মানুষের জীবনের যত রকমের লোভ লালসা অভীপ্সা উদ্দীপনা ও উন্মাদনার অনুভূতি আছে তার মধ্যে অন্যতম এবং শ্রেষ্ঠ অনুভূতিটির নাম বুঝি যৌনতা! বা বলা ভালো যৌন খিদে। এই খিদে যেমন সুন্দর ও সাবলীল, যেমন শাশ্বত ও শিল্পের পীঠস্থান, তেমনই এই খিদের লাগামছাড়া অনুভূতি এক নিমেষে একটি মানুষের ভেতরের সব সৌন্দর্য ও মনুষ্যত্বকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে মানুষটাকে করে তুলতে পারে চরমতম অমানবিক। কেননা জীবনের ওই একটি জায়গায় মানুষ আর পশুর মধ্যে বোধহয় বিশেষ ফারাক থাকে না। মানুষও যে কী ভীষণ পশুত্বে আক্রান্ত হতে পারে তার প্রমাণ আমার শৈশবের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
‘পশুত্ব’ শব্দটা আজ এত বছর পরে যখন এ-লেখায় আমি ব্যবহার করছি, তখন আমার চেতনার চারপাশে নানাবিধ আলোর ছটা। যে আলোতে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যেকে মিথ্যে বলে পরিষ্কার চেনা যায়। দেখা যায়। কিন্তু যে-সময়ের কথা লিখছি, যে-বয়সের ঘটনার কথা লিখছি, তখন, শৈশবের সেই নির্মল সময়কালে একটি শিশুর পক্ষে না পশুত্ব, না মনুষ্যত্ব, না আলো, না অন্ধকার কোনও কিছুই সেভাবে ঠিকঠাক চেনা জানা সম্ভব হয় না। এমনকী একটি মেয়ের শরীরের মহামূল্যবান (?) অংশ যে তার যৌনাঙ্গ, সেই অঙ্গ যে যত্রতত্র ব্যবহার করতে নেই, ব্যবহৃত হতে দিতে নেই, সেই সব তথাকথিত মূল্যবোধও তো তখন তার কাছে ধোঁয়াশা আর অন্ধকারের ধুলোয় আচ্ছন্ন। তার চেতনায় তখন তো পুতুলখেলা ছাড়া আর কোনও সত্য নেই। খেলাধুলার বাইরে আর কোনও আনন্দ কি থাকে নাকি ওই বয়সের জগৎ জীবন মন কোনওখানে!
তখন আমার বয়স কত হবে? বড় জোর বছর তিন কি চার। তখন শীতকাল এলেই তার সঙ্গে দোসর হয়ে আসত এক আশ্চর্য ধরনের রোদ্দুর। সে রোদ্দুরের গায়ে কেবলই আনন্দ আনন্দ গন্ধ থাকত, সব কিছুকেই যেন ভালো লাগত তখন, আমরা সেই রোদ্দুর গায়ে মেখে অকারণেই দৌড়তাম হলুদ হলুদ শেয়ালকাঁটা ফুলের উড়ন্ত পাপড়ির পেছন পেছন, সে যে কী মজা! পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুখও সে মজার কাছে তুচ্ছ। একেকদিন সকালের টিফিনে থাকত পায়েস আর মুড়ির সঙ্গে সদ্য সদ্য গাছ থেকে পেড়ে আনা টাটকা খেঁজুরের রস। সে রসের কী স্বাদ! কী মিষ্টি!কোথায় লাগে আর্টিফিশিয়াল ড্রিংক! আমরা গ্লাস ভর্তি করে করে খেতাম। খেঁজুরের রস খেলে খুব ঘুম পায়, আর বাথরুম পায় বারবার।
কিন্তু, ওই একই রোদ্দুরের গায়েই একেকদিন কোথা থেকে এসে যে মিশে যেত একটা বিচ্ছিরি মন খারাপের কালো মেঘ! আমার চারপাশটা ভরে যেত এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায়। সে বিষণ্ণতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। যাবে না। কী রকম অদ্ভুত এক হাওয়া দিত! শিরশির করে উঠত সারা শরীর! আমার মনের মধ্যে ঢুকে যেত একরাশ বিষাদ। সে বিষাদ যেন দৈত্যের মতো। তার লম্বা লম্বা হাতে নখে খুবলে বের করে নিত আমার মনের সব ভালোলাগা, আনন্দবোধের অনুভূতিদের। পড়ে থাকত শুধু কান্না। আমার খুব কান্না পেত সেই সব মন খারাপের দিনে। কিচ্ছু ভালো লাগত না। খেলতে ইচ্ছে করত না, দৌড়তে ইচ্ছে করত না, কোথাও যেতে ইচ্ছে করত না, অন্যান্য দিনের মতো কিছু খেতেও ভালো লাগত না সেদিন। তবু সেদিনও রোজকার মতোই রোদ্দুর এসে পড়ত আমাদের বাড়ির সাদা ধবধবে উঠোনে। গাছের মাথায় মাথায় ঘুরে বেড়াতো সেই রোদ্দুর আর শীতের পাখিরা। আমি দেখতাম। শুধু দেখতাম। কিন্তু অন্য দিনের মতো আমাকে মুগ্ধ করত না কিছু।
আজ, সেই সময় থেকে এত বছর অতিক্রান্ত, এত দিন পেরিয়ে আসা এই সময়ে দাঁড়িয়ে, এই পূর্ণাঙ্গ বয়সের পরিষ্কার চেতনা দিয়ে আমি স্পষ্ট দেখতে পাই আমার সেদিনের, সেই ছোট্ট সুন্দর নিষ্পাপ মনটার বিষণ্ণতা আর মন খারাপের অন্তরালে থেকে যাওয়া প্রকৃত কারণটাকে। হ্যাঁ, সেই কারণটা হল আমার কাকু। আমার নিজের কাকা।
আসলে ঠিকঠাক চোখে তাকিয়ে দেখলে অন্য অনেক সত্যের সঙ্গে এই সত্যকেও উপলব্ধি করা যায় যে, এক অর্থে পৃথিবীর প্রত্যেকটি শিশুই ভীষণ ভাবে একা। বড়রা তাদের ভাষা আদপেই ঠিকঠাক বোঝে না। বোঝা হয়তো সম্ভবও নয়। কেননা শৈশব মানুষের জীবনের এমন একটা অবস্থা যেখানে বাস করে শুধুই সারল্য, কেবলই নির্মলতা। সেই ভুবনে প্রবেশ করার মতো সময় এবং সারল্য বা ইচ্ছে কোনওটাই কি বড়দের থাকে? কোনও শিশু যখন কাঁদে আমরা তার চোখের জল দেখি, সেই জল মুছিয়েও দিই, কিন্তু তার কান্নার যথার্থ উৎস বা কারণটির সঙ্গে আমরা কি পরিচিত হতে পারি? তাই আমাদের শৈশবের একাকিত্ব, শৈশবের কান্না, অব্যক্ত অসহায়তা, শৈশবের অসংখ্য সত্যের সঙ্গে কখনও দেখা হয় না বড়দের।
আমাদের শৈশবে বড়দের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল শুধুই শাসনে। অন্তত আমার তাই ছিল। সেই সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসার উপস্থিতি বা প্রকাশ চোখেই পড়ত না। বড়জোর পড়াশোনায় খুব ভালো রেজাল্ট করলে কখনও কমলালেবু বা চকোলেট কিংবা মিষ্টি উপহার পাওয়া এই টুকুই ছিল ভালোবাসার বা আদরের বহিঃপ্রকাশ। সেটুকু প্রাপ্তির জোরেই কেটে যেত দিন। বড়রা কেবলই ছোটদের দোষ দেখতে পেত। দিনভর রাশি রাশি দোষ! এটা কেন করেছিস, সেটা কেন করিসনি, আর কখনও যেন ওটা করতে না দেখি, এই সবই তো ছিল ছোটদের সঙ্গে বড়দের কথোপকথন। কখনও ভালো কোনও কাজ করলেও শুনতে হত, ‘ঠিক আছে, ভালোই হয়েছে, তবে আরও ভালো করতে হবে।’ সুতরাং, নিজের কোনও সমস্যা বা কষ্টের কথা নিয়ে বড়দের কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো স্পর্ধাই আমার ছিল না। ফলতঃ আমার আর বড়দের মাঝখানে থাকা চিকের ওপারেই কেটেছে আমার শৈশব। কেটেছে নানান আলোর দিন, অন্ধকারের দিন। বিবিধ বিচিত্র বিভিন্ন চরিত্রের সব মানুষের সঙ্গে, একেকজন নোংরা, কুৎসিত, ঘৃণীত পরমাত্মীয়ের মুখ ও মুখোশের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠতে উঠতে কেটে গেছে আমার শৈশবের লাবণ্যময় আর অত্যাশ্চর্য ভয়াবহ দিনগুলি।
সাধারণত শেষ দুপুরের দিকেই ঘটত সেই ঘটনাটা। বাড়ির বড়রা, মা, কাকিমা, পিশি, ঠাকুমা, দিদিরা তখন শীতের দুপুরের রোদ পোহাতে যেত বাড়ির লাগোয়া আম বাগানে বা উঠোনের শেষ দিকের রোদওয়ালা জায়গায়। আশপাশের বাড়ি থেকেও আসত কেউ কেউ, খেঁজুরপাটি বিছিয়ে তারা সবাই একসঙ্গে বসে যে যার মতো হাতে কাজ আর মুখে চলত হাসিঠাট্টা, গল্পগাছা। কেউ বুনত উলের সোয়েটার, কেউ কুরুশ, কেউ বা নানান রঙের সুতো দিয়ে সেলাই করত চমৎকার চটের আসন, কারও হাতে আবার এমব্রয়ডারির কাপড় টানটান করে ধরে রাখার বেতের তৈরি গোল রিং। সঙ্গে চলত কদবেল মাখা, কুলের আচার, আরও নানান সব মুখরোচক খাবার! সেখানে সাধারণত বাচ্চারা কেউ থাকত না।
আমি তাই ঘরেই ঘুমিয়ে থাকতাম। আর তখনই আসত সেই কাকু। আমার নিজের কাকু। কাকু কি তখন বিবাহিত ছিল? না। সে কি তখন চাকরি করত? কে জানে! নিশ্চয়ই করত। কেননা শীতের ওই সময়টাতেই সে বাড়ি আসত। থাকত বেশ অনেক দিন। তার পর আবার চলে যেত। রীতিমতো লম্বা চওড়া ষণ্ডামার্কা একটা লোক সে তখন। তার হাতের আঙুলগুলোও যে মোটেই রোগা রোগা সরু সরু ছিল না তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? আমার আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে সে জোর করে আমাকে চেপে ধরে একটানে আমার ইজের খুলে দিত। তারপর গায়ের চাদর সরিয়ে আমার নগ্ন দুই উরু ফাঁক করে, সেই মোটা মোটা আঙুলকে ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করত আমার কচি যৌনাঙ্গে। ব্যথায়, জ্বালায়, কষ্টে আমি চিৎকার করে উঠতাম। আমার ছোট্ট শরীরের উপর রীতিমতো বলপ্রয়োগ করে সে চেষ্টা করে যেত তার কর্মটি চালিয়ে যেতে। কিন্তু অত মোটা মোটা আঙুল ওই সরু গলিপথে প্রবেশ করবে কী করে? পারত না। ব্যর্থ হয়ে সে তখন আমাকে দলে পিষে তছনছ করে তার যৌনতা পূরণ করতে চেষ্টা করত। আমি চিৎকার করে উঠলে হাত দিয়ে সে আমার মুখ চেপে ধরত। আমার তখন মৃত্যুর মতো অবস্থা। যোনিমুখে সে যে কী জ্বালা! কিন্তু ওই পাষণ্ডটার হাত থেকে আমাকে মুক্ত করবে কে? ঘরে তো আমি একা। ওইটুকুনি একটা শরীর কি অত বড় একটা শরীরের সঙ্গে লড়তে পারে? আমি ছটফট করতাম। হাতপা ছুড়তাম। যত রকম ভাবে সম্ভব, যতদূর আমার ছোট্ট শরীরের ক্ষমতা তাই দিয়েই প্রাণপণ বাধা দিতাম। লড়াই চালিয়ে যেতাম। কাকুর গায়ে-হাতে নখ দিয়ে আঁচড়ে দিতাম। জোরে কামড়ে দিতাম। সে তখন ঠাস ঠাস করে চড় মারত আমাকে। তবে ঘটনাটা খুব বেশিক্ষণ চলত না। পাছে কেউ ঘরে ঢুকে আসে! সেই ভয়ে বারবার সে খালি দরজার দিকে দেখত, তারপর একসময় সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বেরিয়ে যেত। আমি শুয়ে শুয়ে কাঁদতাম। অনেক অনেকক্ষণ ধরে কাঁদতাম।
অত ছোট বয়সেও আমি বুঝতে পারতাম যে কাকু যেটা করছে সেটা খারাপ কাজ। নোংরা কাজ। এটা কেউ করে না। করতে নেই। কিন্তু ভয়ে আমি কাউকে কিছু বলতে পারতাম না, জানাতে পারতাম না। কারণ আমি জানতাম বড়দের বললে ওরা আমাকেই দোষ দেবে, আমাকেই দেবে উত্তমমধ্যম।
আসলে মেয়েদের জীবনে তো ভয়ের শেষ নেই! শেষ নেই মারের। একেক সম্পর্কের কাছ থেকে একেক রকমের মার। কারও লক্ষ্য যৌনাঙ্গ, কারও লক্ষ্য পিঠ। মস্তিষ্কের মারও আছে। সেসব পরবর্তী পর্বে …
(চলবে)




ভালো পত্রিকা।
আপনাদের যোগাযোগ নম্বর
দিন