পাঠ্যসূচি (কারিকুলাম): মানুষ গড়ার রূপরেখা

শিশু শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দৃশ্য, বইয়ের বাইরেও সার্বিক বিকাশের প্রতীক

সম্পাদক এমন গভীর টালমাটাল সময়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি বিষয় লেখার জন্য স্থির করে দিয়েছেন যে, কাজটি করতে বসে একইসঙ্গে বেশ উৎসাহী এবং হতাশ দুইই হতে হচ্ছে!

বাংলায় ‘পাঠ্যসূচি’ বিষয়টিকে প্রাথমিকভাবে ‘Syllabus’ অর্থে ধরে বিশ্লেষণ ও ভাবনা হবে—এই স্থির হলেও পরবর্তী ক্ষেত্রে ‘Curriculum’ শব্দটিকেই যথার্থ বলেই মনে হল।

এবার আসি, লেখা শুরুতে একে একইসঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ‘স্পর্শকাতর’ কেন বলেছিলাম?

১) গুরুত্বপূর্ণ: কারণ, একটি শিশুর সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটি সঠিক কারিকুলামই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে; কারণ সে ক্ষেত্রে সিলেবাস শুধুমাত্র তার জ্ঞানগত বা কগনিটিভ বিকাশের মানচিত্র মাত্র। কারিকুলাম শুধুমাত্র বই বা পরীক্ষার বিষয়বস্তু নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীর জীবনব্যাপী শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার একটি পরিকল্পিত কাঠামো। তাই আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে পরিধির বিচারে কারিকুলাম আরো বৃহত্তর একটি বিষয়, যা সিলেবাসকে ধারণ করে।

২) স্পর্শকাতর: কারণ, ভারত হল বহুবিধ শিক্ষাপদ্ধতি বা কারিকুলামের দেশ। দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ গুলোতে নানা কারিকুলাম বোর্ডের অধীনে ছাত্রছাত্রীরা শ্রেণী উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ক্রিয়াকলাপ, পরীক্ষা থেকে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে মূল্যায়িত হয়ে থাকে।

১) CBSE: Central Board of Secondary Education

ক) এটি ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনে থেকে মূলত এনসিআরটির পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক অনুসরণ করে শিক্ষাকার্য পরিচালনা করে।

খ) বাস্তবিক ক্ষেত্রে, এতে বিজ্ঞান ও গণিতের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। JEE ও NEET-এর মতো সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলির প্রস্তুতির জন্য এটি বিশেষ উপযোগী হিসেবে মনে করা হয়।

২) ICSE: Indian Certificate of Secondary Education

ক) এটি CISCE (Council for the Indian School Certificate Examination)-এর অধীনে একটি বেসরকারি বোর্ড দ্বারা পরিচালিত।

খ) বস্তুত, এটি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, বিজ্ঞান, ভাষা এবং কলা—সব বিষয়ের উপর একটি বিশ্লেষণাত্মক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের বিকাশে সহায়তা করে।

৩) এছাড়া প্রতিটি রাজ্যের রয়েছে নিজস্ব State Board (রাজ্য শিক্ষা পর্ষদ); পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই ভূমিকা পালনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে WBBSE ও WBCHSE।

এগুলি মূলত সেই রাজ্যের আঞ্চলিক সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভাষা-সাহিত্যের উপর গুরুত্ব আরোপ করে।

এখন, ‘স্পর্শকাতরতা’-র বিষয়ে এই যে এতগুলি প্রচলিত মূল ধারার কারিকুলাম ও কিছু ব্যতিক্রমী ও আন্তর্জাতিক পাঠ্যসূচির মধ্যে তুলনা করা—এবং যা এই প্রতিবেদনের মূল উপপাদ্য:

১) মানুষ গড়ার রূপরেখা নির্মাণে এই কারিকুলাম গুলির ভূমিকা নিরীক্ষণ করা। নিজ সন্তান কিংবা সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের জন্য তুলনামূলক ভাবে কোনটি বেছে নেওয়া বা নির্দেশ করা।

২) শুধু নির্ধারণ করাই নয়, সেই কারিকুলামের সার্বজনীনতার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সওয়াল করা। সর্বোপরি অন্য ও বহুল প্রচলিত কারিকুলামগুলির সমস্যা ও অন্তঃসারশূন্যতার দিকে নির্দেশ করা।

পরিশেষে, যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্বস্তিকর, তা হল—

* এত এত গালভরা কারিকুলাম প্রোগ্রামের পরও কি আমরা সঠিক, সামাজিক, সংবেদনশীল ও সর্বোপরি সুস্থ, সভ্য, শিক্ষার্থী-সমাজ তৈরি করতে পারছি?

এই প্রশ্নের উত্তর যদি নঞর্থক হয়, তবে একজন সঠিক মানুষ নির্মাণের ঠিক কেমন কারিকুলাম বা পাঠ্যসূচি হওয়া উচিত?

এই রাজ্যের একজন বিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে এই বিশাল এবং বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজটি করা ধৃষ্টতা হবে কিনা জানি না। তবে একেবারে মাটির কাছাকাছি ও সমস্যার মূল স্তরে বিচরণ করতে হয় বলেই এই বিষয়ে আরো কিছু লেখার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই প্রবন্ধের সূচনা-প্রয়োজনীয়তা।

বর্তমানে শিক্ষার অবমূল্যায়ন, চলতি শিক্ষক নিয়োগ-দুর্নীতির ডামাডোল ও শিক্ষার বেসরকারিকরণের মতো সময়ে দাঁড়িয়ে আছি বলেই, এই প্রবন্ধ লেখার সময়কালকে ‘গভীর টালমাটাল’ বলে উল্লেখ করেছি। কোনো সন্দেহ নেই, এমন সময় দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন এবং আলোচনা করতে আমি একইসঙ্গে আগ্রহী এবং শঙ্কিত। বর্তমান পরিস্থিতি আমাকে একইসঙ্গে ‘উৎসাহী’ এবং ‘হতাশ’ দুটিই করছে। এবং কোনো অবস্থাতেই বিষয়টির প্রয়োজনীয়তাকে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম পর্ব পাঠকমহলে যৌক্তিক বিবেচিত হলে, প্রশ্ন দুটির উত্তর পরবর্তী পর্বে খোঁজা যেতে পারে


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top