মুজঃফরপুরের দিনগুলো পর্ব ৭

golden hour in a bustling market street

এখানকার কাছাকাছি টাউনটার নাম ‘কেশরিয়া’। নামকরণের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরোলো, কেশরনাথ শিব মন্দিরের অবস্থান থেকেই জায়গাটার এই নাম। কৃষ্ণনগরের মতো একটা টাউন, ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে এটিএম, ডাক্তার, ওষুধের দোকান, বড় বড় শোরুম সবই আছে। এখান থেকে রোজ কলকাতার বাস ছাড়ে, সারারাতের জার্নি শেষে সকালে ‘বাবুঘাট’। কিন্তু বাসে যাওয়ার থেকে ট্রেনে যাওয়াটাই আরামের।
​কেশরিয়ার কাছাকাছি স্টেশন ‘চাকিয়া’, চাকিয়া থেকে আরো এগিয়ে গেলে ‘রক্সৌল’। এই অঞ্চলের হিসাবে রেলপথ অনুযায়ী নেপালের প্রবেশদ্বার। আর নীচের দিকে নেমে গেলে তিনটে ছোট ছোট স্টেশনের পরেই ‘মজঃফরপুর’। এখান থেকে বাই রোড, ‘বীরগঞ্জ’, ওটাও নেপাল বর্ডার। তারপর ক্রমশ ‘কাঠমাণ্ডু’।
​আমি এখান থেকে নেপাল গেলে বাই রোডই যাব। অল্প একটু পথ, ঘণ্টা দুয়েক, এদের সঙ্গে কথা হয়ে আছে, এদের গাড়ি আমাকে বীরগঞ্জে নামিয়ে দিয়ে ফিরে আসবে। আমাকেও ফিরতে হবে এখানে, তবে না ফিরতে পারলেই ভালো হতো। আরো আরো উত্তরে এগিয়ে যেতে যেতে যদি সীমান্তগুলো নস্যাৎ করে এগিয়ে যেতে পারতাম!
​কেশরিয়া থেকে কদিন আগেই আমি আর ধর্মেন্দ্র সিং গাড়িতে ফিরছিলাম। ওখানে এদের বিরাট ব্যবসা। নানারকম জিনিসের ডিলারশিপ নিয়ে রেখেছে, সেই কাজেই গেছিল, সঙ্গে আমিও চলে গেলাম। তবে ওইসব ব্যবসায়িক কচকচানির মধ্যে আমার থাকতে ভালো লাগে না বলে, কেশরিয়ায় পৌঁছানোর পর, গাড়ি থেকে নেমেই আমি উধাও হলাম। পায়ে হেঁটে যতটা পারি ঘুরে ফিরে একটা দারুণ মিষ্টির দোকান আর তার উলটোদিকেই তন্দুরি চিকেনের দোকান আবিষ্কার করে ধর্মেন্দ্র সিংয়ের কেশরিয়ার আস্তানায় ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা, তখনই ধীরে ধীরে দোকানপাটগুলো বন্ধ হচ্ছে, রাস্তায় লোকজন কমে আসছে।
​ফেরার পর, ওখানেই ধর্মেন্দ্রর ফ্ল্যাটে খাওয়া-দাওয়া হলো। এদিককার রেওয়াজ অনুযায়ী নিরামিষ। তবে আমার আমিষ-নিরামিষ দুটোই ভালো লাগে, টেস্টি হলেই হলো। তারপর একটু বসে রাত সাড়ে নটায় বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। পথে একটা জায়গায় দারুণ পান বানায়, ওখানে নেমে একটা পান খেলাম। তারপর লম্বা একটা হাইওয়ে, যেটা বীরগঞ্জ বর্ডারের দিকে চলে গেছে, ওই পথে বেশ কিছুটা এসে ডানদিকে ঘুরতেই শুরু হলো ফেরার রাস্তা, হাইওয়ের পাশে খেত ছিল, এখন বন শুরু হলো। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর আমি গাড়ি থামাতে বললাম। এরা এতদিনে আমার এইসব খামখেয়ালিপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেছে, ওই অন্ধকার রাস্তায় নিশ্চুপে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল, আমি নেমে একটা সিগারেট ধরালাম। আকাশভর্তি তারা, মেঘের সাঁতার, এত তারা বহুকাল দেখিনি; ধর্মেন্দ্রকে বললাম গাড়ি থেকে নামতে, ও-ও এসে দাঁড়াল, ঠিক এমন সময়ই মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ, আর বহু দূর থেকে একটা নেকড়ের ডাক ভেসে এল। ধর্মেন্দ্র শুনেই তাড়া দিতে শুরু করল, “চলিয়ে নিকলতে হ্যাঁয়, ভেড়িয়া লোগ আ রহা হ্যায়।” এমনিতে এরা এদিকে আসে না, তবে মাঝে মাঝে এই পথে নেকড়েদের অনেকেই দেখেছে। আমি ওকে নিশ্চিন্ত থাকতে বললাম। এই অঞ্চলে ভারতীয় নেকড়ে দলবদ্ধভাবে থাকে না। দুটো নেকড়ে এলে নানাভাবেই তাড়ানো যায়। নেপাল সীমান্তের দিক থেকে আবারো একবার ভেসে এল ওই ডাক। দু-পাশে ঘন বন, আরো এগিয়ে গেলে ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে জনবসতি। ধর্মেন্দ্র সিং আবারও তাড়া দিল, “আপ খুদ ভি মরেঙ্গে, হমকো ভি মরওয়াঙ্গে।” আমি ওকে দেখালাম এই পথ কী অপরূপ আবেশে জেগে আছে, বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছে নানারকমের শব্দ। কিন্তু ও ফিরবেই, আর দাঁড়িয়ে থাকতে রাজি না। অতএব গাড়িতে উঠতেই হলো।
​মনে পড়ে গেছিল সহ্যাদ্রিতেও এক বিকেলে বহুদূর পথে একটা নেকড়ে দম্পতি দেখেছিলাম, সঙ্গে চারটে বাচ্চা। আমি ওদের জন্য রাস্তার ওপর আমার ব্যাকপ্যাকে রাখা কেক, বিস্কুট আর একটা জলের বোতল সাজিয়ে রেখে তীব্র গতিতে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেছিলাম। মা-টা ছিল বাচ্চাদের কাছে, বাবা-টা এগিয়ে আসছিল।
​ধর্মেন্দ্র গাড়িতে স্টার্ট দিল। সামনে একটা ছোট্ট ব্রিজ, শ্মশানের ওই নদীটা এই পথে গিয়ে ক্রমশ এগিয়ে গেছে পাটনার দিকে। জীবন, এক অনন্য যাত্রাপথ।

ক্রমশ

মুজঃফরপুরের দিনগুলো ৬ম পর্ব


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top