পাপ- পর্ব ১১

traditional indian home

সময় থেমে থাকে না তার নিজের ছন্দেই এগোতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সব ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যায় না কিন্তু একটা প্রলেপ তো পড়ে। কোন শোক কোন দিনই চিরস্থায়ী হয় না, কোন ভয় সর্বক্ষণ হৃদয়ের ওপরে পাষণের মত চেপে বসে থাকতে পারে না। প্রচন্ড ভয়ের মধ্যে থেকেও মানুষ রান্নাবান্না করে, খাওয়া দাওয়া করে, হাসি ঠাট্টা করে। নিজের নিজের ছোট ছোট স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি করে। বিয়ে থা করে, গণ্ডা গণ্ডা সন্তানের জন্ম দেয়।

শাশুড়ী মারা গেলে আমার কী হবে, মাথা গোঁজার জন্য কোথায় ঠাঁই খুঁজেতে হবে রোজকার জীবন যাপন, প্রচন্ড ব্যস্ততা আর কাজকর্মে সে আশঙ্কা মনের গভীরে কোথাও লুকিয়ে পড়ল। আজকাল শুতে যেতে দেরি হতো আবার খুব ভোরে উঠে কাজে লেগে পড়তাম। কঙ্কা যে মানুষটাকে প্রায় বহন করে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো আর অন্য সব করাতো এখন অর্ধমৃত জ্ঞানহীন সেই মানুষটা পায়খানা পেচ্ছাপ বিছানাতেই সব করছিল। স্বাভাবিক ভাবেই কঙ্কার সঙ্গে আমার কাজও বেড়ে গিয়েছিল। এর মধ্যেই একটা নতুন বিপদ হলো প্রায় অচেতন সে রোগীর কাছে কঙ্কা এলেই দূর্বোধ্য শব্দ বের করে যেন আপত্তি জানাতে শুরু করে দিতে লাগলো। তাঁর স্মৃতির গভীরের কোন তিক্ত ঘটনা বা কোনো শারীরিক অসুবিধে থেকে এমনটা করছিলেন কিনা কে জানে। কঙ্কাও ওই অর্ধচেতন মানুষটার ওপর হম্বিতম্বি করতে লাগল। বুঝতে পারলাম অবস্থার বিপাকে পড়ে দিনের পর দিন রোগীর সেবা করতে করতে ওর মাথার ঠিক নেই। রোগীর যখন চেতনা ছিল তখন মুখ বুজে সব সহ্য করে থাকলেও আজ যখন চেতনাহীন রোগীর সেবা করছে তখন এতদিনের সমস্ত রাগ ক্ষোভ দুঃখ ঘেন্না সব উগরে দিতে চাইছে।
আমি ওকে ভালোবাসা দিয়ে শান্ত করতে চাইলেও ও শান্ত হতে চাইতো না।
কঙ্কা সেই কোন শৈশবে এ বাড়িতে বাপ মায়ের সঙ্গে এসেছিল, দূর সম্পর্কের হলেও দুঃস্থ আত্মীয় বলে আমার শ্বশুরমশাই আশ্রয় দিয়েছিলেন। তবে তা আত্মীয়ের সম মর্যাদায় নয়, আশ্রিতের অমর্যাদা নিয়েই ওরা থাকছিল। ওর একটা ভাইও ছিল। পরবর্তী কালে একে একে নানা রোগে ওর বাবা মা ভাই সবাই মারা যায়। একটু বয়স বাড়লে এক গরিব গৃহস্থ ঘরে ওর বিয়েও দেওয়া হয় খুব সামান্য নাম মাত্র খরচে।
শরীরে যৌবন ভাল মতো আসার আগে আমার মতোই শাঁখা নোয়া খুইয়ে এ বাড়িতেই আবার ফিরে এসেছিল। দু মুঠো ভাত আর বছরে দুখানা থানের বদলে উদয়াস্ত খেটে যাওয়াই যেন ওর ললাট লিখন। এসব আমি ওর কাছেই শুনেছিলাম।

domestic serenity

আজকাল রোজ রোজ গাদা গাদা বিছানার চাদর বালিশের ঢাকা কাচা, রোগীর সেবাযত্ন করতে করতে আমার চোখের সামনে এক মাসের মধ্যে মেয়েটা যেন আধখানা হয়ে গেল। মল মূত্রের উৎকট ঘিনঘিনে গন্ধ যেন ওর হাত থেকে যেতেই চাইতো না। শৈলেন বাবু বড় বড় গোল গোল হলদে রঙের কাপড় কাচা সাবান কিনে এনে দিতেন। আর আনতেন জুঁই ফুলের ছবি দেওয়া গায়ে মাখার সাবান , ইংরেজিতে তাতে নাম লেখা থাকতো। ইংরেজী পড়তে তো শিখিনি, তবে ওই সাবান গায়ে মেখে ও যখন চান করে কল ঘর থেকে বের হতো জুঁই ফুলের সুবাস চার দিকে ছড়িয়ে পড়তো। কাঁচের শিশিতে ভরা এক ধরনের সুগন্ধ যুক্ত গলা সাবানও এনে দিতেন, ওটা চুলে মাখে।
দিন দুবেলা কঙ্কা ওই সব সাবান মেখে চান করতো। তাতেও ওর ঘেন্না যেতো না। হাতে করে ভাত মেখে মুখে গ্রাস তোলার সময় বমি চাপতে গিয়ে চোখে জল আসতো।
ওকে দেখে মনের মধ্যে অপরাধ বোধ জেগে উঠল। আমি তো নিজেও এ বাড়ির আশ্রিত, তবে ওর সঙ্গে আশ্রিতের মতো ব্যবহার কেন করছি! নাহ এভাবে একা ওর ঘাড়ে রোগীর সব ভার দিয়ে রাখা যাবে না, আমাকেও ওর কাজের ভাগ নিতে হবে।
পরদিন থেকে আমিও ওর সঙ্গে কাজ করতে গেলে ও বাধা দিয়ে বলল, “রক্ষে কর সেজ গিন্নী তুমি আর এতে হাত দিও না। সবাই মিলে এক কাজ করতে গেলে কোন সুবিধে হবে না। তুমি হলে এ বাড়ির বউ, আর আমি হলাম গিয়ে এ বাড়ির ঘানিতে বাঁধা দাসী বাঁদি। মরণ কাল পর্যন্ত তাইই থাকব। ঠিক কিনা বল? আমার মতন বিনি মাইনে এমন দাসী থাকতে কোন দুঃখে তুমি এসব গু মুত ঘাঁটতে। যাবে? তা ছাড়া এ কাজ আমি আগেও করেছি। তোমার শ্বশুরের সব রকম সেবাই আমাকে করতে হয়েছে। আমাকে আর মায়া দয়া দেখাতে হবে না। সবাই মিলে এক কাজ করলে বাকি কাজ গুলো কে করবে? তুমি ঠাকুর ঘর আর রান্না ঘর সামলাও, তাতেই আমার অনেক উপকার হবে।”

বুঝলাম শ্বশুর মশাইও শেষ জীবনে শয্যাশায়ী হয়েছিলেন। তখনো এই কঙ্কাকেই তাঁর সেবা করতে হয়েছিল। কিন্তু আমি একটু ভুল বুঝেছিলাম বা বলা উচিত একটু কম বুঝে ছিলাম। এই ‘সেবার’ অনেক গভীর অর্থ ছিল সে সত্য পরবর্তীকালে ভীষণ চেহারা নিয়ে সামনে এসেছিল।

ক্রমশ

পাপ- পর্ব ১০


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top