মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব- ১০


1

পোয়ারো মিনিট কয়েক গভীর চিন্তায় ডুবে রইলেন। এরপর বললেন—

পোয়ারো: মিঃ রাশেটের সচিব ম্যাককুইনের সাথে আর একবার কথা বলাটা জরুরি, দু-একটা জায়গা— (একটু থেমে) ওনাকেই ডাকা হোক।

বুঁ :  ঠিক আছে তাই হোক।

​ম্যাককুইন ডাক পেয়েই এসে হাজির হলো।

ম্যাককুইন: তদন্তের কিছু এগোল?

পোয়ারো: খারাপ নয়। মিঃ রাশেটের আসল পরিচয় আমরা জানতে পেরেছি।

ম্যাককুইন: তাই নাকি? এটা ওনার আসল পরিচয় নয়?

পোয়ারো: এটাই মজার। উনি আসলে কাসেট্রি, রাশেট নামেই দেশ-বিদেশে ঘোরাঘুরি করতেন। হ্যাঁ, কুখ্যাত আমেরিকান কিডন্যাপার কাসেট্রি। উনিই আমেরিকা তোলপাড় করা ডেইজি আর্মস্ট্রং অপহরণ ও হত্যা মামলার মূল আসামি।

ম্যাককুইন: (মুখে প্রবল বিস্ময় ও রাগের মিশ্রণ ফুটে উঠল) এটাই সেই শয়তানটা!

পোয়ারো: ওর সম্পর্কে আর কোনো ধারণা?

ম্যাককুইন: কোনোই ধারণা নেই। যদি জানতাম তবে না খেয়ে মরলেও শয়তানটার গোলামি করতাম না।

পোয়ারো: ব্যাপারটা নিয়ে আপনি এতটা সেনসিটিভ?

ম্যাককুইন: কারণও আছে। আমার বাবা ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটর, এই কেসটায় উনি অ্যাটর্নি ছিলেন। এই কেসের ব্যাপারেই মিসেস আর্মস্ট্রংকে বারকয়েক বাবার চেম্বারে আসতে দেখেছি। চমৎকার মহিলা ছিলেন।

(প্রবল রাগের অভিব্যক্তিতে) যা হয়েছে বেশ হয়েছে, এই ধরনের মানুষের বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই নেই।

পোয়ারো: মনে হচ্ছে, সুযোগ থাকলে আপনিই হয়তো খুনটা করে বসতেন।

ম্যাককুইন: আমি— আমি (একটু থেমে) ক্ষমা করবেন, হঠাৎ উত্তেজনাটা চাপতে পারিনি।

2

পোয়ারো: না, না, আপনার চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বরঞ্চ শুধুমাত্র মনিব বলে এই রকম একটা লোকের মৃত্যুতে অস্বাভাবিক রকমের দুঃখিত হয়ে পড়লেই আমার সন্দেহ বেশি হতো।

ম্যাককুইন: নিজে বাঁচার জন্য বলছি না, তবে ঘৃণা থাকলেও এসব খুনটুন আমার দ্বারা হতো না। কিছু যদি মনে না করেন নিছক কৌতূহল তাই জানতে চাইছি, আপনারা এই তথ্যটা আবিষ্কার করলেন কীভাবে?

পোয়ারো: একটা চিঠির ছোট্ট একটা ছেঁড়া অংশ থেকে।

ম্যাককুইন: আপনি নিশ্চিত? ওটা বুড়োটারই কোনো কারসাজি নয় তো?

পোয়ারো: সেটা হতেই পারে, তবে ওটা সত্যি না মিথ্যা সেটা প্রমাণের দায় আমাদের।

(ম্যাককুইন গোলগোল চোখ করে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে রইল।)

যাক, এখন আমার কিছু রুটিন কাজ আছে, সেটা সেরে নিই। ট্রেন ছাড়ার পর থেকে গতকাল রাত অবধি সকলের গতিবিধির একটা খতিয়ান তদন্তের স্বার্থে আমাদের জানতে হবে।

ম্যাককুইন: অবশ্যই স্যার, তদন্তে যা সহযোগিতা লাগে আমি অবশ্যই তা করব।

পোয়ারো: (স্মিত হেসে) কুপের নং ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করার কোনো মানে হয় না। গতকাল সন্ধ্যা অবধি আমি ও আপনি একই কুপেতে ছিলাম, সেকেন্ড ক্লাস, বার্থ নং ৬ ও ৭। এরপর আমি চলে আসি, তারপর আপনি একাই ওটায় ছিলেন, তাই না?

ম্যাককুইন: ঠিক তাই।

পোয়ারো: আপনি শুধু বলুন ডাইনিং কোচ থেকে বেরিয়ে আপনি কোথায় কোথায় গেলেন এবং কার কার সাথে কাটালেন?

ম্যাককুইন: ডিনারের পর ফিরে গেলাম নিজের কুপেতে। কিছুক্ষণ বই নাড়াচাড়াও করলাম। এরপর বেলগ্রেড স্টেশনে খানিক নেমেওছিলাম, যা ঠান্ডা ট্রেনে আবার উঠেও পড়লাম। তখনই আমার পাশের কুপের ব্রিটিশ মহিলার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তাও হলো। এরপর তো কর্নেল সাহেবের সাথে করিডোরে আড্ডা মারছিলাম, আপনার সাথে তখনই দেখা হলো। সেখান থেকেই মিঃ রাশেটের কুপেতে গেলাম, চিঠিচাপাটির কাজ ছিল, সে কথা আপনাকে আগেই জানিয়েছি। ওনার কুপে থেকে ফেরার সময় দেখি কর্নেল সাহেব তখনো করিডোরে, ওনার কুপে বিছানাপত্র রেডি হচ্ছিল। আমার কুপেতেই আড্ডার জন্য আসতে বললাম। সেখানেই আমরা ড্রিঙ্কস নিয়ে বসি, মূলত ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স, ভারতে ব্রিটিশ শাসন, বিশ্ব এবং ওয়ালস্ট্রিটের অর্থনৈতিক সংকট ইত্যাদি নিয়েই আড্ডা আলোচনায় মজে ছিলাম। এমনিতে ইংরেজদের আমি খুব একটা পছন্দ করি না, তবে আবার্থনট অন্য রকম, সেই কারণেই হয়তো আড্ডা জমেছিল।

পোয়ারো: মনে করতে পারেন উনি কখন আপনার কুপে ছেড়ে বেরিয়েছিলেন?

ম্যাককুইন: দেরি হয়েছিল, তা ধরুন দুটো তো বাজবেই, যতদূর মনে পড়ছে।

পোয়ারো: তখন ট্রেন দাঁড়িয়েছিল না চলছিল?

ম্যাককুইন: ওহ হ্যাঁ, ট্রেন দাঁড়িয়েছিল। প্রথমে একটু অবাকই হই, বাইরে তাকিয়ে দেখি প্রচুর বরফ জমে আছে, কিন্তু তখন মনেই হয়নি ব্যাপারটা এত সিরিয়াস হয়ে উঠবে।

পোয়ারো: কর্নেল আপনার কুপে ছেড়ে কোন দিকে গিয়েছিলেন, মনে করতে পারেন?

ম্যাককুইন: উনি সোজাসুজিই নিজের কুপেতে গেলেন। আমি কন্ডাক্টরকে আমার বিছানা রেডি করে দিতে বললাম।

পোয়ারো: কন্ডাক্টর যখন আপনার বিছানা রেডি করছিলেন আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

ম্যাককুইন: আমি, আমি আর কী করব, করিডোরেই ছিলাম। সেখানেই দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট শেষ করলাম।

3

পোয়ারো: তারপর?

ম্যাককুইন: তারপর— তারপর সোজা বিছানায় এবং এক ঘুমে সকাল।

পোয়ারো: সন্ধ্যার দিকে কি আপনি আর কখনো ট্রেন ছেড়ে নেমেছিলেন?

ম্যাককুইন: কর্নেল আর আমি একবার সন্ধ্যায় ট্রেন ছেড়ে হাত-পায়ের আড় ভাঙতে নেমেছিলাম— কী যেন ছিল জায়গাটার নাম (একটু মনে করে) ওঃ হ্যাঁ, ভিনকোভি। ঠান্ডার চোটে একটু হাঁটাহাঁটি করেই ট্রেনে আবারও উঠে আসতে বাধ্য হই।

পোয়ারো: কোন দরজাটা দিয়ে উঠেছিলেন মনে আছে?

ম্যাককুইন: আমাদের কুপেগুলোর কাছেরটা দিয়েই—

পোয়ারো: ডাইনিং কোচের পাশেরটা।

ম্যাককুইন: তাইই হবে।

পোয়ারো: মনে করতে পারেন ওর ছিটকিনি ভিতর থেকে লাগানো ছিল কি না?

ম্যাককুইন: (একটু ভেবে) ছিটকিনি, মনে হয় লাগানোই ছিল। হ্যান্ডেলের ওপর একটা লোহার রডের মতো। ওটা লাগানোরই কি কথা আপনি জানতে চাইছেন?

পোয়ারো: আমি জানতে চাইছি, ভিনকোভিতে ট্রেনে ওঠার পর আপনি কি ভিতর থেকে দরজাটা ছিটকিনি দিয়ে আটকেছিলেন?

ম্যাককুইন: ওঠার পরে দরজা— সঠিক মনে করতে পারছি না। আমিই সবশেষে উঠেছি মনে করতে পারছি না, তেমন কিছু করেছি কি না।

(হঠাৎ করেই) ট্রেনের এই দরজা খোলা বা বন্ধ থাকাটা কি এই কেসে খুব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু?

পোয়ারো: হতেই পারে, যাগগে আপনি যখন সঠিকভাবে মনে করতে পারছেন না। আচ্ছা, আপনারা দুজন যখন আড্ডা মারছিলেন তখন করিডোরের দিকে দরজা কি খোলা ছিল?

ম্যাককুইন: (মাথা নেড়ে) খোলাই ছিল।

পোয়ারো: একটু মনে করে বলুন দেখি, যতক্ষণ আপনারা বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কাউকে আপনার কুপের দরজার সামনে দিয়ে করিডোর ধরে যেতে বা আসতে দেখেছিলেন?

ম্যাককুইন: (একটু কপাল কুঁচকে চিন্তা করে) একবার কন্ডাক্টরকে দেখলাম ডাইনিং কোচের দিক থেকে আসতে, আর একবার এক মহিলাকে দেখলাম অন্য দিকে— মানে ডাইনিং কোচের দিকে যেতে।

পোয়ারো: কোন মহিলাকে?

ম্যাককুইন: সেটা বলতে পারব না। কারণ কর্নেল আবার্থনটের সাথে তর্কে এতো মশগুল ছিলাম যে ভালো করে লক্ষ্যই করিনি। মনে হলো গাঢ় লাল পোশাক পরে কেউ একজন দরজার সামনে দিয়ে ডাইনিং কোচের দিকে চলে গেল। তাছাড়া আমি যে দিকে বসেছিলাম সেখান থেকে তার পিছনের দিকটাই চোখে পড়েছিল।

পোয়ারো: (মাথা নেড়ে) সেটা সম্ভব, যাই হোক টয়লেট যাচ্ছিল বোধ হয়?

ম্যাককুইন: টয়লেট, হবে হয়তো।

পোয়ারো: তাকে ফিরতে দেখেছিলেন?

ম্যাককুইন: ফিরতে— না, খেয়াল করিনি। ওদিকে যাওয়ার জায়গা আর কোথায়, ফিরেছিল নির্ঘাত।

পোয়ারো: অনেকক্ষণ আপনাকে আটকে রেখেছি, আর একটা প্রশ্ন? আপনি কি পাইপ খান?

ম্যাককুইন: না স্যার, আমার সিগারেটেই চলে।

পোয়ারো: (একটু থেমে) ঠিক আছে, আপাতত এই। আপনি এরপর মিঃ রাশেটের পরিচারককে ডেকে দিন। আচ্ছা, আপনারা যখন বের হন দুজনেই কি বরাবর সেকেন্ড ক্লাসেই ট্রাভেল করেন?

ম্যাককুইন: পরিচারক সেকেন্ড ক্লাসেই করে থাকে, আমি সচরাচর ফার্স্ট ক্লাসে ওনার সাথেই থাকি। বেশিরভাগ সময়ই চেষ্টা করা হয় যাতে মিঃ রাশেটের পাশের কুপেতেই আমার ব্যবস্থা হয়। লাগেজের সিংহভাগই থাকে আমার কুপেতে উনি ঝাড়া হাত-পা ট্রাভেল করতেই ভালোবাসেন। ভিড় থাকায় এইবার সেটা আর সম্ভব হয়নি।

পোয়ারো: বুঝেছি, ঠিক আছে আপনি এবার আসতে পারেন।

ম্যাককুইন ডাইনিং কোচ ছেড়ে চলে গেলেন।

ক্রমশঃ

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব-৯


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top