এখানে এসে আলাপ হয়েছে গগন দোসাদের সঙ্গে। অন্ত্যজ শ্রেণির বলে উচ্চবর্ণদের কাছে জল অচল। আমিও ওর সঙ্গে মেলামেশা করছি বলে উচ্চবর্ণদের আপত্তি ছিল, কিন্তু আমাকে এসব করে আটকাতে পারবে না। আমি যার সঙ্গে ইচ্ছা মিশব, যেখানে খুশি যাব, যা ইচ্ছা খাব, যেখানে খুশি শোব, গাছতলা হলেও সেখানে যদি ভালো লাগে সেখানেই শুয়ে পড়ব। এসব যদি না করতে পারি, আমি এখানে থাকবই না। ওরা বুঝে গেছে আমাকে আটকাতে পারবে না।
এসব দিকে এখনো এগুলো থেকে গেছে। গগন অন্ত্যজ পল্লীতে থাকে, গ্রাম্য রাজনীতির কবলে পড়ে সামান্য জমিজমা যেটুকু ছিল, সব খুইয়ে ডাকাতি শুরু করেছিল। লম্বা, দড়ির মতো পাকানো চেহারা, ছোট করে কাটা চুল, পুরু একটা গোঁফ, গায়ের রং কালো। মধু চাষের আড্ডায় ওর সঙ্গে আলাপ। কথায় কথায় জানতে পেরেছিলাম সীমান্তের আরও কাছাকাছি অঞ্চলে গাড়ি থামিয়ে ডাকাতি করাই ছিল ওর কাজ, একটা খুনও করেছিল, তারপর পালিয়ে গিয়ে নেপালে গা ঢাকা দেয়। বেশ ক’বছর পর রাজনীতির ছত্রছায়ায় এদিকে ফিরে এসেছিল। পুলিশ একটা টাকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তার বিনিময়ে ওকে এক প্রভাবশালীর হয়ে বহু কাজ করতে হয়েছে, চরসের ক্যারিয়ার হিসেবে এখনো ওর ডাক পড়ে। নেপাল থেকে ঘুরপথে লুকিয়ে চরস আর গাঁজা নিয়ে এসে ওই প্রভাবশালীর হাতে তুলে দিতে হয়। তবে তার বিনিময়ে কিছু পাওয়া যায় না। পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে বলেই এটা ওকে বিনা পয়সায় করে যেতে হবে, যতদিন ওব্দি ও এই কাজে সক্ষম।
ওই প্রভাবশালীকে ধরেই ও এই মৌমাছি চাষের জায়গাটা করে নিয়েছে। আম বাগানের ভেতর বেশ কিছুটা জায়গা নিয়ে ওর এই চাষ, একটা তাঁবু। শহর থেকে লোক এসে মধু নিয়ে যায়।
আমাকে এই কথাগুলো বলার সময় ও বলেছিল, ওর আর এখানে থাকতে ইচ্ছা করে না। ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু দাসখৎ লিখে দিতে হয়েছে। এখান থেকে বেরোনোর উপায় নেই। এদের লোক সর্বত্র। যদি উপায় থাকত দেশ ছেড়েই চলে যেত। নেপাল এদের কাছে চৌকাঠ পার হলেই, তাই নেপালে গেলেও ওকে খুঁজে বের করতে অসুবিধা হবে না।
আমি চুপচাপ শুনছিলাম, ও বলে যাচ্ছিল ওর মা, বউ, দশ বছরের ছেলের কথা, গ্রাম্য রাজনীতির নোংরামি, ওই স্থানীয় নেতার বিবিধ অত্যাচারের কথা। সব বলার পর বলেছিল, আপনাকে কেন এসব বললাম জানি না, কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হলো বিশ্বাস করা যায়। আর তারপর শালপাতায় করে চাক ভাঙা মধু এনে দিয়েছিল। টাকা দিতে চাইলে কিছুতেই ওরা নেয় না। বলে ‘আপ হমলোগোঁকে মেহমান হ্যাঁয়।’
গগনের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়েছিলাম। ও ওর ভাইয়ের টাট্টুটা নিয়েছিল, আর আমি শিবজি সিংয়ের একটা ঘোড়া।
আমবাগানকে পেছনে রেখে একটা দোলা-মতো জায়গা পেরিয়ে লিচু বাগান। তখন দুপুর, কোথায় যাচ্ছি জানি না। ও বলেছিল ‘চলিয়ে আপকো এক জগহ লে যায়েঙ্গে।’ দুলকি চালে এগিয়ে যেতে যেতে সামনেই এক বন, ওই বন ক্রমশ ঘন হয়ে এসেছে, শুনলাম এই পথেই নেপাল থেকে চরস এদিকে আসে। এই বনের আরও গভীরে চিতাও আছে, এছাড়া হরিণ, নীলগাই। এই পথ ক্রমশ দূরের সুনীল পাহাড় টপকে ঢুকে গেছে নেপালে। আমি ওই অচেনা বনের রূপে নিমগ্ন হয়ে থাকলাম। ওও কথা বলছিল না, বনের পথে কথা বলতে নেই। ক্রমশ একটা শুঁড়িপথ উত্তর দিকে বাঁক নিয়ে আরও কিছুটা গেলে দেখলাম এক অপূর্ব জলাশয়, কাকচক্ষু জল। আমার চান করতে ইচ্ছা হলো। জলে নেমে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ জলে থেকে পাঞ্জাবি দিয়েই গা’মাথা মুছে আবার ঘোড়ায় উঠে পড়লাম। পাজামাটা ভিজেই আছে, থাক, শুকিয়ে যাবে ঠিক। ওই পথে আরও বেশ কিছুটা যাওয়ার পর একটা বিরাট গাছের নীচে গগন ঘোড়া থামাল। ওপরের দিকে আঙুল তুলে দেখাল একটা মৌচাক ঝুলে আছে, রং আক্ষরিক অর্থেই সোনালি। বলল এই অঞ্চলের সবচেয়ে সুস্বাদু মধু এই মৌমাছিরা তৈরি করে। বছরের এই সময়টাতেই ওরা নেপালের পাহাড় থেকে আসে, প্রতি পূর্ণিমা রাতে মধু নিয়ে উড়ে চলে যায়। তাই এদের সহজে ধরােও যায় না। ক’দিন আগে এই পথে ফিরতে গিয়ে ও চাকটাকে দেখেছে।
ওপর দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, চাকটা তখনও খুব বড় হয়নি, মাঝেমাঝে সোনার মতো কী যেন ঝিলিক দিয়ে উঠছে। ওকে জিজ্ঞেস করতে ও বলল এই মৌমাছিদের মধ্যে সোনালি ডানার মৌমাছি দেখা যায়। তবে তারা সংখ্যায় কম। তারাই নাকি মধু আহরণে নেতৃত্ব দেয়।
এই মৌমাছিদের কথা আমি কখনো শুনিনি, পড়িওনি কোথাও, তাই অদ্ভুত লাগছিল। কিন্তু আমরা পড়েছি, আর ওরা চাক্ষুষ করেছে, দুটোর তফাত অনেক।
ও আমাকে ওখানে দাঁড় করিয়ে রেখেই বনের আরও গভীরে চলে গেল। যখন ফিরে এল, হাতে কয়েকটা লম্বাটে পাতা, ওই পাতায় আগুন ধরিয়ে ও একটা মন্ত্রের মতো পড়তে পড়তে গাছে উঠতে শুরু করল। নীচ থেকে দেখছিলাম মৌমাছিগুলো ওই ধোঁয়ার সামনে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। ওই সোনালি চাক থেকে অল্প কিছুটা কেটে নিয়ে ও নীচে নামতে শুরু করল। একদম নীচে এসে ওই চাক থেকে একটা বড় অংশ ভেঙে আমাকে দিয়ে, বাকিটা মুখে পুরে দিল। আমি ওই মধু খেয়ে দেখলাম, ওই স্বাদ জীবনে পাইনি। সমস্ত মুখ এক অপূর্ব স্বাদে ভরে গিয়েছিল।
গগন বলেছিল, এই চাক ভাঙতে নেই। কেটে কিছুটা খাওয়া যায়। এই চাক ভাঙলে নাকি নেপালের কোনো এক বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবীর অভিশাপ লাগে। এরা নাকি তাঁরই আশ্রিত। তাঁর মন্দিরে এই সোনালি ডানার মৌমাছিদের দেখা যায়।
জিজ্ঞেস করেছিলাম মন্দিরটা কোথায়? তুমি গেছ? বলেছিল নেপাল থেকে তিব্বতে যাওয়ার পথে একটা গুহায় ওই দেবীর মন্দির। ভীষণ দুর্গম অঞ্চল। বৌদ্ধ তান্ত্রিক সন্ন্যাসীদের কাছে ও এই দেবীর কথা শুনেছে।
ওখানে আমাকে যেতে হবে, যাবই।
(ক্রমশ)



