মসিয়ে: আমি তো ব্যাপারস্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। তাহলে কি মিশেল এই হত্যাকাণ্ডের সাথে…
পয়রো: দাঁড়ান দাঁড়ান। ওত তড়বড় করবেন না। আগে যাত্রীদের জবানবন্দিগুলো সব শেষ করি। হ্যাঁ, এরপর তাহলে ওই সুইডিশ মহিলাকে ডাকা যাক। ওনার পাসপোর্টটা…… (পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে) নাম তো দেখছি আলে, গ্রেটা আঁলে। বয়স ৪৯।
ভদ্রমহিলাকে ডাকা হল। ভালো মানুষ চেহারার, ধীরস্থির নম্র। মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা, চোখে চশমা। ফরাসি বুঝতে পারেন, বলতেও পারেন। নাম, ঠিকানা, বয়স ইত্যাদি পাসপোর্টেই ছিল।
মসিয়ে র টুকটাক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। জানা গেল, ভদ্রমহিলা অবিবাহিত, এবং একজন প্রশিক্ষিত নার্স, নার্সিং-এ গ্র্যাজুয়েট। বর্তমানে ইস্তাম্বুলে একটি মিশনারি স্কুলে মেট্রন হিসেবে কাজ করছেন। ছুটিতে দেশে ফিরছেন।
এরপর এরকুল পয়রো জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন।
এরকুল: ম্যাডাম, আপনি বোধহয় শুনেছেন এই ট্রেনে একটা হত্যাকাণ্ড………
আলে: হ্যাঁ, সকাল থেকে তাই তো শুনছি। ওই আমেরিকান ভদ্রমহিলা বলছিলেন খুনি নাকি তাঁর কামরাতেই লুকিয়ে ছিলেন।
এরকুল: ম্যাডাম, আমরা জানতে পেরেছি যে নিহত রাশেটকে আপনিই জীবিত অবস্থায় শেষবারের মতো দেখেন।
আলে: শেষবারের মতো কিনা বলতে পারব না, তবে এটা ঠিক যে রাত্রে শুতে যাওয়ার আগে আমি ওই আমেরিকান ভদ্রমহিলা মিসেস হবার্ডের কুপে ভেবে ভুল করে ওনাটায় ঢুকে পড়ি।
এরকুল: সে সময় ওনার সঙ্গে কি আপনার কোনো রকম কথাবার্তা হয়েছিল?
আলে: তেমন কিছু নয়। উনি বই পড়ছিলেন। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি ক্ষমা চেয়ে বেরিয়ে আসি।
এরকুল: উনি কি আপনাকে কিছু বলেছিলেন?
আলে: হ্যাঁ, উনি কিছু একটা বলেছিলেন, কিন্তু উনি কি বলতে চাইছিলেন, আমি সেটা সঠিকভাবে বুঝিনি।
এরকুল: তারপর?
আলে: এরপর আমি পাশের কামরায় মিসেস হবার্ডের কাছে যাই, খুব মাথা ধরেছিল, ওনার কাছে অ্যাসপিরিন চাই।
এরকুল: হুঁ। আচ্ছা। একটা জিনিস। ওই সময় মিসেস হবার্ড কি ওনার কামরার সাথে মি. রাশেটের কামরার কানেক্টিং দরজাটা বন্ধ আছে কিনা আপনাকে চেক করতে বলেছিলেন?
আলে: হ্যাঁ, দরজাটা বন্ধ আছে কিনা উনি আমাকে দেখতে বলেছিলেন।
এরকুল: বন্ধ ছিল?
আলে: হ্যাঁ।
এরকুল: তারপর?
আলে: আমি অ্যাসপিরিন নিয়ে নিজের কামরায় ফিরে যাই এবং তা খেয়ে শুয়ে পড়ি।
এরকুল: তখন কটা বাজে আন্দাজ?
আলে: তখন—১১টা বাজতে দু-পাঁচ মিনিট বাকি ছিল সম্ভবত।
এরকুল: শুয়েই কি আপনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, না?
আলে: না না। মাথাটা খুব ধরেছিল। শোয়ার খানিক পরে মাথাব্যথাটা একটু কমে এলে তবেই ঘুমটা আসে। শোয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর্যন্ত তো আমি জেগেই ছিলাম।
এরকুল: আপনি যতক্ষণ জেগে ছিলেন তার মধ্যে ট্রেন কি কখনো থেমেছিল?
আলে: না না, আমার তো মনে হচ্ছে ট্রেন থামেনি, চলুই ছিল। তবে একবার ঘুমিয়ে পড়ার আগে তন্দ্রার ঘোরে মনে হল ট্রেন কোনো একটা স্টেশনে যেন থামল।
এরকুল: ইঃ। ওটা সম্ভবত ভিনকোভি স্টেশন। (এরপর টেবিলের উপর রাখা ইস্তাম্বুল–ক্যালে কোচের কামরার স্কেচের দিকে আঙুল নির্দেশ করে জিজ্ঞাসা করলেন) ম্যাডাম, এই ৪ নং টা আপনার কুপে?
আলে: হ্যাঁ হ্যাঁ, 2nd Class.
এরকুল: আপনার বার্থ? আপার না লোয়ার?
আলে: নীচেরটা, দশ নং।
এরকুল: আপনার কুপেতে আর কে আছেন?
আলে: এক ব্রিটিশ মহিলা। অত্যন্ত ভদ্র মার্জিত স্বভাবের মেয়ে। বাগদাদ থেকে আসছেন।
এরকুল: আচ্ছা মনে করতে পারেন, ভিনকোভি ছাড়ার পর কি উনি কখনো কুপের বাইরে বেরিয়েছিলেন?
আলে: সম্ভবত না।
এরকুল: আপনি তো তখন ঘুমোচ্ছিলেন, কী করে বুঝলেন উনি বের হননি?
আলে: উনি আপার বার্থে ছিলেন। উপর থেকে নীচে নামলে অনিবার্য আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যেত। আমার ঘুম বেশ পাতলা। অল্প খুট আওয়াজেই ভেঙে যায়।
এরকুল: আপনি কি বেরিয়েছিলেন?
আলে: একদমই না। আজ সকালের আগে আমি বার্থ ছেড়ে নড়িনি।
এরকুল: (প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে) আচ্ছা ম্যাডাম, আপনার কি লাল রঙের কোনো কিমোনো আছে?
আলে: (বিহ্বল হয়ে) কিমোনো? না তো। লাল রঙের একটা নাইট ড্রেস আছে আমার, তবে সেটা কিমোনো নয়, ড্রেসিং গাউন। হঠাৎ কিমোনো?
এরকুল: ম্যাডাম, গোয়েন্দাদের চিন্তাভাবনার গতি বড় বিচিত্র।
আলে: আপনার সহযাত্রী ব্রিটিশ মহিলার কোনো লাল রঙের……?
আলে: না না, ওনার নাইট গাউনটা হালকা বেগুনি। (একটু স্বভাববিরুদ্ধ অধৈর্য হয়ে)
এরকুল: (প্রসঙ্গ বদলে) আপনি বুঝি ছুটিতে যাচ্ছেন?
আলে: হ্যাঁ। তবে সরাসরি বাড়ি যাব না। এখান থেকে গিয়ে উঠব আমার বোনের কাছে লিয়ন্সে। কিছু দিন ওখানে থেকে তবে বাড়ি ফিরব।
এরকুল: আপনার বোনের নাম ঠিকানাটা যদি একটু দেন।
আলে: (আগ্রহভরে) একটা কাগজ দিন, লিখে দিচ্ছি।
এরকুল: ম্যাডাম, আপনি কি কখনো আমেরিকা গেছেন?
আলে: (কাগজে নাম ঠিকানা লিখতে লিখতে) না, যাইনি। তবে একটা আমেরিকান হ্যান্ডিক্যাপড লোকের দেখাশোনা করার কন্ট্রাক্ট পাওয়ার কথা একবার হয়েছিল, সেটা শেষমেষ ম্যাচিওর করেনি, যাওয়াও হয়নি। তবে শুনেছি আমেরিকানরা খুব দিলদরিয়া টাইপের হয়।
এরকুল: আপনি কি আমেরিকার ইদানীংকালের বিখ্যাত আর্মস্ট্রং মামলার কথা কখনো শুনেছেন বা পড়েছেন?
আলে: না, কখনো শুনিনি।
এরকুল তখন আর্মস্ট্রং–ডেইজি হত্যাকাণ্ড মামলার ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। শুনতে শুনতেই গ্রেটা আলের দুচোখ জলে ভরে গেল।
আলে: ওহ! মানুষ এত নিষ্ঠুরও হয়। ভাবুন একবার ডেইজির মায়ের কথা।
এরকুল: অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম। তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য। এবার আপনি আসতে পারেন।
বিদায় সন্তোষ জানিয়ে সুইডিশ মহিলা ডাইনিং কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এরকুল এরপর আপনমনে একটা কাগজে কীসব লিখছিলেন। সেদিকে নজর পড়তেই মসিয়ে বু জানতে চাইলেন, ‘কী এত নোট নিচ্ছেন?’
এরকুল: ভাবছি আর লিখছি। ঘটনাক্রমগুলো ঠিক কেমন।
৯:১৫: ট্রেন বেলগ্রেড ছাড়ল।
৯:৩০: রাশেটের কামর থেকে পরিচালক সবকিছু গুছিয়ে বেরিয়ে এল।
১০:০০: ম্যাককুইন অফিসিয়াল কাজ সেরে রাশেটের কামরা থেকে বেরিয়ে গেল।
১০:৪০: গ্রেটা আলে ভুল করে রাশেটের কামরায় ঢুকে পড়লেন। এখনো পর্যন্ত আমরা জেনেছি যে, তিনিই তাঁকে জীবিত অবস্থায় শেষবারের মতো দেখেছেন। রাশেট তখন বই পড়ছিল।
১২:০০: ট্রেন ভিনকোভি ছাড়ল।
১২:৩০: ট্রেন বরফঝড়ের কবলে পড়ল।
১২:৪০: রাশেটের কামরা থেকে ঘণ্টির আওয়াজ শুনে কন্ডাক্টর মিশেল দরজায় টোকা দিলেন। ফরাসি ভাষায় শুনলেন রাশেট বলছেন ‘ ‘Ce n’est rien. Je me suis trompé’, অর্থাৎ ‘কোনো প্রয়োজন নেই, ভুল করে ঘণ্টি টেপা হয়ে গেছে, আপনি আসতে পারেন’।
১:১৫: কামরায় লোক ঢুকেছে বলে শ্রীমতি হবার্ড হুল্লোড় জুড়ে দিলেন।
মসিয়ে: বাঃ, বেশ সাজিয়েছেন তো? এই না হলে গোয়েন্দাদের কাজ!
এরকুল: কোনো অসঙ্গতি আপনার চোখে পড়েনি?
মসিয়ে বু: সবই তো পরপর সাজানো আছে। বোঝাই যাচ্ছে খুনটা হয়েছিল ওই রাত সোয়া একটা নাগাদই। ভাঙা ঘড়ি, মিসেস হবার্ড— সবার কথাই বেশ মিলে যাচ্ছে। আপনি যাই বলুন, আমি নিশ্চিত ওই হুমদো ইতালিয়ানটাই খুনি। ব্যাটারো খুব রগচটা হয়। কথায় কথায় ছুরি–বন্দুক চালাতে ওস্তাদ। তাছাড়া দেখছেন না শিকাগোয় থাকতো।
এরকুল: সেটা অবশ্য ঠিক।
মসিয়ে ধু: অবশ্য মানে, অবশ্যই ঠিক। রাশেট আর ও সম্ভবত একই দলের। রাশেটের আসল নাম দেখলেন ক্যাসেটি। ক্যাসেটি নামটাও ইতালি ঘেঁষা, ঠিক কিনা। বুঝলেন ভাই, দুষ্কর্মগুলো সব ওরা মিলেমিশেই করত। বখরা গিয়ে গোলযোগ, তাতেই হয়তো রেগে গিয়ে রাশেটকে খুন করে বসেছে।
এরকুল: ব্যাপারটা কি এতটাই সরল?
মসিয়ে ধু: আলবৎ, এতটাই সরল। আমি নিশ্চিত ওই ব্যাটাই খুনি।
এরকুল: আর রাশেটের পরিচালক? তার সাক্ষ্য যে অন্য কথা বলছে। রাশেটের পরিচালক দাঁতের ব্যথায় সারারাত ছটফট করেছে, ঘুমুতেই পারেনি। সে যে সাক্ষ্য দিচ্ছে ইতালীয়টি চার হাত পা ছড়িয়ে নিজের বেডে সারারাত নাক ডাকিয়েছে। কামরা ছেড়ে বেরোনো দূর থাকুক, বার্থ থেকেই নামেনি।
মসিয়ে: (বিমর্ষভাবে) হুঁ। সেটাই মুশকিল হয়েছে। স্ট্রং অ্যালিবাই, ব্যাটার ছেলেকে ফাঁসানো কঠিন।
এরকুল: (একটু হেসে) সত্যিই আপনার দুর্ভাগ্য। একেই বলে কারো সর্বনাশ আর কারো পৌষমাস। ইতালীয়টির পরম সৌভাগ্য যে ওই রাতে রাশেটের পরিচারকের প্রবল দাঁতব্যথা ছিল।
বু: (হতাশ হয়ে) যাক গে, আপনি আছেন যখন তখন পাপ চাপা থাকবে না। একদিন না একদিন ফুঁড়ে বেরুবেই।
এরকুল: (মাথা নেড়ে) ডিরেক্টর মশাই, একটু ধৈর্য ধরুন, কিছুই অত জলবৎ তরলং নয়, মনের গতি বড় বিচিত্র, মানুষের কাণ্ডকারখানা তো আরও…
(ক্রমশ)
আগের পর্বঃ মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব-১২



