দ্য আরশোলা কমপ্লেক্স: বেকারত্ব ও সমাজ

arsola gang

জিরাট কলোনি বাজারে বাপিদার চায়ের দোকানে পাউরুটি কিনতে গিয়েছিলাম। মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে ছিলাম। এই অল্প সময়েই সবচেয়ে বেশি যে শব্দদুটি কানে এল, তা হল— “শিক্ষিত বেকার”। কেউ বলছেন ছেলে পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরি পাচ্ছে না, কেউ বলছেন মেয়ে এম.এ. করে বাড়িতে বসে আছে। আবার কেউ হতাশ গলায় বলে উঠলেন— “এখন আর পড়াশোনা করে কী হবে?”

বাড়ি ফিরে ভাবছিলাম, আজকের পশ্চিমবঙ্গে “শিক্ষিত বেকার” যেন শুধু একটি শব্দ নয়; এক গভীর সামাজিক বাস্তবতা। সরকার বদলায়, রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়, উন্নয়নের ভাষ্য বদলায়, কিন্তু শিক্ষিত বেকারের দীর্ঘ লাইন খুব একটা বদলায় না। অথচ দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; তা ধীরে ধীরে মানুষের আত্মসম্মান, মানসিক ভারসাম্য এবং সামাজিক সম্পর্ককেও ক্ষয় করে।

সম্প্রতি এক বিচারপতি ‘আরশোলা’র সঙ্গে বেকার যুবকদের তুলনা করেছেন। মন্তব্যটি নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে অনেক যুবক ব্যঙ্গ করেই নিজেদের ‘ককরোজ জনতা পার্টি’ বলতে শুরু করেছেন। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে কৌতুকপূর্ণ মনে হলেও, এর ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে গভীর সামাজিক অপমানবোধ। কারণ সমাজ যখন কাউকে দীর্ঘদিন ধরে অপ্রয়োজনীয়, ব্যর্থ কিংবা বোঝা বলে অনুভব করায়, তখন সেই অপমান ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিক জটিলতায় পরিণত হয়। হয়তো একে ‘আরশোলা কমপ্লেক্স’ বলা যেতে পারে।

আরশোলা শুধু ঘৃণার প্রতীক নয়; এমন এক অস্তিত্বের প্রতীক, যাকে মানুষ দেখতে চায় না, কিন্তু তবুও তা বেঁচে থাকে। দীর্ঘ বেকারত্ব বহু যুবককে ঠিক এই মানসিক অবস্থায় ঠেলে দেয়। তারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সমাজের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই। তখন মানুষ শুধু কর্মহীন হয়ে ওঠে না; বরং হারায় নিজের সামাজিক পরিচয় ও আত্মমর্যাদা।

গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, করোনা-পরবর্তী সংকট, ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব বহু তরুণ-তরুণীর জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অন্যের সাফল্যের প্রদর্শন এবং নিজের ব্যর্থতার অনুভূতি— এই দুইয়ের সংঘর্ষে অনেকের ভিতরে জমে উঠছে হতাশা, ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতা।

বেকার যুবকদের মনোজগতে একটু গভীরভাবে তাকালেই বোঝা যায় তাদের ভিতরের নীরব ভাঙন। আশা ও হতাশা, আত্মসম্মান ও অপমান, স্বপ্ন ও অনিশ্চয়তার সংঘাতে অনেকেই ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বের মূল্য নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা মানুষের ভিতরে জমিয়ে তোলে এক চাপা ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ কখনও নীরব বিষণ্নতায়, কখনও আত্মবিনাশে, কখনও আবার হিংস্র প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পায়।

এই প্রসঙ্গে দস্তয়েভস্কির Crime and Punishment-এর রাসকলনিকভের কথা মনে পড়ে। দরিদ্র, মেধাবী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক যুবক। সেন্ট পিটার্সবার্গের এক ছোট, অন্ধকার ঘরে তার বাস। অর্থাভাবে পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িভাড়া বাকি, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এক বৃদ্ধ সুদখোর মহিলার কাছে বন্ধক রাখতে হচ্ছে। এর মধ্যেই একদিন সে মায়ের চিঠি পায়— যেখানে লেখা, তার বোন অপমান সহ্য করে এক ধনী বয়স্ক ব্যক্তিকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, শুধুমাত্র পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।

চিঠিটি রাসকলনিকভের কাছে শুধু দুঃসংবাদ ছিল না; ছিল নিজের অক্ষমতার নির্মম স্মারক। সে অনুভব করতে শুরু করে, দারিদ্র্য শুধু মানুষকে কষ্ট দেয় না, তাকে অপমানিতও করে। ধীরে ধীরে তার ভিতরে জন্ম নিতে থাকে এক অদ্ভুত বিশ্বাস— অসাধারণ মানুষ ইতিহাস বদলানোর প্রয়োজনে আইন ভাঙতেও পারে। সেই বিশ্বাস, অপমান এবং হতাশার সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় অপরাধ।

রাসকলনিকভ কোনো একক ব্যক্তি নয়; সে এমন এক যুবসমাজের প্রতীক, যারা নিজেদের সম্ভাবনা ও বাস্তবতার সংঘাতে ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। যাকে আমরা আজকের ‘আরশোলা কমপ্লেক্সে’র সাথে তুলনা করতে পারি।

উপন্যাসটিতে অপরাধকে শুধু ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখানো হয়নি। সেখানে দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, অপমান, বিচ্ছিন্নতা এবং ব্যক্তিমানস— সব মিলিয়ে অপরাধের এক জটিল বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে— মানুষকে অপরাধী বানায় কে? সমাজ, রাষ্ট্র, নাকি তার নিজের মনস্তত্ত্ব?

সম্ভবত উত্তরটি একরৈখিক নয়।

আজও আমাদের সমাজে হাজার হাজার যুবক বছরের পর বছর পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করে অপেক্ষা করছে। কেউ কোচিং সেন্টারে ঘুরছে, কেউ অস্থায়ী কাজ করছে, কেউ আবার ধীরে ধীরে সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে শহরের এক অংশে বহুতল, শপিং মল ও ডিজিটাল উন্নয়নের বিজ্ঞাপন ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বৈষম্যের এই দৃশ্যমান ব্যবধান মানুষের ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে।

অপমান যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন মানুষ অনেক সময় নিজের অপমানকেই প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে করতে বহু তরুণ এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছয়, যেখানে হাসি-ঠাট্টার আড়ালেই জমতে থাকে ক্ষোভ ও হতাশা, যার দৃষ্টান্ত ককরোচ জনতা পার্টি।

রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিতে পারে। কিন্তু শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই সমাজের গভীর অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকট দূর হয় না। বেকারত্ব, সামাজিক অপমান এবং বিচারহীনতার অনুভূতি যদি একইভাবে থেকে যায়, তাহলে ক্ষোভও থেকে যায়— শুধু তার ভাষা বদলে যায়।

তাহলে সমাধান কোথায়?

প্রথমত, এমন একটি সমাজব্যবস্থা দরকার যেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, মানুষের মানসিক সুস্থতা এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্নটিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কঠোর আইন বলবৎ ও শাস্তি দিয়ে সাময়িকভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ কমাতে দরকার শিক্ষা, মানবিক পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।

সবচেয়ে বড় কথা, এমন এক সমাজ গড়ে তুলতে হবে যেখানে মানুষ নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বলে অনুভব করবে না। কারণ মানুষ যখন নিজের অস্তিত্বের মূল্য হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজও ধীরে ধীরে নিজের মানবিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে।

দস্তয়েভস্কি শেষ পর্যন্ত রাসকলনিকভের ভিতরে পুনর্জন্মের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হল— আমাদের সমাজ কি তার যুবকদের সেই সম্ভাবনা দেখছে?

যে সমাজ তার যুবকদের বারবার অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করায়, সেই সমাজই একদিন নিজের ভিতরে নতুন নতুন আরশোলার জন্ম দেয়।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top