মুজঃফরপুরের দিনগুলো পর্ব ৬

chasing the blue bull in golden light

এখানকার এই জগৎ শহুরে জগতের সঙ্গে মেলে না। এখানকার রুক্ষ প্রকৃতি, মানুষ—সবই চড়া সুরে বাঁধা, এর সঙ্গে সামান্য মিল পাই সহ্যাদ্রির গভীর অরণ্যের। ওখানেও বর্ষার কয়েক মাস ছাড়া প্রকৃতি রুক্ষ, কখনো কখনো নির্মম। কিন্তু আমি চিরকালই বৈচিত্র্যের খোঁজ করেছি, নানারকম অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে চেয়েছি বলে, ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে অগম্য সব জায়গায় চলে যেতে চেয়েছি বলে, ওই রুক্ষতার মধ্যে থেকেও স্নিগ্ধতাটুকু খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি। সহ্যাদ্রির গভীর বনে নির্জন উপত্যকায় চোখে পড়েছিল ফুলে ভারাবনত একটা অমলতাস গাছ, মুগ্ধ হয়ে বহুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ওইখানে সহজে সবাই যেত না, দরকার ছিল না বলেই যেত না, কিন্তু আমার ভেতরের অস্থিরতাটুকু আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল। যেখানে দেখার কিছু নেই, যেখানে মানুষ যেতে চায় না, সেই জায়গার প্রতি আমার আশৈশব প্রবল আকর্ষণ। এখানেও সেভাবেই নানান দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়াই, লোকে অবাক হয়, কিন্তু আমার মনে হয় কতকিছু দেখা বাকি থেকে গেল, কত অজানা পথের কত অনন্য আহ্বান।

এক বিকেলে হঠাৎ একটা দলছুট নীলগাইকে দেখে আম বাগানের ভেতর দিয়ে পিছু নিয়েছিলাম। আমাকে আম বাগানে ঢুকতে দেখেছিল ভরত কাহার, চিৎকার করে ডেকেছিল, কিন্তু আমি না শোনার ভান করে এগিয়ে গিয়েছিলাম। সাড়া দিলে কাছে এসে ওই পথে যেতে না করত, কারণ ওই আম বাগানের পরেই একটা শিমুলবন পার করে অনেকখানি জায়গা জুড়ে একটা চোরাবালি আর তারও পরে চাষযোগ্য জমি বলে কিছু নেই, তাই জনপদ এদিকটা এগিয়ে আসেনি, ওই পথ, যদিও পথ নেই, ক্রমশ এগিয়ে গেছে দিগন্তের দিকে। আমার ওই পথে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। সেদিন নীলগাইটার পিছু পিছু আমিও ওই পথে পাড়ি দিয়েছিলাম।

আমাকে দেখে স্বভাবতই নীলগাইটা বহুদূর দৌড়ে গিয়ে একবার দাঁড়ালো, পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে নিল আমি ওর পিছু পিছু আসছি কি না, যখন দেখল আসছি, তখন সোজা এক দৌড়, এবং দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। আর আমি আমবাগান পার করে ক্রমশ শিমুলবনের ভেতরে ঢুকে দেখলাম বহু অজানা পাখির ডাক, একটু দূরে গাছের আড়ালে এক নৃত্যরত আগুন তার সমস্তটুকু নিয়ে ওই নির্জনতায় অপরূপ লাবণ্যে সেজে আছে। ওই আগুনের দিকে এগিয়ে গেলাম। অবাক হচ্ছিলাম দেখে, যে ধোঁয়া নেই, পোড়া গন্ধও নেই। আরো কাছাকাছি যাওয়ার পর দেখলাম ভুল করেছিলাম, আগুন না, কয়েকশো হলুদ প্রজাপতির মেলা বসেছে। সুন্দর বহুবার আমার চোখে নিজেকে প্রকাশ করেছেন, কিন্তু এ সৌন্দর্যের তুলনা মেলা ভার, এ দৃশ্য নয়নাভিরাম।

ওই প্রজাপতির ঝাঁকের ভেতর ঢুকিনি, ওদের ছন্দ বিঘ্নিত হোক চাইনি, একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ওরা উড়ছে, উড়তে উড়তে হাওয়ায় ভেসে ওপরে উঠে আবার নেমে এসে বসছে মাটিতে, গাছের ডালে, পাতায় কেঁপে উঠছে ওদের ডানা, আর একটা বিকেল ক্রমশ তার মোহনীয়তায় ভাঁজে ভাঁজে খুলে দিচ্ছে অজানা পথের আনন্দনির্ঝর।

কয়েকটা প্রজাপতি আমার গায়ে মাথায় এসেও বসল, আমি আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যখন ওই চোরাবালির দিকে রওনা দিলাম, ওরা উড়ে গেল ওদের ওই নৃত্যসভার দিকে।

আমি এগিয়ে গেলাম, ক্রমশ বন ছাড়িয়ে সেই চোরাবালির সামনে এসে দাঁড়ালাম। নীলগাইটার চিহ্নও কোথাও নেই, আলো কমে আসছে বলে ঘাসপাতা দেখে তার চলার পথটা অনুমান করতে যাইনি। আরো এগোতেই ক্রমশ পায়ের নীচে একটা ভেজা ভাব টের পেলাম, বুঝলাম চোরাবালির আওতার মধ্যেই এসে পড়েছি। আর সামান্য এগিয়ে দেখলাম দূরের সেই পুকুর, নিঝুম, নির্জন, শুধু হাওয়ার আওয়াজ, দিগন্ত তার শেষ আলোটুকু ছড়িয়ে দিয়ে স্থির। আর একঝাঁক হলুদ পাখি, নাম জানি না, তীব্র বেগে ডাকতে ডাকতে বেরিয়ে এল বাঁ দিকের বন থেকে। আমি বনের পথে অনেক ঘুরেছি, সহ্যাদ্রির গভীর বন পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে বনবাসীদের কাছ থেকে শিখেছিও কিছু। আমি এ সঙ্কেতের অর্থ জানি, বন কথা বলে, শুনতে জানলে অনেককিছু শোনা যায়। যারা বনে জঙ্গলে ঘোরে, বনের পথে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে অজান্তেই তাদের ভিশন ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে চলে যায়। পাখিগুলোর ওইভাবে উড়ে আসার কারণ খুঁজতে খুঁজতে চোখের কোণে বাঁ দিকে ঝোপের আড়ালে একটা অস্বাভাবিক নড়াচড়া চোখে পড়ল, ওই পাখিগুলো আমাকে সেটাই জানাতে এসেছিল, ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, যে সদ্য ওখানে এল।

জানি না সে কে, তবে বিপজ্জনক কিছু হলে বন আরো সঙ্কেত দিত। তবুও এই অবস্থায় পড়লে দ্রুত হাওয়ার উলটোদিকে চলে যেতে হয়, এবং ক্যামোফ্লেজের জায়গাগুলো ঠিক করে নিতে হয়। কারণ আপাত বিপজ্জনক না হলেও, আমি অনধিকার প্রবেশ করেছি, অতএব একটা আপত্তি যে কোনোভাবেই আসতে পারে, একমাত্র হরিণ এক্ষেত্রে পুরোপুরি গা ঢাকা দেয়।

আমি শুকনো পাতা নিয়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম, হাওয়া বইছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে, ওই পাতাটা উড়তে উড়তে চোরাবালির দিকে এগিয়ে যেতেই ওই নীলগাইটাকে দেখা গেল, ঝোপের আড়ালে, স্থির। ও ওখানে আমাকে দেখে তীব্র গতিতে ছুটে গেল ওই পুকুরটার দিকে, আকণ্ঠ জল খেল, তারপর একবার পেছন ফিরে দেখে দিগন্তের কোনাকুনি দূরে বহুদূরে মিলিয়ে গেল।

আমি ফেরার পথ ধরলাম। এই পথটুকু হেঁটে আসতে আসতে ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল, ডানদিকে একটু দূর থেকে ভেসে এল শিয়ালের ডাক, সদ্য পূর্ণিমা গেছে, সেই ভাঙা চাঁদ তার আলো ছড়িয়ে যেন একটা মায়ার চাদর বিছিয়ে দিল। আমার মনে হতে লাগল এই বনে আবার আসতে হবে, ঘন কুয়াশায়, এবং বসন্তপূর্ণিমার সন্ধ্যায়। বনকে বিভিন্নভাবে না দেখলে তাকে দেখা হয়ে ওঠে না।

ওই আমবাগানের সামনে এসে দেখি একঝাঁক টর্চ কাকে যেন খুঁজছে, ভেসে আসছে কথার আওয়াজ। আমি আরেকটু এগোতেই একটা টর্চের আলো আমার গায়ে এসে পড়ল। টর্চের পেছনের অন্ধকার থেকে ভেসে এল ললন সিঙের গলার আওয়াজ, “মাস্টারজি আপ অজীব আদমি হ্যাঁয়…”

ক্রমশ

মুজঃফরপুরের দিনগুলো ৫ম পর্ব


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top