বাড়ি থেকে ঘর – পর্ব ৩

evening at the old gate

সুমনা উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল— অনেকদিন আগে তোমাদের বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি কিছু কথা বলেছিলাম দেবাদা। আমি আজও সেই কথাগুলো মেনে চলি।
দেবাশিষ আর কত অপরাধবোধে জ্বলবে? সুমনা তাকে আরও কিছুটা জ্বলতে সাহায্য করে গেল।
তুহিনার বাড়িতে বসে বাড়িটা নিয়ে কথা হচ্ছিল। তুহিনা আর ওর হাজব্যান্ড নীলাদ্রি, দুজনেরই মত ঐ জায়গায় নিজেদেরই কিছু করা উচিত। তুহিনাকে দেবাশিষ বলল— ছোটকাকা আর সৌরাশিষ দুজনের কী মত?
—ওরা চায় জায়গাটা প্রমোটারকে দিয়ে দেওয়া হোক। সৌর বলছিল, আমাদের সবারই নিজস্ব বাড়ি আছে। সুতরাং নতুন করে বাড়ি তো আর করতে যাব না আমরা। তার চেয়ে প্রমোটার আমাদের যে ক’টা ফ্ল্যাট দেবে, সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হবে।
—মায়ের মত নেই।
—জেম্মা বলেছে আমাকে। তোর কী মত?
—মায়ের মতই আমার মত। তোরা কী চাস?
—আর যাই হোক, প্রমোটারকে দেওয়া হবে না।
এবারে দেবাশিষ সুমনার কথাগুলো ওদের বলল। তুহিনা সঙ্গে সঙ্গেই বলল— সুমনা কিছু ভুল বলেনি। পাড়াতেই এক বড় প্রমোটার আছে। শ্যামদাস প্যাটেল। বর্ধমানে অনেক বড় বড় প্রজেক্ট করছে। ওর নজর আছে জায়গাটার ওপর। আমাকে দু-একবার হিন্টস দিয়েছে। আমি বলেছিলাম, ওই বাড়িতে আমাদের শৈশব, কৈশোর ছড়িয়ে আছে। কিছুতেই ঐ বাড়ি ভাঙতে দোব না।
—এটা বলেই তুহিনা ভুল করেছে। বাড়ির প্রতি আবেগটা প্রকাশ করে ফেলেছে।
নীলাদ্রির কথায় লজিক খুঁজে পেল দেবাশিষ। হয়তো সেই কারণেই বাড়িটা ভেঙে ফেলতে তৎপর হয়েছিল প্যাটেল। বাড়ি না থাকলে আবেগ কিসের? কিন্তু এত সহজে কারোর দিকে আঙুল তোলা ঠিক নয়। দেবাশিষ বলল— যাই হোক, জায়গাটা নিয়ে কী করা হবে ঠিক করতে হবে। তোরা চিন্তাভাবনা কর।
তারপর হঠাৎ তুহিনাকে জিজ্ঞাসা করল— আচ্ছা, সুমনা বিয়ে তা করেনি কেন রে?
তুহিনা হেসে বলল— ও একটা পাগল। ওর কথা ছাড়।
—পাগল কেন বলছিস! এখনও যথেষ্ট সুন্দরী। যে কোনো ভাল পাত্র এগিয়ে আসবে।

serious conversation in a cozy home

—সে তো অনেকেই প্রপোজাল দিয়েছিল। নীলুরই এক বন্ধু ওকে বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। অপেক্ষা করে করে শেষে বেচারি অন্য একজনকে বিয়ে করে নিল। সুমনাই বিয়ে করতে রাজি নয়।
—কেন রাজি নয়?
তুহিনা নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলল—বল না গো। তুমি তোমার বন্ধুর ব্যাপারে যখন বলেছিলে, তখন তোমাকে কী বলেছিল সুমনা, দাদাকে বল।
নীলাদ্রি সরাসরি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বলল—আচ্ছা দাদা, বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমার সঙ্গে সুমনার কোনো কথা হয়েছিল?
দেবাশিষ এমন পরিস্থিতিতে পড়বে ভাবেনি। একটু ইতস্তত করে বলল—হ্যাঁ। হয়েছিল।
—তুমি কি সুমনাকে বিয়ে করবে কথা দিয়েছিলে?
—না, আমি ঠিক কথা দিইনি। তবে সুমনা বলেছিল, আমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না। আমি তার কথার প্রতিবাদ করিনি।
তুহিনা আর নীলাদ্রির মুখে কোনো কথা নেই। দেবাশিষও কী বলবে বুঝতে পারছে না। এতদিন পরে এমনভাবে প্রসঙ্গটা উঠবে, তা সে ভাবতেও পারেনি। তবুও নীরবতা ভাঙার জন্য বলল—কেন কী হয়েছে? এত পুরোনো প্রসঙ্গ আসছে কেন?
নীলাদ্রি বলল— সুমনা আমাকে বলেছিল, অনেকদিন আগেই সে তোমাকে স্বামী বলে মেনেছে। নতুন করে কাউকে আর সে মেনে নিতে পারবে না।
দেবাশিষ হতভম্ব হয়ে গেল। সুমনা খুবই আবেগপ্রবণ সে জানে। তাই বলে এতটা? কবে, সেই যৌবনের প্রথমদিকের বসন্তে কী কথা হয়েছিল, তা ধরে বসে আছে? কোনো মানে হয় এসবের? দেবাশিষ অবাক হয়ে নীলাদ্রিকে বলল—কোনো মানে হয়? কী একটা ক্যাজুয়াল কথা ধরে বসে আছে সুমনা?
তুহিনা প্রতিবাদ করল—তোর কাছে ব্যাপারটা ক্যাজুয়াল হতে পারে, কিন্তু ওর কাছে ওটাই স্বতঃসিদ্ধ। ওর আবেগের অপমান করিস না দাদা।
দেবাশিষ বুঝল, তার ঐভাবে রিঅ্যাক্ট করা ঠিক হয়নি। ব্যাপারটা চাপা দেওয়ার জন্য বলল—যাকগে, ওসব আলোচনা ছাড়! বাড়িটা নিয়ে চিন্তাভাবনা কর। আমাকে দু-এক দিনের মধ্যে ফিরতে হবে।

a warm conversation

শ্যামদাস প্যাটেল লোকটা মহা ধুরন্ধর। নিজে যেচে দেবাশিষের সঙ্গে দেখা করতে এল। সকালে সবে দেবাশিষ মুখ হাত ধুয়ে ড্রইং রুমে চায়ের কাপ নিয়ে বসেছে, এমন সময় তার আবির্ভাব। ভাগ্যিস, তুহিনাও ছিল! নাহলে এই লোককে সামলানো দেবাশিষের সাধ্যের বাইরে। সোজা ড্রইংরুমে এসে হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বলেছিল—নমস্কার দেবাশিষ বাবু, আমি শ্যামদাস প্যাটেল। আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। একটু সময় দেবেন প্লিজ।
দেবাশিষ লক্ষ্য করল, লোকটা কথা বলার অনুমতি চাইল না। জানিয়ে দিল, সে কথা বলতে এসেছে। আরো একটা বিষয়, লোকটা যে অবাঙালি তা বোঝার উপায় নেই। দুর্দান্ত বাংলা বলে। দেবাশিষ লোকটাকে ভাল করে দেখল। প্রায় তারই সমবয়সী লোকটার সব ক’টা আঙুলে পাথর বসানো সোনার আংটি। গলায় মোটা সোনার চেন। টিপিক্যাল প্রমোটার প্রমোটার চেহারা। এই বয়সেই বেশ বড় ভুঁড়ি। তাকে এইরকম ভাবে জরিপ করতে দেখে প্যাটেল বলল—কী ভাবছেন দেবাশিষবাবু?
দেবদশিষ তুহিনার দিকে তাকাল। তুহিনা প্যাটেলকে বলল—আপনি বসুন। আমি আপনাকে চা দিতে বলি।
—আরে না না। আমি চা খেয়ে এসেছি। আমি সোজাসুজি একটা কথা বলি। আপনাদের পৈতৃক বাড়িটা ভেঙে গেছে দেখলাম। আমি ঐ জায়গাটায় একটা কমপ্লেক্স করতে চাই। তাতে আপনাদেরও লাভ হবে। বিল্ডিং তৈরির কাজ আমার। আপনারা ফিফটি পারসেন্ট ইউনিট পাবেন।
দেবাশিষ কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই তুহিনা বলল—আমরা এখনও ঐ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। বলেই তুহিনা উঠে দাঁড়াল। নমস্কার জানিয়ে বলল—আমাকে উঠতে হবে শ্যামদাসবাবু। আমার চেম্বার আছে।
—ঠিক আছে। আমি দেবাশিষবাবুর সঙ্গে কথা বলছি।
—দাদা একা বাড়ির ব্যাপারে কোনো কথা বলবে না। অন্য কোনো কথা থাকলে বলতে পারেন।
শ্যামদাস প্যাটেলের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল—ঠিক আছে। আপনারা ডিসিশন নিন। দয়া করে আমার প্রপোজাল মাথায় রেখে ডিসিশন নেবেন।
শ্যামদাস প্যাটেল চলে যাওয়ার পর দেবাশিষ বেশ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল—এ তো ডেঞ্জারাস লোক রে! সুমনার কথা ঠিক মনে হচ্ছে আমার।
তুহিনা দাদার দিকে একবার তাকিয়ে ঘরের ভেতরে যেতে যেতে বলল—সুমনা ঠিকই বলে। ও আমাদের পরিবারকে নিজের পরিবার বলেই মনে করে। তুই শুধু ওকে চিনতে পারলি না দাদা।

casual conversation

তুহিনা ঘরের ভেতর চলে গেল। ওকে চেম্বারে যেতে হবে। দেবাশিষ ড্রইংরুমেই বসে রইল।
পুরোনো দিনের কথাগুলো মনে পড়ছিল দেবাশিষের। সুমনা তাদের বাড়িতেই বেশির ভাগ সময় থাকত। বেশির ভাগ সময় মানে, সুযোগ পেলেই চলে আসত। আর আসা মানে, অবধারিত ভাবেই তার রুমে চলে আসত। ইনিয়ে বিনিয়ে কত কথাই যে বলত! এতদিনে দেবাশিষের মনে হচ্ছে, সেই ছোট্টবেলা থেকেই মেয়েটা তাকে ভালবাসে। একবার পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট না হওয়ায় বাড়ি থেকে সুমনাকে বকাঝকা করেছিল। ও এমনিতে খুব বুদ্ধিমতী। যে কোনো কারণেই হোক, ওর রেজাল্ট সেবার ভাল হয়নি। স্কুলের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা ছিল সেটা। ওর দাদা, সোমেন দেবাশিষকে বলেছিল—তুমি ওকে একটু ধমকিও তো দাদা। তোমার কাছেই তো থাকে! পড়াশোনাটা মন দিয়ে করতে বলো।
—ও তো বেশ বুদ্ধিমতী রে! কোনো কারণে হয়তো এবারে রেজাল্ট খারাপ হয়ে গেছে। ফাইনাল পরীক্ষায় নিশ্চয়ই মেকাপ করে নেবে।
—তাই যেন করে। তুমি বললে ও শুনবে। আমাকে তাড়িয়ে উড়িয়ে দেয়।
সোমেন চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই যথারীতি সুমনা তার কাছে এসেছিল। দেবাশিষের সামনে কোমরে দু’হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল—আমার নামে দাদা তোমাকে কী লাগিয়ে গেল?
ওর বলার ভঙ্গি দেখে দেবাশিষ হেসে ফেলেছিল। বলেছিল—তুই মন দিয়ে পড়াশোনা করছিস না, তাই বলল।
—আর কী বলল?
—বলল, তোকে যেন আমি ভাল করে বোঝাই।
সুমনা তাড়াতাড়ি দেবাশিষের একেবারে কাছে এসে বলেছিল—তাহলে বোঝাও। দেরি করছ কেন? আচ্ছা, আমি ভাল রেজাল্ট করলে তুমি খুশি হবে?
—নিশ্চয়ই খুশি হব। খুব আনন্দ পাব।
—তাহলে এবার থেকে আমি ফার্স্ট হব, সব পরীক্ষায়।
সুমনার কথায় হেসে ফেলেছিল দেবাশিষ।
—কী হল রে তোর? একা একা বসে হাসছিস কেন?
মায়ের কথায় চমক ভাঙল দেবাশিষের।
—না, মা। তেমন কিছু নয়। তুমি কি কিছু বলছিলে?
—তুহিনা ঐ বদমাশ লোকটার কথা বলছিল। ওকে যেন কোনোভাবেই আমাদের জায়গাটা দিবি না।
—লোকটা যে সুবিধের নয়, তা বোঝা গেল। আমাকে সুমনার সঙ্গে একবার কথা বলতে হবে মা।
—তাই বল। ওকে বরং আসতে বল।
—বলব। আমি এখন বেরুচ্ছি মা।
দেবাশিষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। সুমনার সঙ্গে দেখা হওয়াটা খুব জরুরি। এতদিন পরে তার মনে হচ্ছে, সে সত্যিই সুমনার ভালবাসার মূল্য দেয়নি। মেয়েটা কোন ছেলেবেলা থেকে তাকে ভালবেসে এসেছে, অথচ সে বোঝেই নি। আচ্ছা, সত্যিই কি সে বোঝে নি? নাকি বোঝার চেষ্টা করেনি? একটা ইয়ং মেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল, সহজ ভাষায় তাকেই বিয়ে করবে বলে দিল, এরপরেও না বোঝার কী ছিল? দেবাশিষের নিজেকে আজ বড় স্বার্থপর মনে হচ্ছিল।

quiet conversation

এখনও সুমনার নিশ্চয়ই কলেজ যাওয়ার সময় হয়নি। দেবাশিষ খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগল। ওদের বাড়িতে পৌঁছানোর পর বেশ হাঁফাচ্ছিল দেবাশিষ। সুমনা কলেজ যাবে বলে তৈরি হচ্ছিল। ওকে ঐ অবস্থায় দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল—কী হল? এমন হাঁফাচ্ছ কেন? কোথায় গিয়েছিলে?
দেবাশিষ হেসে ফেলল। বলল—দাঁড়া, একটু দম নিতে দে আগে!
সুমনা সোফায় দেবাশিষের পাশে গিয়ে বসল। ওর গা থেকে খুব সুন্দর একটা পারফিউমের গন্ধ আসছিল। দেবাশিষ সুমনার মুখের দিকে অপলকে তাকিয়েছিল। কী সুন্দর লাগছে সুমনাকে! এখনও যথেষ্ট সুন্দরী সুমনা। তার এই সৌন্দর্য এতদিন পরে দেবাশিষের চোখে পড়ল?
—কী হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছ? বলবে তো নাকি?
—হাঁ করে কী দেখছি জানিস?
—আমি কী করে জানব।
—তুই আগের থেকেও আরো সুন্দর হয়েছিস। কী ভাল যে লাগছে তোকে!
সুমনার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। স্বাভাবিক স্বরে বলল—ও সব ছাড়। এমন হাঁফাচ্ছ কেন?

ক্রমশ

বাড়ি থেকে ঘর – পর্ব ২


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top