সুশ্রী না হওয়ার কিছু অভিজ্ঞতা

tension on an old bus

অভিজ্ঞতা-এক

তখন গ্রাজুয়েশন করতে কলকাতায় গেছিলাম। যদিও পাঠ শিকায় তুলে এক বছর শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসি। সে অন্য গল্প। ভাঙাচোরা, কালো, ল্যাক প্যাক চেহারা। টিউশন পড়াতে যাবো নবিনা সিনেমা হলের কাছে। হাতল ধরে দ্বিতীয় পাদনিতে দাঁড়িয়ে বাসের হ্যান্ডেল ধরে। আনোয়ার শাহ রোড ধরে এগোচ্ছে বাস। পরের স্টপেজেই নবিনা। ঠিক সেই সময় একজন নবিন ভ্রদ্রমহিলা বললেন, ভাই নবীনাতে রাখবে। আমি বুঝতে পারিনি বক্তা আমাকেই বলছেন। এবার ঝাজালো স্বর, ‘বলছিনা নবিনা তে রাখতে। আমি স্মিত হেসে সম্মতি জানালাম। ভেতরে তখন কন্ডাকটরের সহকারীর ট্রেড মার্ক ঘোষণা। ‘নবিনা… নবিনা… জায়গা দিন, হালকা করুন… দিদি নামুন নামুন ‘। নবিনা দিদি নামলেন। আমিও নামলাম। কিন্তু মুখের ভাবটা এমন রাখলাম যেন বাস ছাড়লেই লাফ দিয়ে সিঁড়িতে। মানে কন্ডাকটরের সহকারীর সহকারী। কিন্তু হয়ে ওঠা হলোনা। তবে একটা বিষয় মাথায় এসেছিলো যে পকেট মাররা অনেকটা আমার মতোই দেখতে হবে। মানে ভিড়ে মিশে গেলে চট করে ধরা যাবেনা। নবিনা দিদি দুটো পেশার পথ দেখিয়ে ছিলেন। সুশ্রী না হওয়ার বাড়তি সুযোগ টা হারালাম।

অভিজ্ঞতা- দুই

জীবনে প্রথম চাকরি, কোহিমার একটি প্রাইভেট কলেজে, ১৯৯৯ সাল, সদ্য এম. এ পাশ করে। শীর্ণকায় চেহারা নিয়ে ক্লাস এ ঢুকলাম, ক্লাস রুম এ জানলায় কোনো গ্রিল জাতীয় বাঁধা নেই, মানে ছোট দরজার মতো। একটি ছাত্র, আকৃতিতে আমার দেড়গুন। রোল কল এর সময় ও ভারী গলায় ইয়েস বলে একটা কড়া চোখে তাকালো। বুঝিয়ে দিলো এই রকম ক্ষীণকায় আর যাই হোক টিচার হতে পারেনা। তারপর সে দরজার বদলে, হাই বেঞ্চ এ উঠে জানলা দিয়ে বেড়িয়ে গেলো। আমার কিন্তু ভালোই লেগেছিলো। কারণ বুঝলাম যে এটা আমার অ -অধ্যাপক চিত চেহারার জের।

অভিজ্ঞতা- তিন

পরের ঘটনাটা ২০০৩-এ। তখন সিকিম গভর্মেন্ট কলেজে পড়াই। মালদাতে ফিরতাম তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস এ। যাইহোক, স্লীপার কামরায় বসেছি। উল্টো দিকে আর্মির একজন লোক, আমাকে জিজ্ঞেস করলো ‘ কাহা সে আ রহে হো? আমি বললাম ‘গ্যাংটক সে।’ আমার দিকে ভুরু কুঁচকে আধসোয়া অবস্থায়, অনেকটা মগণলাল মেঘরাজের ভঙ্গিমায় জিজ্ঞেস করলো, ‘কয়া করতে হো?’, আমি একটু গদ গদ ভাবে বললাম,’ কলেজ মে পারহাতা হু’। আর্মি ভদ্রলোকের ঝাঁঝালো উত্তর, ‘ঝুট কিউ বলতে হো?’। আমি ক্ষীণ স্বরে বোধ হয় বলতে পেরেছিলাম, নেহি স্যার, শাচ বতা রাহা হু!’, আমার ক্ষীণ আওয়াজ শুধু ওই আর্মির সহযাত্রীকে আরেকটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে দেখলাম। আমি ট্রেন এর বাথরুম এর ঝাপসা আয়নার দিকেও তাকাতে আর সাহস পাইনি।

অভিজ্ঞতা- চার

সেই সিকিম গভর্নমেন্ট কলেজেই পড়াই। ঘুম থেকে ওঠার ব্যাপারে ভীষণ অলস , আজও তা যত্নে লালন করছি।

ঘুমের মধ্যেই মর্নিং ওয়াক, প্রাণায়াম এবং ঘুমিয়ে শবাসন যে সব আসনের মূল সেটাও আমি কায়, মনো, বাক্যে অনুসরণ করে যাচ্ছি । হাঁটা সম্পর্কে আমার ধারণা খুব পরিষ্কার । হাঁটলে অযথা হাঁটুর ওপর চাপ পরে , ভালো হাঁটুর ওপর বাড়তি চাপ দেওয়ার কোনো মানে হয়না।

যার ফলে দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম, যদিও সেটা আমার কাছে ভোর রাত ,মানে প্রায় সকাল সাড়ে আটটা ।

সকাল নয়টায় প্রথম ক্লাস , দেরি করার কোনো জো নেই। শীতের জায়গা , ফলে স্নানের বদলে চুলে একটু জল দিয়ে আর বেশি করে পারফিউম দিয়ে দ্রুত তৈরী হওয়ার চেষ্টা শুরু হল। আমার কলেজ থেকে ভাড়া বাড়ীর দূরত্ব হেঁটে নয় মিনিট। তাও আবার উৎড়াই তে নামা ফলে বুকের হাপরে চাপ কম। নাহ , তাও পারলামনা। জাস্ট পাঁচ মিনিট বাকী ক্লাস শুরু হতে তখন।

জটপট রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে , সাপের মতো নেমে যাওয়া লোকাল মারুতি ভ্যান গুলোকে হাত দেখাচ্ছি, আর বলছি তাদং কলেজ, তাদং কলেজ…। ওই সময়ে গাড়ি গুলি ছাত্র ছাত্রী নিয়ে আসে বলে ভরা থাকে। গ্যাংটকে সিকিম গভর্নমেন্ট কলেজ ওই নামেই পরিচিত। তাদং জায়গাটার নাম। যাইহোক ভরা গাড়ি গুলো আমার দিকে না তাকিয়ে নেমে যাচ্ছিলো । একজন ড্রাইভার গাড়িটা শেষ মেশ গতি কমাল, জানলা দিয়ে মুখ টা বাড়িয়ে বললো ‘এত্র সিয়ানু ছোড়া, হিনের জানু সকদাইনা’? মানে সহজ’। এতটুকু পুঁচকে ছোকরা , হেঁটে জেতে পারোনা’ ? ঝাঁঝালো উত্তর দিয়ে আপাত খালি গাড়িটা নিয়ে নেমে গেলো। আমি কিম – কৰ্তব্য- বিমুরুহ ! দূরে ক্লাস শুরু হওয়ার বেলের আওয়াজ বাজছে। আমার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানির আওয়াজ তখন হাতুড়ির মতো বাজছে আর কানে বাজছে , পুঁচকে ছোড়া হেঁটে জেতে পারোনা।

অভিজ্ঞতা- পাঁচ

টাই পড়া, শুট, বুটের একটা আলাদা মাহাত্য আছে সমাজে সেটা নিয়ে বিতর্কে যাওয়ার অভিপ্রায় নেই। আমার কাছে ব্যাপারটা জটিল, টাইয়ের নট বাঁধা আর পায়জামার দড়ির গীট ছাড়ানো, দুটোই আমার কাছে সমান। তাই টাই এ অরুচি। কিন্তু গল্প টা অন্য।

সিকিম গভর্নমেন্ট কলেজ এ পড়ানোর সময় ভালো পেট পুজোর উদ্দেশ্যে এম. জি. মার্গ এ আমার সতীর্থ অধ্যাপক দাদা, সত্যদীপ দার সাথে যেতাম। মোটর সাইকেলর পিছনে বসে। কিন্তু রাত ৯ টার পর তাদং চেক পোস্ট এর গেট পরে যেত। সেটা পার হওয়া বেশ চাপের। যাইহোক সত্যদীপ দা ভরসা যোগালো।

যথারীতি রাত ১১. ৩০ টায় ফিরছি। গেট এ আটকালো। কিছু কঠিন প্রশ্ন করার জন্য পুলিশ প্রস্তুত। সত্যদীপ দা ভারী শীতের জ্যাকেট টার বুকের চেন টা নামিয়ে টাইটা দেখালো আর বললো তাদং কলেজ। টাই টা দেখে পুলিশ সেলাম দিলো সত্যদীপ দা কে। গেট খুলে গেলো। আমি টাই মাহাত্য বুঝলাম। পরে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সতীর্থ দাদা বললো ‘এবার বুঝলি কেন টাই টা লাগিয়েছিলাম।’ টাই এর নট বাঁধা শেখা হয়নি। কিন্তু একটা টাই কিনে ওই দাদার সৌজন্যে নট বেঁধে ঢিলে করে আলমারি তে ঝোলানো থাকতো, প্রয়োজনে মোজা গলানোর মতো গলায় ঝুলিয়ে একটু টেনে দিতাম। পাছে চেক পোস্টে না আটকে পড়ি।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top