এরপর একজন সাদাসিধা ইংরেজ ভদ্রলোক ডাইনিং কোচে প্রবেশ করলেন। টেবিলের কাছে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়েই রইলেন।
এরকুল: বসুন, আপনি সম্ভবতঃ মিঃ রাশেটের পরিচারক। হ্যাঁ, স্যার।
এরকুল: আপনার নাম? এডওয়ার্ড হেনরি মাস্টারম্যান।
এরকুল: বয়স?
মাস্টারম্যান: ৩৯।
এরকুল: ঠিকানা?
মাস্টারম্যান : ২১ ফেরিয়ার স্ট্রিট, ক্লার্কেনওয়েল।
এরকুল: আপনি কি শুনেছেন যে, মিঃ রাশেট খুন হয়েছেন?
মাস্টারম্যান: হ্যাঁ, খুবই মর্মান্তিক।
এরকুল: কাল ঠিক কটায় আপনি ওনার ঘরে গিয়েছিলেন? তারপর যা যা ঘটেছিল পরপর বলে যান।
মাস্টারম্যান: (একটু ভেবে) প্রত্যেক দিন যেমন যাই ডিনারের পর কালও তেমনই গিয়েছিলাম। টুকটাক প্রয়োজনীয় যা চেয়েছিলেন সবই দিয়েছিলাম।
এরকুল: কাল রাতে ঠিক কী কী কাজ আপনি করেছিলেন মনে করে বলুন।
মাস্টারম্যান: ওনার জামাকাপড় গোছগাছ করে রাখলাম। ফলস দাঁতগুলো খুলে দিয়েছিলেন সেগুলো প্লেটে জলে ভিজিয়ে রেখেছিলাম। তাছাড়া—এই রকমই টুকটাক যা কাজ বলেছিলেন, করেছিলাম।
এরকুল: অন্য দিনের মতোই কি কাল ওনার মেজাজ ছিল, না সামথিং রং?
মাস্টারম্যান: মেজাজ—, ওনাকে কেমন যেন উদ্বিগ্ন লাগছিল।
এরকুল: কী নিয়ে কিছু আন্দাজ করতে পারেন?

মাস্টারম্যান: আমি যখন ওনার ক্যুপেতে ঢুকি তখন উনি কোনো একটা চিঠি পড়ছিলেন। উনি আমায় জিজ্ঞাসা করলেন এই চিঠির ব্যাপারে আমি কিছু জানি কি না, বিশেষ করে জানতে চাইছিলেন চিঠিটা ওনার ক্যুপেতে কীভাবে এল। চিঠিটা পড়ার পরই ওনার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। প্রায় সব ব্যাপারেই খ্যাচখ্যাচ করছিলেন।
এরকুল: এই রকম মেজাজ খারাপ কি উনি মাঝে মাঝেই করে থাকেন?
মাস্টারম্যান: হ্যাঁ আগেও লক্ষ্য করেছি উনি অল্পেই মেজাজ হারান।
এরকুল: মিঃ রাশেটকে কি কখনো ঘুমের ওষুধ নিতে দেখেছেন?
এই সময় ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন আগ্রহভরে ওদের দিকে সরে এলেন।
মাস্টারম্যান: হ্যাঁ, ট্রেনে ট্রাভেল করার সময় ঘুমের ওষুধ অবশ্যই নেন। ওষুধ না হলে ওনার নাকি ঘুমের ব্যাঘাত হয়।
এরকুল: কী ধরনের ড্রাগ উনি নেন, কোনো ধারণা আছে?
মাস্টারম্যান: নাম তো জানি না স্যার, তবে শিশির গায়ে লেখা দেখেছি ‘ঘুমের ওষুধ, রাত্রে শোয়ার আগে নিতে হবে’।
এরকুল: গত রাতেও কি ঘুমের ওষুধ নিয়েছিলেন?
মাস্টারম্যান: হ্যাঁ নিয়েছিলেন, আমিই শিশি থেকে পরিমাপ মতো গ্লাসে ঢেলে টেবিলের উপর রেখেছিলাম।
এরকুল: তাহলে আপনি গ্লাস থেকে ওনাকে খেতে দেখেননি।
মাস্টারম্যান: না স্যার।
এরকুল: তারপর আপনি কী করলেন?
মাস্টারম্যান: এরপর আমি জিজ্ঞাসা করলাম আর কিছু লাগবে কি না, আরও জানতে চাইলাম সকালে কটায় ওনাকে ডেকে তুলব। বললেন দরকার নেই, আমি বেল না দিলে আসার দরকার নেই।
এরকুল: অন্য দিনও কি এমনটাই করেন?
মাস্টারম্যান: এটাই ওনার রুটিন। উনি সকালে ঘুম থেকে উঠে বেল দিয়ে কন্ডাক্টরকে ডেকে পাঠান, আর কন্ডাক্টর আমায় ডেকে দেন।
এরকুল: আর্লি না লেট রাইজার?
মাস্টারম্যান: টাইমের কোনো ঠিক নেই, কোনো দিন সকালেই উঠে ব্রেকফাস্টে যান আবার কোনো দিন লাঞ্চের আগে ওনার ঘুমই ভাঙে না।
এরকুল: সকালে যখন কোনো ডাক এল না আপনার কোনো চিন্তাই হয়নি, তাই তো?
মাস্টারম্যান: একেবারেই না, এরকম প্রায়ই ঘটে।
এরকুল: আপনি কি জানেন আপনার মনিবের প্রচুর শত্রু ছিল?
মাস্টারম্যান: (নিরাসক্তভাবে) জানতাম।
এরকুল: কীভাবে জানলেন?
মাস্টারম্যান: এই সংক্রান্ত কোনো চিঠি নিয়ে উনি ম্যাককুইনের সাথে আলোচনা করছিলেন—আমার কানে এসেছিল।
এরকুল: মিঃ রাশেটের সাথে কি আপনার কোনো রকম ইমোশনাল বন্ডিং?
মাস্টারম্যান: (নিরাসক্ত ভাবেই) মনিব-চাকরেরই সম্পর্ক, এর বাইরে কিছু নয়।
এরকুল: তাহলে কী দাঁড়াল? আপনি ওনাকে পছন্দ করতেন না?
মাস্টারম্যান: কিছু মনে যদি না করেন—পেটের দায়ে চাকরি করলেও আমি আমেরিকানদের তেমন পছন্দ করি না।
এরকুল: আপনি কখনো আমেরিকা গেছেন?
মাস্টারম্যান: না স্যার, যাইনি।
এরকুল: মনে করতে পারেন, পেপার-টেপারে কখনো আর্মস্ট্রং কিডন্যাপিং কেস নিয়ে কোনো সংবাদ পড়েছিলেন?
মাস্টারম্যান: (মুখটা একটু উজ্জ্বল হলো) হ্যাঁ ওই একটা ছোট্ট মেয়ের অপহরণ সংক্রান্ত কি? খুবই দুঃখজনক ঘটনা।
এরকুল: আপনি কি জানেন আপনার মনিব—মিঃ রাশেট ওই কেসের মূল পাণ্ডা?
মাস্টারম্যান: (একটু উত্তেজিত হয়ে) অ্যাঁ বলেন কী? এতো বিশ্বাসই হয় না।
এরকুল: অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। যাই হোক রুটিনমাফিক সবাইকেই জানতে চাইছি, বলুন কাল মিঃ রাশেটের ক্যুপে থেকে বের হয়ে আপনি কোথায় কোথায় গেলেন আর কী কী করলেন?
মাস্টারম্যান: মিঃ রাশেট ম্যাককুইনকে ডেকে দিতে বলেছিলেন, তাই আমি ওনার ক্যুপেতে গেলাম এবং স্যারের ঘর ডেকে দিলাম। তারপর নিজের ক্যুপেতে ফিরে কিছু বই নাড়াচাড়া করছিলাম।
এরকুল: আপনার ক্যুপের নং?
এরকুল: (সামনের টেবিলে মেলে রাখা ক্যুপের চার্টের দিকে তাকিয়ে) আচ্ছা, কত নং বার্থ আপনার?
মাস্টারম্যান: সেকেন্ড ক্লাসের একেবারে শেষেরটা।
মাস্টারম্যান: নিচের বার্থ।
এরকুল: তাহলে দেখছি চার নং।
মাস্টারম্যান: হ্যাঁ স্যার।
এরকুল: আপনার ক্যুপেতে আর কোনো যাত্রী আছে?
মাস্টারম্যান: একজন ইতালীয়।
এরকুল: উনি কি ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতে পারেন?
মাস্টারম্যান: পারেন তবে খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন। আমেরিকার শিকাগো না কোথায় থাকেন।
এরকুল: আলাপ-টালাপ হয়েছে?
মাস্টারম্যান: না স্যার, ওই একটু-আধটু, আমি নিজের মতো পড়তেই বেশি পছন্দ করি।
এরকুল: (গোমড়া মুখো নাক উঁচু সাহেব আর ফুর্তিবাজ ইতালীয়র সহাবস্থান কল্পনা করে মনে মনে হেসে)—আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে, কী কী পড়লেন এ কদিন?
মাস্টারম্যান: এখন, এখন আমি পড়ছি মিসেস আরবেলা রিচার্ডসনের ‘লাভ’স ক্যাপটিভ’।
এরকুল: কেমন লাগছে?
মাস্টারম্যান: দুর্ধর্ষ।
এরকুল: ঠিক আছে, এবার কাজের কথায় ফেরা যাক। তো আপনি নিজের ক্যুপেতে ফিরলেন এবং উপন্যাসে মনোযোগ দিলেন, কতক্ষণ পড়লেন?
মাস্টারম্যান: এই ধরুন সাড়ে দশটা নাগাদ ইতালীয়টি উপরের বার্থে উঠে গেলেন আর কন্ডাক্টর আমার বিছানা রেডি করে দিলেন।
এরকুল: এরপরই আপনি শুয়ে পড়লেন?
মাস্টারম্যান: শুয়ে পড়লাম বটে কিন্তু ঘুমাতে পারলাম না।
এরকুল: কেন ঘুমের আবার কী সমস্যা হলো?
মাস্টারম্যান: প্রচণ্ড দাঁতের ব্যথা, সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারিনি।
এরকুল: ওহ্! দাঁত ব্যথা, বড় সাংঘাতিক।
মাস্টারম্যান: বড়ই যন্ত্রণাদায়ক স্যার।
এরকুল: কিছু ওষুধপত্র কি নিলেন?

মাস্টারম্যান: কী আর করব? আমার কাছে লবঙ্গের তেল ছিল তাই লাগালাম। একটু কমল বটে, তবে ঘুম এল না। নিজের বার্থের লাইটটা জ্বালিয়ে বই পড়াটা চালিয়েই গেলাম, যদি ব্যথাটা ভুলে থাকা যায়।
এরকুল: ঘুম কি একেবারেই এল না?
মাস্টারম্যান: ভোরের দিকে ওই চারটে-টারটে হবে বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
এরকুল: আপনার সঙ্গী?
মাস্টারম্যান: ওই ইতালীয়টা? ও তো শুয়েই নাক ডাকতে শুরু করে দিল।
এরকুল: রাতে কি ও ক্যুপে ছেড়ে বেরিয়েছিল?
মাস্টারম্যান: না না।
এরকুল: আপনি?
মাস্টারম্যান: আমিও না।
এরকুল: রাত্রে অস্বাভাবিক কোনো শব্দ-টব্দ কানে গিয়েছিল?
মাস্টারম্যান: তেমন কিছু—না না কানে আসেনি। ট্রেন দাঁড়িয়েছিল, চারিদিক নিস্তব্ধ।
এরকুল: (দু-চার মিনিট চুপচাপ থেকে) আর কোনো কিছু কি আপনার অস্বাভাবিক লেগেছিল?
মাস্টারম্যান: আর কিছু—সরি স্যার, অস্বাভাবিক আর কিছু তো নজরে আসেনি।
এরকুল: একটা কথা—মিঃ রাশেটের এর সাথে ওনার সেক্রেটারি ম্যাককুইনের কোনো ঝগড়া বা মনোমালিন্য কখনো আপনার নজরে এসেছে?
মাস্টারম্যান: না না স্যার, তেমন কখনো কিছু আমার নজরে পড়েনি। তাছাড়া ম্যাককুইন অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র স্বভাবের ছেলে।
এরকুল: মিঃ রাশেটের এখানে কাজের আগে আপনি কোথায় কাজ করতেন?
মাস্টারম্যান: এর আগে আমি স্যার হেনরি টমলিনসনের ওখানে কাজ করতাম, গ্রসভেনর স্কোয়ার।
এরকুল: ওখানে ছেড়ে দিলেন কেন?
মাস্টারম্যান: উনি আমাকে খুবই পছন্দ করতেন, কিন্তু হঠাৎই পূর্ব আফ্রিকা চলে গেলেন, তাই বাধ্য হলাম।
এরকুল: মিঃ রাশেটের সাথে কত দিন আছেন?
মাস্টারম্যান: মাস নয়েক হবে, স্যার।
এরকুল: ওকে, অনেক ধন্যবাদ। আচ্ছা আপনি কি পাইপ খান?
মাস্টারম্যান: না স্যার আমি শুধু সিগারেটই, তাও কালেভদ্রে।
এরকুল: ঠিক আছে, আপনি আপাতত আসতে পারেন।

মাস্টারম্যান: (একটু ইতস্তত করে) স্যার একটা কথা বলছিলাম। ওই আমেরিকান ভদ্রমহিলা খুব উত্তেজিত হয়ে বলাবলি করছিলেন, এই খুনের অনেক তথ্যই নাকি ওনার কাছে আছে। আপনাদের কাছে আসার জন্য খুবই হুড়োহুড়ি করছেন।
এরকুল: (স্মিত হেসে) ঠিক আছে, আপনার পরই ওনাকে ডেকে নিচ্ছি।
মাস্টারম্যান: আমি কি ওনাকে আসতে বলব? সেই থেকে কন্ডাক্টরের মাথা খেয়ে নিচ্ছেন, যাতে ওনাকে সাক্ষ্য দিতে আসতে বলা হয়। ওনার কাছে নাকি এই ব্যাপারে প্রচুর তথ্য আছে।
এরকুল: ঠিক আছে পাঠিয়ে দিন, দেখি ওনার কাছে কী তথ্য আছে।
আগের পর্বঃ মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব- ১০



