— কটা বাজে?
— বোধহয় গোধূলি বেজে পাঁচ মিনিট
— আপনি কোথায় যাচ্ছেন ভাই?
— আমি আসলে হতাশা জেলা থেকে ব্যথা পরগনায় ডেইলি প্যাসেঞ্জারী করি।
— আমি হকারি করি মিছিল গ্রাম থেকে মিটিং নগরে। আপনার নামটা জানতে পারি?
— আমি যন্ত্রণা। আপনি?
— আমি আক্রোশ।
— আমি হতাশা জেলা থেকে প্রান্তিক মানুষের অনর্থ নিয়ে ব্যথা পরগনায় ফেরি করি। ব্যথা পরগণা অনর্থ কেনে, সাথে অভিজাত ‘আমিত্ব’ থাকে ফ্রি। ‘আমিত্ব’ নিয়ে ডেইলি প্যাসেঞ্জারী করতে করতে কিছু বিক্রি করি ট্রেনে। ট্রেনে ‘আমিত্ব’ বেচি, ফ্রি দিই না। অনর্থ শুধু ব্যথা পরগনার জন্য থাকে। আপনি কি করেন?
— মিছিল গ্রাম থেকে স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মিটিং গ্রামে বিক্রি করি। মিটিং গ্রাম থেকে বিক্ষোভ আর কর্মসূচি নিয়ে মিছিল গ্রামে
আসি। রাতের আলোতে আর দিনের অন্ধকারে সন্ত্রাসহীন সন্ত্রাসী ধর্মকে ধিকিধিকি তৈরি করি। ব্যবসাপত্র খারাপ নয়।
— ব্যবসাপত্র খারাপ নয়, হতাশা জেলায় আত্মহত্যার ফ্যাক্টরি তৈরি করেছি। মনখারাপ হলেই এখন ওরা কেউ বৃষ্টি দেখে না, আকাশ দেখে না, সবুজ গাছ বা পুকুর দেখে না, পুকুরে টুকুস কুটুস ঢিল ছোঁড়ে না।বড় বড় হাইরাইজে তৈরি আত্মহত্যার ফ্যাক্টরিতে টাকা খরচ করে মৃত্যু কিনে নেয়। ওদের আত্মার মধ্যে জমা অনর্থ চেঁচে নিয়ে বিক্রি করি ব্যথার নগরে। দুরকম লাভ। আত্মহত্যার ফ্যাক্টরিতে টাকা দিয়ে ঢুকতে হয়,তাতে যেমন লাভ, তেমনি লাভ অনর্থ বিক্রি করে। ব্যথা নগরে অনর্থ কেনার জন্য সবাই বসে থাকে। আপনার মিছিল গ্রাম, মিটিং গ্রাম কেমন যদি একটু বলেন আক্রোশ ভাই।
— মিছিল গ্রামে সকালে সনাতনী ধর্ম নিয়ে মিছিল করতে করতে যাওয়া এবং ক’জন যোগ দিল, কীভাবে লোক যোগাড় করতে হবে সেই স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা আবার সন্ধ্যায় ইসলামিক মিছিল বের হয়,লোক যোগাড়, আর আবার তার স্ট্র্যাটেজি। আক্রোশ যেন কিছুতেই না কমে সেটা দেখা, ব্রেইন রট করানো আমার কাজ। এরজন্য আমি অবশ্যই এক অচানক সংস্থা থেকে পেমেন্ট পেয়ে থাকি। তবু আমার পরিচয় হকার। আপনাকেই গোপন তথ্যগুলো দিলাম। সবাইকে তো বলার নয়!
— আমাকেই বা গোপন তথ্য দিলেন কেন?
— জানি না বড় আপন মনে হল। ঐ যে আপনি বললেন গোধূলি বেজে পাঁচ মিনিট।
সেই মুহূর্তে মনে হল আপনি আমার বহুদিনের চেনা।
— জানেন, ব্যথা নগরের বাড়িগুলোর জানালায় বড় বড় কপাট আঁকা, কিন্তু,
সত্যিকারের জানালা নেই। সরু সুড়ঙ্গের মত একটা দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।
আর রয়েছে পাখির ফেলে যাওয়া বাসা সমেত ঘুলঘুলি। ব্যথা নগরের মানুষ আমার কাছ থেকে অনর্থ কেনে আর আর্থারাইটিসের ব্যথার মত ওদের একটা করে ‘আমিত্ব’ আমি ফ্রি দিই। তারপর সারা শরীরময় আমিত্ব নিয়ে ওরা ব্যথিত হয়, আরও আরও আমিত্বের প্রয়োজনে আরও আরও অনর্থ চায়।
— কটা বাজে আপনার ঘড়িতে?
— আমার ঘড়িতে জ্যোৎস্না বেজে পনের। আপনার?
— আমার ঘড়িতে সন্ধ্যা বেজে তের।
— আপনার ঘড়িতে যখন জ্যোৎস্না বেজেছে তখন বিক্রি —বাটা নিশ্চিত ভাল হবে। আমার ঘড়িতে সন্ধ্যা বাজে,তার মানে রাতের দিকে কিছু ঘটতে চলেছে।
— যেদিন আমার ঘড়িতে জ্যোৎস্না বাজে সেদিন কবির কাছে গিয়ে বসি। কবির বাড়িতে সংগ্রহে রয়েছে অনেক পাখির বাসা। কবির খুব সর্দি থাকে সারা বছর। অনর্থ কিনে কিনে ঐ পাখির বাসায় জমিয়ে রাখে আর সমস্ত আমিত্ব সর্দি হয়ে যায়। যেদিন জ্যোৎস্না বাজে আমার ঘড়িতে সেদিন কবি কলম নিয়ে বসেন। পাখির বাসার অনর্থ কালিতে ছাপা হবে কিন্তু প্রকাশ হবে না এমন কবিতা লিখে চলেন।
কবির জ্যোৎস্না রঙের সর্দিরা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। সমস্ত চরাচর জুড়ে কথাদের ওয়েভ ফাংশন ধরতে গিয়েও তাদের ধরা হয়না আমিত্বের খাঁচায়। আমি দেখি সর্দি—গর্মিতে কত অসহায় কবি। শুধু তাকের উপর নিজের বইয়ের দিকে তাকিয়ে দিন কেটে গেল… আপনার ঘড়িতে সন্ধ্যা বাজে; এখন তাহলে কী ঘটবে!
— কিছু একটা ঘটবে, সন্ধ্যা বাজলে মিছিল গ্রামে অদৃশ্য কষ্টের বালি, ভাঙ্গা চশমা আর সত্যের উদ্ভাস উদ্ভ্রান্ত হবে, মিটিং গ্রামের ধূসর পাথুরে মাটিতে রাগেরা আগুন পোহাবে। সন্ত্রাস রাতের শ্বাসকষ্টের কারণ হবে, আক্রোশ বিক্রি করবে
আজ ‘অপ্রতিভ দুঃখ’ আর ‘অভিজাত গর্ব’।
— বেশ, বেশ। পরের স্টেশনে আমার বন্ধু সংশয় আসবেন। উনি ভয় নগরীতে থাকেন। আলাপ হলে আশা করি ভালো লাগবে।
— আজ অন্তরাল স্টেশনে বেশ অনেক্ষণ ট্রেনটা দাঁড়ালো। অনেকদিন বাদে তোমার সঙ্গে দেখা। আত্মহত্যা ফ্যাক্টরির কাজ কেমন চলছে? হতাশা জেলায় একদিন ভিজিট করতেই পারি, যদি তুমি বল। কিছু সংশয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে আসব।
ও—ওনাকে তো ঠিক চিনলাম না
— উনি আক্রোশ। মিছিল গ্রাম থেকে মিটিং গ্রামে ডেইলি প্যাসেঞ্জারী করেন।
আরে বোসো না। বোসো তো সংশয়।ফোর্থ সিটে একটু চেপে চেপে বসলে হয়ে যাবে। যদি হয় সুজন… বাই দ্য ওয়ে তোমার ঘড়িতে কটা বাজে গো?
— আমার ঘড়িতে কোনো সময় নেই। শুধু কে দেখছে আর কাকে দেখা হচ্ছে এই দ্বিধাটুকু জেগে থাকে ঘড়ির কাঁটায়। বলতে পার আমার ঘড়িতে প্রশ্ন বেজে অনন্ত।
— কিছু দ্বিধা বেচতে পারবেন? সামান্য কিছু দ্বিধা ? মিটিং গ্রামে নামাতে পারলে প্রচুর লোক হবে আবার মিছিল গ্রামে দ্বিধা থেকে তৈরি হবে মিছিলের সম্ভাবনা।
— ঘড়ির কাঁটায় থাকা দ্বিধা বেচব কীভাবে?
— যেভাবে সময় সম্ভাবনা বেচে সেভাবে।
— আমি সম্ভাবনার মধ্যে ফাঁকা শব্দের প্রতিধ্বনি ঢুকিয়ে দেব। তারপর শুরু হবে ভাঙচুর খেলা। আমি সংশয়, এটুকু বন্ধুদের জন্য করতেই পারি।
আরে, আলো—ছায়া বিক্রি হচ্ছে খাবে নাকি? বেশ টক ঝাল মিষ্টি আলো—ছায়া
— না বাবু আমি আলো—ছায়া বিক্রি করি না।
— আমি কিছু শব্দ বিক্রি করি যেগুলো কড়মড় করে, খড়খড় করে খাওয়া যায়, চাকুম —চুকুম চিবানো যায়।খেয়ে দেখতে পারেন। বিপ্লব লজেন্স, বিদ্রোহ চুইংগাম, ষড়যন্ত্র ক্যাডবেরি। কোনটা চাই আপনার?
— আমাকে চারটে ষড়যন্ত্র ক্যাডবেরি দাও তো ভাই। মিটিং গ্রামে চারজনকে খাওয়ালেই কেল্লাফতে।
— এছাড়া কিছু নেই? দ্বন্দ্ব বিস্কুট?
— আমি তো বিস্কুট বেচি না দাদা
— বেশ বেশ। আমরা আর কিছু নেব না ।
আপনার বিক্রি ভালো হোক।
— যা বলছিলাম সংশয় তোমার ভয় নগরীর কথা একটু আক্রোশকে বল।
— ভয় নগরীর উপকন্ঠে একটা মন্দির, মসজিদ আর গির্জা আছে। প্রত্যেকটির দূরত্ব একে অপরের থেকে ছয় কিলোমিটার। এরাই মূলতঃ ভয় নগরীর রক্ষাকবচ। এরা আছে বলে ভয় নগরী বেঁচে আছে। ভয় নগরীর বাসিন্দারা তাদের ভয়ের সংস্কার নিয়ে গর্বিত। ওদের দরজার মধ্যে ঘুলঘুলি আর ঘুলঘুলি ঢাকা থাকে ঢাকনা দিয়ে। ওরা আমাকে ছাড়া কাউকে খুব একটা বিশ্বাস করে না। শুধু ঈর্ষা মাঝে মাঝে পিছনের ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ওঠে।
আতস কাচ দিয়ে ওরা একে অপরকে দেখে। তারপর একে অপরকে প্রবল ভয় পেয়ে মন্দির, মসজিদ, গির্জায় চলে যায়। —তারপর?
— ভয় নগরীতে তারপর বলে কিছু হয় না। ঘটে থাকা সবকিছু অভিনয় করে ভয় নগরীর বাসিন্দারা। যা কিছু সম্ভাবনা সব ভয় নগরীর উপকন্ঠে গিয়ে বিতাড়িত হয়।
এখন অনিশ্চয় নগরীতে ট্রেন ঢুকছে। এখান থেকে তো পরিসংখ্যানবিদ ওঠেন।
— এখানে এখানে বসুন। হয়ে যাবে হয়ে যাবে, সংশয় একটু সহযোগিতা করবেন? উল্টো দিকের চেয়ারে মনে হয় এখনই একজন নামবেন।
— এঁ.. হ্যাঁ হ্যাঁ। আপনি বসুন পরিসংখ্যান বিদ দাদা। আমি একটু দাঁড়াই। ফোর্থ সিটে বসে বসে কোমর ধরে গেছে।
— আরে না না। দাঁড়িয়ে গল্প করতেই ভালো লাগবে।
— আপনার ঘড়িতে কটা বাজে? আমি সংশয়াকুল।
— আমার ঘড়িতে ট্রেণ্ড বাজে ।সময় না। আমার ঘড়িতে বাজে ব্যত্যয় তীব্র।
— মানে?
— মানে?
— মানে?
— মানে কিছুই না শহরগুলো তাদের গড়পড়তা থেকে ডেভিয়েটেড হচ্ছে, দূরে দূরে সরে যাচ্ছে। হতাশা হতাশার নিজস্ব বিস্তার থেকে সরে আত্মহত্যার মজলিসে ঢুকছে। ব্যথা নগরীতে ‘আমিত্বে’র ভোগ।আমিত্ব একধরনের ভ্যারিয়েবল ভ্যারিয়েন্স।আমিত্ব শূন্যের দিকে যত এগোয় তত ব্যথা নগর শান্ত হতে থাকে আর আমিত্ব যখন অসীমের দিকে এগোতে থাকে তখন মিছিল গ্রাম দুরন্ত অঙ্গার আর মিছিল, গ্রাম, ধোঁয়া ওঠা চিৎকার…
(ক্রমশঃ)




খুব ভালো লাগলো। শব্দ জাদু টানতে টানতে নিজের কবিতার কাছে ফিরিয়ে আনলো।’আমার রোদের গানে জ্যোৎস্না বাজাও তুমি’ । যদিও :বাজা’শব্দটি এখানে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত তবুও তোমার শব্দ ব্যবহারে খুব আনন্দ পেলাম। কথার আত্মা ছোঁয়ার আনন্দ তো আছেই।
খুব খুব আনন্দ পেলাম 🙏 আমার অনেক বড় প্রাপ্তি 🙏