মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব- ৫

01

01

​​

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস। পর্ব- ৫

যখন ঘুম ভাঙল, লক্ষ্য করলেন ট্রেন দাঁড়িয়েই আছে। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, চারিদিকে শুধু বরফ; ট্রেন আটকে পড়েছে বরফের ঘেরাটোপে। ঘড়ির দিকে তাকালেন, ৯টা বেজেছে।

​পৌনে দশটার মধ্যে প্রাতঃকৃত্য শেষ করে ডাইনিং কোচের দিকে রওনা দিলেন। দেখলেন সবাই মিলে জটলা করে আলোচনায় ব্যস্ত। মিসেস হুবার্ডের গলাই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে।

​হুবার্ড: আসার সময় আমার মেয়ের সে কী তোয়াজ! ট্রেনে উঠবে আর প্যারিস পৌঁছে যাবে! এ কী ফ্যাসাদে ফাঁসলাম রে! কতদিন আটকে থাকতে হবে কে জানে? ওহ্, কাল আমার জাহাজ ছাড়বে। জাহাজ ধরতে পারা তো চুলোয় যাক, টিকিটটা যে ক্যানসেল করব তারও কোনো উপায় নেই।

​ইতালীয় যাত্রী: আমার যা সর্বনাশ হলো কী আর বলব! একটা বড় অ্যাসাইনমেন্ট মনে হয় গেল।

​আমেরিকান যাত্রী: সত্যিই ম্যাডাম, আপনার ‘ওয়ান ওয়ে জার্নি’, এতে যা দেখছি কানেকশন পাওয়া দুষ্কর। অবশ্য এসব ক্ষেত্রে ট্রেন একবার চলতে শুরু করলে অনেক সময় টাইমটা ‘মেক আপ’ করে দেয়।

​সুইডিশ মহিলা: (কাঁদো কাঁদো গলায়) আমার বোন আর তার ছেলেমেয়েরা আমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে। এমন জায়গায় আটকে গেছি যে তাদের জানাতেও পারছি না। ভাববে নির্ঘাত আমার কোনো একটা বিপদ-আপদ ঘটেছে।

​ডেবেনহ্যাম: (অধৈর্যভাবে) কদিন এভাবে আটকে থাকতে হবে কেউ কি বলতে পারবেন?

পোয়ারো লক্ষ্য করলেন, টরাস এক্সপ্রেস আটকে যাওয়ার সময় এই মহিলা যতটা ভেঙে পড়েছিলেন এখন ততটা নন, অনেকটাই স্বাভাবিক।

02

হুবার্ড: এটাই তো মজা, জিজ্ঞাসা করেও কারও থেকে কিছুই জানতে পারবে না। আমরা আটকে পড়েছি তো ট্রেন কোম্পানির কার কী আর এল গেল! এটা যদি কারও বাড়িতে ঘটত, কেউ না কেউ কিছু না কিছু একটা করার চেষ্টা অন্তত করত।

​আর্বথনট: (পোয়ারোর দিকে ঘুরে) আপনি তো মশাই রেল কোম্পানির, কিছু জানেন কখন আমাদের এই দশা কাটতে পারে?

​পোয়ারো: (মুখে স্মিত হাসি এনে) না না, আমি রেল কোম্পানির নই। আপনি সম্ভবত মঁসিয়ে বুঁ-র সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছেন।

​আর্বথনট: ওহ্, আই অ্যাম সরি।

​পোয়ারো: আরে না না, এতে ‘সরি’ হওয়ার কিছু নেই। তাছাড়া আপনার ভুল হতেই পারে, আমি এখন ওঁর কুপেটাই দখল করে আছি কি না।

​চোখ বুলিয়ে পোয়ারো দেখে নিলেন যে মঁসিয়ে বুঁ ডাইনিং কোচে উপস্থিত নেই। আরও লক্ষ্য করলেন যে প্রিন্সেস দ্রাগোমিরফ, হাঙ্গেরিয়ান যুগল, মিস্টার রাশেট ও তাঁর পরিচারক এবং জার্মান লেডি—এরা সবাই এখন ডাইনিং কোচে অনুপস্থিত।

​সুইডিশ মহিলা: (ফোঁপাতে ফোঁপাতে) সত্যি বলতে কী, আমার কান্না পাচ্ছে।

​ম্যাককুইন: (অস্থিরভাবে) ধুর! কাজকম্ম ছেড়ে এভাবে কতদিন আটকে থাকতে হবে কে জানে, ভালো লাগে না—

​হুবার্ড: আচ্ছা, কোন দেশে আটকে আছি কেউ বলতে পারবে?

​ম্যাককুইন: যুগোস্লাভিয়া।

​হুবার্ড: ওহ্! এটাই ভয় করছিলাম, সেই বলকানেই ফেঁসে গেলাম!

​পোয়ারো: (ডেবেনহ্যামের দিকে তাকিয়ে) সবাই দেখছি খুব ভেঙে পড়েছেন, আপনি কিন্তু বেশ স্টেডি।

​ডেবেনহ্যাম: (কাঁধ ঝাঁকিয়ে) না থেকে উপায়ই কী বলুন?

​পোয়ারো: সে তো বটেই। তবে বিপদের সময় এমন দার্শনিক অ্যাটিটিউড কিন্তু বেশ ভালোই।

​ডেবেনহ্যাম: (জানলা দিয়ে বরফের দিকে তাকিয়ে) যেটা আমার হাতেই নেই সেই ব্যাপারে অকারণে উদ্বেগ দেখিয়ে করবটাই বা কী?

​পোয়ারো: সেটা ঠিকই। তবে এমন অ্যাটিটিউড দেখাতে গেলেও যথেষ্ট মনের জোর থাকতে হয়। এখানে আর কারও আপনার মতো মনের জোর কিন্তু ম্যাডাম দেখছি না।

​ডেবেনহ্যাম: আরে না না, আমার থেকেও মনের জোরওয়ালা লোক আছেন। (হঠাৎই কথা থামিয়ে অল্প ভেবে) হ্যাঁ যা বলছিলাম, ধরুন আগের দিনের ওই বয়স্কা মহিলা, দেখতে কেমন তা দেখেইছেন—কিন্তু একটা আঙুলের টুসকিতে যা ইচ্ছা করতে পারেন।

​পোয়ারো: সেটা অবশ্য আমার বন্ধু মঁসিয়ে বুঁ-র ক্ষেত্রে খাটে। তিনি অবশ্য পারেন কারণ তিনি এই রেললাইনের একজন অন্যতম ডিরেক্টর। ব্যক্তিত্বের চেয়ে এখানে পদের জোরই বেশি।

​ডেবেনহ্যাম: (অল্প হেসে) যার যেখানে জোর।

​এভাবেই নানা কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সময় কাটতে লাগল। মিসেস হুবার্ডের গল্পই বেশি শুনতে হলো। সবার জানা হয়ে গেল মিস্টার হুবার্ডের সাথে তাঁর পরলোকগত স্বামীর দাম্পত্য জীবনের নানান খুঁটিনাটি আর খুনসুটির গল্পকাহিনী। এসব যখন চলছিল, সবার অলক্ষ্যেই একজন কোচ কন্ডাক্টরকে আড্ডার জায়গায় আসতে দেখা গেল। আড্ডায় মশগুল মঁসিয়ে পোয়ারোর কাছে গিয়ে অনুনয়ের ভঙ্গিতে জানালেন:

​কন্ডাক্টর: এই অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি।

​পোয়ারো: হ্যাঁ, বলুন।

​কন্ডাক্টর: মঁসিয়ে বুঁ আপনাকে একবার এক্ষুনি ওঁর কোচে আসতে অনুরোধ করে পাঠালেন।

​এরকুল তখন সুইডিশ মহিলার সাথে গল্প করছিলেন। গল্প থামিয়ে বিদায় নিয়ে কন্ডাক্টরের পিছন পিছন মঁসিয়ে বুঁ-র কোচের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজের কোচ ছাড়িয়ে মঁসিয়ে বুঁ-র কোচে এসে হাজির হলেন।

​এটা মঁসিয়ে বুঁ-র কুপে নয়, এথেন্স কোচের সম্ভবত কোনো দ্বিতীয় শ্রেণির কুপে। মঁসিয়ে বুঁ ছাড়াও আছেন একজন ছোটখাটো চেহারার ভদ্রলোক, নীল ইউনিফর্মের একজন বড়সড় চেহারার লোক—সম্ভবত এই ট্রেনের মুখ্য সেফ—এবং পোয়ারোর কোচের কন্ডাক্টর। মঁসিয়ে বুঁ যেন এরকুলের পথ চেয়েই বসে ছিলেন।

​বুঁ: আসুন আসুন, আপনার অপেক্ষাতেই আছি। এই সময় আপনার সাহায্য ভীষণই প্রয়োজন।

​ছোটখাটো চেহারার ভদ্রলোকটি একটু সরে বসতে সেই সিটেই এরকুল বসলেন। মঁসিয়ে বুঁ-র চোখমুখ দেখেই পোয়ারো বুঝলেন অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটেছে।

​পোয়ারো: কী ব্যাপার? হঠাৎ এই এত্তেলা!

​বুঁ: বলছি। একে তো এই তুষারঝড়ে আটকে পড়েছি, তার উপরে এই— (একটু থামলেন, সে সময় লক্ষ্য করা গেল ক্যালে কোচের কন্ডাক্টর একটা উদ্বেগজনিত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন)

​পোয়ারো: হ্যাঁ, তার উপরে কী?

​বুঁ: একজন প্যাসেঞ্জার তাঁর কুপেতে খুন হয়েছেন—স্ট্যাব ইনজুরি।

​পোয়ারো: খুন হয়েছেন! কে খুন হলেন?

​বুঁ: একজন আমেরিকান। হ্যাঁ, কী যেন নাম ভদ্রলোকের… (সামনের কাগজের দিকে চোখ বুলিয়ে) রাশেট—মিস্টার রাশেট, তাই না?

03

কন্ডাক্টর: (ঢোক গিলে) হ্যাঁ, মিস্টার রাশেট। (ভয়ে চিন্তায় মুখ রক্তশূন্য)

​পোয়ারো: আরে ওনাকে বসতে দিন, চিন্তাভাবনায় ওঁর অবস্থা দেখছি বেশ কাহিল।

​ট্রেনের মুখ্য সেফ একটু সরে বসতেই তাঁর পাশে কন্ডাক্টর মাথা নিচু করে বসলেন।

​পোয়ারো: ব্যাপারটা দেখছি বেশ গুরুতর।

​বুঁ: গুরুতর বলে গুরুতর! একে তো ব্যাপারটা খুন, তার উপর এই যে আটকে পড়েছি—কবে মুক্তি জানি না। তাছাড়া ইউরোপের নানা দেশ দিয়ে আমাদের যেতে হবে, এক এক দেশের পুলিশ প্রশাসন এক এক রকম; তারা ব্যাপারটা নিয়ে হয়রানির একশেষ করে ছাড়বে। তাছাড়া এখন আটকে আছি যুগোস্লাভিয়ায়, জানেনই তো—

​পোয়ারো: সত্যিই ব্যাপারটা বেশ জটিলই।

​বুঁ: যুগোস্লাভিয়ার পুলিশের হাতে—ওঃ ভাবতেই! ওহ্ দেখেছেন, এই সব জটজটিলতায় আপনাদের আলাপ করাতেই ভুলে গেছি। ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন, ইনি হলেন মঁসিয়ে এরকুল পোয়ারো।

​ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করলেন, প্রত্যুত্তরে এরকুল পোয়ারোও মাথা ঝোঁকালেন।

​বুঁ: ডাক্তার কনস্ট্যানটাইনের মতে খুনটা হয়েছে রাত ১টার আশেপাশে।

​ডাক্তার: পরীক্ষানিরীক্ষা না করে নিশ্চিত করে বলা মুশকিল, তবুও যা দেখেছি তাতে করে মৃত্যুর সময়টা মধ্যরাত্রি থেকে রাত দুটোর মধ্যেই হবে।

​পোয়ারো: এই রাশেট ভদ্রলোককে শেষ কখন জীবিত অবস্থায় দেখা গেছে?

​বুঁ: তথ্য যা জানতে পেরেছি তাতে করে ভদ্রলোক রাত ১টা বাজতে ২০ মিনিট নাগাদ কন্ডাক্টরের সাথে কথা বলেছিলেন।

​পোয়ারো: সেটাই হয়তো ঠিক। আমিও ওই সময়ই ওনার ঘর থেকে কন্ডাক্টরের সাথে কথা বলতে শুনেছি। এটাই শেষ, তাই তো?

​বুঁ: হ্যাঁ।

​পোয়ারো: (ডাক্তারের দিকে ফিরে) হ্যাঁ, বলুন—

​ডাক্তার: আমি যখন যাই তখন লক্ষ্য করি রাশেটের কুপের জানলা হাট করে খোলা। দেখে যে কেউ ভাববে খুনি ওটা দিয়েই হয়তো পালিয়েছে। তবে আমার মনে হয় এটা তদন্তকে বিপথে পরিচালনা করতেই খুলে রাখা হয়েছে। প্রথম কথা, ওই সময় কেউ ট্রেনের বাইরে বেরোলে তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় নেই—যা তুষারঝড় ওই সময় চলছিল। তাছাড়া সেক্ষেত্রে খুনির পায়ের ছাপ নরম বরফের উপর অবশ্যই পাওয়া যেত। সেসব কিছুই নজরে এল না।

​পোয়ারো: এই খুনের ব্যাপারটা কীভাবে নজরে এল?

​বুঁ: মিশেল?

​কন্ডাক্টর মিশেল মুখ তুলে তাকালেন।

​বুঁ: ওকেই জিজ্ঞাসা করুন ব্যাপারটা কীভাবে জানা গেল।

​মিশেল: (একটু থেমে থেমে) আজ সকালে মিস্টার রাশেটের পরিচারক দরজায় বারকতক নক করেন, সাড়া না পেয়ে ফেরত যান। এরপর, এই আধ ঘণ্টাখানেক আগে রেস্টুরেন্টের অ্যাটেনডেন্টও ব্রেকফাস্টের ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসে দরজায় নক করেন। সাড়া না পেয়ে ১১টা নাগাদ আমাকে খবর দেন। আমার কাছে যে মাস্টার-কি ছিল সেটা দিয়ে দরজা খুলে দেখি ভেতর থেকে বন্ধ। দরজার ফাঁক দিয়েই বোঝা যাচ্ছিল ভেতরটা অসম্ভব ঠান্ডা, জানলাও খোলা। ভাবলাম ভদ্রলোক কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছেন, তাড়াতাড়ি এনাকে (চিফ সেফকে দেখিয়ে) ডেকে আনি। দরজার ভেতরের লক ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি এই অবস্থা। (মিশেল আতঙ্কে মুখ ঢেকে নিলেন)

​পোয়ারো: দরজা বাইরে থেকে লক করা এবং ভেতর থেকেও চেন আটকানো ছিল? সুইসাইড-টাইড নয় তো?

​ডাক্তার: (ব্যঙ্গের হাসি হেসে) একজন লোক আত্মহত্যা করার জন্য নিজের শরীরে ওমন ১০ থেকে ১৫টা স্ট্যাব ইনজুরি করবে? কী মনে হয়?

​পোয়ারো: (চিন্তিত হয়ে) সেটা অবশ্য খুবই অস্বাভাবিক।

​চিফ সেফ: মহিলা, নির্ঘাত কোনো মহিলার কাণ্ড। এমন এলোপাথাড়ি ছুরির আঘাত কোনো মহিলা ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভবই নয়।

​ডাক্তার: অসম্ভব কিছুই নয়, তবে সেক্ষেত্রে সেই মহিলাকে বেশ শক্তিশালী হতে হবে। দু-একটা আঘাত তো একেবারে হাড়মাস ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

​পোয়ারো: স্ট্যাব উন্ডগুলো দেখে আপনার কী মনে হচ্ছে? কোনো পেশাদার খুনির কাজ নয়?

​ডাক্তার: একেবারেই নয়। এমন এলোপাথাড়ি ছুরি চালানো হয়েছে দেখে মনে হবে যেন বিভৎস আক্রোশে চোখ বন্ধ করে কেউ চালিয়েছে।

​চিফ সেফ: (প্রত্যয় নিয়ে) সেটা দেখেই তো বলছি। এ কাজ কোনো মহিলা ছাড়া কারও হতে পারে না। ওরা ক্ষেপে গেলে শরীরে কোথা থেকে অত শক্তি পায় কে জানে, কিন্তু একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

​এত প্রত্যয় নিয়ে বললেন যে বাকিদের মনে হলো ভদ্রলোকের এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে।

​পোয়ারো: হুঃ, তবে এ ব্যাপারে আপনাদের সাথে শেয়ার করার মতো আমার কাছে কিছু তথ্য আছে। শুনলে একটু অবাক হবেন হয়তো—ভদ্রলোক নিজের নিরাপত্তা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন, এমনকি প্রাণসংশয়ের আশঙ্কা করছিলেন। গতকালই এই ব্যাপারে আমার সাথে ওনার কথা হয়েছিল।

​বুঁ: বলেন কী মশাই? তাহলে এটা মহিলা-ফহিলার কাজ হতেই পারে না, এর পিছনে নির্ঘাত কোনো গ্যাংস্টার-ট্যাংস্টার আছে।

​চিফ সেফ: (হতাশ হয়ে) তা যদি হয়, তাহলে বলতেই হয় যে কাজটার মধ্যে গ্যাংস্টারসুলভ কোনো পেশাদারিত্বই নেই।

​বুঁ: ঠিক। এই ট্রেনের ওই কোচে একজন তাগড়াই চেহারার আমেরিকান আছে, সব সময় চুইংগাম চিবোয়—পোশাক-আশাক দেখে আমার কেমন জানি খুব একটা ভালো মনে হয় না—বুঝতে পারছেন কার কথা বলছি? (কন্ডাক্টরের দিকে তাকিয়ে)

​মিশেল: কার কথা বলছেন? ওই ১৬ নম্বরের? হতেই পারে না। কাল রাত্রে ওনাকে নিজের কুপে ছেড়ে কক্ষনো বের হতে দেখিনি।

​বুঁ: সে তুমি নাই দেখতে পারো, কিন্তু খুঁজে আমরা বের করবই। এবার কাজের কথায় আসা যাক, আমরা এগোব কীভাবে? (পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে)

​পোয়ারো: (একটু ইতস্তত ভাব নিয়ে) আমি…

​বুঁ: আচ্ছা বুঝেছি। আমি এই কোম্পানির ডিরেক্টর হিসেবে আপনাকে এই খুনের কিনারা করার দায়িত্ব দিতে চাই। ‘না’ বললে শুনব না, এটা আমার একান্ত অনুরোধ। আপনি বুঝতেই তো পারছেন এই ট্রেন ছাড়লেই যুগোস্লাভ পুলিশ এসে হাজির হবে, হয়রানির একশেষ করে ছাড়বে। তার চেয়ে এর মধ্যে আপনি রহস্যের সমাধান করলেন, যুগোস্লাভ পুলিশ এল আর আমরা তাদের হাতে খুনিকে তুলে দিলাম—ল্যাঠা চুকে গেল। তাছাড়া আপনার তদন্ত নত মস্তকে মেনে নেবে না এমন কোনো দেশের পুলিশ আছে নাকি?

​এরকুল: আর যদি ধরুন আমি রহস্যভেদ করতে না পারি?

​বুঁ: আপনার ক্ষমতা নিয়ে আমার সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আমি আপনাকে চিনি, আপনার কর্মপদ্ধতি জানি। আপনি দয়া করে আর ‘না’ করবেন না। (অনুনয়ের ভঙ্গিতে ঝুঁকে পড়ে) বন্ধু হিসেবে এই বিপদের সময়ে আপনার সহায়তাটুকু চাইছি।

​পোয়ারো: আরে ঠিক আছে। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, কিন্তু আপনি যেমনটা ভাবছেন এর রহস্যভেদ আদৌ খুব সোজাসাপটা হবে বলে মনে হয় না। এই কেসটা হাতে নেওয়ার সেটাই কারণ। কতদিন আটকে থাকতে হবে বুঝতে পারছি না, তাই মাথা খাটানোর এমন একটা সুযোগ ছাড়তেও চাইছি না।

​বুঁ: আশ্বস্ত হলাম। কী যে টেনশনে ছিলাম; এবার নিশ্চয় রহস্যভেদ হবে।

​পোয়ারো: মঁসিয়ে, বললামই তো কেসটা আমি নিচ্ছি।

​বুঁ: গুড! এবার বলুন আমাদের কী করতে হবে?

​পোয়ারো: সাহায্য? হ্যাঁ, প্রথমেই একটা কাজ করুন—ইস্তাম্বুল-ক্যালে কোচের একটা কুপে-ওয়াইজ চার্ট আমাকে দিতে হবে এবং তাতে কোন কুপেতে কার রিজার্ভেশন আছে তারও চার্ট। আর… আর যাত্রীদের সবার টিকিট ও পাসপোর্টও আমার চাই।

​বুঁ: মিশেল, উনি যা যা চাইছেন সেগুলো সব রেডি করে দাও।

​মিশেল কুপে ছেড়ে এগুলো আনতে একপ্রকার দৌড়েই গেলেন।

​পোয়ারো: ওই কোচের যাত্রী ছাড়াও আর কারা এই ট্রেনে ট্রাভেল করছেন?

04

বুঁ: ওই কোচটাই শুধু ভর্তি, বাকি সব কোচই ফাঁকা। এই যেমন ধরুন না, এথেন্সের কোচটাতে আমি আর ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন। বুখারেস্ট কোচে একজন আছেন—বয়স্ক ভদ্রলোক, একটা পা আবার ওঁর বিকলাঙ্গ। এছাড়া বাকি সবই জেনারেল কোচ। ডিনারের পরই ওই দিকটার সাথে দরজা লক করে দেওয়া হয়েছিল। ইস্তাম্বুল-ক্যালে কোচের সামনে শুধু ডাইনিং কোচ, তারপর ইঞ্জিন।

​পোয়ারো: তাহলে মোদ্দা কথা দাঁড়াল যে, খুনিকে আমাদের ইস্তাম্বুল-ক্যালে কোচেই খুঁজে বের করতে হবে। (ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে) আপনিও তেমনটাই বলছিলেন না?

​ডাক্তার: (মাথা নেড়ে) আমারও তাই মনে হয়।

​পোয়ারো: সাড়ে বারোটা নাগাদ তুষারঝড়ে ট্রেন আটকে পড়ল, কারও পক্ষেই ট্রেন ছেড়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়, তাহলে খুনি—

​বুঁ: তার মানে খুনি এখনো আমাদের সাথেই এই ট্রেনেই! মাই গড!

ক্রমশঃ

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব – ৪


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top