তদন্ত সবার হাতে একটা করে চিরকুট ধরিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবাদ যেন দেখেও দেখছে না। এখন প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় কাজ মনে হয় দূরে কুয়াশায় ঘর্মাক্ত লাইনগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা। তদন্ত এসে গেছে, তাই প্রতিবাদ তার কাঁধ থেকে দায়িত্ব কিছুটা হলেও ঝেড়ে ফেলতে পেরেছে। ক্রোধের অট্টহাস্য থামাতে প্রথম চিরকুটটা তাকেই দেওয়া হল। চিরকুটটা হাতে নিয়ে একবার পড়ল, তারপর আবার মুড়িয়ে রেখে দিল। আবার পড়ল। মুখটা থমথম করছে। ক্রোধকে এখন ক্রোধ বলে চেনা যাচ্ছে। প্রেম চিরকুটটা খুলে বিহ্বল হয়ে গেল। যৌনতা ধীরে সুস্থে পান মুখে দিয়ে যখন চিরকুটটা খুলল, তখন ওর খুব হাসি পেল। কিন্তু একঝলক হাসির বিদ্যুৎ খেলে গেলেও ম্লান হয়ে গেল মুখ। তদন্ত কিন্তু কিন্তু করেও চিরকুট ধরাল প্রতিবাদ আর রহস্যকে। প্রতিবাদের শরীরে অবসাদ। থেবড়ে প্ল্যাটফর্মে বসে আছে। ঝিমুনি লতার ঝাড় বড় একা একা ঝিমোচ্ছে। রহস্যের দু-চোখ লাল। চিরকুট হাতে নিয়ে খোলা-পড়া, খোলা-পড়া করতে করতে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে লেখাটাকে। প্রত্যেকের হাতে একটা করে চিরকুট, একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখছে। পারলে সবাই উঁকি মেরে দেখে কার চিরকুটে কী লেখা আছে। কিন্তু চাইলেও কেউ কাউকে কিছু দেখতে দিচ্ছে না। দুমড়ে-মুচড়ে মুঠোয় রেখে দিয়েছে। শক্ত করে।প্রত্যেকের চিরকুটে লেখা আছে— ‘আপনিই খুনি—আপনি যে খুনি নন প্রমাণ করুন’।
আবোলতাবোল আছড়ে আছড়ে ভায়োলিন মাটিতে ভেঙে ফেলে বলে উঠল, “এবার প্রমাণ কর আমি ভায়োলিন ভেঙেছি।”
“সবার সামনে ভাঙলে আলাদা প্রমাণ আবার কিসের জন্য লাগবে?” তদন্ত ভাঙা স্ট্রিংগুলো হাতে নিয়ে বলল।
আবোলতাবোল মুচকি হেসে বলল, “সবাইকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।”
আবোলতাবোলের ক্লু যেন সবাই ধরে ফেলল। তদন্ত হতচকিত হয়ে যার দিকেই তাকায় সেই বলে, “আমি তো দেখিনি কিছু।”
প্রেম আর প্রতিবাদ শুধু হাতের মুঠোয় চিরকুটটাকে নিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
“ভাঙা স্ট্রিংগুলোই প্রমাণ কেউ ভেঙেছে,” বলে ওঠে তদন্ত।
হলুদ ফিকে স্তব্ধ শব্দের গায়ে সংখ্যা জেগে জেগে ওঠে। ওখানে পড়ে আছে শব্দ আর সংখ্যা। কোনো ‘ঈষৎ রাগ’ বলে কেউ নেই। যেন তার অস্তিত্বই ছিল না। কৃত্রিম মেধা একটু চোখ পিট পিট করে এদিক-ওদিক তাকাল। বাসনা প্রেমের কাছাকাছি বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সবই কপাল।”
“এখানে সবাই খুনি,” তদন্ত বলে উঠল।
কৃত্রিম মেধা ভাঙা স্ট্রিংগুলো ধরে ধরে দেখতে দেখতে বলল, “এখানে কেউ খুন করেনি।”
রহস্য বলে উঠল, “তুমি কী বলতে চাইছ? বাইরের থেকে কেউ এসে খুন করে দিয়ে চলে গেছে?”
“না, আমি তাও বলতে চাইনি।”
“তাহলে?”
কৃত্রিম মেধা চারপাশে একবার তাকাল। নীল ভোমরা উড়ছে, নীল টিলার উপর টিপের মতো সূর্য। “আমি বলতে চাইছি, আপাতদৃষ্টিতে ঈষৎ রাগ বলে কেউ নেই। তার ভিতরের শব্দগুলো সংখ্যা হয়ে গেছে। সে যে আদৌ খুন হয়েছে তার প্রমাণ এখন কোথায়?”
“তাহলে তুমি কী বলতে চাইছ?” রহস্যের দু-চোখে প্রশ্ন।
কৃত্রিম মেধা বলে উঠল, “আমি বলতে চাইছি এটা কোনো খুন নয়, দুর্ঘটনা। ঈষৎ রাগের ভিতর থেকে বেরোনো শব্দগুলো কেমন যেন হতচকিত। তারা আগ্রাসী নয়। তারা বদলে দিতে চেয়েছে নিজেদের অস্তিত্বকে। দুর্ঘটনা হলেই এটা সম্ভব। খুন হলে শব্দগুলো আগ্রাসী হয়ে উঠত। তাদের অস্তিত্ব বদলে ফেলত না।”
তদন্ত গম্ভীরভাবে বলল, “তুমি খুনকে ম্যানিপুলেট করে দুর্ঘটনায় বদলে ফেলতে চাইছ, আমি তা হতে দেব না। আমি তোমাকে গ্রেফতার করব।”
প্রতিবাদ বলে উঠল, “কোনো রকমে একজনকে কাঠগড়ায় তুলে দিলেই তদন্ত শেষ হয়ে যায় না। আমি বলছি আমি খুনি নই, কারণ আমিই তদন্তকে ডেকে এনেছি সত্যি জানবার জন্য।”
রহস্য হেসে বলে উঠল, “এমনও তো হতে পারে, তুমি তদন্তকে তড়িঘড়ি ডেকে এনেছ যাতে কেউ তোমাকে সন্দেহ না করতে পারে।”
সারা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে নীরবতা নেমে আসে। এক অসম্ভব সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে রহস্য আর সবাই প্রতিবাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
(ক্রমশ)
দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ৫)



