
ছোটবেলায় মানুষের মনের মধ্যে যে কত রকমের ইচ্ছে থাকে! কত রকমের ইচ্ছে জাগে! সেসব ইচ্ছেরা যেমন আপনা-আপনি জন্মায়, তেমনই আপনা-আপনি মরেও যায়। আজকের তুমুল ইচ্ছেটার সঙ্গে ক’দিন পরে হয়তো আর দেখাও হয় না, তবু ইচ্ছেরা বেড়াতে আসে সেই ছোট্ট সুন্দর নিষ্পাপ মনের অভীপ্সায়! তাকে নিয়ে কয়েকদিন মেতে থাকে শিশুটির মন। স্বপ্ন দেখে। ইচ্ছের ঘুড়িটি ওড়ে তার নির্মল আকাশ জুড়ে। আর শিশুটি নিজের অলক্ষ্যেই দৌড়ায় জীবনের আগামী পথের দিকে।সব শিশুদের তেমনটা হয় কি না জানি না, তবে আমার হতো। তবে সেই সঙ্গে আমার আরেকটি জিনিস হতো—সেটা হল, আমার ছোট থাকতে একদম ভালো লাগত না। কী করে লাগবে? আমাদের ছোটবেলায় ছোটদের না কেউ ভালোবাসত, না আদর করত! না মূল্য দিত কেউ। অন্তত আমার কপালে তো সেসব কখনও জোটেনি। সংসারের অতগুলো সদস্যের ভেতরে আমিও যে একটা মানুষ, আমারও যে একটা মন আছে, সেই মনেরও যে কষ্ট হয়, তারও ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে বড়রা তাকে মূল্য দিক, তার সঙ্গে দুটো কথা বলুক, গল্প করুক, কাছে ডেকে গায়ে-মাথায় একটু হাত রাখুক স্নেহের! না, আমার জীবনে তেমনটা ঘটেনি কখনও। ফলে একটা অমোঘ একাকিত্ব সারাক্ষণ ঘিরে থাকত আমার সারা শৈশববেলা জুড়ে। আর একলা মস্তিষ্কের খোলা দরজা দিয়ে কত রকম অলীক ভাবনা যে এসে ভিড় করে তার ইয়ত্তা নেই
আমার ঠাকুর্দা এবং ঠাকুমা দু’জনেই ছিলেন কৃষ্ণভক্ত। গলায় কণ্ঠীর মালা। নিত্য স্নানের পর তিলকমাটি দিয়ে কপালে রসকলি আঁকতেন। দুই বাহুতে শ্রীকৃষ্ণের চরণের ছাপ। ঝড়-বৃষ্টি-তুফান যাই হোক, সন্ধে হলেই ঠাকুমা টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে অন্তত একবার আখড়ায় যাবেনই। সেখানে রাধামাধব রয়েছেন। রয়েছেন আরও অন্যান্য সতীর্থ ভক্তবৃন্দ। আমিও সঙ্গে যেতাম। ঠাকুমা যখনই যেখানে হরিনাম সংকীর্তন শুনতে যেতেন, সেখানেও সঙ্গে আমি।
আমাদের বাড়ির কাছেই তহবাজারে প্রতি বছর বিরাট বড় করে হরিসংকীর্তনের আয়োজন করত বাজার কমিটি। সেখানে দু’-তিন মাস ধরে একটানা কীর্তন চলত। সে এক মহা উৎসব। বিভিন্ন জায়গা থেকে ভালো ভালো, নামকরা কীর্তনের দলকে ভাড়া করে আনত। একেক দলে আট-দশজন করে কীর্তনীয়া। আর প্রত্যেক দলেই থাকত চার-পাঁচ বছর বয়সের একটা-দুটো বাচ্চা ছেলে-মেয়ে। তারাও নেচে নেচে খুব ভালো কীর্তন করত। বিভিন্ন আধুনিক বাংলা গানের সুরে সেই কীর্তন শুনতে যে কী ভালো লাগত! লোকেরা মুগ্ধ হয়ে সেই বাচ্চা কীর্তনীয়াদের কত কত টাকা উপহার দিত! সেই টাকার মালা ঝুলত তাদের গলায়।
আমার খুব ইচ্ছে করত, আমিও যদি ওদের মতো কীর্তনের দলে দলে ঘুরে কীর্তন করে বেড়াতে পারতাম! সেখানেই কীর্তনের অংশ ছিল রাস—রাস উৎসব।
রাস জিনিসটা যে আসলে কী, সে সম্পর্কে তখন আমার কোনও ধারণাই ছিল না। ওই বয়সে থাকার কথাও না। কিন্তু ঠাকুমার সঙ্গে আমার রাস দেখতে যাওয়া চাই। প্রথম যেদিন প্রত্যক্ষ করলাম রাস উৎসব, উঃ সে যে কী ভীষণ মুগ্ধতা! কী যে বিস্ময়কর অনুভূতি! কী মায়ার সেই স্বপ্ন-স্বপ্ন রঙিন জগৎ!
বছর চার-পাঁচেক বয়সের ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলে কৃষ্ণ সেজেছে, তারই সমবয়সী রাধা। আমিও তো তাদেরই বয়সী! রাসলীলা দেখতে দেখতে বিহ্বল হয়ে আমি একবার কৃষ্ণ হয়ে যাচ্ছি, একবার রাধা। মনে মনে আমারও পরনে তখন রাধাকৃষ্ণের মতো অপূর্ব সাজ! হাতে বাঁশি, মাথায় ময়ূরের পালক-দেওয়া ফুলের মুকুট। সারা শরীর জুড়ে ঝকঝকে অলংকার। আমি কৃষ্ণ হয়ে সেই মোহময় বাঁশি বাজাচ্ছি, আবার রাধা হয়ে সেই বিরহী বাঁশির পেছনে ছুটছি ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ করে। আহা! আহা! প্রেম আর বাঁশি, বাঁশি আর বিরহ—আমার না-বোঝা মনের অলৌকিক অনুভবে তখন মিলেমিশে একাকার!
বাঁশির সুরের যে কী মধুর টান, যে রাস উৎসব না দেখেছে সে কখনও বুঝতে পারবে না। বাঁশি শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে সদ্য মুখস্থ করা রবিঠাকুরের ‘ফাল্গুন’ কবিতার সেই লাইন—
“পান্থ বাজায় বাঁশি আনমনে চলে…”
কিন্তু অধরা কৃষ্ণকে শ্রীরাধিকার প্রাণপণ খুঁজে খুঁজে ফেরা আর না-পাওয়া, ব্যর্থ হয়ে আবারও খোঁজা, আবার… আবার… এই ব্যাপারটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছে। কেন কৃষ্ণটা ধরা দিচ্ছে না শ্রীরাধিকার কাছে! কেন কষ্ট দিচ্ছে রাধাকে! রাধার কান্নায় আমারও চোখে জল। সে এক উথালপাথাল অবস্থা মনের!
আমি তখন ধর্ম বুঝি না, ঈশ্বর বুঝি না, রাধা-কৃষ্ণ কে, কী তাদের ধর্মীয় পরিচয়—সেসব কিছুই জানি না। শুধু বুকের মধ্যে একটা সাধ, একটাই স্বপ্ন—আমিও কৃষ্ণ হবো। আমিও এভাবে রোজ রাতে কীর্তন মঞ্চে মঞ্চে রাসলীলা করে বেড়াব। রাতভর আমার স্বপ্নে, জাগরণে তখন শুধুই রাধা আর কৃষ্ণ। রাত্রি কাঁপানো সেই ‘হরি হরি’ বোল! রাত্রি তো নয়, যেন স্বর্গ! অদ্ভুত অবর্ণনীয় সেই নিশীথকালীন পরিবেশ!
রাত তখন কত হবে? বারোটা কি একটা! রাত গভীর হলেই তো রাস উৎসব শুরু হয়। একে তো গভীর রাতের ভাষাহারা আশ্চর্য মুগ্ধতা থাকেই! কেমন গা-ছমছমে এক রোমাঞ্চিত শিহরণ। তখন সবকিছুকেই যেন অদ্ভুত রোমাঞ্চকর আর মায়াময় লাগে। হয়তো বা সে কারণেই সেই ছোট্টবেলা থেকেই রাতের প্রতি আমার অমোঘ ভালোলাগা।
আমি দেখতাম, রাস শুরু হওয়ার আগে আগে দর্শকাসনের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হত। গাঢ় অন্ধকার ঘিরে ধরত চারপাশের সবকিছু। আমি টের পেতাম, বুঝতে পারতাম—নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, সেই অন্ধকারে অনেকেই নামসংকীর্তন শুনতে শুনতে ভক্তিবিহ্বল হয়ে কাঁদছেন, অঝোরে অশ্রু বিসর্জন করে চলেছেন; কিন্তু চোখ সয়ে যাওয়া অন্ধকারে কারও মুখ পরিষ্কার দেখা যেত না। শুধুমাত্র রাসমঞ্চের জায়গাটি জুড়ে জ্বলত নীলচে রঙের খুব মৃদু জ্যোৎস্নার মতো আলো। সেই আধো-আলো আধো-অন্ধকারে আমার শিশু শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কত অনুভূতির যে জন্ম হতো! মনের মধ্যে কত সাধ, কত স্বপ্ন, কত আলো ফুটে উঠত!
মনে হতো—যেভাবেই হোক আমাকে কৃষ্ণ হতেই হবে। আমারও মাথায় থাকবে ওরকম ময়ূরপালকের মুকুট, হাতে থাকবে বাঁশি, আমিও ওরকম আকাশ থেকে পড়ার মতো ঝুপ করে নেমে আসব রাস উৎসব মঞ্চে আর সবাই এরকম বিহ্বল হয়ে মেতে উঠবে আমাকে ঘিরে! সবাই নিতাই-গৌরাঙ্গের মতো ঊর্ধ্ববাহু হয়ে ‘হরিবোল হরিবোল’ ধ্বনি দেবে!
শেষ রাতে ঠাকুমার সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে আমার সেই কৃষ্ণ হওয়ার পরিত্রাণহীন ইচ্ছের কথা ঠাকুমাকে জানাই। মনের মধ্যে বিরাট আশা—ঠাকুমা নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন! আমার কথা শুনে ঠাকুমা হাসেন কি না অন্ধকারে ঠিক বোঝা যায় না, তবে মুখে বলেন,
“আচ্ছা, সে পরে হবেখন। এখন তো বাড়ি চল।”
আমি একবুক আশা আর বিশ্বাস নিয়ে বাড়ি ফিরি।
পরদিন সকালে চা খেতে খেতে আমার সেই কৃষ্ণ হওয়ার ইচ্ছের কথাটা সবার মাঝখানে পরিবেশন করে হাসাহাসি করে ঠাকুমা। আমি একটু দূরে ঘুরঘুর করতে করতে শুনতে পাই, ঠাকুমা আমার মাকে বলছেন,
“ও সোনাবউ, একবার এদিকে আসো। শোনো তোমার মেয়ের ইচ্ছার কথাটা শোনো—বলে কিনা সে নাকি কৃষ্ণ হবে! কীর্তনীয়াদের দলে রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা করে বেড়াবে!”
দাদু ইজিচেয়ারে বসে গড়গড় শব্দে হুকো টানছিলেন। হুকো থামিয়ে বলে ওঠেন,
“বুজসি, ওর হোগায় সুরসুরি দেওন লাগব। হোগায় চুলকানি ধরসে। নাইলে কি আর লীলা করনের সাধ হয়!”
কথাটা বোধহয় শেষও হয়নি, মা এসে আমার চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে, দুমাদুম ঘা কতক দিতে দিতে ঘরে নিয়ে গিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে শেকল তুলে দিলেন। দাঁতে দাঁত পিষে শুধু বললেন,
“তোর বাবাকে আগে ঘুম থেকে উঠতে দে, তারপর তোর লীলা করা আমি বার করছি।”
(চলবে)




অপেক্ষায় রইলাম 🙏