নিস্তরঙ্গ অবকাশের রোজনামচা

mountain stars optimized 1200x628

পর্ক সসেজটায় সানিসাইড আপের হলুদটা মাখিয়ে নেয় সে। কাঁটাচামচে গেঁথে থাকা শুকিয়ে জড়িয়ে নেওয়া শূয়োরের মাংস ডিমের কুসুমের সাথে মিশে জিভের প্রতিটি পরত জাগিয়ে তুলছিল। জিভের পরতে চোখেরও একটা ভূমিকা থেকে যায় এইসব সময়। গ্লেনারিজ থেকে আজ খুব ভালো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। শেষ পনেরো বছর ধরে প্রতি বছর মৌসুমে সপ্তাহ ধরে ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে হিসেব কষে দার্জিলিং আসা চায় তার। গরমের ছুটির ছোটোলোকী ভিড়টা এই সময় পাতলা হয়ে আসে। টেথিসের স্মৃতি ধরে রাখা অতিকায় ফার্ণগুলো ঝুঁকে আছে এমন রাস্তা দিয়ে তিব্বতি রিফিউজি ক্যাম্পের দিকে যাওয়ার সময় “হ্যালোওওও… হাঁ বে…এ…এ… ক। হেভি হোটেলে আছিইইই বন্ধুউউউ। পাশের একটা খাবার হোটেলে গরু-ভাত হেভিইইই সস্তা…” কানে এলে খানিক আগের ফার্স্ট-প্লাক অরেঞ্জ টি-এর স্বাদ আর রঙ বেসুরো হয়ে যায়। চোখের সামনে নিজের কাজের জায়গা ভেসে আসে। পূজোর ছুটির হুজুগে ভিড়টা এই সময় এড়ানো যায়। বিফ ওয়ান্টন স্যুপ আর চিজ বাফ মোমো খাওয়ার জন্য কুঙ্গায় মিনিমাম দু’ঘণ্টা লাইন দিতে হলে নিজেকে এক নম্বরের বেকুব ঠেকে। ঈদের সময়ের বাংলাদেশি ভিড়টা সাত-আট বছরে একবার এই সময়ে হয়। গ্লেনারিজ, পার্ক, হিমালয়ান ক্যাফের প্রায় প্রতিটি টেবিল জুড়ে একটা করে প্রোটোটাইপ আপার মিডল ক্লাস বাংলাদেশি পরিবারের উপস্থিতি এবং বঙ্গীয় মার্কিনি উচ্চারণের ইংরেজি এবং বাংলায় যাবতীয় কলোনিয়াল হ্যাংওভার উবে যায়। ইয়ার এন্ডিং আর শীতের সময় জুড়ে সত্যিকারের সাদা চামড়াদের উপস্থিতিতে অ্যাবসার্ড প্রাইস হাইকের চাপটা এই সময় থাকে না। তাই এই সময়েই সে দার্জিলিং আসে, বউকে নিয়ে। কোনো কোনো বছর একা। দু-এক বছর অন্য কারো সঙ্গে। যেমন এই বছর বউকে নিয়ে এসেছে। যে স্যুটে রয়েছে তার নাম প্রিন্সেস অফ সিয়াম। গত সন্ধ্যা থেকে তুমুল বৃষ্টির পূর্বাভাস মিলে গেছে। প্ল্যানমাফিক ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালিয়ে দু’জনের স্কচ ও স্কচ সহযোগে কবিতা, সিনেমা, ওটিটি, ফিলোজফি, লাইফ, চ্যাটজিপিটি না গ্রক নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। হিসাব মেনেই সেই সময়ে দু’জনকেই হোয়াটস্যাপে আসা রিপোর্ট দেখে লাইফ-সাপোর্টে থাকা তিনজনের ভাইটালস চেক করে ওষুধের পাওয়ারের রকমফের করতে হয়েছে খানিক। বৃষ্টির শব্দ যাতে হারিয়ে না যায় তার জন্য প্রতিটি স্যুট সংলগ্ন করে রাখা হয়েছে ওয়ান লেয়ার লতা দিয়ে ঢেকে রাখা মেটাল ক্যানোপি। একটি জানালা খোলা রাখলেই বৃষ্টির শব্দ কান দিয়ে ঢুকে বৃষ্টির স্নায়ুতন্ত্র গড়ে তুলছিল। জানালা বন্ধ করে দিলে সেই স্নায়ুতন্ত্র পুরো ভ্যানিশ। ইচ্ছেমতো বৃষ্টির স্নায়ুতন্ত্র গড়া এবং ভাঙার প্রিভিলেজ নিতে নিতে তারা দু-তিনটা চুমু খেয়ে নিজেদের কাছে নিজেদের প্রেমের প্রমাণ দিচ্ছিল। প্রমাণ দেওয়ার পর ব্রাশ করে, দাঁতের ভিতর ফ্লস চালিয়ে, ফেসওয়াশ করে বিছানায় আসে। বউকে বলে ঘুমিয়ে যাও, একটু রিসার্চ করার আছে। লাইট নিভিয়ে দেয়। ম্যাক বুকটা টেনে নেয়।

হিসাব অনুযায়ীই ভোর থেকে নীল এক আকাশ। বউ বেড়াতে এলে লেট রাইজার। মিনিমাম বেলা দশটা। হিসাব কষেই প্রিন্সেস অফ সিয়াম থেকে বেরিয়ে আসে সে এক কাপ চা হাতে নিয়ে। জাপানি পাইন ভিজে রয়েছে। গুরাসে ফুল নাই এখন। ছোটো ছোটো ফ্লাইক্যাচার ও সানবার্ডরা এসে বসছে ডালে। উপর থেকে আসা মহাকাল মন্দিরের ঘণ্টা এবং চিত্তরঞ্জন দাশের বাড়ির বহু নিচ থেকে আসা বৌদ্ধ গুম্ফার হুমম আওয়াজ ভেসে আসছে। সুন্দর বেশ চারপাশ। সুন্দর চারপাশ লাগে তার। এই সুন্দরের জন্যই নিজের বাবার সাথে ঝামেলা করেই সে নার্সিংহোমের দামি কেবিনগুলোর দেওয়ালে মনেট রেখেছে। বাবা তাকে বারবার বোঝাতে চেয়েছে তাদের নার্সিংহোমের রুগী মূলত লুঙ্গিওয়ালারা। লুঙ্গিওয়ালাদের ডিসকমফোর্ট হয় এমন কিছু করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সে বারবার বাবাকে বোঝাতে চেয়েছে লুঙ্গিওয়ালাদের ঘাবড়ে না দিয়েও কিছু কিছু চেঞ্জ আনা যায়। করেওছে সে। তার জন্যেই মনেট দেওয়াল পেয়েছে তিনটা প্রিমিয়াম কেবিনে। চা শেষ হলে হাল্কা একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। বউ অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ব্যাক ম্যালে লোকজন এক্সারসাইজ শুরু করেছে। কুকুর নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। অসময়ের ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এর সামনে বসে পরিমল ভট্টাচার্যকে পড়তে হয়। সে ব্যাগ থেকে ‘দার্জিলিং’ বের করে। “দার্জিলিঙে গ্রীষ্মাবকাশ শেষ হয়ে এলে পর্যটকরা যখন পিঁপড়ের সারির মতো পাহাড় খালি করে দিয়ে নেমে আসে, তখনই এই শৈলশহর আমাকে টানে। এমনিতে এপ্রিল নয়, জুলাই-আগস্ট দার্জিলিঙে নিষ্ঠুরতম মাস। নির্জনতমও। অবশ্য তার আগে থেকেই, সমতলে তাপের পারদ চড়তে থাকার সঙ্গে পাহাড়ের ভাঁজ থেকে মেঘ উঠে প্রথমে মুছে দেয় দূরের দৃশ্যপট, তারপর ক্রমশ অস্বচ্ছ কুয়াশার আবরণে মুড়ে দেয় সবকিছু। যেন খেলনা শহর, টুরিস্টরা খেলা করে চলে যাবার পর ঢেকে রাখা হল, পুজোর সিজন এলে ফের কুয়াশার ঢাকনা খুলে বার করে আনা হবে।” খিদে পাচ্ছে। ফিরতে হবে ম্যালের দিকে। হাঁটা লাগায়। গাছে ঢাকা থাকা এই রাস্তায় এই সময় জুড়ে লতাপাতা বাড়ে। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। হাবিব মল্লিক অ্যান্ড সন্স খুলবে আরো পরে। কটকটা রোদের দার্জিলিং-এ এখাকার শীতশীত অন্ধকারে ঢুকতে পছন্দ করে সে। খিদেপেটে ভিড়হীন গ্লেনারিজকে সুন্দর দেখাচ্ছে। তার সামনের টেবিলে কফি কাপের বাইরের এক বৃদ্ধা বইয়ের পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে কফি খাচ্ছে। সে পর্ক সসেজটায় সানিসাইড আপের হলুদটা মাখিয়ে নেয়।

হিসাবমতো আরো ঘণ্টা দুই পর মেঘ ঘনাতে পারে। তখন লেপচা জগতের পাইন বনের সামনে থাকতে হবে তাদের। পাইনের ভিতর দিয়ে মেঘ বয়ে যাওয়া দেখতে হয়। গান চালিয়ে নিতে হয় এইসব সময়। এসব থেকে ফিরে এসে পার্কে লাঞ্চ। থাই ফুড। তার আগে মোজিতো আর বেসিল মাশরুম। লাঞ্চ শেষ করবে ক্রেপ আইসক্রিম দিয়ে। তারপর উইন্ডামেয়ারে ফিরে বিশ্রাম। হিসাবে গন্ডোগোল না হলে বৃষ্টি শেষ হয়ে বিকালে আকাশ ঝকঝকে হয়ে যাবে। উল্টোদিকের পাহাড়ের উপরের ঝকঝকে রাতের আকাশ আর পাহাড়ের গায়ের আলো দেখছিল মদ খেতে খেতে। লনের পাশের বেঞ্চেই বসে আছে তাদেরই মতো বর্ষার পাহাড় ভালোবাসতে আসা তাদেরই বয়সী আরেকটি কাপল। তাদেরই মতো হিসাব কষে এসেছে হয়তো। হিসাব কষে পাহাড়ের গা আর আকাশের সীমারেখা ব্লার করে দিতে চাইছে মদের সাহায্যে। হিসাব ভেঙে হঠাৎ একের পর এক মুভিং তারার মালা দেখা যায় আকাশে। স্পেস-স্টেশন নাকি? নাকি অন্য কিছু? কয়েক সেকেন্ডে হিসাব বিস্ময়কে সরিয়ে দেয়। স্টারলিংক। পাশের কাপলের মেয়েটি আইডেন্টিফাই করে ফেলে। ইলন মাস্কের গডলাইক প্রেসেন্স নিয়ে পরস্পরের নামটুকু জানতে না চাওয়া দুটি কাপল ডিসকাস করতে থাকে। চীন নাকি নেক্সট জেনারেশন পরমাণু বোমাকে স্যাটেলাইটের মতো অর্বিটে পাক খাওয়াবে পৃথিবীর আকাশে। এই যে আকাশ জুড়ে তারাদের যে মেলা, সেখানে কিছু কিছু দেখতে তারা আসলে হবে পরমাণু বোমা। “টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার” রাইমের মানেই পালটে যাবে বলে বসে চারজনের ভিতর কেউ। বাকি তিনজন নির্ভার হাসিতে ফেটে পড়ে। এই হাসি শুনলে এই কলোনিয়াল হোটেলের আদি ভূতেরা ভয় পেয়ে যাবে বলে বসে চারজনের ভিতর কেউ। বাকি তিনজন নির্ভার হাসিতে ফেটে পড়ে। হাসি থামলে আরো কিছু কথা চালাচালির পর তারা একমত হয় রিয়াল সমস্যা একটাই। ক্লাইমেট চেঞ্জ এবং তার এফেক্ট। সেটার থেকে নজর ঘোরাতেই যাবতীয় রাজনৈতিক ঝামেলা। চারজনের ভিতর কেউ বলে বসে আসলে ভারতে তেমনভাবে ক্লাইমেট জনিত বিপন্নতা এখনো আসে নি বলেই ফালতু ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে রাজনীতি চলছে। রিয়াল কোনো ইস্যুই নেই আসলে। নিচের কোনো গলি থেকে বিকট শব্দে তিব্বতি কোনো বাদ্যযন্ত্র বেজে ওঠে। কেউ কি মারা গেছে? নাকি ভূত ধরতে বেরিয়েছে কোনো লামা? একটা ইঁদুরের শব্দ আসছে লনের কোণা থেকে। শব্দটা আড্ডার তাল কেটে দিল। কেউ কারো নাম না জেনেই ফিরে গেল এই হোটেলে নিজের নিজের আস্তানায়। ব্রাশ করে, দাঁতের ভিতর ফ্লস চালিয়ে, ফেসওয়াশ করে বিছানায় এলো প্রায় রোজকার মতোই। প্রায় রোজকার মতোই বউকে বলে ঘুমিয়ে যাও, একটু রিসার্চ করার আছে। লাইট নিভিয়ে দেয়। নিজের ম্যাকবুকটা টেনে নেয় প্রায় রোজকার মতো। নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে নেয় ভেতর ভেতর। গ্রক খুলে বসে। গ্রকের চ্যাট বক্সে গিয়ে গতকালের চ্যাট হিস্ট্রি মিটিয়ে দেয় প্রায় রোজকার মতো। চ্যাট বক্সে টাইপ করতে থাকে প্রায় রোজকার মতো।

I am an Indian Muslim. One of my blood-relative forced to leave India around 1954 after receiving the order of ‘Quit India’ issued by Government of India. Primarily he was at a stake, but later he settled in Dhaka as a professor of Math. In Dhaka University. His next-generation settled well in Australia, Canada and Germany. I have two questions for you. If my grandfather left India after partition, would I get a stable and secured mental health now? And if I plan for a child which country should be in priority list for the child as its future citizen… Canada, Sweden or New Zealand?

ডটগুলো মিটমিট করতে করতে ওয়েবসার্চ রেজাল্ট খুঁজে বার করে সাজিয়ে গুছিয়ে উত্তর দেওয়ার আগের সময়টাকে প্রায় রোজকার মতোই ইনফিনিটি ঠেকে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top