ডাইনিং কোচে তিনজনে এসে হাজির হলেন।
মঁসিয়ে বুঁ এবং এরকুল পোয়ারো পাশাপাশি বসলেন, ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন একটু দূরে, একাকী।
সামনের টেবিলে পাতা ইস্তাম্বুল-ক্যালে কোচের ম্যাপ, লাল কালিতে কূপে এবং সাথে যাত্রীদের নাম দাগানো। টেবিলের এক কোণে জড়ো করা একরাশ টিকিট ও পাসপোর্ট। ব্যবস্থা দেখে পোয়ারো সন্তোষ প্রকাশ করলেন।

এরকুল: বাঃ! এমনটাই চাইছিলাম। এবার আমরা আমাদের কাজ শুরু করতে পারি। প্রথমেই এই কোচের কন্ডাক্টর মিশেলকে আমরা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকব। ও সারারাত জেগে ছিল, সুতরাং তার থেকে আমরা সবথেকে মূল্যবান তথ্য পেতে পারি। আচ্ছা মঁসিয়ে বুঁ, মিশেল সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? বিশ্বস্ত?
বু: যতদূর জানি খুবই বিশ্বস্ত এবং দায়িত্বশীল, প্রায় বছর পনেরো এই রেল কোম্পানির সাথে যুক্ত। ফরাসি, পুরো নাম পিয়ের মিশেল, ক্যালের কাছে কোথাও একটা থাকেন। শুধু বিশ্বস্ত বললে কম বলা হয়—বুদ্ধিমানও।
এরকুল: আশ্বস্ত হলাম, কোম্পানির বড়কর্তা যখন সার্টিফিকেট দিচ্ছেন—দেখা যাক—
কন্ডাক্টর মিশেল এসে হাজির হলেন, কিন্তু তখনো তাঁর সকালের আতঙ্ক কাটেনি, বেশ নার্ভাসও লাগছে।
মিশেল: (সবার মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে) যা ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম, এখনো আমার হাত-পা কাঁপছে। বুঝতে পারছি না আমার কোন গাফিলতিতে এটা ঘটল। ব্যাপারটা এখনো বিশ্বাসই করতে পারছি না। এখন না আবার চাকরি নিয়ে টানাটানি হয়?
এরকুল: আরে আপনি এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন? তদন্ত চলছে, দোষী ধরা পড়বে, আপনার চাকরি যাওয়ার প্রশ্ন আসে কোথা থেকে। অত টেনশন করার কিছু নেই, আপনি সহযোগিতা করুন ব্যাস। (একটু থেমে) যা দেখছি আপনি বছর পনেরো এই রেল কোম্পানির সাথে যুক্ত, আপনার পুরো নাম পিয়ের মিশেল, থাকেন ক্যালের উপকণ্ঠে, ঠিক তো?
মিশেল: হ্যাঁ।
এরকুল: এবার সরাসরি কাজের কথায় আসি। মিঃ রাশেট কাল ঠিক কটায় নিজের কূপেতে শুতে গিয়েছিলেন?
মিশেল: ডিনারের পরপরই। বেলগ্রেড ছাড়ার আগেই। আগের রাতেও তাই করেছিলেন। ডিনারের সময়ই উনি বিছানা রেডি করে দিতে বলতেন, এবং সেই মতো করেও দিতাম।
এরকুল: ডিনারের পরে ওর কূপেতে কেউ গিয়েছিল কি?
মিশেল: হ্যাঁ, ওনার ব্যক্তিগত পরিচারক ও সেক্রেটারি।
এরকুল: আর কেউ?
মিশেল: যতদূর জানি আর কেউ নয়।
এরকুল: তাহলে দাঁড়াচ্ছে, আপনিই ওনার সাথে শেষ কথা বলেছিলেন। তাই না?
মিশেল: হ্যাঁ মঁসিয়ে, এই ১টা বাজতে মিনিট কুড়ি আগে উনি কলিং বেল টিপে ডাকেন, আমি যাই-ও, বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে ওনার সাথে আমার কথা হয়।
এরকুল: ঠিক কী ঘটেছিল—একটু খুলে বলুন।
মিশেল: ওনার কলিং বেলের আওয়াজ শুনে আমি ওনার কূপের দরজার কাছে যাই, ভিতর থেকে বন্ধ দেখে দরজায় টোকা মারি। তখন উনি বলেন যে, উনি নাকি ভুল করে কলিং বেল টিপে ফেলেছিলেন, দরকার তেমন কিছু নেই।
এরকুল: কোন ভাষায় বলেছিলেন, ইংলিশে?
মিশেল: না না, ফরাসিতে।
এরকুল: তিনি এক্স্যাক্টলি কী বলেছিলেন মনে আছে?
মিশেল: হ্যাঁ, ‘সে নে রিয়াঁ, জ্য মি সুই ত্রঁপে’।
এরকুল: ঠিকই, আমিও ওই রকমই শুনেছিলাম। তারপর আপনি চলে গেলেন?
মিশেল: হ্যাঁ।
এরকুল: নিজের সিটে?
মিশেল: আর একটা কূপে থেকে ডাক পড়েছিল, সেটায় গিয়েছিলাম।
এরকুল: এই প্রশ্নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ঠিকঠাক মনে করে উত্তর দেবেন। কাল রাতে সোয়া একটা নাগাদ আপনি ঠিক কী করছিলেন?
মিশেল: সোয়া একটা—সোয়া একটা নাগাদ আমি করিডরের দিকে মুখ করে আমার চেয়ারেই ছিলাম।
এরকুল: মনে করে বলুন, ঠিক বলছেন তো?
মিশেল: (একটু চিন্তা করে) সোয়া একটা—ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, আমি এথেন্স কোচে গিয়েছিলাম সহকর্মীদের সাথে একটু গল্পগুজব করতে। তুষারপাত নিয়ে কথা হচ্ছিল। সঠিক মনে নেই তবে রাত একটার পরেই হবে।
এরকুল: ফিরে এলেন কখন?
মিশেল: ওই যখন আমার কোচে বেল বাজল। আপনাকে বলছিলাম না, আমেরিকান মহিলাটি বারে বারে বেল বাজাচ্ছিলেন, তখনই ফেরত আসি।
এরকুল: হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়ছে বলছিলেন বটে। তারপরে কী করলেন?
মিশেল: তারপর আপনার কাছে এলাম, জলের বোতল দিলাম। তারপর এই ধরুন আধ ঘণ্টা খানেক পরে ওই আমেরিকান যুবক—মিঃ রাশেটের সেক্রেটারি, তাঁর বিছানাপত্র রেডি করে দিতে ওনার কূপেতে গেলাম।
এরকুল: ওই সময় কি ম্যাককুইন নিজের কূপেতে একাই ছিলেন?
মিশেল: না না, ১৫ নং-এর কর্নেল আর্বাথনট ওই সময় ওনার সাথে গল্প করছিলেন।
এরকুল: কর্নেল ওই কূপে ছেড়ে বেরিয়ে কোথায় গেলেন, লক্ষ্য করেছিলেন?
মিশেল: নিজের কূপেতেই গেলেন বলেই তো মনে করতে পারছি।
এরকুল: তার মানে কূপে নং ১৫। কূপে নং ১৫টা আপনার সিটের কাছাকাছিই, তাই না?
মিশেল: হ্যাঁ, একেবারে পাশেই, করিডরের ওদিককার প্রান্ত থেকে দ্বিতীয়।
এরকুল: সময়টা?
মিশেল: ঘড়ি দেখিনি তবে রাত দুটোর আগেই হবে।
এরকুল: এরপর?
মিশেল: এরপর সকাল অবধি নিজের চেয়ারেই ছিলাম।
এরকুল: রাতে আর এথেন্স কোচে যাননি?
মিশেল: না মঁসিয়ে।
এরকুল: তাহলে কি চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?
মিশেল: না মনে হয়। জেগেই তো ছিলাম। আসলে ট্রেন চললে তার দুলুনিতে একটা তন্দ্রাভাব আসে। ট্রেন কাল সারারাত দাঁড়িয়েই ছিল, সেই কারণে ঘুমের ভাবই আসেনি।
এরকুল: কাল রাতে করিডর দিয়ে কাউকে যাতায়াত করতে দেখেছেন?
মিশেল: (একটু সচকিত হয়ে) হ্যাঁ, লক্ষ্য করেছি। কোনো একজন মহিলা যাত্রীকে অন্য প্রান্তের টয়লেটে যেতে দেখেছিলাম।
এরকুল: কাকে দেখেছিলেন?
মিশেল: সেটা বলতে পারব না। দূর থেকে দেখেছি তাও পিছন থেকে। পরনে স্কারলেট কিমানো, পিঠে ড্রাগনের ছবি আঁকা।
এরকুল: (ঘাড় নেড়ে) ঠিক আছে, তারপর উল্লেখযোগ্য আর কিছু?
মিশেল: তেমন বলার মতো আর কিছু তো নজরে আসেনি।
এরকুল: আপনি নিশ্চিত?
মিশেল: হ্যাঁ, আর একটা জিনিস ভুলে যাচ্ছিলাম, আপনাকে একবার লক্ষ্য করলাম দরজা খুলে গলা বাড়িয়ে করিডরে কিছু একটা খুঁজতে।
এরকুল: ওহ্! আমি ভাবছিলাম—আপনি এটা লক্ষ্য করেননি। কাল ওই সময় আমার দরজার সামনে ভারী কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনেই আমি গলা বাড়িয়েছিলাম। এই ব্যাপারে আপনি কিছু লক্ষ্য করেননি?
মিশেল: না, না। আমি নিশ্চিত ওই সময় আপনার কূপের সামনে ভারী কোনো জিনিস পড়ে-টড়ে যায়নি।
এরকুল: (দার্শনিক ভাবে) তাহলে আমারই শোনার ভুল।
বুঁ : অন্য কোনো কূপের সামনে কোনো জিনিসের পড়ার শব্দ হয়তো আপনি শুনে থাকতে পারেন।
এরকুল বুঁ-এর মন্তব্যের ব্যাপারে আলোচনা আর এগোতে চাইলেন না, হয়তো মিশেলের সামনে অন্য কোনো জিনিস পতনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনাটা এড়াতে চান বলে।
এরকুল এরপর মিশেলকে উদ্দেশ্য করেই বললেন—
এরকুল: আপনার কী মনে হয়, হত্যাকারী কাল রাতে বাইরে থেকে ট্রেনে উঠেছিল? যদি উঠেই থাকে তাহলে সে গেল কোথায়? রাতে যা তুষারপাত ঘটেছে তাতে তার পক্ষে ট্রেন ছেড়ে যাওয়াটা নিতান্তই অসম্ভব। তার পক্ষে যদি এই ট্রেন ছেড়ে যাওয়া সম্ভব না হয়, তবে তার ট্রেনেই কোথাও লুকিয়ে থাকার কথা।
বুঁ : সেটার সম্ভাবনা আপনি বাদ দিতে পারেন, আমরা ট্রেন তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালিয়েছি, অপরিচিত কাউকেই পাইনি।
মিশেল: তাছাড়া অন্য কোনো কোচে যেতে গেলেও আমার চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি সারারাত ঠায় করিডরের দিকে মুখ করে বসে ছিলাম।
এরকুল: ট্রেনটা শেষ কোথায় থেমেছিল?
মিশেল: ভিনকোভি।
এরকুল: কটায়?
মিশেল: ভিনকোভি ছাড়ার কথা ১১টা ৫৮-তে, ট্রেন আবহাওয়ার জন্য তখন মিনিট ২০ লেটে চলছিল।
এরকুল: জেনারেল কম্পার্টমেন্ট থেকে কারও আসার সম্ভাবনা আছে?
মিশেল: না না, ডিনারের পরপরই ওদিককার সাথে এদিককার মাঝের দরজায় তালা দিয়ে দেওয়া হয়।
এরকুল: তুমি কি নিজে ভিনকোভিতে ট্রেন থেকে নেমেছিলে?
মিশেল: হ্যাঁ, প্ল্যাটফর্মে নেমেছিলাম, কিন্তু অন্য কন্ডাক্টররা যেমন করে অর্থাৎ দরজার পাদানির কাছেই ছিলাম।
এরকুল: ডাইনিং কোচের দিককার দরজাটা কী অবস্থায় ছিল?
মিশেল: ওটা তো সব সময় বন্ধই থাকে।
এরকুল: (আঙুল বাড়িয়ে কোচের দরজা দেখিয়ে) এখন যেমন বন্ধ আছে।
মিশেল: (সেই দিকে তাকিয়ে, একটু চুপ থেকে) এহেঃ! এখন দেখছি খোলা, নির্ঘাত কোনো প্যাসেঞ্জার বরফ জমা দেখতে খুলেছিল, বন্ধই—
এরকুল: ঠিক আছে, ছাড়ুন ওটা। (টেবিলের উপর আপন মনে টোকা দিতে দিতে চিন্তা করতে লাগলেন)
মিশেল: (অনুনয়ের ভঙ্গিতে) বিশ্বাস করুন, জ্ঞাতসারে আমি কোনোভাবেই এর সাথে—

এরকুল: (থামিয়ে দিয়ে) দেখুন, তদন্তের এই পর্যায়ে কাউকেই সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখা সম্ভব নয়, আপনিও নেই। দেখা যাক কী দাঁড়ায়—ওহ্! একটা জিনিস মিস করে যাচ্ছিলাম। আপনি বলছিলেন না মিঃ রাশেটের কল অ্যাটেন্ড করার সময় আর একটা কূপে থেকে ডাক পড়েছিল, সেটা কোন কূপে থেকে?
মিশেল: মাদাম ড্রাগোমিরফ-এর। ওনার পরিচারিকাকে ডেকে দেওয়ার জন্য বলছিলেন।
এরকুল: এবং আপনি সেটা করেছিলেন?
মিশেল: অবশ্যই।
এরকুল পোয়ারো সামনে মেলে রাখা ক্যালে কোচের ম্যাপটার উপর একবার ঝুঁকে কিছু একটা মনোযোগ দিয়ে দেখলেন, তারপর চেয়ারে রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসলেন।
এরকুল: এবার আপনি আসতে পারেন, আপাতত আর দরকার নেই, প্রয়োজনে ডেকে নেব।
মিশেল: (সবার দিকেই মাথা নত করে বো করে) ধন্যবাদ।
ওঠার সময় উৎকণ্ঠা নিয়ে মঁসিয়ে বুঁ-এর দিকে তাকালে বুঁ আশ্বস্ত করলেন—
বুঁ: চিন্তা করবেন না, আমি আপনার গাফিলতি তেমন কিছু দেখলাম না।
মিশেল: অনেক ধন্যবাদ মঁসিয়ে। (ডাইনিং কোচ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন)।
ক্রমশঃ
মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব- ৮



