থতমত খেয়ে সে বলল—কেন পারব না? নিশ্চয়ই পারব। কিন্তু ওষুধের দোকান করতে গেলে কী কী সব লাগে বলে শুনেছি যে!
এবারে নীলাদ্রি ওকে বলল—সে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুমি শুধু দোকান চালাবে কি না, বলো! ফলের দোকানটা না হয় কাউকে লিজ দিয়ে দেবে।
—ওটা নিয়ে চিন্তা করি না। তোমাদের কাছাকাছি থাকতে পারব, এটাই তো অনেক।
কাবেরি এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। এবারে বলল—আমিও অফ ডিউটিতে দোকানে বসতে পারি। যদি আমাকে সুযোগ দেন আপনারা।
—এ তো খুব ভাল কথা। তুমি দেখলে সবচেয়ে ভাল। সোমেনের থেকে ওষুধের ব্যাপারটা তুমি ভাল বুঝবে।
দেবাশিষের কথা শেষ হওয়া মাত্রই সুমনা বলল—আমার একটা কথা বলার ছিল।
সবাই তার দিকে তাকাল। তুহিনা বলল—তোকেও কি অনুমতি দিতে হবে?
সামান্য হেসে সুমনা বলল—না, তা ঠিক নয়।
—তাহলে বলে ফেল।
—দেবাদা বলল, ওখানে কুড়ি কাঠা জায়গা আছে। এতটা জায়গায় শুধু হসপিটাল না করে কিছুটা জায়গা প্রমোটারকে বিক্রি করে দিলে হয় না? ফর এক্সামপল, দশ কাঠা। সেখানে প্রমোটারের থেকে একটা ফোর বিএইচকে ফ্ল্যাট নেওয়া যায়। দেবাদার তো এখানে মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠাঁই নেই। ওটা দেবাদার নামে হত। বাকি জায়গাতে হসপিটাল, ওষুধের দোকান হোক, না হয়। জায়গাটা বিক্রি হলে হসপিটাল তৈরির খরচও অনেকটা উঠে আসবে।
দেবাশিষ আর কত অবাক হবে? সুমনা এত পরিণত হয়ে গেছে, সে ভাবতেই পারছে না। যে প্রপোজাল সে দিল, তা একেবারে পরিণত চিন্তার ফসল। সবাই তখন সুমনার দিকেই তাকিয়ে আছে। হয়তো দেবাশিষের মতো সবার চিন্তা একই রাস্তায় হাঁটছে। তুহিনা বলেই ফেলল—তোর এত পাকা মাথা কবে থেকে হল রে?
সুমনা আড়চোখে একবার দেবাশিষের দিকে তাকাল। দেবাশিষ তখনও সুমনার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে হালকা হাসি।
নীলাদ্রি সুমনাকে সমর্থন করে বলল—দারুণ বুদ্ধি। ভাল প্রপোজাল। আর যদি প্রমোটারকে দিতেই হয়, তাহলে হোয়াই নট প্যাটেল? ও যখন আগ্রহী, তখন আমরা ওর ইন্টারেস্টকে ক্যাপিটালাইজ করতে পারি।
—নিশ্চয়ই পারি। তবে বাজার যাচাই করা দরকার। সোমেন পারবি না?
সৌরাশিষ সোমেনকে বলতেই সে রাজি। বলল—তোমরা বললে বাজার দেখে নেব আমি। তবে প্যাটেলই বেশি দাম দেবে। প্রথমত ও লোকাল লোক। দ্বিতীয়ত, বাড়িটা ভেঙে পড়ার পিছনে যে ওর হাত ছিল, সেটা আমি ওকে জানাব। প্রমাণের কথা বলব। তাহলেই ভয়ে ও আমার কথা শুনবে। এটাই ওর শাস্তি। ওকে বেশি দাম দিয়ে জায়গাটা নিতে হবে। ওটা আমার উপর ছেড়ে দাও দেবাদা।
সোমেনের কথায় সবাই হেসে উঠল। সৌরাশিষ সোমেনকে বলল—আমি যতদিন না এনগেজ হচ্ছি, ততদিন মোটামুটি ফ্রি। কাগজপত্র তৈরি করার ব্যাপারে তুই দায়িত্ব নে। যখন যেরকম দরকার হবে, আমাকে বলিস। দাদা, তাহলে এইরকমই হোক।
দেবাশিষ তখন অন্যকিছু ভাবছিল। সৌরাশিষকে ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
দিল্লিতে দেবাশিষকে ফিরে যেতে হবে। অনেকদিন হয়ে গেল সে এসেছে। অফিস থেকে বারবার ফোন আসছে। ফেরার আগে একবার সুমনার সঙ্গে দেখা হলে ভাল হত। ওর কথা মনে এলেই নিজেকে বড্ড ছোটো লাগছে তার। একটা মেয়ে তার কিশোরীবেলা থেকে তাকে ভালবেসে এসেছে, তা প্রকাশও করেছে; অথচ সে মেয়েটার ভালবাসার কোনো মূল্য দেয়নি। তবুও মেয়েটা তার ভালর কথাই ভেবে যাচ্ছে। বাড়িটা ভেঙে যাওয়ায় দেবাশিষের বর্ধমানে যে মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই রইল না, তাও সেই প্রথম প্রকাশ করেছে। সেদিন মা সুমনার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছে। ওদের মধ্যে কী কথা হয়েছে, দেবাশিষ জানে না। তবে যাওয়ার আগে সুমনার সঙ্গে একবার দেখা করতেই হবে।
সুমনাদের বাড়িতে সকালেই পৌঁছে গেল দেবাশিষ। সোমেন তার স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে কয়েকদিন পরেই এই বাড়িতে চলে আসবে। দোতলার একটা ঘর পরিষ্কার করিয়ে রেখেছে সুমনার বাবা। ড্রইংরুমে গিয়ে বসল দেবাশিষ। সুমনা তখন ওখানেই বসে পেপার পড়ছিল। দেবাশিষকে দেখে পেপার পড়তে পড়তেই বলল—জানতাম, তুমি আসবে। তোমাকে আগেই একটা কথা বলি দেবাদা।
—বল।
—তুমি তো সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরিটা ছেড়ে এসে এখানকার কনস্ট্রাকশানের কাজগুলো তুমি দাঁড়িয়ে থেকে করাতে পার না?
—ভাল বলেছিস। ভেবে দেখব তোর কথা। আমারও আর দিল্লিতে ভাল লাগছে না। এবারে ঘরে ফিরতে হবে।
—জানি, তুমি এখন ফিরতে চাও। কেন, তাও জানি।
দেবাশিষ হেসে বলল—তুই আমাকে আমার থেকে বেশি বুঝিস।
সুমনা পেপার থেকে মুখ তুলে বলল—এই ক’দিনে জানলে?
—একদমই তাই। আগে যদি বুঝতাম রে!
—শোনো দেবাদা, জেম্মা আমাকে কিছু বলেছিল। আমি রাজি হইনি।
—কী বলেছিল রে?
একটু চুপ করে থেকে সুমনা বলল—আমাদের বিয়ের কথা।
দেবাশিষ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—কেন রাজি হোসনি?
—জানো তো, আগেকার দিনে বিয়ে করাকে বলা হত ‘ঘর বাঁধা’। আমাদের তো ঘরটাই নেই গো! যে ঘরটার জন্যে আমি তোমাকে আমার স্বামী বলে মেনেছিলাম, সেই ঘরটাই আজ নেই। সেই বারান্দাটা, সেই কেষ্টসায়রের জলে চাঁদের আলোর ঝিকিমিকি, সব হারিয়ে গেছে। এটা ঠিক যে, আমি এখনও তোমাকে ছাড়া আর কাউকেই আমার জীবনে মানি না। কিন্তু ঘর কোথায় গো?
সুমনা কী বলতে চাইছে, দেবাশিষ কিছুই বুঝতে পারছে না। হাঁদার মতো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সুমনা বলে চলল—যতদিন আমার শরীরে প্রাণ আছে, ততদিন আমি তোমার হয়েই থাকব। যদি কোনোদিন মনে হয়, তোমার সঙ্গে বাঁধার মতো ঘর পেয়েছি, সেইদিনই আমি বিয়ের কথা ভাবব।
কথাগুলো বলে সুমনা সোফা থেকে উঠে চলে গেল। দেবাশিষ হতভম্বের মতো ড্রইংরুমে বসে রইল। তার মাথার ভেতরটায় নিকষ অন্ধকার। অনেক দূরে একটা আলোর বিন্দু যেন স্থির হয়ে আছে। আর দেবাশিষ সেই আলোর বিন্দুটার দিকে অপলকে তাকিয়ে আছে। ঐ আলোর বিন্দুটাতেই তাকে পৌঁছাতে হবে। পৌঁছাতেই হবে।
(শেষ)



