শরীরের কলকব্জাগুলো সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে কাজ করে। বিধাতা পুরুষ বোধহয় এতোটাও করিতকর্মা নন যে সধবা আর বিধবার শরীর আর মন আলাদাভাবে গড়বেন। সেটা হতো যদি বিধবাদের তিনি নিজে আলাদাভাবে সৃষ্টি করতেন, তারা সমাজের দ্বারা সৃষ্ট না হতো। এক তিনি বহু হতে চেয়ে সবার মনে আর শরীরে সৃষ্টির রসদ জুগিয়েছেন। তাই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই বিধবার শরীরেও সে-সব সম্ভাবনার আয়োজন করে রেখেছেন। তাদের মনটা তো আর পাথরের তৈরি নয়। অসম্ভব এবং অনাচার জেনেও, সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেও কখনো কখনো তারাও কোনো পুরুষকে মন দিয়ে ফেলত। হয়তো তাতে দেহের টানই বেশি থাকতো। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এদেশের বিধবারা নিজের শরীর আর মনকে কঠোর ব্রত, উপবাস আর নিয়মের কঠিন লৌহশৃঙ্খলে বেঁধে, ‘সম্মানের জীবনযাপন’ নামক বিবর্ণ ধুধু রুক্ষ মরু পার করে, একসময় অনাড়ম্বর মরণকে আলিঙ্গন করতো। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কাগজটা রোজ হাতে করে দেখতাম। সম্বোধনহীন একটা চিঠি, মাত্র কটা কথা ওতে লেখা আছে— “পরিবারের সবার অনুমতি নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সামান্য টাকায় এত জনের মুখে একবেলার ভাতও জোটাতে পারছিলাম না। তিনটে বোনের বিয়ে দিতে হবে। উনি নিজের সব গয়না দিতে রাজি, সবাইকে নিয়ে পশ্চিমে চলে গেলাম। জানি না কেন এত কথা লিখলাম, তবুও মনে হলো কাউকে বোধহয় জবাব দেওয়া উচিত। জানি না ক্ষমা চাওয়ার কোনো অধিকার আছে কিনা।”
আমার গীতাঞ্জলির মধ্যে কাগজটা ছিল। দিন পাঁচেক আগে প্রভাসবাবু সপরিবারে উধাও গেছেন। এদিকে বিনিরও কোনো খোঁজ নেই, গাঁয়ের লোকে দুয়ে দুয়ে চার করে নিল। ছি-ছিকার পড়ে গেল চারদিক। প্রভাস মাস্টারের জাত তুলে গালিগালাজের সঙ্গে বিনিদের বাড়ির লোকেরা যে আদতে চরিত্রহীন এবং সেই কারণেই বালিকাবেলাতেই ওর বর লাথি মেরে ওকে দূর করে দিয়ে আর একটা বিয়ে করেছে, সেই রসালো আলোচনাতে ছোটো থেকে বুড়ো কয়েকদিন মেতে থাকলো। ‘হতভাগি সংসারের কোনো কাজ করতো না, কিছু বললেই চিৎকার-চেঁচামেচি আর শাপশাপান্ত করে বাড়িতে কাক-চিল বসতে দিত না’— সে একরকম ছিল, কিন্তু এভাবে বংশের মুখে কালি মাখিয়ে চলে যাবে, কেউই ভাবতে পারেনি। বিপদে পড়ে ওরা বোঝাতে চেয়েছিল বড় বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হওয়ায় বড়দা গায়ে হাত তুলেছিল বলে নিশ্চয়ই মেয়ে নদীতে ডুবে মরেছে, দেহ কোথাও ভেসে গেছে। কিন্তু ভবি ভোলার নয়, ও-বাড়ির ছোট বউ ভুল করে আগেই বলে ফেলেছে যে শুধুমাত্র নিজের গয়না নয়, বাড়ির সব বৌদের গয়না আর ভালো ভালো গোটা কতক শাড়ি নিয়ে তার বরে-খেদানো গুণধর ননদিনী কুলত্যাগ করেছে। সে ছোট মেয়ে, গয়না আর শাড়ির শোকটা সামলাতে পারেনি আর এত তলিয়ে বোঝার বয়সও হয়নি।
বিনি… চিরকাল নিয়ম ভাঙার মেয়ে বিনি, নিজের সুখে থাকার অধিকার এক তিল ছেড়ে দিতে শেখেনি মেয়েটা। বিনা দোষে আমার চরিত্রে যে কালি পড়তে যাচ্ছিল, অনায়াসে এবং নির্দ্বিধায় সে কলঙ্ক নিজে গ্রহণ করে সুখী হতে অজানা পথে পাড়ি দিল। কিন্তু যে বন্ধনের ভিত শুধুই স্বার্থ, শুধুই প্রয়োজন, তা কি ওকে আদৌ সুখী করবে? তবে আমার নিজের কাছে নিজের কোনো আড়াল নেই… নিঃস্ব আমি নতুন করে নিঃস্ব হলাম।
বাড়ির উঠোনে পাকা কুয়ো খোঁড়া হলো। চানঘর আর খাটাপায়খানা কিছুদিন আগেই করা হয়েছিল। এর ফলে বাড়ির মেয়ে-বউদের আর পুকুরঘাটে যাওয়ার দরকার রইলো না। যে-সব মাইনে করা ভারিরা পুকুর থেকে সারাদিনের হাত-পা ধোয়ার জল এনে দিত, তাদের কাজ গেল; আর পুকুরঘাটে স্নান করার নাম করে আড্ডা দিতে গিয়ে বউ-ঝিদের চরিত্র নষ্ট হওয়ার ভয়টাও আর থাকলো না।
সেদিন মেজজ্যাঠামশাই বিকেলে ভাতঘুম দিয়ে উঠে হুঁকো টানছেন, এমন সময় পাড়ার একটা ছেলে একজনকে সঙ্গে নিয়ে এল বাড়ি চিনিয়ে দিতে। সৌজন্য বিনিময়ের পর সে একখানা চিঠি দিল। তাকে বসতে দিয়ে মেজজ্যাঠামশাই চিঠি পড়তে লাগলেন। পড়া শেষে পত্রবাহককে জিজ্ঞেস করলেন— “বেয়াইমশাই তো তিন বছর হলো গত হয়েছেন, তা বেয়ান ঠাকরুন কেমন আছেন? তাঁর মাজা গেছে? নাকি বাতে পঙ্গু?”
লোকটা অপ্রতিভ হয়ে বলল, “আপনার এ কথার মানে বুঝলাম না মশাই!”
মেজজ্যাঠামশাই মৃদু হেসে বললেন, “মানে না-বোঝার তো কিছু নেই। খুব সহজ কথাই তো বললাম, এতকাল পর বাপের বাড়িতে পড়ে থাকা বাড়ির বাল্যবিধবা বউয়ের খোঁজ তার শ্বশুরবাড়ি কেন করবে, তার তো একটা কারণ থাকা উচিত, নাকি?”
লোকটা আমতা আমতা করে জবাব দিল, তিনি সত্যিই বাতে পঙ্গু হয়েছেন। বাড়ির কত্তা গত হওয়ার পর সব ভাই ভাই ঠাঁই-ঠাঁই হয়েছে, সবার হাঁড়ি আলাদা। কেউ আর শাশুড়িকে দেখতে চায় না। এখন সেজবৌমা যদি সংসারের মানে ছোটদেওর আর শাশুড়ির দেখভালের দায়িত্ব নেন, তাহলে তিনি বেশ কিছু জমিজমা তার নামে লিখে দেবেন, যাতে ভবিষ্যতে তার ভাত-কাপড়ের কোনো অভাব না থাকে। এমনকি চাইলে শেষ বয়সে তীর্থধর্মও করতে পারবে।
শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ এসেছেন, এ খবর আমার কাছে এসেছিল। বিয়ে বা পালাপার্বণে তো সেখান থেকে কোনো খবর আসে না। কেবলমাত্র মৃত্যুর খবর আসে অশৌচ পালন করার জন্য। আমি সেরকমই কিছু ভেবেছিলাম।
বাবা-মা বেঁচে নেই, দাদাদের তেমন কোনো দায়িত্ব নেই। বুঝতে পেরেছিলাম এ বাড়ির পাট আমার উঠল। হয়তো চিরকালের জন্যই উঠল। মেজজ্যাঠামশাই স্বার্থপর। কাঁধের বোঝা নামানোর এত বড় সুযোগ আজকের দিনে কেউ কি ছাড়ে? মন বললো— চল ভেসে চল।
আসল কথাগুলো কানে যাওয়া অবধি চোখের জল বাধ মানছিল না। যাদের সঙ্গে কোনোদিন কোনো সম্পর্কই তৈরি হয়নি, বাড়ির সবাই যে সেখানেই আমাকে নির্বাসন দিতে প্রস্তুত, সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। বছরে দুটো থান আর একবেলা দুমুঠো আলোচালের ভাতের বিনিময়ে সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রম করি। তাও এরা আমার পায়ের তলায় মাটি আর মাথার ওপরে ছাদটুকু কেড়ে নিয়ে ভাসিয়ে দিতে চায় চিরকালের মতো।

এদিকে নয়, এদিকে নয়
“এদিকে নয়, এদিকে নয় গো। হুঁই কোনে রাখ দেখি। আবার মোঁড়া-মিঠাই আনা কেন বাপু! আকাশ-পথের কাপড়ে আনা ও-জিনিস কেউ ছুঁয়ে দেখবে নাকি? রেখে দাও, ঝিনু নেবে যাবে খন। নতুন বৌ-এর বাপের ঘরে আচার-ব্যবহারের বালাই নেই বুঝি?”
কথাগুলো যিনি বললেন, তিনি সম্ভবত এই বাড়ির কাজের বৌ। সস্তা ডুরে শাড়ির আধহাত ঘোমটা মাথায় দিয়ে খরখর করে কথাগুলো বর্ষণ করলো দুজন হাঁ-ক্লান্ত মানুষের ওপর। এ বাড়িতে কি আর কেউ নেই?
গরদের থানের ঘোমটা একটু পেছনে ঠেলে ঈষৎ কঠিন গলায় বললাম, “তুমি কে গো বৌ? এ বাড়িতে কাজ কর? বাড়ির আর সব কোথায়? আমাকে নিশ্চয়ই চেন না, আগে তো কখনো দেখনি, আমি এ বাড়ির সেজ বৌ।”
আমার গলায় বিন্দু ভর করেছিল কিনা জানি না, তবে চিরকাল নরম সুরে কথা বলা আমি প্রথমবার শ্বশুরঘর করতে এসে এভাবে গরম মেজাজে কথা বলব, সেটা ভাবিনি। মেজদাদাও নিশ্চয়ই খুব চমকে ছিল। এদের কাজের মেয়েটাও বোধহয় ভাবতে পারেনি যে ওর ধৃষ্টতার এমন কঠোর উত্তর কখনো শ্বশুরঘর করতে না-আসা বাল্যবিধবা বৌয়ের থেকে পাবে। আমি কিন্তু এখানেই থামলাম না, কড়া গলায় বললাম, “মিষ্টির হাঁড়িটা আঁশ হেঁশেলে রেখে দাও মেয়ে। কুটুম্বাড়িতে কেউ খালি হাতে আসে নাকি? এমন ধারাকাণ্ড কোন কালে কখনো দেখেছ? কোথায় হাত-পা ধোব, দেখিয়ে দাও। বাইরে থেকে এসে মানুষ হাত-পা ধোবে তো নাকি?”
রূপের জয় সর্বত্র, তার সঙ্গে যদি ব্যক্তিত্ব যোগ হয় সে রূপের ধার আরও বৃদ্ধি পায়। আর ধারালো জিনিসকে ভয় পেতে হয়। এই মহিলার উঁচু গলা নিমেষে নিচু হয়ে গেল, মিষ্টির হাঁড়িটা হাতে নিয়ে নিচু স্বরে গজগজ করতে করতে এগিয়ে গেল। আমরাও ওর পিছু পিছু এগোলাম। পরপর কয়েকটা ঘর আর বারান্দা পেরিয়ে বিরাট উঠোন, উঠোনের প্রান্তে পাশাপাশি দুটো ঘর। সেগুলো সম্ভবত আঁশ আর নিরামিষ হেঁশেল। বৌটা আঙুল তুলে একদিকে দেখিয়ে দিয়ে বলল, “হুঁই যে টিউবওয়েল, আর হুঁই যে চানঘর, জল ভরাই আছে।”
টিউবওয়েল? গাঁয়ে থাকতে নাম শুনছিলাম বটে, আগে দেখিনি কখনো।
মেজদাদা এদিক-ওদিক নানা কাজে যায়, অনেক কিছু জানে। ও গিয়ে সেটার হাতল-মতো জিনিসটা চেপে নিচু করতেই লোহার নলের মতো মুখ দিয়ে হড়হড় করে জল পড়তে লাগলো। বুঝলাম আমাকে শেখানোর জন্যই ও এটা করলো। টিউবওয়েল চালানোর শব্দে ঝি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “ও নতুন বৌ, দাদাবাবুকে বলুন চানঘরে জল তোলাই আছে।”
চান করে পরিষ্কার হলে বৌটা আমাকে শাশুড়ির ঘরে নিয়ে গেল। একটা কালো চকচকে উঁচু পালঙ্কে ফরসা থান পরে তিনি জেগে শুয়ে ছিলেন। একজন অল্পবয়স্কা বিধবা তাঁকে আধবসা করে দিল কয়েকটা বালিশ উঁচু করে। আমি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে তিনি ভ্রু কুঁচকে চেয়ে দেখলেন, বাঁকা আঙুলগুলো মাথায় দিতে চাইলেন বোধহয়, ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, “ও কঙ্কা, ওকে জল খেতে দিয়েছিস?”
—“এই বার দেব মাসিমা। ও নতুন বৌ, চল আমার সঙ্গে, দুটো মুখে দেবে।”
দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার কারণে বেশ খিদে লেগেছিল। কিন্তু খিদেকে কিল মেরে চুপ করিয়ে রাখার অভ্যাস ছোটবেলা থেকে তৈরি হয়েছে।
আমি ইতস্তত করে বললাম, “আমার মেজদাদা—”
—“ওঁর জন্য চিন্তা করতে হবে না। তেনার জন্যি লুচি ভাজা হচ্ছে।”
আমার ছোট তোরঙ্গটা ওদের দেখানো একটা ঘরে রেখে দিয়েছিলাম। দুধ-কলা আর সাবু দিয়ে ফলার করার পর মেজদাদার ধুতি আর ফতুয়া বের করে দিতে গেলাম। আগের ঝি আমাকে বসার ঘরে নিয়ে গেল। মেজদাদা গল্প করছিলেন এক জনের সঙ্গে, আমাদের সাড়া পেয়ে তিনি মুখ ফেরালেন। নতুন বৌ যে ইতিহাস বই দেখিয়েছিল, তাতে এক বিদেশি বীরের ছবি ছিল— টিকালো নাক, মাথাভরা কোঁকড়া চুল, চওড়া কপাল। ইনি প্রায় সেই রকমই দেখতে, শুধু ধুতি আর হাতাগুটা-জামা পরা। তিনিও আমার দিকে অপলকে চেয়ে রইলেন।
মেজদা বললেন, “পুঁটি, আমি শৈলেন বাবুর সঙ্গে কথা বলছিলাম, ইনি তোর সেদেওর হন।”
আমি ভেবেছিলাম মেজদা ওই ঘরে একাই বসে আছে। ওই ভদ্রলোককে আশা করিনি। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মাথায় ভালো করে কাপড় টেনে দিলাম।
তিনি ঈষৎ হেসে দুহাত জোড় করে নমস্কার করলেন, আমি এসব আদব-কায়দায় অভ্যস্ত না হওয়ায় চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকলাম।
আমার এ বাড়িতে আসা বেশ কিছুদিন হল। লোকে বলে শ্বশুরবাড়ি হল মেয়েদের নিজের জায়গা, শক্ত ঘাঁটি। বিয়ের পর এখানে দোলায় আসে আর চালায় বের হয়। কথাটা কতটা অন্তঃসারশূন্য, ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। কিন্তু আমার দমলে চলবে না। বাপের ঘর যত সহজে ঘাড় থেকে নামিয়ে দিল, এখানেও তেমন হলে মাথার ওপর থেকে ছাদ চিরতরে হারিয়ে যাবে। পথে দাঁড়াতে হবে। একমাত্র উপায় হল সংসারে অপরিহার্য হয়ে ওঠা, কিন্তু সেটা কখনোই কায়িক শ্রমে হবে না।
সেবা-যত্ন ভুলে যেতে মানুষ সময় নেয় না; ভালো ব্যবহারে মন জয় করা যায়, কিন্তু নরম কাদার ভিত নড়বড়ে হয়, যখন-তখন ধসে পড়তে পারে। এদের ছোট্ট সংসারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে হলে ওই শয্যাশায়ী মানুষটার বিশ্বাস অর্জন খুব দরকার। আর বাড়ির একমাত্র পুরুষ মানুষটির সম্মান আদায় করে নিতে হবে।
ক্রমশ



