স্কুলে ঢুকলেই প্রতিদিন যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ে, তা হলো শৃঙ্খলা। যে শৃঙ্খলা আমার স্বভাবে নেই— অথচ আমাকে কাজ করতে হয় এই শৃঙ্খলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। সারিবদ্ধ বেঞ্চ, নির্দিষ্ট সময়ের ঘণ্টা, দেওয়ালে টাঙানো নিয়মাবলি—সবকিছু এমন নিখুঁতভাবে সাজানো যে মনে হয়, এখানে বিশৃঙ্খলার কোনো জায়গাই নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত সাজানো কাঠামোর মধ্যেই আমি অনুভব করি—ধীরে ধীরে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ছাত্রদের জীবনবোধ। তারা শেখে কখন দাঁড়াতে হবে, কখন বসতে হবে, কখন কথা বলতে হবে। কিন্তু কখনো তারা শেখে না— কখন প্রশ্ন করতে হবে, কখন প্রতিবাদ জরুরি, আর কখন নীরব থাকাটা অপরাধ।
আজ আমরা ‘আধুনিক শিক্ষা’ নিয়ে গর্ব করি— প্রযুক্তির ব্যবহার, স্মার্ট ক্লাস, ডিজিটাল বোর্ড—এসবের কথা বলি, তখন আমাদের মনে হয় আমরা বোধহয় অনেক এগিয়ে গেছি। অথচ আমার মনে হয়, শিক্ষা আজও বন্দি হয়ে আছে ‘ডাকঘর’ নাটকের অমলের মতোই। আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা জানলার বাইরে যে প্রকাণ্ড আকাশ আছে, সেটা তারা দেখতে পায় না।
সিলেবাসের বই খুললেই একের পর এক অধ্যায়। কখনো ভূগোলের মানচিত্র, ইতিহাসে মনীষীদের জীবন, বিপ্লব ও বিদ্রোহ, বিজ্ঞানের আবিষ্কার, অঙ্কের ভারী ভারী সূত্র, সাহিত্যে প্রেম ও বেদনার মতো অসংখ্য বিষয়; এই বিষয়ে অসংখ্য উদাহরণও দেয়া যেতে পারে। কিন্তু না, উদাহরণের ভারে ভারাক্রান্ত না করে আমি বলতে চাই, আজকের পড়াশোনার মধ্যে কোথাও যেন একটা শূন্যতা রয়ে যায়। মনে হয়, বইয়ের পাতায় জীবন আছে, কিন্তু জীবনের সঙ্গে বইয়ের যোগাযোগ নেই। আমি প্রতিদিন অনুভব করি—ছাত্র পড়ে, কিন্তু হাঁটতে শেখে না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার ভাষায়: জুতো হাঁটছে, পা রয়েছে স্থির।
একজন ছাত্র নিউটনের তৃতীয় সূত্র জানে, জানে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক নিয়ম। কিন্তু সে জানে না—অন্যায়ের ধাক্কা খেলে নিজেকে কীভাবে সামলাতে হয়। সে জানে স্বাধীনতার সংজ্ঞা, কিন্তু নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে যখন কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, তখন সেই স্বাধীনতা কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়—তা সে স্কুল থেকে শেখে না। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সে ব্যবস্থা নেই, সিলেবাসেও নেই। আর আমরা—শিক্ষকরা—সেটা শেখাতে ব্যর্থ।
ক্লাসঘরের ভেতরে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বড়ই গোলমেলে। কথোপকথন কম, নির্দেশ বেশি। আমরা কী বলছি, আমরা কী ভাবছি—সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। ছাত্রের মত, তার প্রশ্ন, তার দ্বিধা—সবকিছু যেন সিলেবাস শেষ করার দৌড়ে পিষে যায়। ছাত্র-ছাত্রীরা জানে গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ। কিন্তু ক্লাসঘরে ভিন্ন মত বললে, প্রশ্ন করলে, তাকে যে আলাদা করে দেওয়া হবে—যেদিন সে এটা বুঝে ফেলে, সেদিন থেকেই তার ভেতরে গণতন্ত্রের মৃত্যু শুরু হয়। শৈশব থেকেই সে শেখে—মেনে নিতে হয় অথবা মানিয়ে নিতে হয়। প্রতিবাদ নয়, প্রশ্ন নয়—নীরব সম্মতিই হয়ে ওঠে আদর্শ।
এই অদ্ভুত দ্বন্দ্বের ভেতরে মাঝেমধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কৌতূহল জাগে, বিস্ময়ের জন্ম নেয়। তবু আমি দেখেছি—এত কিছু পরেও তারা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রস্তুত। কারণ চিরকালের মতো শিক্ষা এখনো বন্দি একটি খাঁচায়। সেটা সিলেবাসের খাঁচা, পরীক্ষার খাঁচা, নম্বরের খাঁচা। আর সেই খাঁচার বাইরে যে বিশাল, অনিয়ন্ত্রিত, অসম জীবন— তার জন্য কোনো মানচিত্র নেই। নেই সমস্যাকে অতিক্রম করার সাহসী অনুশীলন।
আমরা স্কুলে প্রায়ই বলি—
‘ভুল কোরো না।’
কিন্তু জীবন বলে—
‘ভুল না করলে শেখা যায় না।’
সিলেবাস বলে—
‘ঠিক উত্তর দাও।’
জীবন বলে—
‘কখনো কখনো প্রশ্নটাই সবচেয়ে জরুরি।’
এই দুই ভাষার মাঝখানেই ছাত্রছাত্রীরা আটকে পড়ে। ফলে তারা না পারে পুরোপুরি শিক্ষিত হতে, না পারে পুরোপুরি মানুষ হয়ে উঠতে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—পাঠ্যবইয়ে সমাজ আছে, কিন্তু সমাজের সংঘাত নেই। দারিদ্র্য আছে, কিন্তু খিদের কাঁপুনি নেই। নারী স্বাধীনতা আছে, কিন্তু ভয়ের বাস্তবতা নেই। ধর্ম আছে, কিন্তু ধর্মঘটিত হিংসার প্রশ্ন নেই। জীবনকে নির্বিষ করে ছাত্রদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এই নির্বিষ শিক্ষা ছাত্রদের রক্ষা করে না—বরং দুর্বল করে তোলে।
যেদিন তারা প্রথমবার বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হয়—ক্লাসঘরের বাইরে, পরীক্ষার খাতা ছাড়া—সেদিন হঠাৎ বুঝতে পারে, এই পৃথিবী এমসিকিউ নয়। এখানে অপশন দেওয়া থাকে না। এখানে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, দাঁড়াতে হয়, হার মানতেও হয়। সুযোগ একটাই। সেই মুহূর্তে স্কুল-শিক্ষা আর পাশে থাকে না।
আমরা শিক্ষকরাও অনেক সময়—নিজেদের অজান্তেই—এই খাঁচার প্রহরী হয়ে যাই। আমরা হয়তো জীবনের কথা বলতে চাই, কিন্তু সময় কোথায়? সিলেবাস শেষ করার তাড়া থাকে, পরীক্ষার দিন এগিয়ে আসে। ফলে জীবনের জটিল প্রশ্নগুলো ক্লাসঘরের দরজার বাইরেই পড়ে থাকে। ছাত্ররা সেগুলো কুড়িয়ে নেয় অন্য জায়গা থেকে—সোশ্যাল মিডিয়া, গুজব, অর্ধসত্য, হিংসা থেকে। আর আমরা বিস্মিত হয়ে বলি—‘এই প্রজন্ম এত অস্থির কেন?’ ‘এই প্রজন্ম কিছুই জানে না’, ‘এখনকার ছেলে-মেয়েরা সঠিকটা বোঝে না’—এই ধরনের কথাগুলো বলে বেড়াই।
কিন্তু খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখলে বোঝা যায়, আসলে তারা অস্থির নয়; তারা দিশাহীন। কারণ তারা বড় হচ্ছে এমন এক শিক্ষার ভেতর দিয়ে, যেখানে জীবনের কান্না-হাসির দোল, দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা—একটি নিষিদ্ধ অধ্যায়। যেখানে ক্লাব নেই, পাড়া নেই, খেলাধুলো নেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বন্ধু নেই। আমি এদের সঙ্গে মিশে দেখেছি—এরা ভীষণ অসহায়।
একদিন ক্লাসঘরের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা একটি ছাত্র লক্ষ করে—জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে। সেই আলো ধীরে ধীরে বেঞ্চ, বই, খাতা ছুঁয়ে এগোয়। আশ্চর্যভাবে আলোটা বইয়ের পাতায় থেমে থাকে না—সে পাতা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
ইতিহাসের বিপ্লবীরা হেঁটে বেরিয়ে আসে। সাহিত্যের চরিত্ররা কথা বলে ছাত্রদের সঙ্গে। বিজ্ঞানের সূত্রগুলো প্রশ্নে রূপ নেয়: ‘এগুলো দিয়ে তুমি কী করবে?’ খাঁচার ভেতরে শিক্ষা নড়েচড়ে বসে। ঘণ্টা বাজে না, পরীক্ষার তারিখ মিলিয়ে যায়। সিলেবাসের পাতা খুলে যায় এক অদ্ভুত দরজার মতো। ঠিক তখনই শিক্ষক বোর্ডের দিকে ফিরে কিছু বলেন না, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। সেই নীরবতায় ছাত্ররা প্রথমবার বোঝে—শিক্ষা নির্দেশ নয়, সহযাত্রী।
পরের মুহূর্তে আলো নিভে যায়। সব আবার আগের মতো—বেঞ্চ, খাতা, ঘণ্টা। কিন্তু ছাত্রদের চোখে আর আগের দৃষ্টি নেই। খাঁচা এখনও আছে, কিন্তু তারা জানে—খাঁচার বাইরে একটা আকাশ আছে। আর হয়তো একদিন, এই জানাটাই খাঁচা ভাঙার প্রথম ধাপ হয়ে উঠবে।
ক্রমশ




ভালো লিখেছেন, অয়ণ। মকর সংক্রান্তি আসছে, কেটে যাবে, আবার আসবে। আপনার রচনায় আমরা পেলাম এক সংবেদনশীল শিক্ষকের অব্যক্ত যন্ত্রণার রূপরেখা,। রবি নিজে ইস্কুলে গিয়েই এমন অনুভব করেছিলেন দেড়শো বছরের আগেই, তাই অমলের সৃষ্টি হয়েছিল আর সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে—অনবিরাম।
আসলে যে কোন শৃঙ্খলার মধ্যেই যে শৃঙ্খল থাকে সেই ধ্রুব সত্যটি আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। অতএব, প্রায় সব খেদোক্তি বাহুল্য মাত্র। হ্যাঁ, তবে আধুনিক প্রজন্মে যে দিশাহীনতার কথা আপনি মমত্বভরে উল্লেখ করেছেন, সেটি নিদারুণ সত্য। পুরোনো মতবাদগুলির অপমৃত্যুর পর যে নতুন মতবাদ ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে তার সঙ্গে অন্তত মধ্যবিত্ত বাঙালি অপরিচিত। বিভ্রান্তি স্বাভাবিক। তারা শৈশবে ‘আচ্ছে দিনের’ প্রতিশ্রুতি শুনেছে, ‘পরিবর্তনের’ প্রতিধ্বনি শুনেছে । কিন্তু, জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনেকাংশেই সেই শ্রুত স্বপ্নের সঙ্গে তাল মেলায়না ––প্রশাসনিক প্রচারযন্ত্র প্রায়শঃই প্রহেলিকার উত্তর দেবার চেষ্টা করে। তবে অত্যন্ত ভাগ্যের বিষয় যে সাধারণ বাঙালি এমন একটি ডিএনএ নিয়ে জন্মেছে যে সন্দেহ আর যায়না! তাই তারা মনোকষ্টে ভোগেন—সোজাপথে অর্থকষ্টের নিরসন হয়না। মোমবাতি নীরবে গলতেই থাকে।
ধন্যবাদ