মিঃ রাশেটের কূপে থেকে এরকুল পোয়ারো এবং ডাক্তার কনস্ট্যানটাইন এসে হাজির হলেন মসিয়ে বুঁ-এর কূপেতে। তাঁদের দেখে বুঁ অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন,
“আমি আজ তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সার্ভ করে দিতে বললাম, তারপর ডাইনিং কোচ ফাঁকা হয়ে যাবে। আপনি ডাইনিং কোচেই পোস্ট-লাঞ্চে আপনার জবানবন্দি নেওয়ার কাজ স্বচ্ছন্দে করতে পারবেন। এর মধ্যে আমরা তিনজন লাঞ্চটা এখানেই সেরে নেব।”
এরকুল : “এক্সেলেন্ট, লাঞ্চের টাইম হয়েও এল প্রায়, লাঞ্চের পরেই ব্যাপারটা ভালো হবে।”
বুঁ : “এবার বলুন, নতুন কী তথ্য আবিষ্কার করলেন?”
এরকুল : “গোটা ব্যাপারটাই নতুন। খুন হওয়া লোকটার পরিচয়টাই নকল, আসলটা উদ্ধার করে আনলাম এবং জানতেও পারলাম ওর আমেরিকা ছেড়ে যাওয়ার কারণ।”
বুঁ : “বলেন কী, নকল পরিচয়ে ট্রাভেল করছিল! আসল পরিচয়টা তাহলে কী?”
এরকুল : “আপনার কি আমেরিকার বিখ্যাত আর্মস্ট্রং কেসটা মনে আছে? এই লোকটি হল সেই কেসের মূল আসামি, ডেইজি আর্মস্ট্রং-এর হত্যাকারী—ক্যাসেটি!”
বুঁ : “হ্যাঁ, কতক কতক মনে পড়ছে বটে। যতদূর মনে পড়ছে খুবই মর্মান্তিক ঘটনা, ডিটেলস এখন আর কিছু মনে নেই।”
এরকুল : “কর্নেল আর্মস্ট্রং ছিলেন জাতিতে ব্রিটিশ, খুবই দক্ষ সেনানায়ক, সেনা অফিসার হিসেবে ভিক্টোরিয়া ক্রসও পেয়েছিলেন। আমেরিকা প্রবাসী, তাঁর মা ছিলেন ওয়াল স্ট্রিটের মিলিয়নিয়ার ভ্যান ডার হ্যাল-এর কন্যা, মধ্য ইউরোপীয়। কর্নেল আর্মস্ট্রং বিবাহ করেছিলেন লিন্ডা আর্ডেনের কন্যাকে। লিন্ডা আর্ডেনের পরিচয় হল তিনি আমেরিকা কাঁপানো অপেরা অভিনেত্রী—অসামান্য অভিনয় প্রতিভার জন্য তাঁকে বলা হয় ‘ট্র্যাজিক কুইন’। আর্মস্ট্রং দম্পতির একমাত্র কন্যা এই ডেইজি আর্মস্ট্রং—বয়স বছর তিনেক। ডেইজিকে অপহরণ করা হয় এবং মুক্তিপণ হিসেবে এক অসম্ভব অর্থও দাবি করা হয়, প্রায় দু’লক্ষ ডলার। আর্মস্ট্রং পরিবার সেই দু’লক্ষ ডলার মুক্তিপণ দিয়েও দেয়, কিন্তু ডেইজিকে আর ফেরত পাননি, পান ছোট্ট ডেইজির ক্ষতবিক্ষত দেহ।
এই ঘটনায় গোটা আমেরিকায় বিরাট জনআন্দোলন তৈরি হয়, পেপার মিডিয়াতেও শুরু হয় বিরাট হইচই। এর পরের ঘটনা আরও মর্মান্তিক। তখন মিসেস আর্মস্ট্রং ছিলেন সন্তানসম্ভবা। প্রচণ্ড শোকে তাঁর প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি হয়ে যায়। একটা মৃত সন্তান প্রসব করেন তিনি এবং সেই সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান মিসেস আর্মস্ট্রংও। প্রচণ্ড পারিবারিক এই শোকের আঘাত কর্নেল আর্মস্ট্রং আর কাটাতে পারেননি, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নিজের রিভলবারের গুলিতে নিজেকে শেষ করে দেন—গোটা পরিবারটাই এই ঘটনায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়!”
বুঁ : “মাই গড, কী মর্মান্তিক ঘটনা। ঠিকই এবার আমার গোটা ব্যাপারটা মনে পড়েছে। আচ্ছা, আর একটা আত্মহত্যার ঘটনা এই ব্যাপারটার সাথে শোনা গিয়েছিল না?”
এরকুল : “হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। সম্ভবত ওই পরিবারের কোনো একজন ফরাসি অথবা সুইডিশ কমবয়েসি মেডকে পুলিশ ঘটনার সাথে যুক্ত সন্দেহে গ্রেফতার করে। সে বারবার তার যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করে এবং কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে ছেড়েও দেওয়া হয়। একদিকে ডেইজি ও আর্মস্ট্রং পরিবারের শোক, তার উপর পুলিশি হয়রানি—সব মিলিয়ে মেয়েটিও পরে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে দেখা যায় মেয়েটি নির্দোষ, কোনোভাবেই ব্যাপারটার সাথে যুক্ত ছিল না।”
বুঁ : (দুঃখিত হয়ে) “না, আর শোনা যাচ্ছে না।”
এরকুল : “এর প্রায় মাস ছয়েক পরে পুলিশ পালের গোদা এই ক্যাসেটিকে গ্রেফতার করে এবং বিচারের জন্য আদালতে পেশ করে। এবার ক্যাসেটির খেলা শুরু হয়। এই সব অপহরণ জালিয়াতি করে প্রচুর কামিয়েছিল, সেগুলো দু’হাতে ছড়াতে শুরু করে। উপরমহলেও প্রভাব ভালোই ছিল, সেসবও ব্যবহার করে। সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ বিপক্ষে থাকা সত্ত্বেও টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে ক্যাসেটি ছাড়া পেয়ে যায়। কিন্তু জনমত ছিল ওর বিপক্ষে, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালে গণপিটুনিতে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সেই কারণেই নাম বদলে ক্যাসেটি থেকে রাশেট হয়ে বেড়াল তপস্বী সেজে দেশ ছেড়ে বিদেশে ঘুরে বেড়াতেন।”
বুঁ : “আদ্যন্ত পশু একটা! এমন একটা লোকের খুন হওয়াতে আমার বিন্দুমাত্র আফশোস হচ্ছে না।”
এরকুল : (স্মিত হেসে) “ঠিকই, এইভাবে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে খুন না হলে আমারও বিন্দুমাত্র মাথা ঘামানোর তাগিদ ছিল না।”
বুঁ : “যাই হোক, এক্ষেত্রে আমাদের তদন্ত চালানো ছাড়া গতি নেই। এখন প্রশ্নটা হল কার হাতে নরাধমটা খুন হল? রাইভ্যাল গ্রুপের হাতে, না কারও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায়? এরকুল, দেখুন সত্যি বলতে কী, চিঠিটা পোড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল কারণ, হত্যাকারী চায়নি আর্মস্ট্রং কেসের সাথে রাশেটের যোগাযোগ তদন্তের সময় উঠে আসুক। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার তত্ত্বটাই প্রাধান্য পায়।
আচ্ছা, আর্মস্ট্রং ফ্যামিলির কেউ কি আর বেঁচে আছে?”
বুঁ : “উঁহু, সে ব্যাপারে আমার কিছুই জানা নেই। তবে কোথায় যেন একবার মিসেস আর্মস্ট্রং-এর ছোট বোনের ব্যাপারে পড়েছিলাম—”
এরকুল : “ব্যাপারস্যাপার দেখে রাইভ্যাল গ্রুপের থেকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থিয়োরিটাতেই বেশি জোর দিতে হবে, দেখা যাক—”
বুঁ : “তবে ভাঙা ঘড়ি উদ্ধার হওয়াটা বেশ কাজে লাগবে। খুনের সময়টা যে সোয়া একটা—সেটা বন্ধ ঘড়িটা থেকেই বোঝা যাচ্ছে।”
এরকুল : “সম্ভবত, তবে সেটাও তদন্তসাপেক্ষ।”
বুঁ : “আপনিই তো বলছেন যে নিজের কানে পৌনে একটায় রাশেটের গলা শুনেছেন?”
এরকুল : “মিঃ রাশেটের কূপে থেকে কন্ডাক্টরের সাথে কথোপকথন শুনেছিলাম।”
বুঁ : “তার মানে হল পৌনে একটা নাগাদ মিঃ রাশেট ওরফে ক্যাসেটি জীবিত ছিলেন।”
এরকুল : “পৌনে একটা নয়, সঠিকভাবে বলতে গেলে একটা বাজতে তেইশ মিনিট বলা উচিত।”
বুঁ : “সেক্ষেত্রে আমরা ধরে নিতেই পারি যে বারোটা বেজে সাঁইত্রিশ মিনিট অবধি মিঃ রাশেট জীবিত ছিলেন।”
এরকুল কোনো উত্তর করলেন না। চিন্তিতভাবে সামনে তাকিয়ে রইলেন। এই সময়ই মসিয়ে বুঁ-এর কূপের দরজায় টোকা পড়ল। রেস্টুরেন্ট অ্যাটেনডেন্ট কূপেতে প্রবেশ করলেন।
অ্যাটেনডেন্ট : “মসিয়ে, ডাইনিং কোচ ফাঁকা হয়ে গেছে, আপনারা আসতে পারেন।”
বুঁ : “চলুন তাহলে এগোনো যাক।”
ডাক্তার : “আমি কি আপনাদের সাথে আসতে পারি?”
বুঁ : “নিশ্চয়, অবশ্য মসিয়ে পোয়ারোর যদি কোনো আপত্তি না থাকে।”
এরকুল : “আরে এতে আপত্তি করার কী আছে? আপনি স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞাসাবাদের সময় থাকতে পারেন।”
জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি-প্রকরণ নিয়ে ছোট্ট আলোচনার শেষে তিনজনই ডাইনিং কোচের দিকে রওনা দিলেন।
ক্রমশঃ
মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস – পর্ব ৭


