মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব-১২


প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে ঝড়ের মতো মিসেস হুবার্ড এসে ঢুকলেন ডাইনিং কোচে। ঢুকেই তড়বড় করতে শুরু করলেন।

gemini generated image jvkeamjvkeamjvke (1)

হুবার্ড: আরে আমি কার সাথে কথা বলব? কে? কে? আপনাদের মধ্যে অথরিটি কে আছেন? কার সাথে আমি কথা বলব? আমার কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে, খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও। আমি জানতে চাই কার সাথে আমায় কথা বলতে হবে।

​দাঁড়িয়েই কথাগুলো বলছিলেন, দৃষ্টি ঘুরছিল তিনজনের উপরেই।

​এরকুল: ম্যাডাম, আমার সাথে কথা বলুন, কিন্তু তার আগে দয়া করে আপনি বসুন, ওত উত্তেজিত হবেন না।

​হুবা: (পোয়ারোর উল্টোদিকের চেয়ারে জমিয়ে বসে) উত্তেজিত হব না? কাল রাতে এই কোচে একটা মার্ডার হয়ে গেল, আর খুনি আমার কূপেতে ঢুকেছিল, তবু বলছেন—

​এরকুল: আপনি নিশ্চিত, খুনি আপনার কূপেতে—

​হুবা: (ফেটে পড়লেন) আমি কি মিথ্যা কথা বলছি! ২০০ শতাংশ নিশ্চিত না হয়ে আমি কোনো কথা বলি না। ওহ্! ভাবতেই পারছি না। শুনুন, কাল রাতে হঠাৎই আমার ঘুম ভেঙে যায়, দেখি আমার ঘরে একটা লোক। আমি ভয়ে মড়ার মতো চোখ বুজে বিছানায় পড়ে রইলাম, ভাবছি হায় ভগবান, এ কাদের পাল্লায় পড়লাম, প্রাণ নিয়ে কি আর ফিরতে পারব? সোনাদানা যাক, সেসব নিয়ে পরোয়া করি না, কিন্তু প্রাণ! অবশ্য সোনাদানা আমি কায়দা করেই রাখি, মোজার ভেতরে বালিশের নিচে—ওসব চোরের বাবাও টের পাবে না। ভাবুন একবার, মাথায় ওই ঢিপলি নিয়ে শুয়ে থাকাটা কি জঘন্য ব্যাপার! উপায় বা কী, যেমন জঘন্য ট্রেন—চোরের হাত থেকে বাঁচলে কী হবে, এ তো খুনির পাল্লায় পড়লাম—ভাবতে পারছি না এ আমি কোথায় এলাম?

​এরকুল: বুঝলাম ম্যাডাম, কাল আপনার কূপেতে একটা লোক ঢুকেছিল।

​হুবা: চোখ বন্ধ করে ভাবছি, আজ আর রেহাই নেই। চারিদিক শুনশান, কোনো আওয়াজ পর্যন্ত কানে আসছে না, এমনকি ট্রেন চলার আওয়াজও না। একবার মনে হলো, ট্রেনের সব্বাইকে খুন করে বোধহয় আমার কূপেতে ঢুকেছে, তাই কোনো আওয়াজ পাচ্ছি না। আমার মেয়ে যদি এই অবস্থায় আমায় দেখত কিছুতেই একা ছাড়ত না। যাই হোক, হঠাৎ করেই মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আমি কলিং বেলের সুইচ টিপতে লাগলাম—একবার দুবার—বারবার—আর আপনাদের অ্যাটেনডেন্ট গুলোও হয়েছে—প্রথমবার কিছুতেই সাড়া দেবে না। কোনো সাড়া না পেয়ে আমি ভাবলাম, শেষ—সব শেষ—কেউই আর বেঁচে নেই। এই সময় করিডরে পায়ের শব্দ পেলাম—আমার দরজার কাছেই এসে থামল, দরজায় নক করার শব্দও শুনলাম। একটু ভরসা পেয়ে ‘যা আছে কপালে’ বলে দিলাম বেড সুইচ টিপে কূপের আলোটা জ্বালিয়ে। দেখি ওমা, কোথাও কেউ নেই—লোকটা ভ্যানিশ!

​এরকুল: তারপর কী করলেন?

​হুবা: আমি কন্ডাক্টরকে গোটাটা বললাম। প্রথমে কিছুতেই মানতে চাইবে না। বলে কি না আমি স্বপ্ন দেখে বানিয়ে বানিয়ে বলছি! আমি বানিয়ে বানিয়ে বলব? বললাম, দেখ ভালো করে, সিটের তলায় লুকিয়ে থাকতে পারে। বলে কি না সিটের তলায় একটা মানুষের পক্ষে লুকিয়ে থাকা সম্ভব নয়। কী যে বলে! দায়ে পড়লে কত বড় বড় চেহারা ছোট জায়গায় সেঁধিয়ে যায়। যাই হোক, সেখানেও কাউকেই পাওয়া গেল না। কন্ডাক্টর অবশ্য বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল—আচ্ছা, আপনার পরিচয় তো জানা হলো না, আর আপনিই বা কে? (বুঁ -এর দিকে তাকিয়ে)

​এরকুল: (প্রত্যেককে দেখিয়ে) আমি ম্যাডাম এরকুল পোয়ারো, আর ও মঁসিয়ে বুঁ—রেল কোম্পানির অন্যতম ডাইরেক্টর, আর উনি ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন।

​হুবা: এরাই মাথা দেখছি (বিড়বিড় করে)। আপনারা তিনজনেই আছেন, ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস। এক ফোঁটা বানিয়ে বলছি না। আমি নিশ্চিত লোকটা পাশের কূপে থেকেই ঢুকেছিল—ওই যে হতভাগ্য লোকটা খুন হলো তার কূপে থেকেই। আমি কন্ডাক্টরকে দুটো কূপের সংযোগকারী দরজাটা আমার দিক থেকে বন্ধ আছে কি না দেখতে বললাম। আমি নিশ্চিত ওটা খোলা ছিল, আমি কন্ডাক্টরকে শক্ত করে ছিটকিনিটা এঁটে দিতে বললাম। কন্ডাক্টর চলে যাওয়ার পরে এক বড় সুটকেশও ওই দরজায় ঠেসিয়ে দিলাম—যা সব ছিটকিনির ছিরি!

​এরকুল: কটা নাগাদ এটা ঘটল?

​হুবা: আমি প্রাণের ভয়ে মরছি, ঘড়ি দেখতে যাব—ওসব টাইমফাইম আমি দেখিনি, বলতেও পারব না।

​এরকুল: এই লোক ঢোকা ব্যাপারটা নিয়ে আপনার মতামত কী?

​হুবা: মতামত? মতামত আবার কী? এ তো জলের মতোই সোজা, যে লোকটা আমার কূপেতে ঢুকেছিল—ওই খুনি।

​এরকুল: এরপর কি তাহলে আবার আগের কূপেতেই ফিরে গেল?

​হুবা: আমি ভয়ে চোখ টিপে শুয়ে আছি, আমি জানব কীভাবে ও কোথায় গেল?

​এরকুল: দরজা দিয়ে করিডরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তাই নেই।

​হুবা: সেসব আমি জানি না, আমার চোখ বন্ধ ছিল—ব্যাস। ওহ্ ভগবান! আমার মেয়ে যদি এসব জানত—

​এরকুল: ম্যাডাম, এত ভেঙে পড়বেন না। আচ্ছা ম্যাডাম, কাল রাতে আপনার পাশের কূপেতে কোনো অস্বাভাবিক আওয়াজ কিছু পেয়েছিলেন?

​হুবা: না না, ওসব শব্দ-টব্দ আমার কানে আসেনি। এখনো ভাবলেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে—ওই লোকটা আর আমি একসাথে এক কূপেতে ছিলাম, ভাবতেই পারছি না! এর অকাট্য প্রমাণ আমার কাছে আছে।

gemini generated image mychnfmychnfmych

এরপর মিসেস হুবার্ড সঙ্গে আনা বড় একটা হ্যান্ডব্যাগ টেবিলের ওপর ঢেলে দিলেন। সেখান থেকে হিরে থেকে জিরে নানান বস্তু টেবিলে ছড়িয়ে পড়ল—রুমাল, চশমা, কাঁচি, চাবির রিং, কী নেই? সেখান থেকে ছোট একটা ধাতব বস্তু হাতে নিয়ে বিজয়ীর ভঙ্গিতে—

​হুবা: বলেছিলাম না? দেখুন এই বোতামটা। এমন বোতাম কি আমার কখনো হতে পারে? কিন্তু আমি পেয়েছি, আজ সকালেই মেঝেতে কুড়িয়ে পেয়েছি। বানিয়েই যদি বলব, এটা এল কোথা থেকে?

​মিসেস হুবার্ড বোতামটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন।

​বুএই: (অবাক হয়ে) এটা—এটা তো কোনো কন্ডাক্টরের পোশাকের বোতাম দেখছি?

​এরকুল: হ্যাঁ, কন্ডাক্টরের পোশাকেরই বোতাম। (মিসেস হুবার্ডের দিকে ফিরে) ম্যাডাম, আমার মনে হচ্ছে কাল রাতে যখন আপনার কূপেতে কন্ডাক্টর গিয়েছিল এবং খোঁজাখুঁজি করছিল অথবা আপনার বিছানা রেডি করতে গিয়েছিল, তখন তার পোশাক থেকে এটা খসে পড়তে পারে।

​হুবা: সেসব আপনারা খুঁজে বের করুন, ওটা আপনাদের কাজ। শুনুন, আমি কাল রাতে ফিরে এসে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিলাম, পড়তে পড়তে সেটা মাথার কাছে ছোট টেবিলটায় রেখে সুইচ অফ করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কাল রাতে কন্ডাক্টর আমার ডাকে কূপেতে এসেছিল, পাশের কূপের সাথে দরজার ছিটকিনি ঠিকঠাক আছে কি না দেখেওছিল, ঝুঁকে বিছানার তলাটাও দেখেছিল—কিন্তু আমার বিছানার মাথার দিকে যায়ই নি। বোতামটা কোথায় পেয়েছি জানেন? আমার মাথার কাছে রাখা ছোট টেবিলটার তলা থেকে—এবার বুঝলেন কেন বলছি? কেন এত উতলা হচ্ছি? এবার বলুন এটাকে কী বলবেন?

​এরকুল: ঠিকই, তাহলে এটাকে এভিডেন্স হিসেবেই ধরতে হয়।

​হুবা: গোটা ব্যাপারটা ভেবে আমার কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে, শেষে কি না—

​এরকুল: (শান্তভাবে) ধন্যবাদ ম্যাডাম, এখনো পর্যন্ত আপনিই বোধহয় আমাদের সব থেকে মূল্যবান সূত্রটা দিলেন। এখন দু-একটা অন্য প্রশ্ন কি আপনাকে করা যেতে পারে?

​হুবা: মনের যা অবস্থা! ঠিক আছে করুন।

​এরকুল: ম্যাডাম, আপনি বলছিলেন না মিস্টার রাশেটকে নিয়ে আপনার আশঙ্কা হচ্ছে—কাল শোয়ার আগে আপনি ওর কূপের দিককার দরজাটায় ছিটকিনি দেওয়া আছে কি নেই, লক্ষ্য করেননি?

​হুবা: করিনি আবার?

​এরকুল: করেছিলেন? তাহলে?

​হুবা: সত্যি বলতে কী, আমি নিজে দেখিনি। ওই সুইডিশ মহিলাকে দেখতে বলেছিলাম।

​এরকুল: আপনি নিজে দেখে নিলেই পারতেন?

​হুবা: কী করে দেখব? বিছানা থেকে ভালো করে লক্ষ্যই করা যায় না, তার উপরে আমার বড় স্পঞ্জের ব্যাগটা আবার ওই দরজাতেই হুকে ঝোলানো ছিল কি না।

​এরকুল: ওনাকে আপনি কটা নাগাদ দরজার ছিটকিনিটা চেক করতে বলেছিলেন?

​হুবা: দাঁড়ান, এটা একটু ভেবে বলতে হবে। এই ধরুন সাড়ে দশটা কি পৌনে এগারোটা নাগাদ। উনি ওই সময় অ্যাসপিরিন চাইতে এসেছিলেন। বললাম, একটু দেখুন দেখি? কী যে ছাই দেখলেন!

​এরকুল: আপনি কি তখন বিছানায় ছিলেন?

​হুবা: হ্যাঁ। (হঠাৎ করেই হেসে) বড্ড বোকাসোকা মেয়ে, ভুল করে আগের কূপের দরজাটায় নক করে ফেলেছিল।

​এরকুল: মিস্টার রাশেটেরটায়?

​হুবা: তবে আর বলছি কী! কী বিচ্ছিরি কাণ্ড! কূপের দরজাগুলো বন্ধ থাকলে সব একই রকম লাগে না? এখানেও তাই হয়েছে, বেচারি বুঝতে না পেরে আমার ভেবে মিস্টার রাশেটের দরজায় নক করে ফেলেছিলেন। ওই লোকটা দরজা খুললে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাও চান। লোকটি কী অসভ্য ভাবুন, বলে কি না, ‘আপনার বয়স হয়ে গেছে তা না হলে…’

​মিসেস হুবার্ডের কথা শুনে ডাক্তারের মুখে একটু ফিচলে হাসি দেখা গেল, পরক্ষণেই মিসেস হুবার্ডের কড়া চাউনিতে সেটা মিলিয়েও গেল।

​হুবা: কী ধরনের মানুষ ও, সেটা আপনারা বুঝতেই পারছেন। (ডাক্তারের দিকে ফিরে) এটা শুনে আবার আপনার হাসি পাচ্ছে?

​ডাক্তার: সরি ম্যাম।

​এরকুল: ওনার ঘর থেকে কোনো আওয়াজ—

​হুবা: ঠিক আওয়াজ বলব না, তবে—

​এরকুল: তবে কী?

​হুবা: ওই নাক ডাকার শব্দ।

​এরকুল: নাক ডাকার আওয়াজ?

​হুবা: ভয়ংকর! ওই নাক ডাকার চোটে প্রথম রাতে দু-চোখের পাতা এক করতে পারিনি।

​এরকুল: আচ্ছা ম্যাম, যখন আপনি আপনার কূপেতে অন্য লোকের উপস্থিতি টের পান, তখনও কি মিস্টার রাশেটের নাক ডাকার আওয়াজ পাচ্ছিলেন?

​হুবা: সত্যি, এই বুদ্ধি নিয়ে আপনি গোয়েন্দাগিরি করছেন! শুনব কী করে, ততক্ষণে তো খুনটা হয়ে গেছে।

​এরকুল: ওহ্ সরি সরি, আমার প্রশ্নটাই করা উচিত হয়নি। মরে গেলে আর নাক ডাকবে কী করে, ঠিকই। যাক ম্যাম, অন্য একটা প্রসঙ্গে আসি। আপনি কি আমেরিকা কাঁপানো আর্মস্ট্রং অপহরণ কেসের কথা শুনেছেন?

​হুবা: শুনব না আবার? একটাই শুধু আমার মাথায় ঢোকে না, এমন একটা শয়তান ছাড়া পেল কীভাবে? যদি একবার হাতে পেতাম না—

​এরকুল: সে সুযোগ আর নেই ম্যাম, লোকটা মারা গেছে। কাল রাতে খুন হওয়া লোকটিই সেই শয়তান।

​হুবা: (উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে) কী! কী বলছেন কী আপনি? ওটাই সেই শয়তান—

​এরকুল: হ্যাঁ ম্যাম, মিস্টার রাশেট ওরফে কাসেট্টিই সেই জঘন্য অপহরণকারী ও খুনি, গতকাল রাতে খুন হয়েছেন।

​হুবা: বেশ হয়েছে, হওয়াই উচিত, যেমন কর্ম তেমন ফল। আজই আমি মেয়েকে লিখছি পাপটা পৃথিবী থেকে বিদেয় হয়েছে। আরে আপনাকে—হ্যাঁ আপনাকেই কাল রাতে বলছিলাম না, লোকটা সুবিধার নয়, দেখলেন তো মিলে গেল। সাধে কি আর আমার মেয়ে বলে, মায়ের যখন একবার সন্দেহ হয়েছে, কিছু না হয়ে যায় না। মিলল কি না?

​এরকুল: আর্মস্ট্রং ফ্যামিলির কারো সাথে কি আপনার জানাশোনা ছিল?

​হুবা: আরে না না, ওরা সব উঁচু তলার মানুষজন, আমাদের মতো হেঁজিপেঁজির সাথে যোগাযোগ থাকবে কীভাবে? তবে শুনেছি খুবই অভিজাত এবং ভালো ফ্যামিলি; বিশেষ করে মিসেস আর্মস্ট্রং-এর নাকি তুলনা হয় না।

​এরকুল: ঠিক আছে ম্যাডাম, অনেক তথ্য দিয়ে আপনি তদন্তের যা উপকার করলেন তা বলার নয়। ম্যাম, আপনার পুরো নামটা জানতে পারি কী?

​হুবা: হ্যাঁ, না বলার কী আছে। ক্যারোলিন মার্থা হুবার্ড।

​এরকুল: একটা কাগজে যদি দয়া করে নাম-ঠিকানাটা লিখে দেন—

​হুবা: (কাগজ টেনে নিয়ে লিখতে লিখতে) ভাবতেই পারছি না, শয়তান কাসেট্টিটা এই ট্রেনে! নজর বাবা নজর, এক ঝলকেই মালুম হয়। কী মঁসিয়ে পয়োরো? বলছিলাম না লোকটা গোলমেলে—বেরোল তো? শেষে কি এই ভাবে—

​এরকুল: ম্যাম, আপনার কি রক্তবর্ণের কোনো ড্রেসিং গাউন আছে?

​হুবা: মেয়েদের ড্রেসিং গাউন, সেসব নিয়ে আবার টানাটানি কেন? দেখুন, আমার দুটো গাউন আছে। একটা ফ্লানেলের পিঙ্ক, এই সব জার্নি-টার্নির জন্য ব্যবহার করি। অন্যটা আমার মেয়ে আমায় দিয়েছে, ওখানকার স্পেশ্যাল, পার্পল সিল্কের। এগুলো জানাও কি তদন্তের জন্য জরুরি?

​এরকুল: দেখুন ম্যাম, আমাদের কাছে তথ্য আছে যে রক্তবর্ণ কিমানো পরিহিতা কেউ একজন আপনার অথবা মিস্টার রাশেটের কূপেতে ঢুকেছিল।

​হুবা: না না, ওমন রক্তবর্ণ কিমানোয়ালি-টোয়ালি কেউ আমার কূপেতে ঢোকেনি।

​এরকুল: তাহলে কি মিস্টার রাশেটের কূপেতে?

​হুবা: (ছোট্ট করে চোখ নাচিয়ে) সেটা হলে আমি খুব একটা অবাক হব না, যা সব শুনেছি—

​এরকুল: (মিসেস হুবার্ডের কাছে কান নিয়ে গিয়ে) কাল রাতে কি মিস্টার রাশেটের কূপেতে ‘মহিলা কণ্ঠ’ পেয়েছিলেন?

​হুবা: না না, এসব আলোচনা আমার রুচিতে বাধে, কিন্তু অবাক হয়ে যাচ্ছি আপনি জানলেন কীভাবে? জানতেই যখন চাইছেন তবে শুনুন ‘পেয়েছিলাম’, ব্যাস।

​এরকুল: কিন্তু আমি যখন জানতে চাইলাম, আপনি যে বললেন শুধু নাক ডাকার শব্দ পেয়েছি।

​হুবা: সেটাও সত্যি, নাক ডাকার আওয়াজ পেয়েছিলাম তো, কিন্তু তার সাথে— (একটু ইতস্তত করে ও কপট রাগ দেখিয়ে) ছাড়ুন ওসব, ওসব নিয়ে আপনাদের সাথে আলোচনা করতে আমার রুচিতে বাধছে।

​এরকুল: কটা নাগাদ আপনি মিস্টার রাশেটের কূপেতে ‘মহিলা কণ্ঠ’ শুনতে পান?

​হুবা: সময়টা ঠিক বলতে পারব না। হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে যাওয়ায় কানে এল কোনো এক মহিলার কণ্ঠ রাশেটের কূপেতে। ভাবলাম, আচ্ছা তাহলে ঠিকই ভেবেছি, এই তোমার চরিত্র! এসব ভাবতে ভাবতে আবার কখন ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। দেখুন, বারবার বলছি এইসব ব্যাপার নিয়ে আপনাদের মতো অপরিচিত তিনজন পুরুষ মানুষের সাথে কথা বলতে আমার সংকোচ হচ্ছে, তবে—

​এরকুল: আমি ম্যাম, জানতে চাইছি মহিলা কণ্ঠ আপনি কখন শুনেছেন? আপনার ঘরে লোকের উপস্থিতি টের পাওয়ার আগে না পরে?

​হুবা: (অধৈর্য হয়ে) কী বুদ্ধির ছিরি! মড়া মানুষ মেয়েছেলে নিয়ে করবেটা কী? বলছি—

​এরকুল: সরি ম্যাম, সত্যিই তো করবেটা কী? কী সব বোকা বোকা প্রশ্ন হয়ে যাচ্ছে।

​হুবা: এখনো ভাবলেই আমার গা শিরশির করছে। ওহ্! শয়তান কাসেট্টিটার খপ্পরে পড়েছিলাম আর একটু হলেই। ওনার চরিত্র কারো জানতে বাকি আছে?

​এরকুল: (ওনার হ্যান্ডব্যাগে জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার সময় সাহায্য করতে করতে) ঠিক আছে ম্যাম, আর আমাদের তেমন কিছুই জানার নেই, সবই তো প্রায় জানিয়েই দিয়েছেন। আপনি বোধহয় তাড়াহুড়োয় আপনার রুমালটা ফেলে যাচ্ছেন। (একটা ছোট রুমাল হাতে নিয়ে হুবার্ডের দিকে বাড়িয়ে)

​হুবা: না না মঁসিয়ে পয়োরো, এটা আমার নয়। আমারটা এই ব্যাগে। (ব্যাগ দেখিয়ে)

​এরকুল: ঠিক আছে ম্যাম, ভাবলাম যদি আপনার হয়, কোণায় ‘এইচ’ অক্ষরটা এমবস করা আছে কি না—

​হুবা: এইচ—ইন্টারেস্টিং! এটা বেশ দামি, আমি এ ধরনের রুমাল ব্যবহারই করি না। তাছাড়া আমার রুমালের কোণায় থাকে সি. এম. এইচ.। এসব প্যারিসের জিনিসের, বেশ সরেস—এসব বড়লোকের দেমাকি ফুলটুসিরা হাতে নিয়ে ফান্টুসি করে। আমাদের মতো বুড়িদের নাক মোছার জন্য এত দামি রুমালের দরকারটাই বা কী? যত্তোসব—

gemini generated image 80bqgo80bqgo80bq

​বিদায় না নিয়েই মিসেস হুবার্ড গটগট করে ডাইনিং কোচ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন

(​ক্রমশঃ)

আগের পর্বের লিঙ্ক মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস (পর্ব-১১)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top