“রামকৃষ্ণ বলেছেন, মেয়েদের সঙ্গে বসা কি বেশিক্ষণ আলাপ, সেও একপ্রকার রমণ। রমণ আট প্রকার, স্মরণং কীর্তনম্ কেলিঃ প্রেক্ষণং গুহ্য ভাষণং।/ সংকল্লোহধ্যাবসায়শ ক্রিয়ানিষ্পত্তিরেব চ এতস্মৈথুনমষ্টাঙ্গং ॥
মেয়েদের কথা শুনছি; শুনতে শুনতে আনন্দ হচ্ছে, ও এক রকম রমণ। মেয়েদের কথা বলছি [কীর্তনম], ও এক রকম রমণ; মেয়েদের সঙ্গে নির্জনে চুপিচুপি কথা কচ্ছি, ও এক রকম। মেয়েদের কোনও জিনিস কাছে রেখে দিয়েছি, আনন্দ হচ্ছে, ও এক রকম। স্পর্শ করা, আর এক রকম।” এই কথার সরলীকরণ করেই আমরা সাধারণভাবে বলি, পুরুষের এক শ্রেণি আছে যাদের বলে সুখ, এক শ্রেণি আছে যাদের দেখে সুখ আর এক শ্রেণি আছে যাদের শুনে সুখ। নারীকে বস্তুগত করে তোলে পুরুষের সচেতন এবং অচেতন মন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এ সত্য গৃহীত। রমণ সে তো একচ্ছত্র পুরুষের চর্চার বিষয়। সন্ন্যাসী হোক বা গৃহী, রমণ তার নিজস্ব সমীকরণ। সে সমীকরণে মেয়েরা প্রবেশ করলে তাদের বলা হবে বেশ্যা। বেশ। কিন্তু বেশ্যা কারা? একজন যৌনকর্মী হলেন বেশ্যা। তার সঙ্গে তুলনা করে গণ্ডির বাইরে যাওয়া মেয়েরাও বেশ্যা। কিন্তু পুরুষদের জন্য এমন একটি শব্দ নেই কেন? ব্যাভিচারি পুরুষকে কেন তাহলে বলা হবে না বেশ্যা! অন্তত অন্য কোনো শব্দবন্ধ! নেই। পুরুষের গণ্ডির বাইরে যাওয়ার জন্য কোনো গাল নেই, কোনো অশ্লীল শব্দ নেই। সে ভয়ভীতহীন লাগামছাড়া ঘোড়া! এমন ক’জন পুরুষকে জানেন যারা প্রেমিকা ছেড়ে দেওয়ার পর তাকে বলেছে বেশ্যা! আমি বহুজনকে জানি। আপনিও জানেন নিশ্চয়ই!
মেয়েরা যৌনতার উপকরণ কিন্তু যৌনতার কথায় ছি ছি! যৌনতার সামগ্রী কিন্তু যৌনতার প্রয়োজন প্রসঙ্গে ছি ছি! নদীতীরে স্বল্পবসনা নারীকে দেখে গোপনে স্বমেহন কিন্তু পাশের বাড়ির মেয়ের পোশাক পাতলা হলে ছি ছি! এই ছি ছি উচ্চারণটা গোপন শীৎকারের পোশাকি প্রকাশ। শুধু পুরুষ নয়, মেয়েরাও মেয়েদের মাংস খায়। ৮ ই মার্চ এ ভাষণ দেওয়া মেয়েরাই মেয়েদের পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে পৌরোহিত্য করে। পরকীয়ার গন্ধ নিয়ে ট্রোল করে।
যুদ্ধের প্রধান কারণ বৈষম্য এবং একচ্ছত্র রাজত্বের লোভ। এই লোভ ক্ষমতাআসীন মানুষের বীজমন্ত্র। খুব মাইনিউট লেভেল থেকেই। আপনার আমার ঘরের ভিতর থেকেই এই লোভ বড় হতে থাকে। শুধুই গণধর্ষণ নয়, শুধুই অসুস্থ লালসা নয়, মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় এরকম মেয়েদের সংখ্যাও কম নয়। মূল বিষয়টি হল দখল নেওয়া, নিচে নামিয়ে রাখা, গাছের ডাল বেড়ে গেলে তাকে ছেঁটে দেওয়া। আপনার ঘরের পুরুষ সন্তানের ছোটবেলার দিকে তাকান। শিশুটিকে কোনোভাবে বোঝানো হয়েছে তাকে মেয়ে বলাটা খুব লজ্জার কথা। ভয় পেলে তাকে বলা হয় এমা মেয়েদের মতো ভয় পাচ্ছিস! কাঁদলে তাকে বলা হয় মেয়েদের মতো কাঁদছে, সাজগোজ করলে পর্যন্ত তাদের বলা হয় তুই মেয়ে নাকি যে এমন সাজছিস! শিশুসন্তান বুঝতে পারছে মেয়েদের মতো হয়ে পড়াটা বা মেয়েদের মতো নির্দিষ্ট কিছু ধরনকে ধারণ করাটা লজ্জার। মেয়ে সন্তানটিকেও তেমন বলা হয়। তাকে বলা হয় সারাদিন টো টো করে পাড়া ঘুরছিস তুই কি ব্যাটাছেলে মানুষ নাকি? পা ফাঁক করে বসলে ঠাকুমা বলতেন মদ্দাদের মতো বসনের ভঙ্গি। পা ঢাইক্যা বস। ছেলেদের দু পা ফাঁক করে বসার মধ্যে আধিপত্য অথচ মেয়েদের পা ছড়িয়ে বসার মধ্যে অলক্ষ্মী! এই বৈষম্য সুচিছিদ্র। পশ্চিমবঙ্গে গত দশ বছরে কটি গণধর্ষণ হয়েছে আমরা তার হিসেব নিকেশ নিয়ে কথা বলব। কিন্তু সেকথা রাজনীতির কথা হবে। সংকট যখন সার্ভে এবং গণনার বস্তু হয়ে ওঠে তখন তা রাজনৈতিক সুবিধার কথা বলে। অরাজনৈতিক বলে কিছু না থাকলেও রাজনৈতিক সুবিধা বলে অনেক কিছুই থাকে। তাকে দল জাস্টিফাই করে। সিপিএম আমলে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের সংখ্যাকে ঢেকে দিয়ে তৃণমূলের আমলে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের সংখ্যাকে বাড়ানো হয় রাজনৈতিক সুবিধার জন্য। বিজেপি সঙ্ঘ পরিবারের রক্ষণশীলতাকে নারীর নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক সুবিধার জন্য। এই চক্রব্যুহে আটকে থাকা এজেন্ডার কোনো ভার নেই, ভরসাও নেই। আজকের পরিসংখ্যান আগামীর মেয়েদের নিরাপত্তা দেয় না, বৈষম্য ছেঁটে ফেলে না। আজকের পরিসংখ্যান আগামীর মেয়েদের ভয় দেখায়! শাসায়! চুপ থাকো নাহলে গলার নলী কেটে দেব। চুপ থাকো নাহলে সাঁড়াশি দিয়ে উপরে নেব দাঁত!
ধর্ষণ কি মেয়েদের জন্যই তৈরি করা ফাঁদ? ধর্ষণ পুরুষেরও হয়। অত্যাচার ট্রান্স মানুষদের উপরেও হয়। কিন্তু মেয়েদের উপরে শুধু ধর্ষণ নয় এক বীভৎস ছবি তৈরি করা হয় অত্যাচারের। আজ পর্যন্ত দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধ কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে কোনো অ্যাপোক্যালিপ্টিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যত ধর্ষণ হয়েছে তার নারকীয়তা এটাই প্রমাণ করে যে ভিন্ন লিঙ্গের বলপ্রসু দল ভয় দেখাতে চেয়েছে প্রতিবাদকে। মেয়েদের প্রতিবাদের গলা চিঁরে দেওয়া হয়েছে ভয় দেখিয়ে। অনুগত থাকো নাহলে শুধু যৌন আক্রমণ নয় তার পাশবিক রূপ দেখিয়ে দেব। ২০২৬ এর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের থিম হলো ‘Give to gain’। যা লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে এগিয়ে আসার ডাক দেয়। ২০২৫ এর থিম ছিল “For ALL Women and Girls: Rights. Equality. Empowerment” ২০২৪ এ ছিল “Invest in Women: Accelerate Progress”। ২০২৩ এ ছিল “EmbraceEquity” ২০২২ এ ছিল “#BreakTheBias” এই পাঁচ বছরে সারা ভারতে মহিলাদের উপরে যত অত্যাচার হয়েছে তার ১৩ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে। এটা অবশ্য বিবিসির অফিসিয়াল পাতার খবর। আনঅফিসিয়াল সংখ্যা কোথায় পৌঁছবে তার ঠিক নেই। তাহলে এইসব থিম শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে? উত্তরপ্রদেশে দলিত মেয়েদের উপর হওয়া অত্যাচারের সঠিক পরিসংখ্যান আছে? পশ্চিমবঙ্গের জেলা অঞ্চলে খাপ পঞ্চায়েতের নিদানে নারীধর্ষণের পরিসংখ্যান আছে? উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থা্ন, হরিয়ানা অঞ্চলে ঘটে যাওয়া অনার কিলিং এর ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান আছে? পরিসংখ্যান একটি পুঁথিগত ভ্রষ্টাচারের নমুনামাত্র।
তো রাষ্ট্র যেখানে নিরাপত্তা দিতে পারে না সেখানে একজন মহিলা নিরাপদ কোথায়? তার ঘর, তার পরিবার, তার কর্মস্থল সর্বত্র তাকে লড়ে যেতে হয় নিরাপত্তার জন্য। তার সাহসকে ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়। তার পোশাকের স্বাধীনতাকে আঙুল তোলা হয়। আর সবথেকে দুঃখজনক হলো অন্য এক শিবিরের মেয়েরাও সেই দুর্দশার পৃষ্ঠপোষক হয়। মেয়েদের সবথেকে দুর্বল জায়গা হল সেক্সুয়াল লিমিটেশন। তাই দুর্বলতাকে খোঁচানো হয়। মেয়েরা যৌনতার প্রশ্নে এখনো সনাতন। তারা যেদিন সচেতন হবেন সেদিনই মোড়ে মোড়ে গড়ে আখড়া যেখানে পুরুষতন্ত্রের পৌরোহিত্যকে জ্বালিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।




লেখাটা খুব ভালো হয়েছে
ধন্যবাদ
লেখার বিষয় শুধু ৮ই মার্চের বিশেষ দিনের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং বলা যায় প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে নারী পুরুষ উভয়ের গভীরভাবে অনুধাবন ও প্রয়োজনে সময়োপযোগী সংশোধন করে অবস্থান করার মতো বিষয়। খুব ভাল লেগেছে লেখাটা। তবে প্রেমিকা ছেড়ে চলে গেলেই পুরুষ মাত্র তাকে বেশ্যা সম্বোধন করে কি না জানা নেই। কোন কিছুই জেনারেলাইজ করা যায় না।
ভালো লাগল সোমা।
অসাধারণ
কী চমৎকার লিখলে মেয়েদের কথাগুলো। অনেক অনেক শুভেচ্ছা দিদি। ভালোবাসা। নত হই তোমার লেখায়।
কি অপূর্ব লেখনি,বড়োই স্পর্শ কাতর লেখা। খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়,কয়জনা পারে এতো সুন্দর করে উপস্থাপন করতে।
অসাধারণ লিখেছেন