ক্রিস্টোফার নোলানের ইন্টারস্টেলার সিনেমায় যখন কৃষক–পাইলট কুপার শনি গ্রহের কাছে ভেসে থাকা এক বিশাল ওয়ার্মহোলের সামনে দাঁড়ায়, তখন হলভর্তি দর্শকের বুকের ভেতর ঠিক একই সঙ্গে ভয়, বিস্ময় আর কৌতূহল কাঁপতে থাকে। যেন মহাবিশ্ব নিজেই ফিসফিস করে বলছে – “চলো, শর্টকাটে যাই – সোজা অন্য তারামণ্ডলে!”
আমরা যারা সিনেমা দেখে বেরিয়ে এসে চায়ের দোকানে আলোচনা করি, আমরা তখন ঘাড় উঁচু করে বলি – “আরে, ওটা কিন্তু শুধুই কল্পবিজ্ঞান নয়, আইনস্টাইনের সমীকরণে এমন সম্ভাবনা সত্যিই লুকিয়ে আছে!”
এখানেই শুরু হয় ওয়ার্মহোলের আসল জাদু। এটি শুধু মহাকাশের শর্টকাট নয় – এটি কৌতূহলের এক রঙিন দরজা, যেখানে বিজ্ঞান, দর্শন, কল্পনা আর খানিকটা দুষ্টুমি সবাই মিলে হাত ধরাধরি করে হাঁটে।
ওয়ার্মহোল – মহাবিশ্বের ভাঁজ করা কাগজের ছিদ্র
ভাবুন, একটা কাগজে দুটো দূর বিন্দু আঁকলেন। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে দুই বিন্দুকে কাছে এনে মাঝখানে একটা ছিদ্র করলেন। রেখাটি আর পুরো পথ ঘুরে যায় না – সে সোজা ছিদ্র দিয়ে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। এই ছিদ্রটাই হলো ওয়ার্মহোল – স্পেসটাইমের শরীরে তৈরি এক রহস্যময় সুড়ঙ্গ, যা দুটি স্থানকে, এমনকি দুটি সময়কেও, যুক্ত করে দিতে পারে।
পদার্থবিদেরা বলেন – ওয়ার্মহোলের থাকে দুটি “মুখ” আর মাঝখানে সরু এক “গলা”। (আমাদের দেশের আমলা–ব্যবস্থার মতো, মুখ দুটো দূরে কিন্তু গলা দিয়ে সবকিছু আটকে থাকে।) মুখ দুটো থাকতে পারে আলোবর্ষ দূরে, অন্য গ্যালাক্সিতে, অথবা – বিজ্ঞান একটু বাড়াবাড়ি করলে – ভিন্ন সময়ে!
বাইরে থেকে ওয়ার্মহোলের মুখ নাকি ব্ল্যাক হোলের মতোও দেখতে হতে পারে – সব আলো, সব বস্তু ঢুকে পড়ে তলিয়ে যায়; তবে পার্থক্য হলো – যদি ওয়ার্মহোলটা ট্র্যাভার্সেবল হয়, তাহলে ঢোকা জিনিস অন্য মুখ দিয়ে আবার বেরিয়েও আসতে পারে।
সে যেন মহাবিশ্বের “এক্সপ্রেস লেন” – কিন্তু টোল দিতে হয় জটিল গণিতে।
এক্সোটিক ম্যাটার – বিজ্ঞানের আবদার, প্রকৃতির হাঁটু গেড়ে দাঁড়ানো সম্মতি
ওয়ার্মহোল বানানো এত সোজা হলে মানুষ আজই অফিসে না গিয়ে অ্যান্ড্রোমেডা থেকে কাজ করত।
সমস্যা হলো – ওয়ার্মহোলের গলা টিকিয়ে রাখতে লাগে এমন পদার্থ, যার কাজ হলো আকর্ষণের বদলে ঠেলে দেওয়া, অর্থাৎ রিপালসিভ গ্র্যাভিটি! প্রকৃতি সাধারণত জিনিসপত্র টেনে ধরে রাখতেই ভালোবাসে – আপেল মাটিতে পড়ে, নক্ষত্র জোড়া হয়ে থাকে – কিন্তু এখানে প্রয়োজন উল্টো স্বভাবের পদার্থ, যার শক্তি হবে নেতিবাচক, যাকে পদার্থবিদেরা নাম দিয়েছেন – এক্সোটিক ম্যাটার।
কোয়ান্টাম তত্ত্ব খুব কাৎ হয়ে বলে – “হুঁ… একটু আছে ঠিকই… কিন্তু মানুষ–আকারের ওয়ার্মহোল চালাতে যে পরিমাণ লাগবে – তা ভাবলেই মাথা ঘোরে!”
অর্থাৎ, বিজ্ঞান বলছে – অসম্ভব নয়, কিন্তু প্রকৃতি এখনো ফাইলটা পুরো সই করেনি। তা–ও কাগজটা টেবিলের ওপর খোলা রেখেছে – এই আশাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
সময় ভ্রমণ – বিজ্ঞানের মার্জিত কৌতুক
এবার আসা যাক সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশে। ধরুন, ওয়ার্মহোলের এক মুখকে পাঠালাম প্রায় আলোর গতিতে ভ্রমণে, আরেকটি মুখকে রেখে দিলাম একদম শান্ত ও স্থির। আপেক্ষিকতা বলে – যে বেশি দৌড়ায়, তার ঘড়ি ধীরে চলে। ফিরে এসে দেখা গেল – একটি মুখ বয়সে কম, অন্যটি একটু “বুড়ো” হয়ে গেছে।
এখন যদি তরতাজা মুখ দিয়ে ঢুকে বয়সী মুখ দিয়ে বেরোন – তাহলে আপনি ভবিষ্যৎ নয়, সোজা অতীতে গিয়ে পড়তে পারেন! ওয়ার্মহোল তখন কার্যত টাইম মেশিন।
স্টিফেন হকিং সাবধান করে বলেছিলেন – “মহাবিশ্ব হয়তো তার ইতিহাসকে খুব ভালোবাসে। কেউ যদি টাইম মেশিন বানাতে যায়, কোয়ান্টাম স্তরে এমন ঝামেলা হবে যে মেশিনটাই নিজে নিজে ভেঙে যেতে পারে!”
অর্থাৎ – মহাবিশ্ব যেন বলে – “দুষ্টুমি করতে পারো, তবে বেশি বাড়াবাড়ি নয়।”
ওয়ার্মহোলকে খুঁজে পাওয়া যাবে? নাকি সে কেবল গুজবের নায়ক?
যখন ব্ল্যাক হোল শুধুই গাণিতিক কল্পনা ছিল, তখন কেউ ভাবেনি একদিন তার ছবি তুলতে পারব। কিন্তু ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ সেই স্বপ্নকেও সত্যি করেছে।
তাই প্রশ্ন ওঠে – ওয়ার্মহোলকে কি কখনো শনাক্ত করা সম্ভব?
বিজ্ঞানীরা ভাবছেন – যদি কোনো ওয়ার্মহোল মহাজাগতিক পরিবেশে টিকে থাকে, তবে তার পাশ দিয়ে আলো গেলে ব্ল্যাক হোলের মতো নয় – কিছু আলাদা ধরনের গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং প্যাটার্ন দেখা যেতে পারে। আলো বাঁকানোর ধরনে সূক্ষ্ম কম্পন, কোয়াসিনরমাল রিংগিং–এর মতো প্রভাব – যেন মহাবিশ্ব দূর থেকে ইশারা দিচ্ছে – “দেখো, আমি ব্ল্যাক হোল নই – আমি অন্য কিছু!” এখনো সরাসরি প্রমাণ নেই – কিন্তু প্রশ্নটি এখন আর নিছক দর্শনের নয়, এটি সাবলীলভাবে ঢুকে পড়েছে পরীক্ষামূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের টেবিলে।
কল্পবিজ্ঞান বনাম বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা – লড়াই নয়, সহযাত্রা
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ওয়ার্মহোল মানেই দ্রুত মহাকাশযাত্রা, সময়ের গোলকধাঁধা, আর এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সিতে হালকা নাস্তায় স্যান্ডউইচ খেতে খেতে ভ্রমণ।
বাস্তবে – যদি ওয়ার্মহোল সত্যিই থেকে থাকে, তবে সেগুলো সম্ভবত অতি ক্ষুদ্র, ভয়াবহ অস্থিতিশীল, এবং মানুষের জন্য একদমই উপযোগী নয়।
তবু কল্পবিজ্ঞানকে আমরা বাতিল করতে পারি না। কারণ কল্পবিজ্ঞান বিজ্ঞানীদের কানে কানে বলে – “না–ঘটা জিনিস নিয়েও ভাবো।”
অতএব, ওয়ার্মহোল কেবল তত্ত্ব নয় – এটি একধরনের মানবিক আকাঙ্ক্ষা – দূরত্ব ভেঙে ফেলার, সময়কে চ্যালেঞ্জ করার, আর অজানাকে আলিঙ্গন করার।
শেষ কথা – প্রশ্নটাই এখানে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার
ওয়ার্মহোল হয়তো এখনো ত্বরিত যাত্রার টিকিট হয়ে ওঠেনি, হয়তো কোনোদিনও হবে না। তবু মানুষের কল্পনা, মানবজিজ্ঞাসা, আর বিজ্ঞানের সাহসী কৌতূহল একে বাঁচিয়ে রেখেছে।
কারণ বিজ্ঞান সবসময় বলে – উত্তর না থাকলেও প্রশ্ন করো। আর সেই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।




খুবই মূল্যবান এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনা।
It is truly commendable how the author presents the mystery behind wormholes and time travel in such a lucid way. Indeed a fun to read.
এত সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় বোঝানো হয়েছে,যে যে কোনো বয়েসের ব্যক্তি লেখাটি পড়ে খুব সহজেই বুঝতে পারবেন এবং বিজ্ঞানের অজানা জিনিসের স্বাদ অনায়াসে উপভোগ করতে পারবেন…..লেখিকাকে ধন্যবাদ এত সহজভাবে বোঝানোর জন্য❤️
খুবই সুন্দর। মহাকাশ বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে বাংলা ভাষায় সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার এই প্রয়াস – সাধুবাদ।
You’ve explained complex scientific ideas with such clarity that even a layperson can understand them. Making science feel accessible and exciting is a rare skill, and you’ve done it beautifully. 🌌👏