উলুম দানু এবং
ব্রেকফাস্টে নতুন কিছু পাওয়া গেল না। সেই নুডলস, ফল আর ব্ল্যাক কফি। তবে একটা কথা না বললেই নয়, আমরা যে হোটেল গুলোতে ছিলাম, প্রত্যেকটা হোটেলে আসাম চা বা লিপটনের অন্য চায়ের ডিপ পাউচ দেওয়া থাকছিল যথেষ্ট পরিমাণে। ইলেকট্রিক কেটলিতে জল গরম করে রোজ সকালে সেই চা (দুধ এবং চিনি ছাড়া, যদিও গুঁড়ো দুধ আর চিনির পাউচ দেওয়া থাকছিল) আমরা খুব উপভোগ করেছি। এর আগে থাইল্যান্ডে গিয়ে যেমন প্রচুর ফল খেয়েছিলাম, এখানেও সেই একই পথ অনুসরণ করেছি। যাই হোক, ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম উলুম দানুর উদ্দেশে।
উলু শব্দের অর্থ আগেই বলেছি। দানু শব্দের অর্থ হলো জল বা লেক। একটা বিশাল লেকের গায়ে এবং ভেতরে অনেকটা জায়গা জুড়ে এই মন্দির। এই লেকের নাম ব্রাতান বা বেরাতান। বেরাতান লেকের গায়ে অবস্থান করে বলে এই মন্দিরকে উলুম দানু বেরাতান মন্দিরও বলে। মন্দিরটি জলদেবী দেউই দানু-কে উৎসর্গ করে আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে তৈরি করা হয়। এখানে যেমন শিব, পার্বতী সহ হিন্দু দেব দেবীর আরাধনা হয়, তেমন বৌদ্ধ মূর্তিও পাওয়া যায়। যে দিকে চোখ যাবে, সেদিকেই সুন্দর সুন্দর স্ট্যাচু আর অযুত-নিযুত ফুলের বাহার। কত রকমের আর কত রঙের যে ফুল আছে এখানে! আর মন্দির কী একটা আছে নাকি? একই প্রযুক্তির সেই গেটও আছে। মূল মন্দিরটা লেকের সামান্য ভেতরে। খড়ের ছাউনি দেওয়া এগারোটি স্তরের এই মন্দির মূলত শিব, পার্বতীকে উৎসর্গীকৃত। এই মূল মন্দিরটি লেকের ওপরে ভাসমান। পুরো মন্দির চত্বর ঘুরে দেখতে দেখতে ওখানকার স্থাপত্য কীর্তি দেখে অবাক হতেই হবে।
বেশ সময় লেগে গেল উলুম দানু ঘুরে দেখতে। বালিতে আজই আমাদের শেষ দিন এবং রাত। কাল সকাল দশটায় ফেরার ফ্লাইট। সুতরাং কাল আর কিছু দেখার সুযোগ নেই। আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে একটা হোটেলে গিয়ে সেই নাসি গোরেং আর মি গোরেং মিলিয়ে লাঞ্চ করে নিলাম। তারপর আদির উপদেশ মতো চলে গেলাম একটা পার্কে। বেরাতান লেকেরই অন্যদিকে, লেকের একদম ধারেই একটু উঁচুতে অদ্ভুত এই পার্কটা। খুব বেশি চওড়া নয়, লম্বাও কম। কিন্তু এরই মাঝে ওখানকার লোকজন পার্ক টাকে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য সাজিয়ে রেখেছে। সুইং আছে, বসে ফটো তোলার জন্য হৃদয়াকৃতির এবং গোলাকৃতির সেট আছে এবং ফটো তোলার জন্য আলাদা ফিস আছে। আমার আর সহধর্মিণীর ফটো তোলার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ওখানকার দুজন মহিলা একপ্রকার জোর করেই আমাদের অনেক ছবি তুলে দিল। বক্তব্য খুব পরিষ্কার, ফিস যখন দিয়েছেন তখন ছবি কেন তুলবেন না? আমাদের সাথে পার্থক্যটা আবার বড় বেশি করে চোখে পড়ল। এই আন্তরিকতা আমরা দেখাতে পারি না কেন? মামের অবশ্য ছবি তোলাতে কোনো বিরাম নেই। হাজার ছাড়িয়ে বোধহয় লক্ষ অতিক্রম করার অপেক্ষায় তার ছবির সংখ্যা।



ওখান থেকে বেরিয়ে আমাদের অনুরোধে আদি একটা আর্ট এম্পোরিয়ামে নিয়ে গেল। অনেক রকমের হাতে তৈরির জিনিসের (জামাকাপড় সমেত) সম্ভার সেখানে। কিছু কিছু জিনিস সত্যিই চোখে লাগার মতো। সেগুলোর গায়ে ইন্দোনেশিয়ান রুপিতে যে দামগুলো লেখা আছে, আমাদের অনভ্যস্ত চোখ তা দেখে হৃদয় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। দু-একটা উদাহরণ দিই। মেয়েদের মাথায় বাঁধা ক্লাচারের দাম লেখা আছে ৬০,০০০ টাকা, একটা ফুলস্লিভ জামার দাম ৪,৫৬,০০০ টাকা, একটা ছোট্ট ভ্যানিটি ব্যাগের দাম ২,৫০,০০০ টাকা ইত্যাদি, ইত্যাদি। খুব বেশি দেরি করা যাবে না এখানে। এখনও হান্ডারা গেট দেখা বাকি আছে। বালিতে গিয়ে উবুদ সুইং, উলুম দানু মন্দির আর হান্ডারা গেটের ছবি না তুললে এবং সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট না করলে স্ট্যাটাস ডাউন হয়ে যাবে। অতএব ছোটো হান্ডারার দিকে।
শেষবারের মতো
হান্ডারা গেট আসলে সেই মাঝখানে মসৃণ করে কেটে দুদিকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া প্রযুক্তিরই গেট। বালিতে এমন গেট কয়েক লক্ষ আছে। তাহলে এই গেট আলাদা করে দেখার কী আছে? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আমার চোখে অন্তত তেমন কোনো পার্থক্য ধরা পড়েনি। হ্যাঁ, গেটটা সাইজে অনেকটাই বড়। বালির প্রথম গল্ফকোর্স হান্ডারার প্রবেশ দ্বার হিসেবে ১৯৭৬ সালে বালির ঐতিহ্যপূর্ণ গেট শিল্পের প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয় এই গেট। এখন গেটের গায়ে প্রচুর জঙ্গল চোখে পড়ল। বালিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের ফটো শুটের এক সুন্দর জায়গা এই হান্ডারা গেট। গেট বরাবর সোজা দৃষ্টি চালিয়ে দিলে চোখ ধাক্কা খাবে সবুজ বনানী আর পাহাড়ের গায়ে। চত্বরে পৌঁছে কাউন্টারে টিকিট কাটা হলো। মানে, ফটো তোলার জন্য লাইন দেওয়া হলো। ক্রম অনুসারে আমাদের আগে আরো চোদ্দো জন/গ্রুপ লাইনে আছে। অতক্ষণ অপেক্ষা করার সময় আমাদের নেই। অতএব সোশ্যাল মিডিয়ায় ইজ্জত বাঁচানোর জন্য সাইড থেকে ছবি তুলে হান্ডারাকে বাই-বাই করে বেরিয়ে এলাম। আপাতত বালি ভ্রমণ এখানেই শেষ।


কুটায় “হোটেল আদি জায়া”-তে আমাদের ঘর বুক করা ছিল। এটা এয়ারপোর্টের কাছে এবং ডিসকভারি মলের পাশে। শেষ দিনে এমন একটা জায়গায় হোটেল নেওয়ার কারণ, যদি ইন্দোনেশিয়ান রুপি কিছু হাতে থাকে তাহলে মল থেকে কিছু কেনা যাবে আর পরদিন সকালে এয়ারপোর্টে তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যাবে। ওখানে পৌঁছাতে রাত প্রায় ন’টা বেজে গেল। তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে মালপত্র গুছিয়ে আমরা মলে গেলাম। মলের পাশে তখন ওপেন এয়ার ফাংশন চলছিল। খোলা আকাশের নিচে কয়েকজন মিউজিক্যাল হ্যান্ডস নিয়ে গান বাজনা করছে। বেশ কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। খুব ভালো লাগছিল। মলে গিয়ে কিন্তু একদমই ভালো লাগল না। জিনিসের দাম শুনে মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছিল। আফশোস হচ্ছিল, আদির নিয়ে যাওয়া শপ থেকে কেনা হল না! ওখানে প্রায় অর্ধেক দাম ছিল জিনিস পত্রের। কিছু না কিনে ফিরে এলাম হোটেলে।
পরদিন সকালে সাতটার সময় আদি এসে হাজির। হোটেলে চেক আউট করে আদির সাথে বেরিয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশে। দশটায় ফ্লাইট। এয়ারপোর্টের গেটের মুখে আদি আমাদের নামিয়ে দিল। ওকে “বাই” বলতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি বললাম, “তারিমা কাশি আদি, ফর এভরিথিং ইউ হ্যাভ ডান ফর আস।” ও ইন্দোনেশিয়ান স্টাইলে হাতজোড় করে বলল, “ধন্যবাদ পাপা”। ও চলে যাওয়ার পরেও ওর যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা।

আমাদের এখানকার রেল কুলিদের মতো লাল জামা আর মাথায় বালিনিজ টুপি পরা একজন এয়ারপোর্টের ট্রলি নিয়ে এসে আমাদের ব্যাগ গুলো ট্রলিতে তুলে নিল। আমরা ভাবলাম, এয়ারপোর্টের পোর্টার হবে হয়তো। যদিও এমন পোর্টার কোনো এয়ারপোর্টে কোনোদিন দেখিনি। আমাদের ভেতরে নিয়ে এসে ব্যাগগুলো নামিয়ে ও হাত পেতে টাকা চাইল। অবাক হলাম। তবুও কত দিতে হবে জানতে চাইলাম। বলল, এক লাখ। সর্বনাশ! বলে কী? এইটুকু আসার জন্য এত দাম দিতে হবে বুঝিনি। শুধু বুঝলাম, ও আমাদের টুপি পরিয়েছে। দর দস্তুর করে পঞ্চাশ হাজার (ইন্দোনেশিয়ান) দিয়ে মুক্তি পেলাম। সমস্ত ফর্মালিটি মিটিয়ে এক গাদা টাকা খরচ করে ওখানে কিছু খেয়ে নির্দিষ্ট ফ্লাইটের পেটে ঢুকে গেলাম যথা সময়েই। নির্দিষ্ট সিটে বসেও গেলাম। মন কি একটু খারাপ? মোটেই না। প্রথমত, একবুক আনন্দ নিয়ে ফিরছি। মনের মাঝে অজস্র সুন্দর সুন্দর ছবি। দ্বিতীয়ত, অনেকদিন ভাত, বিউলির ডাল, আলু পোস্ত আর মাছের ঝোল খাইনি। বাংলার মাটিতে ফিরেই আগে…।



