেখান হতে শুধু চাঁদ আর আকাশ দেখা যেত৷ আকাশের নীচে বেলগাছিয়ার প্রধান বাজারের আভাস৷ দোকানের চালে কেবল চাঁদ৷ বাকি আঁধার৷ অর্ধ আলোয়  আভাস ছাড়া স্পষ্টকে আর দেখি কী করে! তবে কি জানেন, আভাস দর্শনে দৃষ্টির লাভটা বেশি হয়! দশমীর চাঁদে দোকানকে গৃহস্থঘর বলে ভ্রম হত৷ দশমীর সন্ধেতে বাজার দোকান বন্ধ থাকত৷ ফলে আঁধার হয়ে থাকত বণিকের সংসার৷ মাকে জিজ্ঞেস করতাম  —আচ্ছা মা, গোষ্ঠ (মুদি),  বিশ্বনাথ (গুড়ের দোকান) এদের বউরাও কি মাকে পান-সন্দেশ খাওয়াতে যাচ্ছে! বউগুলো আলতা পরেছে? হি হি হি! গোষ্ঠ যেমন বউপাগলা ও ব্যাটা নিজেই বউয়ের পায়ে আলতা পরিয়ে দিচ্ছে! গোষ্ঠ তখন দ্বিতীয় বিয়ে করেছে!  আর আমি শালা এত্ত বদ, প্রথম বউটার কান্না না—ভেবে তার সতীনের আলতা পায়ে ফোকলা দাঁতের চুমু ভেবে যাচ্ছি! মা দুগ্গা ন্যায়নীতি ভুলিয়ে আমাকে কেন কেবল সৌন্দর্য দেখিয়ে যায় গো! বুঝি না বুঝি না! পাপও কেন এত সুন্দর, পাপের কল্পনা এত মোহময় সত্যিই বুঝি না!

রাতের দিকে পারুলদি চারটি ত্রিকোণ সন্দেশ আনত৷ আমাদের জন্য৷  পারুলদি আমাদের বাড়ি বাসন মাজত৷ ঘর মুছত৷ এখন IT বাঙালি প্রতিবেশীদের  বিজয়ার মিষ্টি বিলোবোর সৌজন্য ভুলেছেন৷ তখন কিন্তু পারুলদির মতো সাতবাড়ি খেটে বেড়ানো মানুষরাও বাড়ির কর্তা কত্রীদের জন্য মিষ্টি আনতেন৷ হয়তো  তাঁদের আনা সন্দেশ দোকানের সবথেকে সস্তা সন্দেশ হত কিন্তু না আনার কথা তাঁরা ভাবতেও পারতেন না৷ সন্দেশ চারটে ফট করে আমার হয়ে যেত৷ মা বলতেন— পারুল চা  কর৷ একসঙ্গে খাই৷ আর নাড়ু নাও প্লেটে৷ নিজেই গুছিয়ে নাও৷ বাড়ির জন্য নিও…

দেখতাম— পারুলদির পায়ে আলতা নেই৷  এই নিয়ে ঝামেলা করলে পারুলদি  বলত— ধুত্‌! পুজোয়  সবার বাড়ি এত লোক এসেছে, বাসন মাজতে দিন কাবার৷ নাড়ু বানাবার গামলায় একটুও জল দিয়ে রাখেনি গো বৌদি৷ সারাদিন গুড়ের তলানি বাতাসে থেকে আঁট হয়ে গেছে এমন, মাজতে কী কষ্ট ৷

আমি বলতাম— পারুলবালা এবার মেঝেতে পায়ের পাতা ভালো করে ফেলে রাখ দিকি!

হাঁ হাঁ করে উঠত— একদম হাজায় হাত দেবে না তুমি! হাতে পোক ধরে যাবে৷ পারুলদি আমি দুজনেই তখন হাজাকে পোকা ভাবতাম৷ সাদা পোকা, মানুষের চামড়া খায়৷

আমি কি আর শুনি  তা! খুব সাবধানে পারুলদির আঙুলের ফাঁকে  আলতা মাখাচ্ছি! একটা হাত—আয়না ধরেছি পারুলদির পায়ে!  মানুষের এঁটোজলে ডোবে তার কি আপন পা দেখার সাধ হয়! পারুলদি মায়ের সঙ্গে গল্পে মশগুল৷ বর,ছেলে নিয়ে  তার একটি-দুটি ঠাকুর দেখার গল্প ৷

গরিবের পায়ের পোকা লাল হয়ে যাচ্ছে ৷

দশমীর চাঁদে  মানুষের চামড়াখেকো পোকারা ঠিক ক-দিনের জন্য মরত ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে আজও! 

মায়ের ড্রেসিং— টেবিল ছিল না ৷

দাদুর দেওয়া গোদরেজ আলমারির আয়নায় পূর্ণ শরীর দেখা যেত না!

তাই স্পষ্ট দেখা হয় নি ৷

হয়ত মন্দ 

হয়ত ভালো ৷

পুণ্যের হাঁড়ি অর্ধশূন্য 

দশমী দশানন 

আজও আকাশে কাঁসার বগি। চারপাশে উনুন জ্বালা। হলুদ আলোর মধ্যে দিয়ে দশমী এসে তার  নতুন বাড়ির খবর দিয়ে গেল। তার লাল শাড়িতে আনন্দ টুকটুক করছিল। দশমী এমনিই। সেজেগুজে পাটভাঙা শাড়িটি পরে লোকের বাড়ি বাসন মাজতে যাবে। কতদিন জিজ্ঞেস করেছি— ও দশমী সারাদিন এত বাড়ি বাসন মেজেও সন্ধেবেলা ফের কী অত মাজতে যাও গো! দশমী বলে— সল্টলেকের বউগুলো খুব চাকরি করে গো! সারাদিন বাসন জমে। 

woman in sari cleaning pots at dusk

আমি বলি— জমে তো জমে। সেগুলো আবার পরের ভোরে মাজবে। দশমী হেসে দেয়। ভিখিরির ঝোলায় কানাকড়ির মতো জ্বলতে থাকে সে হাসি। অদ্ভুত যুক্তি দশমীর– সন্ধেবেলা বাসনমাজা না থাকলে লাল-নীল শাড়িগুলো পরব কখন! বাসন মাজতে মাজতে কী মনে হয় জানো দিদি! মনে হয়, সন্ধে পরিষ্কার করছি।

যত বলি, দশমী সন্ধেবেলা বেড়াতে গেলে পার তো! তাতেও তো শাড়ি পরা হয়। দশমী গা মুচড়ে বলে— দূর! দশ বছর থেকে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ছুটে ছুটে কাজ করি। এত আনন্দ লাগে, পাঁচ বাড়ি ঘুরতে! ঘুরতে ঘুরতে কখন যে ঘুরে বেড়াই। 

পরীক্ষা করার জন্য দশমীকে একবার লোভনীয় টাকা দিয়ে আমাদের বাড়ি রান্না করতে বলেওছিলাম। দশমী লাফ মেরেছিল।

 —ও দিদি, না না একবাড়িতে ছ-ঘণ্টা জুড়ে রান্না করলে অন্য বাড়ি কমে যাবে। ছোটা কমে যাবে। খালি মনে হবে, সংসার করছি! 

সেদিন আর দশমীর সঙ্গে ঠাট্টা করতে মন চায়নি। একটু চুপ থেকে শুধু বলেছিলাম— সংসার তোমার ভালো লাগে না?

 দশমী আরও চুপ থেকে বলেছিল— আটকা আটকা লাগে। ফনফনে ভাব থাকে না। আর আমি তো আমার কাজের বাড়ির সব টাকা বরকে গুনে দিয়ে দি’। ও করে সংসার।

কেউ বলেনি। তবু  বুঝে যাই, দশমী  ভুললেও অন্যপক্ষের গুনতিতে ভুল হবে না।

বারবার রেগে যাই।

—কেন? সব পয়সা দাও? নিজের জন্যে একটু রাখো । দশ বাড়ি কাজ করো । বরকে বলবে, ন’ বাড়ি কাজ করো । 

দশমী অবশ্য ধরা পড়ে গিয়েছিল। বর যখন বলেছিল— ন’বাড়ি আর দশ বাড়িতে কাজের সময় এক হয় না রে দশমী। আমি ঘড়ি দেখেছি।

দশমী নির্দ্বিধায় সবটুকু দিয়ে বরের গলা জড়িয়ে বলেছিল— দিলাম গো দিলাম। এবার ষাট টাকা দাও। ডাবল এগরোল খাব।

—হ্যাঁ রে দশমী। মানসম্মান নেই তোর? ওর কাছেই রোল খেতে চাইলি? 

দশমী বলে— ভালোবাসার মানুষকে মিছে কথা বলে নিজেরই পেট ফুলছিল। সত্যি কথা বলার পর পেট আমার নাভির তলে গেছে। তাই নিজের উপার্জনেই খাবার দিয়ে আবার ফুলিয়ে নিলাম পেট। বর বলেছে, মেয়েমানুষের মাংস থাকা ভালো। দশমীর গ্যারেজ ঘর থেকে মৌ মারাদের গান আসে। এবার সুন্দরবনে গিয়ে এই গান তুলে নিয়েছে 

বাসুদেব। দশমী আর বাসুদেব দুজনেই সুন্দরবনের বর বউ। 

 বিয়ের আগে বাসুদেবকে লুকিয়ে লুকিয়ে কতবার যে দেখেছিল দশমী! বাবা বলেছিল – বাসুদেব মেয়ের তোমায় খুব পছন্দ। কলকাতায় কাজ করে আমার মেয়ে। দু—পয়সা পায়। সব তোমায় দিয়ে দেবে। মিলিয়ে জুলিয়ে জমি কিনে বাড়ি কর! 

সেই দশমী কালরাতে জানতে পায়— বাসুদেব দশমীর পিসি চপলাকে ভালোবাসে। দশমী কাঁদতে কাঁদতে চেঁচায় দাওয়ায়। বাসুদেব তো খেপে আগুন।

—আমার সব কথা বলে প্রেস্টিজ নষ্ট করলি! হয় বেরো বাড়ি থেকে, নয় সবাইকে বল, বিয়ের আগে তোর পেট হয়েছিল। তোর বাপে খসিয়ে নে বে দিছে তোর! আমি সব জেনে তোকে বিয়ে করেছি। মনে থাকবে তো কথাগুলো! যা নিজের কু গেয়ে আমার সমান হ।

এবার দশমীর মাথায় বুদ্ধি খেলেছিল।  পিসির ড্রেসিং-টেবিলে সাজ সেরে নির্ভুল এক্টিংটা করে ঘরে এসে বলেছিল— দ্যাখ পিসি! তু্ই যা পারিস নি, আমি তাই করে দেখিয়েছি! তোর বাসুদেবকে গাঁয়ের সামনে ভগবান বানিয়ে দিয়েছি! সবাই জানল বাসুদেব খুঁতো মেয়ে উদ্ধার করছে। 

এসব দেখে বাপটা ছুটছিল। ছুটতে ছুটতে শরীরটা বিন্দু হয়ে যাচ্ছিল। দশমী বাপকে থামায়নি। সেই দেখার পর আর দেখা হওয়ার সুযোগও দেয়নি বাপ। 

হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলাম— কীসে মরলে বাপ? 

দশমীর উত্তর— সুন্দরবনে মরার কারণের অভাব? 

তো আজ সেই বাড়িটার খবরই দিতে এসেছে দশমী। বাপ যে বাড়িটা চেয়েছিল তার কাছে। নিজের জমিতে দোতলা হয়েছে। বাসুদেবের সঙ্গে বসে প্ল্যান করেছে, একতলায় পিজি খুলবে। 

যাওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল— এবার আমি একবাড়িতেই থাকব চব্বিশ ঘন্টা। ভাড়ার ছেলেদের জন্য রান্না করব। কাঁকড়া রসুন। ছোটোবেলায় মা করে দিত। সুন্দর করে বানাব। বাসুদেব বলেছে—ভালো রান্না করলে আমার পিজির নাম হবে। লোক আসতেই লাগবে। আমার নতুন বাড়ি  নতুন লোকে ভর্তি হয়ে যাবে।

— আর আমাদের কাছে আসবি না?

—না দিদি। এলেই সব পুরোনো মনে পড়ে যাবে। পিসির পুরোনো লাভার যদি মনে পড়ে যায়!

ফিক ফিক হেসেই যাচ্ছে দশমী। 

রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধিমান গল্পকার। “মরণ” শব্দেই চন্দরার সব অভিমান নিঃশেষ করেছিলেন। 


4 thoughts on “দশমীর গদ্য”

  1. অশোক প্রসূন চট্টোপাধ্যায়

    আপনার ছোট্ট গল্পগুলো দিনকে দিন সুন্দর হচ্ছে। এখন আপনার আর কমেন্ট দেখার দরকার নেই। নিজের স্টাইল পেয়ে গেছেন। নিজের মতো লিখে চলুন। অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

  2. Sanjukta Bagchi

    দশমীর এই অনুকাহিনীগুলো আগে পড়েছি।
    ময়ূরীর অনবদ্য গদ্যে সাধারণ মানুষের যাপন কাহিনী সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে।

  3. কান্তারভূষণ নন্দী

    ভীষণ মায়াময় গদ্য। ছোটো ছোটো সুখকথা, দু:খকথা ভেতরটাকে ছুঁয়ে গেল তিরতির, পাত্র-পাত্রী ভীষণই চেনা, তবু মনে হয় দূর কোন অলৌকিক জগতে ওদের বিচরণ, ছুতে পারি না…
    ভালো লিখছেন বড়ো। চলুক না….

  4. আপনার লিখা পড়ে ভালো লাগে,একঘেয়ে নয়,মনের ভাবনা প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায় …

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top