মাটির টান

mother and son in a warm moment

এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বৈঠকখানা যেমন সাজানো থাকে,  তেমনটি সাজিয়ে রাখা। চেয়ারে এক যুবক বসে আছে,  নাম শাশ্বত। মা ঢোকেন,  হাতে একটি বাটি,  চামচ।

মা :  পায়েস করেছি,  নতুন গুড়ের। তুই বলছিলি কদিন ধরে। আসলে তোর বাবা ভালো গুড় পাচ্ছিল না বাজারে। ঠাণ্ডাটা জাঁকিয়ে পড়তে পেল।

শাশ্বত :  দাও। আর একটু বোসো। কটা কথা বলার আছে।

মা :  আমার কি বসার সময় আছে রে বাবু? আটা মেখে রুটি করতে হবে। পায়েসটা ফেলে রাখিস না রে। চা খেতে দেরি হয়ে যাবে। বিকেল শেষ হয়ে আসছে।

শাশ্বত : জরুরী কথা মা।

মা : কি হয়েছে?

শাশ্বত : ব্যাঙ্গালোরের চাকরিটা নিয়ে নিলাম।

মা : বাবা যে বারণ করল!

শাশ্বত : বাবা যদি অবিবেচকের মত কথা বলে,  আমাকে সেটা মানতেই হবে মা?

মা : একেই বাবার সঙ্গে এতো দূরত্ব তোর,  সেটা তো আরো বেড়ে যাবে!

শাশ্বত : বাবা যদি বাবার ঠুনকো আদর্শ নিয়ে এখনও বসে থাকে, আমি কি করতে পারি?

মা : বাবার আদর্শ ঠুনকো!

শাশ্বত : নয়? সবসময় হুকুম করে, ’বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি করবে না, , ইউএসএর তো নয়ই। ‘আরে আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কর্পোরেটে জব তো করবই। বেশিরভাগই তো ফরেন কোলাবরেশন। কি করতে পারি বলত? কে কোথায় আমার দেশের সঙ্গে, অন্য দেশের সঙ্গে কী কূটনৈতিক খেলা খেলছে, তা জেনে আমি করব টা কী বলত? ’

মা : এরপর হয়ত বিদেশ চলে যাবি।

শাশ্বত : সুযোগ পেলে তো যাবই।

মা : আমরা তো এমনটা চাইনি বাবু?

শাশ্বত : জীবনে সবকিছু নিজেদের চাওয়ার মধ্যে থাকেনা মা। পরিস্থিতি বদলে যায়।

মা : তোর বাবা আসলে সারাটা জীবন অন্যরকম ধ্যান ধারণা নিয়ে বেঁচেছে। তুই যেমন যেমনভাবে পড়াশোনা করতে চেয়েছিস, পড়িয়েছে। কিন্তু হয়ত মনে শান্তি পায়নি। বাবার ইচ্ছা ছিল তুই অর্থনীতিবিদ হোস। দেশের জন্য কাজ করিস।

শাশ্বত : আমার ছোট থেকেই যে আবার এসবে কোনও ইচ্ছাই নেই, , এসব আদর্শ, নীতি, ধ্যান, ধারণা নিয়ে আদৌ কিছু হয় বলে মনে হয় তোমার মা?

বাবা সুবিনয় কিছু আগেই ঢুকে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

সুবিনয় : আদর্শ আসলে এক একজনের কাছে এক একরকম বাবুই। আপেক্ষিক। আন্দাজ করতে পারছি তোমরা কী বিষয় নিয়ে কথা বলছ। তুমি নিশ্চিন্তে চাকরিতে জয়েন করো। আমার মত ভেসে যাওয়ার তো কোন প্রয়োজন নেই। তবে আমরা কখনও চায়নি তুমি ইঁদুর দৌড়ে নাম লেখাও। চন্দ্রা আমার পায়েসটা এখানেই দাও। তুমিও নিয়ে এসো। পায়েস শুভ তো। বাবুইয়ের সফলতা উদযাপন হোক।

মা/চন্দ্রা : তুমি আবার এসব সংস্কার কবে থেকে মানতে শুরু করলে?

সুবিনয় : যাপনটাই যে কেমন একটা ধূসর হয়ে যাচ্ছে চন্দ্রা। চাঁদের কাস্তে আর ধারাল আছে বলে মনে হয় তোমার? আমাদের আকাশটাই যে বড় ছোট হয়ে গেছে।

শাশ্বত/বাবুই : বাবা, এসব কিন্ত সেন্টিমেন্টাল কথাবার্তা হয়ে যাচ্ছে। এভাবে আমাকে মানসিক চাপ দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? তোমরাই কিন্তু অনেক কিছুর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করেছ, করে চলেছ। কেন করছ, সেটা ভেবেছ?

সুবিনয় : কি বলতে চাইছ!আমি নিজে নীতি থেকে কখনও বিচ্যুত হইনি।

শাশ্বত :  শুধু নিজেরা ঠিক থাকলেই হবে বাবা। আমাদের এই অবস্থার জন্য দায় কি তোমাদের নেই? কে চায় বলত মানসিক চাপ নিয়ে ছুটে ছুটে বেড়াতে? দিনশেষে আমাদেরও বুঝি শান্তির ঘুমের প্রয়োজন নেই?

চন্দ্রা : বাবুই,  মানসিক চাপে আমরা সকলেই। যে যার মত টিকে আছি। আমি অন্তত তোকে একটুও দোষ দিইনা। পরিস্থিতি এখন যে খুব অস্থির।

সুবিনয় : পরিস্থিতি মসৃণ হলে জীবন বৃথা চন্দ্রা। যাও, পায়েস নিয়ে এসো।

শাশ্বত হঠাৎ ফুপিয়ে ওঠে।

শাশ্বত : আমরও যে ভয় হচ্ছে সেটা ভাবো। বিপুল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি মনে হচ্ছে। আমি কি সাঁতরাতে পারব মা? কোথাও কি সীমানা আছে? থাকে আদৌ?

চন্দ্রা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেন শাশ্বতকে। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলেন,

চন্দ্রা : শান্ত হ বাবুই। আমরা আছি সঙ্গে। শান্ত হ

এক অসীম নীরবতা নেমে আসে মঞ্চে। আলো নিভে গিয়ে আবার মৃদু, হলুদ হয়ে ফিরে আসে।

সুবিনয় চেয়ারে বসে বই পড়ছেন। ঘরে একটি ডিভান জাতীয় কিছু থাকলে ভালো। চন্দ্রা ঢোকেন চা নিয়ে। একটু ক্লান্ত।

চন্দ্রা : বাবুইয়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে। পারবে কি, একা সব সামলাতে?

সুবিনয় : জেনে শুনে বিষ পান করছে তোমার ছেলে। বৃথা ভাবনা করে লাভ কি?

চন্দ্রা : তুমি বাপু খুব নিষ্ঠুর বাবা। এত কষ্ট করে পড়াশুনা করেছে, ও তো উন্নতি করতে চাইবেই।

সুবিনয় : উন্নতি মানে কি শুধু টাকা রোজগার করা?

চন্দ্রা : তা কেন? ভালো জায়গায় কাজ করলে শিখতেও পারবে তো অনেক কিছু। এখন তো প্রতিযোগিতার যুগ। যে যত জানবে, তার পায়ের নিচের মাটি তত শক্ত হবে।

সুবিনয় : তুমি কি জানো, আসলে কোথাও এখন একটুও মাটি নেই। দাঁড়াবে আর কোথায়। সব চোরাবালি। অতলে ডুবছি আমরা।

চন্দ্রা : সব সময় হেঁয়ালি করে কথা কেন যে বলো! আশেপাশের সকলে যখন আরামে থাকতে চায়, একটু স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে জীবন কাটাতে চায়, তখন আমাদের ছেলেই বা না চাইবে কেন?

সুবিনয় : ওর ভালো থাকতে চাওয়া যে অনেকের মন্দ থাকা হয়ে যায়।

চন্দ্রা : মোটেই না। এসব তোমার মন গড়া কথাবার্তা।

সুবিনয় : জানো চন্দ্রা, আমার জেঠু সারাটা জীবন হাহাকার করে গেছেন ওপার বাংলায় ফেলে আসা জমি জিরেতের জন্য। বাবা যখন হাড় ভাঙা পরিশ্রমের পর এই জমিটা কিনে বাড়ি করল, তখনও জেঠুর হা হুতাশ একটুও কমে নি। বড়মা রেগে যেত, আবার আড়ালে চোখের জল ফেলে বলত,  ’ আমাগো সে পুকুর খান,  আমাগো সে আম বাগানের ছায়া হারায় ফেলছি রে চির জনমের লগে। এ বেদনা কুরে কুরে খায় ‘। শিকড়ের মর্ম বুঝল না বাবুই।

চন্দ্রা : (ঘন হয়ে দাঁড়ায় সুবিনয়ের বুকের কাছে) টানাপোড়েন নিয়েই তো জীবন গো বাবুইয়ের বাবা। ছেলেটাও কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সঙ্গে না থাকলে কে থাকবে বলো তো?

একটি শ্যামলা মেয়ে ঢোকে। নাম ঝিনুক।

ঝিনুক : শাশ্বত আছে?

সুবিনয় : আছে। বোসো। বাবুই কে ডাকো চন্দ্রা।

চন্দ্রা চলে যায়।

সুবিনয় : বন্ধু?

ঝিনুক : ঠিক জানিনা। বন্ধু শব্দটার বড় ভার।

সুবিনয় : তা বটে। থাকো কোথায়?

ঝিনুক : কলকাতা। মানে উত্তর কলকাতা। হাতিবাগান।

সুবিনয় : বাবা! সেখান থেকে এই মধ্যমগ্রাম এলে! দাঁড়াও, কিছু খেতে দিতে বলি তোমাকে।

ঝিনুক : না, না। আমি ফিরে যাব এখনই।

সুবিনয় : ফিরতে তো যাবেই মা, তবু যতক্ষণ আছো, ততক্ষণ যে যত্ন করতেই হয়, তাইনা?

শাশ্বত আর চন্দ্রা আসে।

শাশ্বত : তুই, আমাকে তো বলিস নি আসবি যে। তুই বাড়ি চিনলি কি করে?

ঝিনুক : একবার আসব বলেছিলাম, লোকেশন পাঠিয়েছিলিস, মনে নেই?

শাশ্বত : হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কিন্তু আমাকে বললেই তো হত, দেখা করে নিতাম।

ঝিনুক : আমি আসতে চেয়েছিলাম তোর কাছে, , তোর বাসায়।

সুবিনয় : বাসা! বড়মা বলত বাসা!

ঝিনুক : আমার ঠামি বলে।

সুবিনয় : ’ বাসা ছেড়ে কেউ যায়না, যতক্ষণ না বাসা তোমাকে অসহ্য করে তোলে ‘

শাশ্বত : (খুব জোরে) দয়া করে এসব কথা একটু বন্ধ করবে তোমরা ? বিরক্ত লাগছে, ঝিনুক, আমার ঘরে আয়।

ঝিনুক : না, এখানেই একটা প্রশ্ন করি, আগে থেকে কিছুটি না জানিয়ে হঠাৎ করে শুধু একটা মেসেজ, , ’ আমি চলে যাচ্ছি ‘। আমি কি কখনও আটকে রেখেছি তোকে?

শাশ্বত : আমি কি আর আসব না? সকলে এমন ভাবে কেন আমাকে কাঠ গড়ায় তুলছ তোমরা!

চন্দ্রা : আমার মনে হয়, একটু শান্ত হই সকলে।

সুবিনয় : হ্যাঁ, সেই ভালো, চন্দ্রা, ঝিনুককে একটু পায়েস দাও।

চন্দ্রা : ঠিক বলেছ। এখনই নিয়ে আসছি। তুমি বরং শাস্বতর সঙ্গে কথা বল ততক্ষণ। তুমিও এসো। ওদের একটু একলাটি হতে দাও।

ওরা বের হয়ে যায়।

ঝিনুক : তুমি এভাবে পালিয়ে যাচ্ছ শাশ্বত? কথা দিয়েছিলে আমাকে ছেড়ে যাবে না।

শাশ্বত : চোখের সামনে না থাকলেই কি চলে যাওয়া হয়! আমাকে তো একটু নিজের মত করে নিজেকে খুঁজে নিতে দে। নিজে পড়ে, নিজেকে উঠতে দে। বাবা এদিকে মানুষের উড়ানের কথা বলে, মুক্তির কথা বলে, অথচ আমাকে কেন ঘেরাটোপে আটকে রাখতে চায় বলত? তুই কেমন ছেলেমানুষের মত কথা বলিস। দিন বদলে দিতে চাস। হ্যাঁ রে, দিন কি অত সহজেই বদলায়। বা বদলের একই গতিপথে? অন্য ভাবে কি ভাবা যায় না? বদলাতে গেলে আগে যে নিজের আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করতে হবে।

ঝিনুক : আমি যে অন্য ভাবে ভাবতে শিখিনি শাশ্বত। আমি যে ‘আগুনের পরশমণি’ ছাড়া আর কিছু গাইতে শিখিনি।

শাশ্বত : ওই, সেদিন যে গাইছিলিস, প্রিন্সেপ ঘাটে,  ‘বেলা চাও, চাও’ (সুর করেই গায় শাশ্বত)

ঝিনুক এগিয়ে যায় শাশ্বতর দিকে।

ঝিনুক : তুমি দেখা না করেই চলে যাচ্ছিলে কি করে শাশ্বত?

শাশ্বত : বিদায় বলে নিতে নেই রে। না বলে বিদায় নিলে অপেক্ষা মধুর, তাও জানিস না বোকা মেয়ে : কিন্তু আমি তো মেসেজ করলাম। লিখলাম যে ‘ঝিনুকের মধ্যে মুক্তো হয়ে থাকব। শাশ্বত হয়ে, সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়ে যাব।’

ঝিনুক : (কাঁধে হাত রাখে শাশ্বতর,  মৃদু স্বরে গায়), এ তুমি কেমন তুমি, চোখের তারায় আয়না ধরো, এ কেমন কান্না তুমি, আমায় যখন আদর করো…

চন্দ্রা এবং সুবিনয় আসেন।

চন্দ্রা : এসো ঝিনুক, আমার কাছে একটিবার এসো। ( পায়েসের বাটি দেন),  ঝিনুক, বাবুইয়ের বাবা বলেন, সম্পর্ক হল নদীর মতো। ভাঙতে ভাঙতে, গড়তে গড়তে যায়। বাঁধ দিয়ে আটকালে বৃথাই তোলপাড় হয়। বইতে দাও, সইতে দাও।

সুবিনয় : বাবুই, সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে, ঝিনুককে পৌঁছে দিয়ে এসো। ঝিনুক, আবার এসো, আমাদের বাসায়। নদীরও ঘাট লাগে দু দণ্ড জিরোতে।

ঝিনুক : আসব। (পায়েস খাচ্ছিল, শেষ হতে বাটি রেখে) চলো শাশ্বত। আমাকে পৌঁছে দিয়ে এসো।

কাকু,  শাশ্বত আমার বন্ধু। এই বিশ্বাস নিয়ে থাকব, থাকতেই হবে।

চলে যায় দুজন।

সুবিনয় এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ান চন্দ্রার কাছে।

সুবিনয় : বাবুই শিকড় কে ভুলবে না,  তুমি দেখো। খুব শান্তি পেলাম গো আজ।

চন্দ্রা : আমি জানি, বাবুই ঠিক কেমন , কারণ আমি তো এটা জানি, বাবুই যে তোমাকে দেখতে দেখতে বড় হয়েছে। যতই তুমি মুখে বলো, তুমিও জানো, এখনও মাটি আছে গো, আছে।

সুবিনয় : আর আছে মাটির টান।

( চন্দ্রা,  সুবিনয়ের বুকে মাথা রাখেন )

পর্দা পড়তে থাকে।

(এই নাটক নাট্যকারের অনুমতি ব্যতীত কোথাও অভিনয় করা যাবেনা।)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top